কৃষি বিল নিয়ে তোলপাড় দেশ, ধন্দে রাজ্যের শষ্যগোলা বর্ধমানের চাষিরা

ঠকে ঠকে চাষি এখন সার বুঝে গেছেন। আর ঠকতে রাজি নন তাঁরা। কৃষি বিল রাজ্যসভাতেও পাশ হয়ে গেছে। গোটা দেশে আলোড়ন। শস্যগোলার চাষিরাও আগ্রহী কী হতে চলেছে তা জানতে। এটা যে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: কোভিড বিপর্যয়ে থমকে গোটা দেশ। হাড়ির হাল জিডিপির। গোটা দেশে হাজার হাজার মানুষ কর্মহারা। এই গভীর বিপর্যয়ে অবহেলিত কৃষিই এখন ভরসা। সেই তখনই কেন্দ্রের আনা কৃষি বিল নিয়ে তোলপাড় দেশ।

অবিভক্ত বর্ধমানকে শস্যগোলা বলা হত। ধান চাষে এ জেলা এখনও এক নম্বরে। আলুতে স্থান হুগলির পরেই। গত কয়েকদিনে জেলার নানা প্রান্তে কৃষি বিল নিয়ে চাষিদের কপালে গভীর ভাঁজ। মফস্বলের চায়ের দোকান বা গ্রামের আটচালা আলোচনা জোরদার। সারা ভারত কৃষকসভার রাজ্য সম্পাদক অমল হালদার বলেন, ‘‘চাষির কথা এতদিন কেউ ভাবেনি। ভাবেও না। এই কৃষি বিল নিয়ে গোটা রাজ্যে বড় ধরণের আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। কারণ এই বিল রূপায়িত হলে আবার আকাল নামবে। দুর্ভিক্ষ আসবে। আবার খাদ্য আন্দোলন করতে হবে।’’

অমলবাবুর যুক্তি, মান্ডি ছাড়া গোটাটাই খোলাবাজারের হাতে ছেড়ে দিলে ভয়ানক বিপর্যয় ঘটবে। প্রথমে নানা সুযোগ সুবিধা দিলেও কৃষিপণ্যের বাজারটা কর্পোরেটের মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হবে। চাষি কার্যত দাসে পরিণত হবে। যা খুশি তাই দামে কেনা হবে চাষির কষ্টের ফসল। আর ঢালাও চুক্তিচাষে বড়বড় কোম্পানি তাদের লাভটুকু বুঝে নেবে। লাভজনক ফসল উৎপাদন করবে কর্পোরেট। যা বাইরে যাবে; যা বেশি মুনাফা দেবে। মার খাবে খাদ্যশস্যের উৎপাদন। দেশের মানুষ বিপন্ন হবে। খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।

এই বিলকে বিপদ হিসেবে দেখছে তৃণমূল কংগ্রেসও। গোটা জেলায় রবিবার এই বিলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেছে রাজ্যের শাসকদল। দলের জেলা মুখপাত্র প্রসেনজিৎ দাসের কথায়, ‘‘আবার নীলকর সাহেবদের দিন ফিরিয়ে আনার চক্রান্ত চলছে। কেন্দ্র সরকার কারও কথা শুনছে না। নিজেদের মর্জিমতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এ রাজ্যে কিষাণ মান্ডি-সহ নানা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে চাষির স্বার্থে।একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। দায় বিপদে পাশে থেকেছে। কিন্তু দেশের সরকারের নীতিতে চাষিরা বিপন্ন।’’ তাঁরা গ্রামে গ্রামে মানুষের কাছে এই বিলের বিপদের কথা তুলে ধরবেন বলে জানালেন প্রসেনজিৎ।

আমড়া গ্রামের শেখ নজরুল দু’রকম ভাবেই চাষ করেন। চুক্তিতে ধান আলু করেন। আবার নিজেও চাষ করেন। প্রায় সতেরো বিঘে জমি আছে তাঁর। এই চাষির কথায়, এখানে কিষাণ মান্ডির সুযোগ তাঁরা নিতে পারেন না। নানা নিয়মের কারণে তাঁদের খোলাবাজারে পণ্য বেচতে হয়। তিনি বলেন, ‘‘উৎপাদন বেশি হলে তাঁদের যা খুশি তাই দামে জিনিস বেচতে হয়। দামের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না চাষির। তার উপর সার বীজ কীটনাশকের দাম দিনের পর দিন নাগালের বাইরে। এটা নিয়ে ভাবছে না কেউ। ভর্তুকি কমেই যাচ্ছে। খরচ বাড়ছে আর লাভ কমছে। চাষি বাঁচবে কীভাবে?’’

