কাঞ্চন-শিখরে জাতীয় পতাকা, ক্লান্ত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত! তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ ছুঁয়ে সফল বাংলার সাহাবুদ্দিন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ২০১৯ সালের ঘটনাবহুল ও বিয়োগান্তক আরোহণ মরসুম চলছে। কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহণ করতে গিয়ে হিমালয়ের কোলে শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন বাংলার দুই পর্বতারোহী বিপ্লব বৈদ্য এবং কুন্তল কাঁড়ার। মাকালু আরোহণে গিয়ে ফেরার পথে আজ চার দিন নিখোঁজ অভিজ্ঞ পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষ। মিরাকল কিছু না ঘটলে,চরম দুঃসংবাদটির আসা প্রায় নিশ্চিত।

    অন্য দিকে, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষে কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন বাংলারই দুই পর্বতারোহী রুদ্রপ্রসাদ হালদার ও রমেশ রায়।  ১৮ এপ্রিল ভোর তিনটের সময় দুঃসাহসিক অভিযানে নেমেছেন বাংলার পিয়ালি বসাক। একই অভিযানে ২২ মে এভারেস্ট এবং ২৩ মে লোৎসে শৃঙ্গ আরোহণ করার কথা।

    এসবেরই মাঝে, সফলভাবে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা আরোহণ করে বেসক্যাম্পে নেমেছেন ইছাপুরের জেলে পাড়ার বাসিন্দা শেখ সাহাবুদ্দিন। ভারতের শ্রীনগরের ছেলে, কিন্তু বাঙালির চেয়েও বেশি বাঙালি যুবকটির সাফল্যে আজ বাংলার মানুষ গর্বিত।

    কাঞ্চনজঙ্ঘা শীর্ষে শেখ সাহাবুদ্দিন
    শুধু পর্বতারোহণ নয়, ক্যারাটে ও সাঁতারে সমান দক্ষ, মোহনবাগানের অন্ধ ভক্ত সাহাবুদ্দিন। ক্যারাটের জাতীয় প্রতিযোগিতায় দু’বার পদক জিতেছেন৷ এক বার সোনা ও এক বার ব্রোঞ্জ পদক৷  ছাত্র জীবনে জাতীয় স্তরের সাঁতার প্রতিযোগিতায় দু’বার জলে নেমে দু’বারই রুপো জিতে এসেছেন৷ বাইক চালিয়ে গিয়েছিলেন লাদাখের খারদুংলায়।

    শেখ সাহাবুদ্দিনের বাবা শেখ নিজামুদ্দিন চাকরি করতেন ভারত সরকারের মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরিতে। মাত্র ১৮ বছর বয়েসে বাবাকে হারিয়ে, পরিবারের হাল ধরতে, ইছাপুরের ওই মেটাল অ্যান্ড স্টিল ফ্যাক্টরির চাকরিতে যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। নিজের কৰ্মস্থলে ছিল ‘মেটাল লিটল ফ্যাক্টরি মাউন্টেনিয়ারিং’ ক্লাব। সেই ক্লাবের মাধ্যমেই পৰ্বতারোহণে হাতেখড়ি হয়  শেখ সাহাবুদ্দিনের।

    কাঞ্চনজঙ্ঘা শীর্ষে শেখ সাহাবুদ্দিন
    আজ শেখ সাহাবুদ্দিন যথেষ্ট  অভিজ্ঞ ও স্বনামধন্য পর্বতারোহী।  সাহাবুদ্দিনের সাফল্যের মুকুটে আছে এভারেস্ট ও প্রায় কুড়িটি শৃঙ্গ আরোহণের সোনালি পালক। ২০১৭ সালে, এভারেস্ট অভিযানের আগে, তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল৷ সেই প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এভারেস্ট আরোহণ করেছিলেন অনমণীয় সাহাবুদ্দিন ৷

    সেই সাহাবুদ্দিন, এবছরের বসন্ত মরসুমে, কাঞ্চনজঙ্ঘায় বিপ্লব বৈদ্য, কুন্তল কাঁড়ার, রুদ্রপ্রসাদ হালদার ও রমেশ রায়ের সহযাত্রী ছিলেন। ১৫ মে সকাল ৭.৩০ মিনিটে তিনি কাঞ্চনজঙ্ঘায় আরোহণ করেন। আরও এক ঘন্টা আগেই পৌঁছতে পারতেন কিন্তু, এভারেস্টের মতই কাঞ্চনজঙ্ঘায় সেদিন ট্রাফিক জ্যাম ছিল। কারণ ওইদিন প্রায় ৫০ জন আরোহী ছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘায়। কাঞ্চনজঙ্ঘার শৃঙ্গে পৌঁছে সাহাবুদ্দিন  তুলে ধরেন জাতীয় পতাকা। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গেয়ে ওঠেন ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে‘। স্লোগান দিয়ে ওঠেন ‘জয় হিন্দ‘। সে ভিডিও দেখে, ভারতীয় হিসেবে আমাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে।

    দেখুন সেই ভিডিও

    ২০১৭ সালে কুন্তল কাঁড়ারের সঙ্গে একসাথে এভারেস্ট শৃঙ্গে সফল ভাবে আরোহণ করেছিলেন সাহাবুদ্দিন। সেবার কুন্তলকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। যা আমরা পরে জেনেছি সংবাদমাধ্যম থেকে।

    “আমার একটি সিলিন্ডার শেষদিকে দিয়েছিলাম কুন্তল কাঁড়ারকে৷ মনের জোরটাই আসল৷ মনের জোর হারালে সব শেষ৷ শেষদিকে শরীর বেহাল হয়ে পড়েই৷ তখনই মনের জোর কমতে থাকে৷ তখন সাবধান হয়ে যেতে হয়”। (সুত্র- https://eisamay.indiatimes.com/sports/other-sports/climber-sheikh-sahabuddin-returns-home-after-summitting-mt-everest/articleshow/58853640.cms)

    ক্যাম্পে ফিরে আসার পর সাহাবুদ্দিনকে বরণ করে নেওয়া হচ্ছে

    পর্বতারোহণের অমোঘ সত্যটাই বলেছিলেন সাহাবুদ্দিন। এবারও কাঞ্চনজঙ্ঘায় কুন্তল আর সাহাবুদ্দিন দু’জনেই ছিলেন। তিনি ফিরলেন, কুন্তল ফিরলেন না। কাঠমান্ডু ফিরে রুদ্রপ্রসাদের কাছে সাহাবুদ্দিন হয়ত শুনেছেন বা শুনবেন বা সংবাদমাধ্যমে জানবেন সেই দিনের মর্মান্তিক মুহূর্তটি। যেখানে রুদ্রপ্রসাদ বলছেন

    “কুন্তলকে পাগলের মতো চড়-থাপ্পড় মারছিলাম। বেশ জোরে জোরেই। ব্যথা পাওয়ার মতো। কিন্তু ও তখন সমানে একই সুরে বলে চলেছে, ‘রুদ্র আমায় একটু শুতে দে না। প্লিজ়, একটু ঘুমোতে দে না আমায়।’ আমি বুঝতে পেরে গেছিলাম, হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি…।”

    আমি নিশ্চিত, নিজের অসামান্য সাফল্যের মধ্যেও দুই সহযোদ্ধাকে হারানোর দুঃখ কুরে কুরে খাচ্ছে সাহাবুদ্দিনকে। 

    ছবি ও ভিডিও কৃতজ্ঞতা – শেখ সাহাবুদ্দিনের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More