শুক্রবার, জানুয়ারি ২৪
TheWall
TheWall

ব্যালন ডি’ওর পেলেন সেরা মহিলা ফুটবলার মেগান র‌্যাপিনো: বিপ্লবী, সমপ্রেমী, মাঠের বাইরেও অপ্রতিরোধ্য

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

আজ মেসি-দিবস বলেই মনে করছে ফুটবল জগত। ষষ্ঠ ব্যালন ডি’ওর জিতে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। আরও এক বার নিজেকে প্রমাণ করেছেন ‘ফুটবলের ঈশ্বর’ হিসেবে। উচ্ছ্বাসের পারদ আকাশ ছুঁয়েছে সর্বত্র। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংবাদমাধ্যম— সকলের সমস্ত আলো আজ তাঁরই দিকে। কিন্তু একটু চোখ সরালেই দেখা যায়, সে আলো মেখে উজ্জ্বল হাসিতে ভরা দৃপ্ত মুখে বসে আছেন আরও এক ‘মে’। তিনি মেগান র‌্যাপিনো। ব্যালন ডি’ওর মহিলাদের বিভাগে বর্ষসেরা, বিশ্বকাপ জয়ী মার্কিন তারকা ফুটবলার।

পুরস্কারের মঞ্চে উপস্থিত হতে পারেননি মেগান, তাই পাঠিয়েছেন ভিডিওবার্তা। বলেছেন, “মাঠের ভিতরে হোক বা বাইরে, আমি আজ যা করে উঠতে পেরেছি, সে জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য আমার কোচ, ফেডারেশন ও সহ-খেলোয়াড়দের। আমি এ বছর থাকতে পারলাম না, আগামী বছর নিশ্চয় থাকব।”

বেগুনি চুলের ফুটবল বিপ্লব

কিন্তু মেগানের সাফল্য বা প্রাপ্তির হিসেব এই একটা পুরস্কার দিয়ে করতে গেলে, তা অন্যায় হবে। অন্যায় হবে খোদ মেগানের সঙ্গে, অন্যায় হবে ফুটবলের সঙ্গেও। অন্যায় হবে তামাম বিশ্বের মেয়েদের লড়াইয়ের সঙ্গেও। কারণ মেসি যদি ফুটবলের ঈশ্বর হন, তাহলে মেগানও ‘ফুটবলের বিপ্লবী’। যিনি খেলার পাশাপাশি বারবার সরব হয়েছেন মহিলা ফুটবলারদের অধিকার নিয়েও। নিজের বর্ণময় জীবনের উদ্দামতায় কার্যত ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন সামাজিক অবহেলা ও বৈষম্য। যিনি চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও। তাঁর মাথা ভরা ঝাঁকড়া বেগুনি চুল যেন স্পর্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছে বারবার।

সেই মেগানের হাতে উঠল ব্যালন ডি’ওর। এই সাফল্যের উদযাপনে তাঁর কথা আরও একটু বেশি করে জানার দাবি রাখছে ফুটবল জগৎ।

সমবেতনের দাবিতে আদালতে

অন্যান্য শিল্প বা খেলাধুলোর মতো ফুটবলেও রয়েছে ‘সিস্টেম্যাটিক ওয়েজ ডিসক্রিমিনেশন’। অর্থাৎ মহিলাদের বেতন পুরুষদের তুলনায় কম। তথ্য বলছে, মার্কিন মহিলা দল সমসাময়িক পুরুষ দলের চেয়ে শুধু গড় বেতনের প্রাথমিক স্তরেই প্রায় ৩০ হাজার ডলার কম রোজগার করেন। বোনাসে ফারাকটা আরও বেশি। অথচ মার্কিন পুরুষ ফুটবলের দল বিশ্বের দরবারে প্রথম ষোলোর ভিতরেই আসে না। মহিলা দল আসে। শুধু তাই নয়, টিভির পর্দায় চলা ফুটবল ম্যাচের রেটিং দিয়ে বিচার করলেও চার বছর ধরে জনপ্রিয়তার নিরিখে এগিয়ে রয়েছে মহিলা ফুটবল দলই।

