ইন্দিরাদেবীকে লেখা চিঠি ছুঁয়ে ২৫শে বৈশাখ কবিকে স্মরণ করে কোচবিহার, এবারও সেজে উঠেছে রায় বাড়ি

শান্তিনিকেতনের ‘শ্যামলী’ থেকে চিঠি লিখেছেন কবি। চিঠি পৌঁছেছে সাতশো কিলোমিটার দূরে কোচবিহারে। ইন্দিরা নারায়ণ রায়ের কাছে। কবির স্নেহধন্য ইন্দিরা! একটা বা দু’টো নয়, নিয়মিতই কবি চিঠি লিখতেন ইন্দিরাকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দিব্যেন্দু ভৌমিক, কোচবিহার: লকডাউন। তবুও নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি সানি কটেজে। আলমারির পাল্লা খুলে আগলে রাখা ইতিহাস সাজিয়ে রেখেছেন ষাটোর্ধ্ব আশিস রায়। কেউ কেউ যে আসবেনই কবির টানে। আজ যে ২৫শে বৈশাখ।

    ‘‘কল্যাণীয়েসু , তোমার চিঠিখানি পেয়ে খুশি হলুম। নানা প্রদেশ ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আর কিছু দিন পর হাওয়া বদলের জন্য কোথাও যাবার ইচ্ছে আছে। ইতিমধ্যে ব্যস্ত আছি বুড়ির বিয়ের উদ্যোগে। …আগামী ১২ বৈশাখে বিয়ের দিন । …এই সময় তুমি থাকতে পারলে খুব খুশি হতুম । …আশা করি আবার কখনো একবার তোমার আসবার অবকাশ জুটবে । ইতি ৪ বৈশাখ , ১৩৪৩ , আশীর্বাদক -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’’

     

    শান্তিনিকেতনের ‘শ্যামলী’ থেকে চিঠি লিখেছেন কবি। চিঠি পৌঁছেছে সাতশো কিলোমিটার দূরে কোচবিহারে। ইন্দিরা নারায়ণ রায়ের কাছে। কবির স্নেহধন্য ইন্দিরা! একটা বা দু’টো নয়, নিয়মিতই কবি চিঠি লিখতেন ইন্দিরাকে। লিখতেন কবির পুত্রবধূ প্রতিমাদেবীও।

    ত্রিপুরার রাজ পরিবারের মেয়ে ছিলেন ইন্দিরা। এই রাজ পরিবারের সঙ্গে যেহেতু রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক যোগ ছিল তাই খুব ছোট থেকেই ইন্দিরাকে চিনতেন কবি।  ভালোও বাসতেন। পরবর্তীতে তাঁর বিয়ে হয়েছিল কোচবিহারের মহারাজা জিতেন্দ্রনারায়ণ ভূপ বাহাদুরের এডিসি ক্যাপ্টেন পূর্ণানন্দ রায়ের সঙ্গে। সেই সূত্রে কোচবিহারের রাজবাড়িতেও অবাধ যাতায়াত ছিল ইন্দিরার। সেই সময় কোচবিহারের মহারানিও ছিলেন আরেক ইন্দিরা। তখন ইন্দিরা নারায়ণ রায় মহারানির ‘অফিসিয়াল কম্পানিয়ন’। তাঁর তত্ত্বাবধানেই রাজকুমারী ইলা, আয়েশা ওরফে গায়ত্রী দেবীকে পড়তে পাঠানো হয়েছিল শান্তিনিকেতনে। যতদিন বেঁচে ছিলেন কবি ততদিনই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল ইন্দিরার সঙ্গে। ১৯৭৮ সালে প্রয়াত হয়েছেন ইন্দিরা নারায়ণ রায়ও।

    কোচবিহারে কোনওদিন আসেননি কবিগুরু। তাই এই জেলার সঙ্গে কোনও স্মৃতি জড়িয়ে নেই তাঁর। এখানকার মানুষদের কাছে এটা বিশাল অপ্রাপ্তি। ইন্দিরাদেবীকে লেখা কবির চিঠিতে তাই তাঁকে খুঁজে নেন কোচবিহারের মানুষ। প্রতি বছর  রবীন্দ্রানুরাগীদের ঢল নামে কোচবিহারের সিলভার জুবিলি রোডের সানি কটেজে। ‘রায় বাড়ি’ হিসেবেও অনেকের কাছে এই বাড়ির পরিচিতি।

    ইন্দিরাদেবী চলে গেছেন ৪২ বছর আগে। এখন তাঁকে লেখা কবির চিঠি, উপহারসামগ্রী, রাজ আমলের গ্রামোফোন, বাকিংহাম প্যালেস থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া সোনার পাতে মোড়ানো বাইবেল, নন্দলাল বসু ও শান্তিদেব ঘোষের লেখা চিঠি, শচীন কর্তার দেওয়া নানান উপহার, সবই আগলে রেখেছেন ইন্দিরা-পূর্ণানন্দর নাতি আশিসবাবু। বললেন, ‘‘প্রতিবছর ২৫শে বৈশাখ বহু মানুষ আসেন আমার ঠাকুরমাকে লেখা কবির চিঠি ও শান্তিনিকেতনের আরও কিছু নিদর্শন দেখতে। তাই সব বের করে এই বিশেষ দিনটিতে সাজিয়ে রাখি। এবার লকডাউন। তাও কেউ যদি এসে পড়েন! এবারও সাজিয়ে রেখেছি সব। খুব ভাল লাগে। কবি প্রণামের দিন সবাইকে যত্ন করে দেখাই আমার ঠাকুরমাকে লেখা বিশ্বকবির চিঠি।’’

    পরক্ষণেই উদাস হয় যান আশিসবাবু। বলেন, ‘‘আমাদের এই বাড়িটি হেরিটেজ হয়েছে। এতো ইতিহাস! এতো নথি! কতদিন আগলে রাখতে পারব কে জানে!’’

    রবীন্দ্র গবেষক ডঃ আশিস নাহার কথায়, ‘‘রবীন্দ্রনাথ কোচবিহারে কোনদিনই আসেননি। ইন্দিরা রায়ই ছিলেন কোচবিহারের সঙ্গে কবির যোগসূত্র।’’ সেই যোগসূত্রকেই আজও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন ইন্দিরাদেবীর নাতি। ২৫শে বৈশাখ তারই উদযাপন।

     

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More