করোনা আবহের মধ্যে এত উচ্ছ্বাস, এত উৎসবের রং কলকাতা বলেই সম্ভব, দুঃখ একটাই, আমি তার সঙ্গী হতে পারলাম না

১০৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

কিবু ভিকুনা
(মোহনবাগানের প্রাক্তন আই লিগ জয়ী কোচ)

আমি নিউটাউনের রোজডালে হাজরা মন্দির স্টপেজের যে ফ্ল্যাটে থাকতাম, তার পাশেই একটা চায়ের দোকান ছিল। আমরা সব স্প্যানিশরা বিকেলে ক্যাফে কফি ডে-তে আড্ডা মারতে যেতাম। সেইসময় করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরু হলেও লকডাউন শুরু হয়নি। তো সেই চায়ের দোকানের ছেলেটি কী যেন নাম, ঠিক মনে পড়ছে না এই মুহূর্তে। প্রতিদিন একবার আমাকে ভাঙা ইংরাজিতেই বলে যেত, স্যার আমার দোকানের চা-টা একদিন সবাই মিলে খেয়ে দেখবেন, ভাল লাগবে।

একদিন ফ্রান, বেইতিয়ারা মিলে আমরা ওই ছেলেটির দোকানে চা খেতে গিয়েছিলাম। ওর ওই মায়া মাখানো মুখটা আমার বেশ মনে পড়ছে। আমরা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ১০ নম্বরের একটা মোহনবাগান জার্সি কোথা থেকে পড়ে ফেলল। হয়তো দোকানের ভেতরই ছিল। ওই ছেলেটি আর ওঁর স্ত্রী আমাদের ভাড়ে করে চা খাওয়াল সেদিন। কী আন্তরিকতা ব্যবহারে। চায়ের সঙ্গে দুটি করে বিস্কুটও দিয়েছিল।

বারবার আমাদের এসে বলছিল, আমি স্যার মোহনবাগান সাপোর্টার, কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব। আপনি না থাকলে আমরা চার ম্যাচ আগে চ্যাম্পিয়নই হতে পারতাম না। যখন চা খাওয়ার পরে টাকা দিতে যাব, নেবেই না। হাতে দেওয়ার পরেও ফিরিয়ে দিচ্ছে। আমাদের হারই মানতে হয়েছিল ওই ছেলেটির জেদের কাছে।

রবিবার আচমকা ওর কথা মনে পড়ল। আমি কলকাতায় প্রায় নয় মাস থেকেছি, একটা বিষয় কোনওদিন ভুলব না, সেটি হল কলকাতা শহরের আবেগ। আমি বাসে করেও কলকাতায় ঘুরেছি। বাসে ওঠার পরে চিনতে পেরে কত মানুষ আমাকে সিটের জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, কেউ এসে অটোগ্রাফ নিয়েছে।

রবিবার কলকাতা শহরে আই লিগের ট্রফি এল। আমাকে বহু সদস্য-সমর্থক কতরকমের ছবি পাঠিয়েছে উৎসবের। কেউ ই-মেল করেছে, কেউ বা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছে ছবি। মনটা খারাপই লাগছিল। যে দলের জন্য আমরা এত পরিশ্রম করলাম, সেই দলের এমন একটা দিনে আমিই নেই দলের সঙ্গে। কিন্তু কিছু করারও নেই। জীবন বড় কঠিন, ভাল না লাগলেও সেটিকে মেনে নিতে হয়।

বেশ মনে পড়েছে কল্যাণীতে গতবার আই লিগের ম্যাচে মোহনবাগান ২-৪ গোলে হেরেছিল। ওই ম্যাচ শেষে যখন টিম বাসে করে ফিরছি সেইসময় রাস্তাঘাটে আমার নামে সবাই বাজে কথা বলছিল। হয়তো ওরা দুঃখ পেয়ে এমন কথা বলছিল। আমি তবুও কাঁচ নামিয়ে ওদের ওই আবেগ শোনার চেষ্টা করছিলাম। ওদের ওই কষ্ট আমার বুকে এসে আঘাত করছিল।