তার পরেও কেন এই বেতন বৈষম্য— তা নিয়ে বহু দিন ধরেই জমছিল ক্ষোভ। সেই ক্ষোভই আদালতে পৌঁছেছিল মেগান ব়্যাপিনোর নেতৃত্বে। চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রাক-বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিতে নিতেই প্রাতিষ্ঠানিক লিঙ্গবৈষম্যের অভিযোগে আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা। ফুটবলপ্রেমীদের অনেকেই বিরক্ত হয়েছিল। দু’দিন পরে ফুটবল-যুদ্ধ, তার আগে মামলা কেন! কিন্তু মেগান সেই কবে থেকেই একরেখা, জেদি মেয়ে হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। সামান্য ভ্রূকুটি তাঁর লড়াইকে থামাতে পারে নাকি!

জাতীয় সঙ্গীত না গেয়ে প্রতিবাদ, ব্যঙ্গ ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক লিগ শুরু হল, থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ দিয়ে। শুরুর আগে যখন স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইছেন সকলে, তখন চুপটি করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেগান। প্রতিবাদে নাড়েননি ঠোঁট, মেলাননি গলা। ম্যাচ অবশ্য শেষ হয়েছিল, থাইল্যান্ডকে ১৩ গোলে হারিয়ে।

তবু আক্রমণ করতে ছাড়েননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। মেগানের প্রতিবাদের কারণ বা দাবি জানতে না চেয়ে ব্যঙ্গের সুরে বলেছিলেন, ‘‘এর মধ্যে প্রতিবাদ কোথায়!’’ এই সময়েই মেগানের একটা পুরনো সাক্ষাৎকার সামনে চলে আসে। সেখানে মেগান বলেছিলেন, ‘‘আমি কাপ জিতলেও হোয়াইট হাউসে যাব না।’’ ট্রাম্পের ব্যঙ্গের উত্তরে সেই একই কথা ফের বললেন মার্চেও। কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে তখন মেগানের দল। মেগান বললেন, জিতলেও যাবেন না ট্রাম্পের কাছে। এই বলে মাঠে নেমে নিজেই গোল করলেন দুটো। যদিও তখনও ৭৩ বছরের ট্রাম্প তখনও ৩৪-এর মেগানকে বিঁধে রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন— ‘‘আগে তো জিতুন!’’

সমকামী মেগান, লড়াইটা মাঠের বাইরেও

মেগান কিন্তু অপ্রতিরোধ্য। দুর্দমনীয়। হুঁশিয়ারির পরোয়া করেন না। তোয়াক্কা করেন না প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির। তাই ফাইনাল ম্যাচ জেতার পরেও, ট্রাম্পের উত্তর দেওয়ার আগে তাঁর কাছে জরুরি ছিল বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া। যে চুমুর দৃশ্য পরে ‘এলজিবিটি রাইট মুভমেন্ট’-এর পদক্ষেপ হয়ে ওঠে।

হ্যাঁ, মেগান সমকামী। এবং তাঁর সপাট যুক্তি, ফুটবল স্টেডিয়াম শুধু খেলারই জায়গা নয়, একটা বড় প্ল্যাটফর্মও বটে। সেখানে পৌঁছেও তিনি যদি তাঁর আদর্শ বা লড়াইকে তুলে না ধরেন, শুধু খেলে চলে আসেন, শুধু জেতা-হারা নিয়েই মাথা ঘামান, তা হলে সেটা তাঁর মতো আরও হাজার লড়াকু মেয়ের প্রতি অবিচার হবে।  অবিচার হবে আগামী প্রজন্মের প্রতি।

সু বার্ডের কাছে থিতু হল প্রেম

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মহিলা ফুটবলার সারা ওয়ালশের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান মেগান। চার বছর পরে ভাঙে সম্পর্ক। ফের প্রেম আসে জীবনে। মার্কিন পপগায়িকা সেরা কাহুনের সঙ্গে উদ্দাম ডেটিং চলে আট বছর। ঠিক হয় বিয়েও। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বিচ্ছেদ। তার পর থেকে মেগানের প্রেমিকা সু বার্ড। মার্কিন মহিলা বাস্কেটবল প্লেয়ার সু চার চারটে অলিম্পিক্সে সোনা পেয়েছেন।

