Latest News

বন্ধু ফিদেলের মৃত্যু দিনেই চলে গিয়ে ‘অপার কৃতজ্ঞতা’ দিয়েগোর

শুভ্র মুখোপাধ্যায়

 

ঈশ্বরই একমাত্র ইচ্ছামৃত্যু নিতে পারেন। তিনি যদি মনে করেন এই পৃথিবীর মোহ এবার ত্যাগ করতে হবে, তা হলে তিনি চলে যান সকলের অলক্ষ্যে।

দিয়েগো মারাদোনাও ঈশ্বর, তিনি ক্ষণজন্মা। না হলে বেছে বেছে নিজের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির মৃত্যুদিনকে কিভাবে তিনি বেছে নেন?

ফিদেল কাস্ত্রোকে তিনি বলতেন ‘বন্ধু’, আবার ‘দ্বিতীয় বাবা’ও। বন্ধু, কারণ তিনি তাঁর অসময়ে পাশে ছিলেন। মারাদোনাকে কোকেনের গ্রাস থেকে মু্ক্ত করে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন নিজ বাসভবনে রেখে।

দিয়েগো বাবা বলতেন এই কারণেই যে, পিতৃ স্নেহে ফিদেল বাহুডোরে বেঁধে রেখেছিলেন মারাদোনাকে। তাই দিয়েগো বলতেন, ‘‘আমার জন্য যখন আমার দেশ আর্জেন্টিনার দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেইসময় কিউবার দরজা খোলা ছিল, তার জন্য ফিদেলের কাছে আমার ঋণের শেষ নেই।’’ তাই চার বছর আগে ফিদেলের মৃত্যুর সময় তিনি কিউবাবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

এমন মৃত্যু মহাকাব্যতে হয়, সেটিও জীবনের শেষ অধ্যায়ে অদৃশ্য দোয়াতে লিখে গেলেন ফুটবলের জাদুগর। কিছু কিছু মানুষের মৃত্যু এত কষ্টের যে ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না। ২৫ নভেম্বর ভারতের রাত ৯-৫০, মনে হয় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সময়, যেন সেই আমেরিকান প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের মৃত্যুর সময়ের মতোই ১০-১০।

সন্তান বাবা-মা-কে হারালে যে খেদ হয়, কষ্ট হয়, তেমনি যন্ত্রনা ভোগ করেছেন বিশ্বের তামাম মানুষ। এই কষ্ট বোঝানো যায় না, বুকে একটা অব্যক্ত জ্বালা আসে, রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়, শুধু মনে হয়, ওই যে একটা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির মানুষ বিপক্ষের সব ফুটবলারগুলোকে ড্রিবল করে গোল দিতে ছুটছেন। পড়ে যাচ্ছেন, হেলতে দুলতে গিয়ে গোলও দিয়ে আসছেন।

প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাঁকে রক্তাত্ম করছেন, কিন্তু তিনি বেপরোয়া, তিনি অকুতোভয়, যেন পিঠে অদৃশ্য একটা জার্সি, তাতে ১০ নম্বর তো লেখা তো রয়েইছে, আরও রয়েছে খেতে না পাওয়া কৃষকের মুখের ছবি, লকআউটে অনাহারে থাকা শ্রমিকের মুখের অবয়ব।
মারাদোনা খেলতেন নিজের জন্য নয়, তাঁর জেহাদ ছিল বুর্জোয়া শ্রেণীর ওপর। তিনি পুঁজিপতিদের দৌরাত্মকে ঘৃণা করতেন। তাঁর বাঁ পায়ে ছিল চে গুয়েভারার উল্কি, আর বাঁহাতের বাহুতে ছিল ফিদেলের উল্কি।

মারাদোনার বাঁ পা-ই ছিল সম্পদ, কত দেশের রাষ্ট্রনায়করা বলেছিলেন, ‘‘আমাদের শস্য ভান্ডার নিয়ে যাও, বিনিময়ে দাও দিয়েগোর বাঁ পা।’’ ওই পায়ের জাদুতে তিনি মোহান্বিত করে রেখেছিলেন ফুটবল দুনিয়াকে।

