Latest News

ভালো থাকবেন বাংলা ক্রিকেটের ‘দ্য ওয়াল’ শ্যামসুন্দর মিত্র

দেবাশিস সেনগুপ্ত

চোখের জল আর মনখারাপ নিয়ে কিছু লেখাই যায় না। তবু ‘শামুদা’র জীবনের ইনিংস শেষ হয়ে গেলে কিছু তো লিখতেই হয়। সপ্তাহ দুয়েক পরে হলেও। গত ২৭শে জুন ২০১৯ তারিখে সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বেশ কিছুদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগা বাংলার ক্রিকেটের মহীরূহ শ্যামসুন্দর মিত্র। সল্টলেকেই ছিল তাঁর শেষ জীবনের বাসস্থান।

ময়দান তাঁকে চিনত দুর্দান্ত ক্লাসি ব্যাটসম্যান, ক্লাব ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে রানের রাজা ও সুদর্শন, ভদ্র এক মজার মানুষ হিসেবে। সেই সঙ্গে তাঁকে নিয়ে আক্ষেপও কম ছিল না বাংলার ক্রিকেট মহলে। প্রচুর রান করেও ভারতীয় টিমে না খেলার আক্ষেপ। সেই সব কিছু পিছনে ফেলে রেখে ৮২ বছর বয়সে চলে গেলেন শ্যামসুন্দর মিত্র, ‘অন্য’ প্যাভিলিয়নে। থেমে গেল কলকাতা ময়দানের রানের রাজার বিজয়রথ।

১৯৩৬ সালের ৮ নভেম্বর জন্ম শ্যামসুন্দর মিত্রের। বাংলার ক্রিকেট মহলে তিনি ছিলেন ‘শামুদা’ নামেই পরিচিত। ডান হাতে ব্যাট করার পাশাপাশি সুইং বলের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বাংলার হয়ে তাঁর অভিষেক হয়েছিল ২২ বছর বয়সে, ১৯৫৮ সালে। চোদ্দ বছর চুটিয়ে খেলে ১৯৭২ সালে শেষবার বাংলার হয়ে খেলতে নেমেছিলেন তিনি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫৯টি ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করে ৭৮টি ইনিংসে ৩০৫৮ রান করেছিলেন ৫০.১৩ গড়ে। ৭টি শতরান ও ১৭টি অর্ধশতরানের মালিক শ্যামসুন্দর মিত্রের ১৫৫ ছিল সর্বোচ্চ স্কোর। বল হাতে উইকেট নিয়েছিলেন ১৫টি।

তখনকার দিনে ঈর্ষণীয় রঞ্জি ব্যাটিং (১৯৫৮ – ১৯৭২) রেকর্ড ছিল তাঁর। বাংলার হয়ে অসাধারণ সব ইনিংস খেলেছেন শ্যামসুন্দর মিত্র। বিহারের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে রঞ্জি অভিষেক ঘটেছিল শ্যামসুন্দর মিত্রের। ১৯৬৮ সালে রঞ্জি ট্রফিতে তৎকালীন বোম্বাইয়ের বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ১৩৫ রানের ইনিংস এখনও মনে রয়েছে সুনীল গাভাসকারের। তিনি ওই অপরাজিত ১৩৫ রানের ইনিংসে এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে লিখেছিলেন, “ওই ইনিংসটা সব তরুণ ক্রিকেটারের জন্য শেখার। আমি নিজেও শিখেছি, ধৈর্য কাকে বলে!” আর সর্বোপরি ১৯৬৩তে গিলক্রিস্ট সমৃদ্ধ হায়দ্রাবাদের বিরুদ্ধে ভাঙা কব্জি নিয়ে করা ৯৮ তাঁকে বাংলা ক্রিকেটে অমর করে রেখে দেবে চিরদিন। সে বার ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড চার জন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ফাস্ট বোলারকে ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট খেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ডাকসাইটে ফাস্ট বোলার রয় গিলক্রিস্ট হায়দরাবাদের হয়ে খেলেছিলেন। গিলক্রিস্টের আগুনে বোলিং সামলে শ্যামসুন্দর মিত্র ৯৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। যদিও সেই ম্যাচে পঙ্কজ রায় দু’ ইনিংসে শতরান করেছিলেন। কিন্তু, শ্যামসুন্দর মিত্রের ধৈর্যশীল ইনিংস নিয়ে এখনও চর্চা হয় ভারতীয় ক্রিকেটে। এসবের বাইরেও ‘আমরাও পারি’ এই বিশ্বাসটা বাংলা দল পেত যাঁদের জন্য, তাঁদের অন্যতম ছিলেন শামুদা।

