কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধি হয়ে হিটলারের প্রতিবাদ করেছিলেন জেসি ওয়েন্স

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো : কোনও কোনও লড়াই রূপকথা হয়ে যায়। কোনও কোনও প্রতিবাদ হয়ে যায় ইতিহাসের একটা ধাপ। কিংবদন্তিরা সবসময় মঞ্চ খোঁজেন, তাঁদের লক্ষ্য থাকে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের। 

১৯৩৬-‌এর সেই বার্লিন অলিম্পিক মানেই চলে আসে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অ্যাথলিট জেসি ওয়েন্সের কথা। ওই অলিম্পিকে জার্মানির শাসক অ্যাডলফ হিটলার খুব উৎসাহী ছিলেন অ্যাথলেটিক্সের দুটি ইভেন্ট নিয়ে। ১০০ মিটার দৌড় এবং লং জাম্প। ওই দুই ইভেন্টে তিনি দুই জার্মান এরিক বোর্চমেয়ার এবং লুজ লং-‌এর গলায় সোনার পদক দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেসি ওয়েন্সের সামনে উড়ে গিয়েছিলেন এরিক। আর লড়ে হেরেছিলেন লং।

দ্বিতীয় দিনেই ‘ব্ল্যাক’ জেসি ওয়েন্স যখন ১০০ মিটারে সোনা জেতেন, হিটলার তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি ওয়েন্সের সঙ্গে করমর্দন করতেও রাজি হননি। তৃতীয় দিন লং জাম্পে ওয়েন্সের আবার সোনা। আবার একই কাণ্ড হিটলারের। কিন্তু হিটলারের চোখের সামনে প্রথমে যিনি ওয়েন্সকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তিনি লুজ লং। পরে লং-‌এর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল ওয়েন্সের। চিঠিতে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বার্লিন অলিম্পিকের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মারা যান লং। তারপরও লংয়ের পরিবারের সঙ্গে যোগযোগ ছিল ওয়েন্সের। লংয়ের ছেলের বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে জার্মানিতেও গিয়েছিলেন ওয়েন্স।

শুধু লং জাম্পের নয়, সেবার বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্সের গলায় উঠেছিল চারটি সোনার পদক। বাকি তিনটি ১০০ মিটার (‌১০.‌৩ সেকেন্ড)‌, ২০০ মিটার (‌২০.‌৭ সেকেন্ড)‌ এবং ৪x১০০ মিটার রিলের (‌৩৯.‌৮)‌। এরমধ্যে ২০০ মিটার ও ৪x১০০ মিটার রিলেতে হয়েছিল বিশ্বরেকর্ড। বার্লিন অলিম্পিক পরিচিত ‘হিটলার্স অলিম্পিক’ নামে। কিন্তু জেসির ওই সাফল্যের জন্য অনেকে বলেন, ‘ওয়েন্সেস অলিম্পিক’। বার্লিন অলিম্পিকে জেসি ওয়েন্সের ওই চারটি সোনা জয় আসলে ছিল বিশ্বের কালো মানুষদের হয়ে একটি প্রতিবাদও। অনেক উপেক্ষা, অবজ্ঞার জবাব ওই চারটি সোনা।

জেসি ওয়েন্সের জন্ম ১৯১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আমেরিকার আলবামার ডানভিলে এক দরিদ্র পরিবারে। মা-‌বাবার ১০ সন্তানের সবচেয়ে ছোট। শৈশবে ছিলেন রুগ্ন। ছিল শ্বাস নালীর সমস্যা। শিশু বয়স থেকেই সঙ্গী ছিল ব্রঙ্কাইটিস। কয়েকবার তা থেকে জীবন সঙ্কটও দেখা দিয়েছিল। মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন। বাবার নাম হেনরি ক্লিভল্যান্ড ওয়েন্স। মা এমা ফিৎজেরাল্ড। বাবা ছিলেন ঢালাইকার। কিন্তু নিয়মিত কাজ পেতেন না। ফলে তুলো চাষ করে তাঁকে সংসার চালাতে হত। সেই আয়ও ছিল খুব সামান্য।