আমি এর আগে পোল্যান্ডে কোচিং করিয়েছি, একটা দল হারলে সমর্থকদের এমন রোষানলের মধ্যে পড়তে হয়, আমি জানতামই না। কিন্তু আমি সেদিনও নিশ্চিত ছিলাম এই দলটাই ঘুরে দাঁড়াবে। সেদিন যদি মোহনবাগান অফিসিয়ালরা আমার পাশে না থাকতেন, আমাকে হয়তো চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরতে হতো। আমাকে তারপরেও দেবাশিসদা, টুম্পাইদা (সৃঞ্জয় বসু) বলেছিলেন, ‘‘কোচ আপনার সঙ্গে আমাদের চুক্তি আই লিগ শেষ হওয়া পর্যন্ত, এর মধ্যে যাই হোক না কেন, আপনিই কোচ থাকবেন।’’

এই কথাটি আমাকে মনের জোর দিয়েছিল। আমি নয়া উদ্যমে ফের কোচিং শুরু করি। তারপরে কী ঘটেছিল, সবাই আপনারা জানেন। আমার প্রিয় দল রিয়াল মাদ্রিদ, আমি মনে করি মোহনবাগানও ‘ভারতের রিয়াল’। একটা দলের ১৩০ বছরের ইতিহাস রয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত সারা বিশ্বেই খুব কম ক্লাবের রয়েছে। তাই আমি মনে প্রাণে চেয়েছিলাম এশিয়ার কোনও একটা ক্লাবে কোচিং করাতে। আমার এজেন্ট মোহনবাগান নামটা বলতে আমি প্রথমে জানতামই না, তারপর সব ইতিহাস জেনে তবেই আমি চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলাম।

আমাকে যেসব ভিডিও এবং ছবি পাঠিয়েছে মোহনবাগান সদস্য ও সমর্থকরা, তাতে দেখলাম একেবারে উৎসবের প্লাবন বয়ে গিয়েছে কলকাতার রাস্তায়। এই করোনা আবহের মধ্যে এমন উচ্ছ্বাস কলকাতাই দেখাতে পারে, সেটি নিয়েই কথা হচ্ছিল গোয়ায় কেরালা ব্লাস্টার্স দলের ফুটবলারদের সঙ্গে। আমাকে ওই সমর্থকরা ভোলেননি, আমার নামে জয়গান শোনার পরে বুঝতে পারলাম। আমার ছবিকে সামনে রেখে আনন্দ করছিলেন ওঁরা।

এটাই তৃপ্তি আমার কাছে। আমার যদি কোনও কৃতিত্ব থাকে সেটা আমার ফুটবলারদের জন্য। ওরা না থাকলে আমি একা কী করতে পারতাম! আই লিগ জয় সহজে আসেনি। না হলে একটা ম্যাচ কাশ্মীরের এক ডিগ্রি ঠান্ডাতে খেলার দুইদিন পরেই আবার কোয়েম্বটোরের ৩০ ডিগ্রি গরমে খেলতে হয়েছে। সব খেলেছে ফুটবলাররাই, ওই পরিস্থিতিতে ম্যাচও বের করে দিয়েছে। আমি তাই ফুটবলারসহ দলের ম্যানেজার, অফিসিয়াল, সদস্য-সমর্থকদের এই জয় উৎসর্গ করছি।

আমি শুরু থেকে চেয়েছিলাম এই দলটিকে ফিট রাখতে, যাতে ৯০ মিনিট দৌড়তে পারে, নিজেদের মধ্যে পাস খেলতে পারে। তাই করেছিল ওরা। আজ সত্যিই আমার খুব আনন্দের দিন। শুধু দুঃখ একটাই, মোহনবাগানের ওই দলটা পুরো ভেঙে গেল। আবার নতুন করে লড়াইয়ের মন্ত্র নিতে হবে সবাইকে।

আমার ক্ষেত্রেও তাই, আইএসএলে কেরালা ব্লাস্টার্স দলের হয়ে আমার লড়াই-ও শুরু হবে এবার, একেবারে অন্যভাবে। বলছিলাম না, জীবনের লড়াই থেমে থাকে না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More