অন্যদিকে ধান-আলু-শশা-সবজি সবই চাষ করেন প্রদীপ চক্রবর্তী। তাও চাষে লাভ নেই। তাই দক্ষিণ ভারতে পুজো করতে যান তিনি। বললেন, ‘‘চোখের সামনে হাত ফেরতা হয়ে দাম বাড়তে দেখি। চাষি থেকে যায় তিমিরে।’’ উনিও চুক্তিপ্রথায় আলু চাষ করেন। তাঁর কথায়, ‘‘চুক্তি প্রথায় ন্যুনতম দামটুকু পান চাষি। আলুতে দামের ওঠানামা প্রচণ্ড। যে বছর বাজার নেমে যায়, সে বছর মাথায় হাত পড়ে। তবে সব কিছুর উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার।’’ নিজে শশা লাগিয়েছেন দশ কাঠায়। বিশ্বকর্মা পুজোর আগে দাম পাবেন ভেবে। যে শশা বর্ধমানে ১৫ টাকায় বেচেছেন তিনি চোখের সামনে তা ৩০ টাকায় হাত ফেরতা হচ্ছে। বললেন, ‘‘চাষির পণ্য বিপণনের সুবন্দোবস্ত না থাকলে লাভ হবে না।’’

আবার টোটপাড়া গ্রামের চাষি সুপ্রভাত ঘোষ চুক্তিচাষ ছেড়ে দিয়েছেন। জানালেন ওতে এজেন্টের বড় উৎপাত।প্রাকৃতিক কারণে ফসলের দাগ হলে তা নেয় না কোম্পানি। এবছর আলুর দাম পেয়েছেন তাঁরা। আগের তিনবারই অবশ্য দামে মার খেতে হয়েছে। ৩২ বা ৩৫ টাকায় আলু বিক্রি হলেও তার সুফল চাষি পান না। তাঁর মত, একাধিক কোম্পানি এলে দর কষাকষির সুযোগ বাড়বে। চাষে খরচ বাড়ছে। সার, চাপান, লেবার- সব খরচই দিনের পর দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। গতবারে একবিঘে আলু চাষে ২৩-২৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেখানে একবিঘা জমির ফসল বেচে ঘরে এসেছে ১৮ হাজার টাকা। এবছর আলুর সর্বোচ্চ দাম পেয়েছেন প্রতি কেজি ১০ টাকা। সেই আলু বাজারে এখন ৩২ টাকা।

জেলার শক্তিগড় বড়শুল এলাকায় আলুতে চুক্তিচাষের প্রথা প্রায় পনেরো বছর ধরে চলছে। মূলত চিপসের জন্য কনট্রাক্ট ফার্মিং চলে এখানে। ধানেও গত কয়েকবছর এই প্রথার প্রচলন হচ্ছে। বেশ কয়েকজন গত এক দশকের বেশি এভাবে চাষ করছেন। আমড়া, বেলনা, টোটোপাড়া গ্রামে কৃষকদের বেশিরভাগ কিন্তু চুক্তিচাষ প্রথায় অভ্যস্ত। গত কয়েকবছর এভাবে চাষ করে অন্তত একটা বাঁধা দাম পেয়েছেন। কিন্তু একইসঙ্গে এজেন্টদের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ। তাঁদের ক্ষোভের কারণ, একই এলাকায় নানা মাঠে নানা দর। চাষির অসুবিধা না ভাবা। কিন্তু একাধিক কোম্পানি এলে তাঁরা দর কষাকষির সুযোগ পাবেন মনে করছেন অনেকেই।

আলু চাষ খুব অনিশ্চিত। এখানে বাজার ওঠানামা করে খুব। এ বছর আলুর দাম চড়া। চাষি হয়তো কিছুটা লাভ পেয়েছেন। কিন্তু সিংহভাগ কখনই পাননি। অন্যবার দাম না থাকলে মাথায় হাত। চুক্তিচাষে মোটামুটি একটা দর তাঁরা পেয়েই থাকেন। অন্যদিকে কৃষাণ মাণ্ডিতে অনেকেই ধান দিতে পারেননি। দূরত্ব আর নিয়মের জটিলতার কারণে তাঁরা সহায়ক মূল্যে ধান দেননি। পরিবর্তে খোলাবাজারেই পণ্য বেচেন।

বাজার আরও খুলে গেলে পণ্য চলাচল বাড়তে পারে। কিন্তু এখানেও একটা মৌলিক সমস্যার কথা বলেছেন তাঁরা। যখন উৎপাদন বেশি হয় তখন পণ্য বিপণনের নেটওয়ার্ক ঠিকমতো কাজ না করলে তারা দাম পান না। অন্যদিকে কৃষি উৎপাদনের খরচে কোনও লাগাম নেই। সার-বীজ-কীটনাশকের দামে কোনও রাশ নেই। দিনের পর দিন ভর্তুকি কমেছে এসব খাতে। তাই চাষির লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যায়। ঠকে ঠকে চাষি এখন সার বুঝে গেছেন। আর ঠকতে রাজি নন তাঁরা। কৃষি বিল রাজ্যসভাতেও পাশ হয়ে গেছে। গোটা দেশে আলোড়ন। শস্যগোলার চাষিরাও আগ্রহী কী হতে চলেছে তা জানতে। এটা যে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন। কেন্দ্রের নয়া কৃষি বিল জেলার কৃষকদের ধারণা এখনও খুব স্পষ্ট নয়। তাই তাদের বক্তব্য, আসল সমস্যার দিকে দৃষ্টি দিক সরকার। যাতে উৎপাদন খরচ কিছুটা কমে। সরবরাহ স্বাভাবিক হোক। আর ন্যয্য দাম পাক চাষি। তবেই হাসি ফুটবে চাষির মুখে।

 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More