গত বছরে বিখ্যাত স্পোর্টস জার্নাল ইএসপিএন-এর ‘দ্য বডি ইস্যু’‌র কভারে জ্বলজ্বল করেছে মেগান এবং সু-এর নগ্ন দেহ। হাতে-পায়ে ফুটবল, মুখে হাসির দীপ্তি। সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় স্পর্শ করতে পারেনি সে দীপ্তি।

খেলার কেরিয়ার গ্রাফ

ক্যালিফোর্নিয়ায় এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন মেগান র‌্যাপিনো। পাঁচ ভাই–বোন একসঙ্গে বড় হয়ে উঠেছিলেন। দাদা ব্রায়ান ফুটবল-পাগল ছিলেন। তাঁকে দেখেই ভালবাসা ফুটবলের প্রতি। ভালবাসা বদলে যায় নেশায়, পেশায়। ২০০২ সালে অনূর্ধ্ব ১৬ জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পান মেগান। অনূর্ধ্ব ১৯ পর্যন্ত খেলেন। ২০০৬ সালে সিনিয়রদের জাতীয় দলে খেলেন আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ২০০৭ এবং ২০০৮—পরপর দুটো বছরের অলিম্পিক্স ও বিশ্বকাপের মতো বড় ম্যাচে খেলার সুযোগ কেড়ে নেয় চোট। ২০০৯ সালে ফেরেন মাঠে।

২০১১ সালের বিশ্বকাপে প্রাণপণ লড়েও ফস্কে যায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। ২০১২ অলিম্পিক্সে আসে সোনা। সেই সঙ্গে, ওল্ড ট্র‌্যাফোর্ডে কানাডার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে কর্নার থেকে সরাসরি গোল করেন মেগান। অলিম্পিক্সের আসরে পুরুষ ও মহিলা মিলিয়ে এই নজির রয়েছে একমাত্র তাঁরই। তবে বিশ্বকাপ না জেতার আফশোসও মেগান সুদে-আসলে উসুল করে নিয়েছেন ২০১৫ এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ জিতে।

সোনার বুট, সোনার বল ভোলাতে পারেনি আসল লড়াই

এ দিকে ২০১৯ সালের মার্চে সমবেতনের দাবিতে মামলা দায়ের হলেও, তা নিয়ে ইতিবাচক কোনও সাড়া মেলেনি কয়েক মাস। এর মধ্যেই জুলাইয়ে শুরু হয়ে যায় মহিলাদের ফুটবল বিশ্বকাপের আসর। মেগানের নেতৃত্বে ফ্রান্সের মাটিতে হল্যান্ডকে ২–০ গোলে পরাজিত করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আমেরিকাই। ৬টি গোল করেন মিডফিল্ডার মেগান। জিতে নেন সোনার বল, সোনার বুট।

তবে সে সব ছাপিয়ে ফের আওয়াজ তোলেন সমবেতনের দাবিতে। বিশ্বকাপের মঞ্চে সে সুর বেমানান ঠেকলেও পাত্তা দেননি মেগান। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। মেগান তাঁর সামনেই সটান বলে দেন, তাঁদের সমবেতনের দাবি ন্যায্য। ফিফা পারবে না এই দাবি নস্যাৎ করতে। মেগানের কণ্ঠস্বরে যেন বজ্রের দৃঢ়তা ফুটে উঠেছিল সেই দিন।

হাল না ছাড়া, হার না মানা

এ দাবি কবে পূরণ হবে, তা এখনও জানে না কেউ। কিন্তু সকলেই এটা জানে, মেগান হাল ছাড়বেন না। মেগানরা হাল ছাড়েন না। মাঠেও নয়, মাঠের বাইরেও নয়। আর এই মেগানদের জন্যই চলতে থাকে লড়াইটা।

তাই সোনার বুট, সোনার বল, বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি’ওর— হাজার ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করার পরেও মেগানের পাখির চোখ আজও সমবেতনের দাবি এবং মাঠের বাইরে তাঁর লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী লিঙ্গবৈষম্য।

আরও পড়ুন: মেজর জেনারেল, অধ্যাপক, ডাক্তার, মা! সব ভূমিকাতেই সাফল্যের শীর্ষে কলেজে ফেল করা সেদিনের তরুণী

Share.

Comments are closed.