শুধুই কী ফুটবল দুনিয়াকে? কখনই নয়, মারাদোনা মানে শুধু ফুটবল নয়, মারাদোনা মানে শুধু আর্জেন্টিনা নয়, মারাদোনা মানে শুধুই জাদুগর নয়, তিনি একটা প্রতিষ্ঠান, তিনি নিজেই একটা জাতি, নিজেই একটা দেশ, নিজেই একটা ব্রক্ষ্মান্ড।

আমরা সাংবাদিকরা ঘোরের মধ্যে নানা কল্পনার স্বপ্ন আঁকি। যদি অমিতাভ বচ্চন আবার বিয়ে করেন, যদি আর্নল্ড সোয়ার্জেনেজার আবার হিরোর রোলে অভিনয় করেন, ডন ব্র্যাডম্যান যদি ফিরে এসে আবার শচীনের সঙ্গে ব্যাটিং করতে যান, এইসব আজব কল্পনার পাশে থাকে কিছু অমোঘ সত্যি, যদি আমাদের দেশের বরেণ্য নায়কদের জীবনাবসান হয়, তা হলে সাংবাদিক হিসেবে কী করণীয় হবে।

সত্যি কথা বলতে সেই দিনের একটা যে ২৫ নভেম্বর পৌনে দশটা নাগাদ আসবে, কেই বা ভেবেছিলেন? খবরটি শোনার পরে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়, ফোন বাজলেও তা ধরার ইচ্ছে থাকে না। পেশার তাগিদে কাজ শুরু করলেও কী লিখব, মাথা কাজই করে না। ওই যে বললাম, নিকট পরিজনের মৃত্যুর শোকই যেন বহন করে নিয়ে এলেন মারাদোনা।

ঈশ্বরকে সামনে থেকে দেখেছি বার তিনেক। একবার যখন বামফ্রন্টের আমলে শমীক লাহিড়ী মারাদোনাকে নিয়ে এলেন। সেবার বাটানগর স্টেডিয়ামে মারাদোনা গিয়েছিলেন, আমিও থাকতাম সেইসময় বাটাতেই, কিন্তু আমি বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে নয়, কলকাতার জোড়া গির্জার অফিস থেকে গাড়িতে করে বাটায় গিয়েছিলাম মারাদোনার গাড়ির পিছন পিছন।

সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। ব্রেসব্রিজের জিনজিরা বাজারের কাছে মারাদোনার কনভয় আমাদের গাড়িকে হুঁসিয়ারি দিয়েছিল, আমাদের ব্যারাকিংয়ের ভেতর থেকে সরে যাও, না হলে পরিণাম ভাল হবে না। সেই ড্রাইভার শোনেননি, তিনিও যে মারাদোনা অনুরাগী, ঈশ্বরকে সামনে থেকে দেখতে চান। তাঁর কাছে তো আমাদের মতো প্রেস কার্ড নেই যে মারাদোনার কাছে চলে যাবেন।

তাঁরও তো ইচ্ছে হবে, তিনিও তো রক্তমাংসের, তিনিও যে ছোট্ট শরীরের নায়গ্রা জলপ্রপাত দেখেছেন ১৯৮৬ সালের আজটেক স্টেডিয়ামে। মেক্সিকোর সেই রৌদ্রছায়া স্টেডিয়াম, যেখানে বিকেলে খেলা হলে একটা পাশ পুরো অন্ধকার হয়ে যেত। তাঁরও যে মনে পড়েছে সবকিছুই। ওই স্টেডিয়ামের আলো ঘেরা অংশ থেকে তিনি গোধূলির আলো হয়ে ফুটতেন সারা মাঠে।

বেশ মনে রয়েছে সাদা রংয়ের একটা শার্ট পরে তিনি বাটা থেকে চলে গিয়েছিলেন সোজা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। এতটুকু বিশ্রাম নেওয়া নেই, চড়কির মতো ঘুরছেন, যেন সেই প্রাণচঞ্চলতা, খেলার জীবনের মতো। যুবভারতীতে গাড়ির বনেটের ওপর বুকে হাত দিয়ে দেখাচ্ছেন, ‘‘আমিই সেই দিয়েগো…’’ সেইসময় কালো মাথার সারিগুলো স্বপ্ন দেখছিল, বৃদ্ধ বাবা যুবক পুত্রকে বলছিলেন, ‘‘ওই দ্যাখ রে, আমাদের মারাদোনা, আমাদের দিয়েগো…।’’

