Latest News

ইডেন থেকে হাতিবাগান মোড়, সাধারণের ভিড়েও অসাধারণ, দুর্গতদের সাহায্যে অকৃপণ উৎপল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওই ঘটনা বঙ্গ ক্রিকেটে সোনায় মোড়া রয়েছে। সিএবি-তে এখনও কান পাতলে শোনা যায় সেদিনের ঘটনা।

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস, বাংলা বনাম হায়দরাবাদ রঞ্জি ম্যাচে মোট আট উইকেট পেয়ে উৎপল চট্টোপাধ্যায় ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন। বাংলা পৌঁছে গিয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালে।

সেই ম্যাচ খেলেই অবসরে চলে যান উৎপল। ঘটনা সেটি নয়, ওই ম্যাচে হায়দরাবাদকে একাই হারিয়ে তিনি সিএবি থেকে বেরিয়ে হেঁটে ধর্মতলা থেকে মেট্রো ধরে শ্যামবাজারের বাড়ি ফিরেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এমন ভাবাই যায় না।

এখন নিদেনপক্ষে লিগের ম্যাচে কেউ তিনটি উইকেট পেলেই বাড়ি থেকে বাবা-মা গিয়ে তাঁকে নিজেদের গাড়িতে করে বাড়ি নিয়ে আসেন। যাদের গাড়ি নেই, তারাও পেল্লাই কিটস নিয়ে ওলা কিংবা উবের করে বাড়ি ফেরে।

উৎপলের আমলে অ্যাপস মারফৎ গাড়ি হয়তো পাওয়া যেত না, কিন্তু হলুদ ট্যাক্সি তো ছিল।  তিনি ওসবের ধারেকাছেই যাননি। ইডেনে যেসব দর্শকরা তাঁর স্পিন কেরামতি দেখেছেন সারাদিন ধরে, সন্ধ্যায় তাঁদের সঙ্গেই মেট্রো করে বাড়ি ফিরেছেন। কেউ কেউ চিনে ফেলে বলেছে, ‘‘আরে আপনি উৎপল চ্যাটার্জি না? আপনিই তো জেতালেন আমাদের। দাদা, আপনি আমাদের সঙ্গে মেট্রোতে যাচ্ছেন…!’’

কেউ কেউ ভিড় মেট্রোতে সিট ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি বিনয়ের সঙ্গে ‘না’ করে দিয়ে বলেছেন, ‘‘আমাদের এসব অভ্যাস আছে, সারাদিন তো দাঁড়িয়েই থাকি আমরা।’’

সেই সাধারণ উৎপল এখনও তেমন রয়েছেন। হাতিবাগান কিংবা হেদুয়া মোড়ে কিংবা শ্যামবাজার পাঁচ মাথায় গিয়ে ‘উৎপলের বাড়ি কোথায়…’ বললে যে কেউই আপনাকে বাড়ির চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। কয়েকমাস আগেও কোভিডের বাড়বাড়ন্ত যখন একটু কম ছিল, সেইসময়ও দেশবন্ধু পার্কে বিকেলে গেলে বাংলার এই প্রাক্তন অধিনায়ককে দেখা যেত। নয় পাড়ার মোড়ে চা খাচ্ছেন, কিংবা স্থানীয়দের সঙ্গে ক্যারম খেলছেন।

তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থাকবেন, কোভিড যোদ্ধা হিসেবে নিভৃতে কাজ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তিনি কাজে মহাতারকা হলেও চলনে বলনে বাকিদের মতোই। তাই ইয়াস বিধ্বস্ত মানুষদের সহায়তায় উৎপল ও তাঁর সংস্থা উদয়ের পথে আগামী সোমবার যাচ্ছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবা অঞ্চলের পাখিরালায়। ওখানকার মানুষদের হাতে তুলে দেওয়া হবে ২১টি বিভিন্ন নিত্যজাত দ্রব্য।

তার আগে হেদুয়া মোড়ের শিশির ভাদুড়ি সরণীতে সংস্থার অফিসে ত্রান কার্যে সহায়তা করছেন বাংলা ক্রিকেটের সবচেয়ে সফলতম স্পিনার, যাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৫২০টি প্রথম শ্রেণীর উইকেট। যিনি খেলেছেন ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটও। আজহারউদ্দিনের প্রিয় পকেটবয় বেঙ্কটাপতি রাজুকে সুযোগ দিয়ে অন্যায়ভাবে ছেঁটে ফেলা হয়েছে উৎপলকে। সেই বঞ্চনা নিয়ে তিনি ভ্রুপেক্ষহীন, বলেনও, ‘‘যা হওয়ার হয়েছে, নিজের দক্ষতায় যতটুকু পেরেছি এগিয়েছি।’’

উৎপল বলছিলেন, ‘‘আমি একা কি পারব নাকি ওই দুর্গতদের সহায়তা করতে? আমাদের সংস্থা উদয়ের পথে-র সবাই এগিয়ে এসেছে।’’ অন্যতম আধিকারিক সঞ্জয় ঘোষ (বাপ্পা) রয়েছেন, পাশাপাশি সভাপতি নবরতন ঝাওয়ার ছাড়াও অমিত চক্রবর্তী, অঞ্জন রায়, তরুণ বসু, সৌম্যজিৎ ঘোষরা ছাড়াও সংস্থার একঝাঁক তরুণ মুখরা সদা কাজ করে চলেছেন।

এমনকি উৎপলের দাদা শ্যামল চট্টোপাধ্যায়ও ছিলেন একটা সময় এই সংস্থার কাজে। এই সংস্থাই এবার কোভিডে নানা কাজ, রক্তদান দিবস আয়োজন করা, পাশাপাশি কারোর ভ্যাকসিন প্রয়োজন হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো সবটাই করেছে আন্তরিকতার সঙ্গে।

সব থেকে বড় কথা, এত বড়মাপের ক্রিকেটার হয়েও দাম্ভিকতা ছেড়ে সাধারণের মতোই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ত্রান কার্যে হাত লাগিয়েছেন উৎপল, সেটাতেই সবাই অবাক। পরণে একটা টি শার্ট, আর খেলোয়াড়দের মতো একটা হাফ প্যান্ট। এই কারণেই সবার কাছের ডেডিভ সংস্থার মধ্যমনি হয়ে উঠেছেন, তেমনি বাংলা ক্রিকেটেও তিনি সমান শ্রদ্ধা পান। না হলে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিদগ্ধ মানুষও ফোন করে বলেছেন, ‘‘ডেডিভদা, তুমি এসে বাংলার স্পিন কোচের দায়িত্ব নাও, তুমি না এলে আমাদের হবে না।’’

এই ভরসাতেই এগোচ্ছেন ডেভিড, সাধারণের ভিড়ে অসাধারণ হয়ে!

You might also like