যুদ্ধের ধাক্কা হোক বা কোভিডের ঝড়, ফ্লোরেন্সদের হাতের বাতি কখনও নেভে না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মধুছন্দা ভট্টাচার্য

    তখন আমি বেশ ছোট। কিন্তু বাংলা যুক্তাক্ষর পড়তে শিখে গেছি আর হাতের সামনে যে বই পাচ্ছি গোগ্রাসে পড়ে ফেলছি। সেবার গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি গিয়ে মাসি-মামাদের বইপত্র নিয়ে টানাটানি করছি খুব। এই করতে গিয়েই এক অমূল্য রতন পেলাম। আমার ছোটমাসির স্কুলের একটা বই, নাম “গল্প হলেও সত্যি”।

    এখনও মনে আছে, সেটা নিয়ে ছাতে ওঠার সিঁড়ির এক কোণে বসেই মগ্ন হয়ে গেছিলাম। পরপর কত অসাধারণ সব মানুষের কাহিনি! লিভিংস্টোন, কলম্বাস, জোয়ান অফ আর্ক, ডেল কার্নেগি, আলফ্রেড নোবেল– এরকম আরও কতজন মহান মানুষের কথা।

    পড়তে পড়তেই পেলাম, এক চাষির পোষা খোঁড়া কুকুরের গল্প। এক দুষ্টু ছেলে পাথর ছুড়ে পা ভেঙে দিয়েছিল সে পোষ্যের। কুকুরটা যন্ত্রণায় খুব কষ্ট পাচ্ছে দেখে চাষি তাকে মেরে ফেলাই মনস্থির করেছিল। আর তাই দেখে পাশের বাড়ির একটা ছোট মেয়ের খুব মন খারাপ হল। আমারও তাই পড়ে মন খারাপ! তারপর গল্পের মেয়েটা চাষির কাছ থেকে কুকুরটিকে চেয়ে নিয়ে। শুরু করল অপটু হাতের শুশ্রূষা। পায়ে ওষুধ দিয়ে পট্টি বেঁধে, সেঁক দিয়ে সেই কুকুরের খোঁড়া পা ঠিক করে চাষিকে ফেরত দিয়ে এল মেয়েটি। ব্যস, আমিও খুশি!

    পরে সেই মেয়ে যত বড় হয়ে উঠতে লাগল, চারপাশের দুঃখী, অসুস্থ মানুষের আর না-মানুষের সেবায় মন-প্রাণ দিয়ে দিল। সে সব ২০০ বছর আগের কথা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পেরেছেন আমি কার জীবনের গল্প পড়ছিলাম সিঁড়ির চাতালে বসে। হ্যাঁ, ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নামেই সমস্ত পৃথিবী চেনে তাকে।

    ফ্লোরেন্স সেই ছোটবেলাতেই মনস্থির করেছিল, সে সারাজীবন অসুস্থ মানুষের সেবা করবে। জার্মানি গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করে নার্সিং ট্রেনিং নিয়েছিল সে। তার পরে দেশে ফিরে প্রবল উদ্যমে সমস্ত হাসপাতালগুলোর আশ্চর্য পরিবর্তন এনে ফেলল। সারা দেশের মানুষ ধন্য ধন্য করতে লাগল। এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৮৫৪ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের যুদ্ধ শুরু। সেই যুদ্ধে ইংরেজদের পূর্ব প্রস্তুতি একেবারেই ছিল না। যার ফলে যুদ্ধে আহতদের জন্য ঠিকঠাক চিকিৎসা বা সেবার বন্দোবস্ত ছিল না। সেই যুদ্ধে আহত সৈন্যদল চিকিৎসা ও সেবার অভাবে দলে মারা যেতে লাগল। সে এক সাংঘাতিক দুরবস্থা। তখন ইংল্যান্ডের যুদ্ধমন্ত্রী নিজে ফ্লোরেন্সকে চিঠি লিখলেন সাহায্য চেয়ে। সেই ডাক শুনে অকুতোভয় ফ্লোরেন্স মাত্র ৩৪ জন নার্সকে সঙ্গে নিয়ে চলল যুদ্ধক্ষেত্রে। দেশের লোক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল সেদিন।

    ১৮৫৪ সালে সেই যুদ্ধক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স যে এক অসম লড়াই শুরু করেছিলেন, সেই যুদ্ধক্ষেত্র আজও আছে। তবে যুদ্ধ মানেই যে সবসময় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারামারি হানাহানি তা তো নয়। এবার এক অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধে নেমেছে সমস্ত পৃথিবীবাসী। আর সেই পৃথিবীবাসীর সেবার ভার অসংখ্য ফ্লোরেন্সের কাঁধে।

    সেদিনের সেই চিলেকোঠায় বসে ফ্লোরেন্সের গল্পে মগ্ন থাকা ছোট্ট মেয়েটিও কেমন করে যেন সেবার পেশায় নিযুক্ত হয়ে তেমনই এক যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়ল। সেই মেয়েটাই আজকের আমি। আজ আরও একটা আন্তর্জাতিক নার্স দিবস এল জীবনে। এবারে দিনটা একেবারে অন্যরকম। কখনও ভাবিনি, পিপিই পরে ঘামতে ঘামতে, মাস্ক পরে দমবন্ধ হয়ে আসা অবস্থায়, রবারের গ্লাভসে কুঁচকে যাওয়া হাতের পাতা টানটান করে লিখতে বসব নার্স দিবসের কথা।