মোহনবাগান ক্রিকেট দলে খেলেছেন এবং অধিনায়কত্বও করেছিলেন তিনি। ২০১৬-১৭ সালে মোহনবাগান তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে “মোহনবাগান রত্ন” উপাধিতে ভূষিত করে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে বাংলার হয়ে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। জাতীয় দলের হয়েও খেলতেই পারতেন তিনি। কিন্তু, ভারতীয় দলে জায়গা পাননি তিনি। অসাধারণ প্রতিভাবান হয়েও কেন ডাক পাননি তা নিয়ে বিতর্ক ছিল প্রচুর। তবে শ্যামসুন্দর মিত্রের ক্রিকেটীয় নৈপুণ্য নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ ছিল না। খবরের ভিতরের খবর হল, সেই সময়ে ভারতীয় বোর্ডে স্পোর্টিং ইউনিয়নের এক কর্তার দাপট ছিল। সেই কর্তা স্পোর্টিং ইউনিয়ন ক্লাবে খেলার কথা বলেছিলেন শ্যামসুন্দর মিত্রকে। কিন্তু, মোহনবাগান ছেড়ে স্পোর্টিং ইউনিয়নে যাননি এই ক্রিকেটার। ফলে ভারতীয় দলেও ডাক পাননি তিনি, একবারের জন্যও। শ্যামসুন্দর মিত্র নিজে বলেছিলেন, “মোহনবাগানে খেলার জন্য আমি আর জাতীয় দলে সুযোগ পাইনি।” আজকের এই আদর্শহীনতার দিনকালে খুব বেমানান লাগে তার এই কথাটা শুনতে। শুধু মোহনবাগান ছেড়ে যাননি বলেই তাঁর টেস্ট খেলা হল না কোওনদিন। তাঁর মানের ব্যাটসম্যান না খেলার দরুণ তার থেকেও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারতীয় টেস্ট দল।

ময়দানে সতীর্থদের অনেকে তাঁকে ‘এসএস’ বলেও ডাকতেন। জমাট ব্যাটিংয়ের জন্য ‘দ্য ওয়াল’-ও বলতেন অনেকে। রানের রাজা ছিলেন তিনি। ক্রিকেটার পরবর্তী জীবনে নির্বাচকও হয়েছিলেন। বাংলা ক্রিকেট দলের নির্বাচন কমিটির প্রধানের দায়িত্বও একসময় পালন করেছেন। সেখানে শুধু তথাকথিত বড় ক্লাবের ক্রিকেটার নেওয়ার রেওয়াজ ভেঙে অনামী ক্লাবের প্রতিশ্রুতিমানদের সুযোগ দেওয়ারও চেষ্টা করেন। অন্যায়ের সঙ্গে চিরদিনই ছিলেন আপোষহীন। বাংলার ক্রিকেটে তাঁর অবদানের জন্য সিএবি-র তরফ থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট সম্মান দেওয়া হয় তাঁকে।

আমার মত অনেকেরই খসে গেল ছোটবেলার ভালবাসার রাজপ্রাসাদের আর একটা খিলান আর হারিয়ে গেল ছোটবেলার সযত্নে লালিত স্মৃতির আর একটা বড় বাক্স। এখন এগুলো খুব কষ্ট দেয়। এমন প্রতিভাধর ক্রিকেটারের প্রয়াণে বাংলার ক্রিকেট যে অভিভাবকহীন হল, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আপনাকে ভোলা যাবেনা, মিস্টার শ্যামসুন্দর মিত্র।

সিএবি-র লাইফটাইম বা মোহনবাগান রত্ন তো আপনার বর্ণাঢ্য মুকুটে আর দুটো পালকের মত ছিল। ভাল থাকুন বলাটা বাহুল্য। কেননা আপনি খারাপ থাকতেই পারবেন না কোনওদিন। আমরা জানি।

You might also like