কপিল সাইকেল চালাত, আমি সামনে বসে থাকতাম, আর বলত, তুই আমার আগে ইন্ডিয়া খেলবি!

৯৪৪

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

 

 

অশোক মালহোত্রা

শুক্রবার দুপুর তখন পৌনে দুটো হবে, হঠাৎ করে আমার এক দিল্লির বন্ধু খবরটা দিল, বলল, অশোক শুনেছিস খবরটা? আমাদের কপিলের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?

খানিক বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ওই বন্ধুটা ফোনের ওপাশ থেকে ‘হ্যালো, হ্যালো…’ করেই যাচ্ছে, আমি যে কিছু বলব, সেই হুঁসও ছিল না। তারপর মোবাইল ফোনটা নামিয়ে রেখে উদাস হয়ে বসে রয়েছি। আমার বাড়ির লোকেরা বুঝতেই পেরেছিল কিছু একটা খারাপ খবর এসেছে।

আমার বাবারও বয়স প্রায় ৯০-র উপরে। তিনি আমাকে বললেন, হ্যাঁ, রে অশোক সব ঠিকঠাক তো? বাবাকে আর কী বানিয়ে বলব! বলেই দিলাম আসল কথাটি। তিনি দেখলাম বেশ রাগতস্বরে বললেন, ‘‘এমন একটা ভাব করছিস যেন কী না কী হয়েছে! বন্ধুটার নাম ভুলে গেলি, ওর নাম কপিল দেব, ওর কিছু হতেই পারে না, দেখবি আবারও কয়েকদিনের মধ্যে তোকে ফোন করে ইয়ার্কি মারছে, কী রে অশোক, কবে যাব তোর বাড়িতে?’’

বাবার ওই কথা শুনে মনে বেশ জোর পেলাম। তারপরই দিল্লিতে রোমি ভাবিকে (কপিলের স্ত্রী, রোমি দেব) মোবাইলে ধরলাম, জিজ্ঞাসাই করলাম, কী হয়েছে গো ভাবি আমার বন্ধুর? রোমি ভাবি যা বললেন, সেটি শুনে ছোটবেলার কত স্মৃতি যে মাথায় ভিড় করছিল, সে আমিই জানি।

রোমি ভাবি জানালেন, আমার বন্ধুর একগুঁয়ে স্বভাবের কথা, যা মনে করবে, সেটাই করবে। কেউ যদি বলে ডানদিকে গেলে ভাল, তুমি ডানদিকে যাও, কপিল যদি মনে করে বাঁদিকে গেলে ভাল, ও সেটাই করবে সে যতই সেদিকে বিপদ থাকুক না কেন!

গত দু’দিন ধরেই বুকের বাঁদিকটা ব্যথা ব্যথা করছিল কপিলের। ভাবি বলেছেন বারবার, একবার ডাক্তারকে ফোন করে ডেকে নাও না, দেখো না কোনও সমস্যা রয়েছে কিনা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বারবার বিশেষজ্ঞের মতো নিজেই নাকি বলেছে, ‘‘তুমি অত ভেবো না, আমার কিছু হবে না, হয়তো গ্যাসট্রিক থেকে কিছু একটা হয়েছে, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।’’

ঠিক আর হলো কোথায়? শুক্রবার সকাল ১১-৩০টার পর থেকেই বাড়াবাড়ি হতে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। ডাক্তার দেখেই বলেছেন, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করাতে হবে, মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, তবে রাতের দিকে খবর নিলাম কপিলের বুকে স্টেইন বসাতে হয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় কপিল দেব। পাশে একমাত্র মেয়ে।

যিনি সিংহহৃদয়ের মতো খাঁচা নিয়ে দিনের পর দিন ভারতীয় পেস বোলিং লাইনআপকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন, সেই বুকেই স্টেইন বসাতে হলো। জানি না পরবর্তীকালে পেসমেকার বসাতে হবে কিনা। তবে একটা ক্ষত তো তৈরি হয়ে গেল। এটাই চিন্তার।