মারাদোনারা সারা বিশ্বকে এক করে দেন। সব ভৌগলিক দুরত্ব নিমেষে ছোট হয়ে যায়। সেই মানুষটিকে যখন রিও ডি জেনেইরোর হোটেল থেকে ২০১৪ ব্রাজিল বিস্বকাপের সময় বেরিয়ে আসতে দেখেছিলাম মেলানো যায়নি। সেখানে তিনি অহমিকার চূড়ান্ত বাদশা। মুখে হয়তো সিগার ছিল না, কিংবা কোনও অ্যালকোহলের বোতলও নয়, তবুও মারাদোনাকে মনে হয়নি উনিই আমাদের স্বপ্নের রাজপুত্র।
কমান্ডো বেস্টিত ওই মানুষটির মেজাজও বিগড়ে ছিল নিজের দেশ ভাল খেলছিল না বলে! কারণ নিজের দেশের খেলা থাকলে তিনি চলে যেতেন অন্য জগতে, ভাল খেললে পাশের অচেনা মানুষটিকে হয়তো আলিঙ্গন করে চুম্বণ করে দেবেন গালে, আবার যদি দল হারে, তা হলে পাশে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট থাকলেও কথা বলে সৌজন্যও দেখাবেন না।

সেই মেজাজী বাদশার সঙ্গে ধাক্কাও লেগেছিল মোহনবাগান মাঠে। ওই প্রথমবার জাদুগরের কলকাতা দর্শনের সময়। সেদিন বুঝেছিলাম দেরি করে অ্যাসাইনমেন্টে গেলেও ঈশ্বরের সঙ্গে করমর্দন দুরত্বে হাঁটা যায়। মারাদোনাও প্রবেশ করছেন গ্যালারি ভরা মোহনবাগান মাঠে, আমিও নিরাপত্তারক্ষীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাঁরই পাশে চলে গিয়েছিলাম একবার হাত ধরার আশায়। একবার ধাক্কাও লেগে গিয়েছিল, তৎক্ষণাৎ পুলিস এসে সরিয়ে নিয়ে যান ‘ফুটবলের আটলান্টিক মহাসাগর’কে।

পারিনি। অতটা সহায়তা করেননি ফুটবল দেবতা, তবুও মারাদোনার জন্য পুলিস অফিসারদের বকুনি খাওয়াও আমার কাছে আশীর্বাদই।
তাই ভাবছিলাম, এরকম দিনও চলে এল যেখানে মারাদোনার অবিচুয়ারি লেখারও সময় পেলেন না তাবড় সাংবাদিকরা। তিনি ধরাই দিলেন না কাউকে, যেভাবে সকলের নজর এড়িয়ে হাত দিয়ে গোল করে গিয়েছিলেন, সেই ভাবেই মৃত্যুকেও এড়িয়ে জীবনের গোল করে গেলেন, শেষ বারের মতোই।

আরও একটা কথা, এই বছরটা কবে শেষ হবে, সেটি আজ থেকে গুণতে হবে আমাদের সকলকে, আর মনে হয় ৩৫ দিন ২০২০ বছর পার হয়ে ২০২১ সাল পা দিতে। করোনা বছর কাউকে রেহাই দিল না, ঈশ্বরকেও টেনে নিয়ে গেল অমৃতলোকে, হোক না তিনি ফুটবলের ভগবান, তবুও তো তিনি পীড়িত মানুষদের প্রতিনিধি, সেটাই সবচেয়ে কষ্টের।
মারাদোনা বুঝতে গেলে ফুটবল বুঝতে হয় না, কিন্তু ফুটবল বুঝতে গেলে মারাদোনাকে জানতে হয়, সেটাই চিরন্তন সত্য হিসেবে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে তাঁর অফুরান ক্যারিশমার মতোই।

You might also like