বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

ষাট পয়সার গ্যালারি থেকে উত্থান, মোহনবাগানকে ‘সবার’ করেছিলেন সচিব অঞ্জন

দেবাশিস সেনগুপ্ত 

আপাদমস্তক সবুজ-মেরুন রঙে রঙিন ছিলেন অঞ্জন মিত্র। ময়দান আর মোহনবাগান ছিল তাঁর কাছে অবিচ্ছেদ্য। যেখানে দাপটটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। ষাট পয়সার গ্যালারিতে খেলা দেখা থেকে মোহনবাগান সচিবের চেয়ার। একটা লম্বা জার্নির অবসান হল।

মাঠ সূত্রেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় স্বপনসাধন বসুর। ময়দান যাঁকে টুটু বসু নামেই চেনে। শুরু হয় নতুন ময়দানী বন্ধুত্বের। একদিকে টুটু বসু, অন্যদিকে অঞ্জন মিত্র। অঞ্জন মিত্র এবং বর্তমান ক্লাব সচিব টুটু বসুর বন্ধুত্ব কলকাতা ময়দানে একরকম মিথে পরিণত হয়েছিল। ২০১৮ সালে মোহনবাগান নির্বাচনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে পড়েছিলেন অঞ্জন মিত্র। ২০১৮-র সেই টালমাটাল সময়েও এই বন্ধুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে ক্লাব সচিব পদে টুটু বসুর বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াই থেকে সরে আসেন তিনি। যেহেতু প্রতিপক্ষ বন্ধু টুটু বসু, তাই সেই প্রথম হয়ত চ্যালেঞ্জ না নিয়ে সম্মান জানিয়েছিলেন বন্ধুত্বকে। নির্বাচনের ঠিক আগে প্রতিপক্ষ হিসেবে সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেকে। ২০১৮ সালেই শেষ হয়েছিল মোহনবাগানে মিত্র সাম্রাজ্যের। আমৃত্যু টুটু বসুর সঙ্গে বন্ধুত্বকেই সম্মান জানিয়ে গিয়েছেন তিনি।

দীর্ঘ ২৩ বছর মোহনবাগানের ক্লাব প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে ফুটবল প্রশাসক হিসেবে কাজ শুরু অর্থসচিব হয়ে । সেই পথচলা চালু রেখেই অঞ্জনবাবু পরে ক্লাবের সচিব হন। টুটু বসু পরবর্তী মোহনবাগান সচিব হন অঞ্জন মিত্র, এরপর টানা ২০১৮ পর্যন্ত।

পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়, চাটুনির জাতীয় লিগ (১৯৯৭-৯৮)থেকে সঞ্জয় সেনের আই লিগ (২০১৪-১৫) ও ফেডারেশন কাপ জয় (২০১৬), ইগর, ব্যারেটো থেকে ওডাফা—যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছিল সচিব অঞ্জন মিত্রর আমলে। মোহনবাগান সবার – এই বিশ্বজনীন ভাবনা প্রথম ভেবেছিলেন ট্যাংরার মিত্র বাড়ির ছেলে অঞ্জন মিত্র। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট অঞ্জন মিত্রর মস্তিষ্কে প্রথম রূপ পেয়েছিল কর্পোরেট মোহনবাগান। ২০১৮ সালে, নির্বাচনের আগে স্পনসরের নাম ঘোষণা করেও তার নিয়োগকে রূপ দিতে পারেনি তাঁর টিম। উত্থান-পতনেই মানুষের জীবন। মোহনবাগানের অনেক উত্থান-পতনের সক্রিয় সাক্ষী ছিলেন তিনি। তাঁর সময়ে মোহনবাগান ২০১৪-১৫র আই লিগ সহ দেশের সেরা সব ফুটবল টুর্নামেন্ট জেতে। ২০১৮ সালে মোহনবাগান প্রশাসন থেকে বিদায় নেন তিনি।

২০১৭ সাল। আইলিগ না আইএসএল? কার প্রাধান্য থাকবে এই প্রশ্নে দ্বন্দ্ব তখন তুঙ্গে ভারতীয় ফুটবলে। নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে শত্রুতা ভুলে এক টেবিলে এক হয়ে সভায় বসলেন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। সেই প্রথম। ক্যানসার আক্রান্ত অশক্ত শরীরে সেই বৈঠকে হাজির হয়েছিলেন মোহনবাগানের তৎকালীন সচিব অঞ্জন মিত্র। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল না থাকলে কলকাতায় আইএসএল নয়। তাঁর হুমকিতে কেঁপে গিয়েছিল ভারতীয় ফুটবল। দিল্লীর ফুটবল হাউসের কর্তাদেরও মাথা ঝোঁকাতে হয়েছিল তার এই হুঁশিয়ারির কাছে।২০১৭ সালে মোহনবাগান সচিবের সেই হুঁশিয়ারি হয়ত বাস্তব হতে চলেছে আগামী মরশুমে।হয়ত মোহনবাগান আইএসএল খেলবে, কিন্তু তা দেখে যেতে পারলেন না আপাদমস্তক ‘সবুজ মেরুন’ টানা ২৩ বছর পালতোলা নৌকোর কান্ডারী অঞ্জন মিত্র।

শেষের দিকে ক্যানসারজনিত অসুস্থতার জন্য সে ভাবে আর ক্লাবে আসতেও পারতেন না অঞ্জনবাবু। দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগছিলেন তিনি। বেশ কয়েকবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সুস্থ হয়ে ফিরেও এসেছিলেন। এ বার আর পারলেন না। বৃহস্পতিবার রাত ৩টে ১০ মিনিটে থেমে গেল তাঁর লড়াই। বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মোহনবাগানের প্রাক্তন সচিব অঞ্জন মিত্র।

মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁর কন্যা সোহিনী মিত্র চৌবেও মোহনবাগানের প্রশাসনে যুক্ত ছিলেন বেশ কয়েক বছর। তাঁর জামাতা কল্যাণ চৌবে ভারত, মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তন গোলরক্ষক, যার হাতে নিশ্চিন্ত থাকত তাঁর টিমের গোলপোস্ট নয়ের দশক আর এ শতাব্দীর প্রথম দশকের সিংহভাগ।

“কোনও কিছুই স্থায়ী নয়” – তাঁর কথিত এই চেনা আপ্তবাক্যকে সত্যি প্রমাণ করে চলে গেলেন অঞ্জন মিত্র। ৮ নভেম্বর, ২০১৯, বাগানে আক্ষরিক অর্থে শেষ হয়ে গেল অঞ্জন যুগ। আর ময়দানে পা রাখবেন না প্রাক্তন মোহনবাগান সচিব। তাঁর অনুপস্থিতিতে ময়দানও কি মনে রাখবে যে ‘নাথিং ইস স্ট্যাটিক’?

সবুজ-মেরুন দিগন্ত ছাড়িয়ে যেখানে চলে গেলেন, সেখানে ভাল থাকুন অঞ্জন মিত্র।

Comments are closed.