আমার সঙ্গে কপিলের বন্ধুত্বের বয়স প্রায় ৫০ বছর। সেই ১২ বছর বয়স থেকে ওঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব। আমরা চন্ডীগড়ে একই পাড়ায় বড় হয়েছি। একই স্কুল ডিএভি চন্ডীগড় স্কুলে পড়তাম। আমাকে সাইকেলে করে সামনে বসিয়ে নিয়ে যেত। আমার খাটো উচ্চতা, ও তো ছোট থেকেই লম্বা, আমি প্যাডলে পা পেতাম না, তাই আমাকেই চালিয়ে নিয়ে যেত। আর একটু বড় হয়ে যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করলাম দু’জনে, আমাকে প্রায়ই বলত, তোকে তো সাইকেল চাপিয়ে নিয়ে যেতেই হবে, কারণ তুই আমার থেকে আগে ইন্ডিয়া খেলবি।

তখন কী আর জানতাম সাইকেল চাপিয়ে যে নিয়ে যাচ্ছে, সেই একদিন ভারতীয় ক্রিকেটকে শাসন করবে। কিংবদন্তির সঙ্গে ঘুরেছি, স্কুল ছুটির পরে মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলেছি। স্কুলের ক্রিকেট দলে খেলেছি একসঙ্গে। কতই না স্মৃতি বুকে রয়ে গিয়েছে। বরাবর বলত আমাকে, এই দেশে কেউ পেস বোলিং করে ইন্ডিয়া টিমে ঢুকেছে বল? যদি দলে সুযোগ পেতেই হয়, তা হলে স্পিন বোলিং করতে হবে। ওঁর কথা শুনে কিছু বলতে পারতাম না, কারণ জানতামই তো, সেইসময় সবাই স্পিনার, জোরে বোলার কোথায়!

ভারতীয় ক্রিকেটে পেস বোলিংয়ের প্রধান নেতা কপিলই। ওই প্রথম দেখিয়েছিল পেস বোলিং করে দেশকে জেতানো যায়, বিপক্ষের চোখে চোখ রাখা যায়। সেইসময় ভারতের সব মাঠেই স্পিন সহায়ক উইকেট করা হতো। সেই বধ্যভূমিতে পেসারদের উইকেট পাওয়ার জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হতো। সেটাই দিনের পর করে গিয়েছে আমার বন্ধু।

তাই ওঁর অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে মনটা খানিক খারাপ হলেও এটাই মনে হয়েছে কপিল দেব হলেন জাত ফাইটার। ভারতীয় ক্রিকেটের একটা ইতিহাস। গাড়ি যেমন চলতে চলতে খারাপ হয়ে যায়, আমার বন্ধুরও তাই হয়েছে। না হলে এখনও দিনে ১০-১২ ঘন্টা কাজ করে। ভাবিই বলছিলেন, এখনও পরিশ্রম করে চলেছে।

লকডাউনের জন্য কাজ অবশ্য করতে পারছিল না। বাড়িতে বসে বসে বোর হয়ে গিয়েছিল। এটা একটা মানসিক সমস্যা হয়ে গিয়েছিল। যারা বাড়ির বাইরে সারাক্ষণ এক কর্মকান্ডের মধ্যে থাকে, সেই মানুষটি যদি দীর্ঘদিন বাড়ির মধ্যে আটকা পড়ে যায়, একটা মানসিক কষ্ট হয়। আমার মনে হয় সেটাই হয়েছে আমার বন্ধুর, তবে এও ঠিক, মোবাইলে যদি কথা হয় আজ, তা হলে বলব, কী রে ভাই, খুব যে কারোর শরীর খারাপ হলে পিছনে লাগিস! এখন যে নিজেই শুয়ে আছিস, চল কোথাও গলফ খেলি গিয়ে।

যতই রসিকতা করি ওঁর সঙ্গে, কষ্ট আমারও হচ্ছে, আর চিৎকার করে ডাকতে ইচ্ছে করছে, কপিল, চল বন্ধু, শুয়ে থাকলে হবে না, তোকে আবার মাঠে ফিরতে হবে, ফিরতেই হবে…।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More