    গতবছরের পুজোর পর থেকেই খবরের কাগজ, টিভি নিউজ, বিভিন্ন ই-পোর্টালে শুনছিলাম চিনের উহান প্রদেশে অদ্ভুত এক ভাইরাল ডিজিজে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। তার পর দেখতে দেখতে সেই প্রাণঘাতী মারণ ভাইরাসের কোভিড ১৯ অসুখে সমস্ত পৃথিবী ছেয়ে গেল। ১৮৫৪ সালে যেমন ইংল্যান্ড যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে পারেনি, এবারেও ঠিক তেমনই এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করার জন্য গোটা পৃথিবী প্রস্তুত ছিল না। যার ফলেই এত মানুষের মৃত্যুঝড়।

    এবারেও যুদ্ধের ময়দানে নেমে পড়তে হয়েছে সমস্ত ফ্লোরেন্সকে। ডাক্তার রোগীর চিকিৎসা বাতলে দেবেন ঠিকই কিন্তু সেটা যথাযথ ভাবে কার্যক্ষেত্রে পালন করার দায়িত্ব ফ্লোরেন্সদের। রোগীদের সময়মতো ঠিকঠাক ওষুধ ও পথ্য দেওয়া, রোগীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখার দায়িত্বও তাদেরই।

    এমনিতেই আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় নার্সিং কর্মী অত্যন্ত কম। নেই পর্যাপ্ত বেড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও। তার মধ্যে অসহনীয় গরম জলবায়ুর বাসিন্দা আমরা। এই অবস্থায় হাওয়া চলাচল বন্ধ থাকা বর্মের মতো পিপিই পরে ১২ ঘণ্টার টানা ডিউটি আমাদের অনেককেই অসুস্থ করে তুলছে। পিপিই পরা অবস্থায় সমস্ত রকম ইনপুট-আউটপুটও বন্ধ রাখতেই হবে। ফলে তেষ্টা পেলেও জল খাওয়া যাবে না, টয়লেট পেলে ভরসা ডায়াপার।

    এই অসুখের এখনও কোনও ওষুধ নেই, নেই ভ্যাকসিন। ফলে এযুগের ফ্লোরেন্স-অনুগামীদের লড়াইটা যে কতখানি দুরূহ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বলে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে আসব না আমরা কেউ। আমরা তো জানি, অসুস্থ শিশু থেকে বৃদ্ধ, সকলেই তেষ্টায় বা যন্ত্রণায় কাতর কন্ঠে একটাই ডাক দেয়– “সিস্টার!” ডাক্তারবাবুরাও যে কোনও প্রয়োজনে ওয়ার্ডে ঢুকেই ডেকে ওঠেন, “সিস্টার!”

    সবার জন্য আমরা আছি। ফ্লোরেন্সরা কখনও হেরে যাবে বলে যুদ্ধক্ষেত্রে নামেনি। আমরা আপনাদের সবার পাশে আছি। কিন্তু আপনারাও আমাদের কথা ভেবেই একটু নিয়ম মেনে চলুন এই কঠিন সময়ে। ঘরে থাকুন। যে কোনও কাজ করার আগে ও পরে হাত ধোয়ার অভ্যাসটা তৈরি করুন। ভিড় এড়িয়ে চলুন। দূরত্ব বজায় রাখুন। রোজ অল্প সময়ের জন্য হলেও ব্যায়াম করুন, পুষ্টিকর খাবার খান। আপনারা ভাল থাকলে আমাদের লড়াই সহজ হবে যে!

    আমরা অনেকেই কর্মসূত্রে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টেড। অনেক জায়গায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছি আমরা। কিন্তু এই দুঃসময়ে আমরা যখন রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে থাকতে বদ্ধপরিকর তখনও কোথাও কোথাও থেকে খবর এসেছে বাড়িওয়ালা বা পাড়ার লোক নার্সদের বাড়িছাড়া করার জন্য বাধ্য করছে বা জোট বেঁধে অপমান করছে। মনুষ্যত্বের এই নিম্নগামী ধারা দেখে খুব মানসিক যন্ত্রণা পাই আমরা। কষ্ট পাই, মনে হয় সমস্ত ঘেন্না-ভয়ের ঊর্ধ্বে যে পেশাকে আপন করেছি, তাতে বোধহয় হেরে গেলাম। কিন্তু তার পরেও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে বেরিয়ে আসার কথা ভাবতে পারি না। চোখ মুছে, চোয়াল শক্ত করে হাসপাতালে যাই, যতটা সম্ভব স্নেহে ও দক্ষতায় উপশম দেওয়ার চেষ্টা করি রোগীদের।

    প্রতিবন্ধকতা চিরকাল ছিল, এখনও আছে। কিন্তু হাতে হাত ধরে লড়লে আমরা জিতবই। কারণ শত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে আলোক শিখা বয়ে নিয়ে যাওয়ার যে দায়িত্ব ফ্লোরেন্স আমাদের দিয়ে গেছেন, তাকে জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। কারণ যুদ্ধের ধাক্কা হোক বা কোভিডের ঝড়, ফ্লোরেন্সদের হাতের বাতি কখনও নেভে না। এ বাতির দায়িত্ব সম্মানের, এ বাতির ভার বওয়া গর্বের।

    আজ আন্তর্জাতিক নার্স দিবসে আমার তরফ থেকে পৃথিবীর সকল সহকর্মীর প্রতি আভূমি শ্রদ্ধা রইল। এক যোদ্ধার তরফে ময়দান ভর্তি অন্য যোদ্ধাদের জন্য রইল কুর্নিশ।

    (লেখিকা উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের নার্স। মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More