জেসি ওয়েন্সকেও ৭ বছর বয়স থেকে বাবার সঙ্গে তুলো চাষের কাজে হাত লাগাতে হত। একবার উইভিলস পোকার আক্রমণে সব তুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিবারে আরও দারিদ্র্য নেমে আসে। দিন কাটতে থাকে প্রায় না খেয়েই। জমি বিক্রি করে জেসির পরিবার চলে যেতে বাধ্য হয় ক্লিভল্যান্ডে। জেসির বয়স তখন ৯ বছর। ক্লিভল্যান্ডে যাওয়ার পর জেসির কাজ ছিল মুদির জিনিস বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। কিছুদিন জুতো মেরামতির দোকানেও কাজ করেছেন। পরে ছাত্র থাকাকালীন লিফট অপারেটরের কাজও করেছেন। একসময় রাজ্য আইনসভার উর্দি পরা কর্মী ছিলেন।

ক্লিভল্যান্ডে গিয়েই জেসি দেখা পান চার্লস বা চার্লি রিলের। ফেয়ারমাউন্ট জুনিয়র স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক হলেও আইরিশ এই ভদ্রলোক ছিলেন অ্যাথলেটিক্স কোচও। জেসিকে দেখে চার্লির মনে হয়েছিল বড় অ্যাথলিট হবে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যই পাশের বোল্টন জুনিয়র হাই স্কুল থেকে নিজের স্কুলে এনে ভর্তি করান জেসিকে। দারিদ্র্যে র মধ্যেও শুরু হয় জেসির পদক জেতা। পরে লেখাপড়া করেছেন ইস্ট টেকনিক্যাল হাই স্কুল এবং ওহিও ইউনিভার্সিটিতে।

শুধুই কি দারিদ্র্য? গায়ের রঙ কালো বলে পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়েছে জেসি ওয়েন্সকে। স্কুল বা ইউনিভার্সিটি থেকে কখনও খেলোয়াড় হিসেবে কোনও বৃত্তি পাননি। অথচ ওঁর চেয়ে কম সাফল্য পাওয়া অনেকেই সেই বৃত্তি পেয়েছেন, গায়ের রঙ সাদা হওয়ায়। আরও কত সমস্যা!‌ ওয়েন্স জানিয়েছেন, বন্ধুদের সঙ্গে একবার এক রেস্তোরাঁয় খেতে ঢুকেছেন। মালিক শ্বেতকায়। সেখানে কালোদের প্রবেশ নিষেধ ছিল। কর্মীরা খবর দেন মালিককে। তিনি এসে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দেন জেসিকে। বার্লিনের সাফল্যের পর ওই রেস্তোরাঁর মালিকই জেসির সম্মানে ভোজ দিয়েছিলেন!‌

একসময় ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। ১৯৭৯-‌র শেষ দিকে শারীরিক অবস্থা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়ে। পরের বছর মস্কো অলিম্পিক নিয়ে তখন টালমাটাল অবস্থা। আমেরিকা মস্কো অলিম্পিক বয়কট করতে চলেছে। তা নিয়ে বিশ্ব তোলপাড়। আমেরিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সঙ্গে হৃদ্যতা ছিল ওয়েন্সের। অসুস্থ অবস্থাতেই তিনি জিমি কার্টারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, মস্কো অলিম্পিক বয়কট করা ঠিক হবে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন, ‘খেলার সঙ্গে রাজনীতিকে মেশানো উচিত নয়। অলিম্পিক আদর্শ সবার উপরে।’ তাঁর সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। আমেরিকা বয়কট করেছিল ১৯৮০-‌র মস্কো অলিম্পিক। সেটা অবশ্য দেখতে হয়নি ওয়েন্সকে। তার আগেই সেই ‘অলিম্পিক ইয়ার’-এ (‌১৯৮০)‌ ৩১ মার্চ জীবনাবসান হয় জেসি ওয়েন্সের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More