রঘুবংশবাবুর সেদিন যেন মেয়ের বিয়ে! এমন সৎ, কর্মনিষ্ঠ,পারদর্শী গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দেখিনি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শঙ্খদীপ দাস

সংসদ ভবনের এক নম্বর গেট দিয়ে ঢুকেছি, দেখি রঘুংবশবাবু দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী রঘুবংশ প্রসাদ সিংহ। চোখে মুখে বেশ উৎকণ্ঠার ছাপ। পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছেন ওঁর আপ্ত সহায়ক ধ্যানিজি। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে? বললেন, “আরে রাইসিনা থেকে ফাইল আসবে। এলেই দৌঁড় দেব রাজ্যসভায়।”

সেদিন ছিল ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটের আগে, সংসদের শেষ দিনের অধিবেশন। আগের দিন জমি অধিগ্রহণ সংশোধন বিল পাশ হয়েছে লোকসভায়। সুতরাং সেদিনই রাজ্যসভায় বিলটি পাশ করাতে না পারলে কেঁচে গণ্ডুষ করতে হবে। প্রথম ইউপিএ সরকারের মেয়াদে সংশোধিত আইন আর দিনের আলো দেখবে না।

ফাইল সই হয়ে আসতেই দ্রুত পায়ে রাজ্যসভার দিকে এগোলেন রঘুবংশ বাবু। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে বিতর্কের পর শতাব্দী প্রাচীন জমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধনের জোরালো দাবি উঠেছে তখন দেশজুড়ে। অধিগ্রহণ আইন সংশোধন গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের বিষয় ছিল। ওই বিলের খসড়া চূড়ান্ত করতে প্রায় দেড় বছর ধরে পরিশ্রম করেছিলেন রঘুবংশবাবু। শিল্পমহল, বণিকসভা, কৃষক সংগঠন– কার সঙ্গে কথা বলেননি! সংসদে তাই বিল পাশ করানো তো নয়, সেদিন দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ওঁর মেয়ের বিয়ে। কন্যা দায়! নইলে বিলের জন্য অমন উৎকণ্ঠা নিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে কোনও মন্ত্রীকে দেখিনি।

রঘুবংশবাবুর দুর্ভাগ্য, রাজ্যসভায় বিলটি পেশ করলেও সুষমা স্বরাজরা সেদিন তা পাশ হতে দেননি। স্রেফ রাজনৈতিক কারণেই রুখে দিয়েছিলেন। তাতে খুবই হতাশ হয়েছিলেন তিনি।

আজ ১৩ সেপ্টেম্বর, রবিবার দুপুরে মৃত্যু হয়েছে রঘুবংশবাবুর। জুন মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। তার পর প্রথমে পাটনা এইমসে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে, পরে দিল্লির এইমসে। রবিবার সকাল ১১ টা নাগাদ সেখানেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর।

ছাত্রাবস্থায় গণিত নিয়ে গবেষণা করেছিলেন রঘুবংশবাবু। পরে অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন। তবে কলেজে পড়ার সময় থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সোশ্যালিস্ট রাজনীতিতে। পরে সত্তর সালের গোড়ায় সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়েন। বিহারে প্রথমবার মন্ত্রী হয়েছিলেন ৭৭ সালে। কর্পুরি ঠাকুর তখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। কর্পুরি ঠাকুরের মৃত্যুর পরে লালু প্রসাদের সঙ্গে পথ চলা শুরু হয় তাঁর।

রঘুবংশবাবুর সঙ্গে আলাপ ২০০৪ সালে। কেন্দ্রে প্রথম ইউপিএ সরকার সবে তৈরি হয়েছে। সেই সরকারে লালু প্রসাদের আরজেডির তখন খুব দাপট। ২৫ জন সাংসদ নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক ছিল আরজেডিই। লালু প্রসাদ রেলমন্ত্রী আর রঘুবংশবাবু গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী। আরজেডি থেকে আরও পাঁচ প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন সেবার।

গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের বাজেটের বহর বরাবরই বড়। গুরুত্বও কম নয়। কিন্তু বিহারের বৈশালির সাংসদ রঘুবংশবাবুর পা ছিল মাটিতে। কৃষি ভবনের পিছনের দিকে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রীর দফতর। রঘুবংশবাবু চেয়ার টেবিলে বিশেষ বসতেন না। ঘরের একদিকে সোফা সেট ছিল। সেই সোফায় পা তুলে বসতেন। ধুতিটা প্রায় হাঁটু পর্যন্ত তোলা। রঘুবংশবাবুদের প্রজন্মের বহু নেতাই রাম মনোহর লোহিয়ার শিষ্য ছিলেন। ওঁদের বলা হত ‘লোহিয়া কে লোগ’। এঁরা সকলেই লোহিয়ার মতো গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি রাখতেন। রঘুবংশবাবুও তাই। আর তাঁর নেশার মধ্যে ছিল পান খাওয়া ও নস্যি নেওয়া। মাঝে মধ্যে খইনিও খেতেন।

এহেন গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রীর ঘরে অবারিত যাতায়াত ছিল সাংবাদিকদের। এ প্রসঙ্গে এক মজার কথা না বললেই নয়। এক ইংরেজি দৈনিকের সাংবাদিক প্রথমবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। বাকি সাংবাদিকরাও তখন রয়েছেন। রঘুবংশবাবুকে নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি তাঁর বিজনেস কার্ডটা বাড়িয়ে দেন মন্ত্রীর দিকে।

কিছুক্ষণ পর দেখি ওই বিজনেস কার্ড মুড়িয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছেন রঘুবংশবাবু। সতীর্থ ওই সাংবাদিকের মুখ দেখে তখন করুণা হবে। কিন্তু রঘুবংশবাবু সেই যে একবার তাঁর নাম শুনেছেন, দ্বিতীয়বার তাঁকে পরিচয় বা নাম মনে করাতে হয়নি কখনও।

আসলে শহরের আভিজাত্য রঘুবংশবাবুর কখনও ছিল না। খুব রূঢ় শুনতে লাগতে পারে, তবে বলা যায় যে দেহাতি ছাপ ছিল তাঁর মধ্যে। কথাও বলতেন পুরোপুরি ভাগলপুরী টানে। কিন্তু মন্ত্রী হিসেব খুবই পারদর্শী ছিলেন তিনি। গ্রামোন্নয়নের বিষয়-আশয় অসম্ভব ভাল বুঝতেন। মন্ত্রকের সমস্ত পরিসংখ্যাণ, রাজ্যওয়াড়ি সব হিসেব ছিল তাঁর ঠোঁটস্থ। ফাইল দেখে বলতে হত না। বৈঠকে মন্ত্রকের সচিবরা পর্যন্ত বিস্মিত হয়ে যেতেন।

প্রথম ইউপিএ সরকারের শুরু থেকেই বস্তুত গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের উপর নজর ছিল মনমোহন-সনিয়ার। কারণ, ভোটের ইস্তেহারে কংগ্রেস জানিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে গ্রামীণ মানুষের রোজগার সুনিশ্চিত করতে আইন পাশ করবে। ইউপিএ জোটের অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচীতেও রোজগার গ্যারান্টির কথা রাখা হয়েছিল।

ফলে শুরু থেকেই রঘুবংশবাবুর ছিল হেভি ডিউটি। মহাত্মা গান্ধী রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি আইন তথা এমজিনারেগা প্রবর্তন তিনি শুধু করেননি, তাঁর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের কাণ্ডারিও ছিলেন তিনি। এই যে নবান্ন এখন দাবি করে যে, ‘একশো দিনের প্রকল্প রূপায়ণে বাংলা ১ নম্বরে’, সেই প্রকল্প প্রথম দিন থেকে সযত্নে বাস্তবায়িত হয়েছে রঘুবংশবাবুরই হাত ধরে। যদিও রাজ্য স্তরে এই প্রকল্পে চুরি ও অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগে ছিলেন তিনি। তাই বারবারই বলতেন, প্রকল্পের টাকা সরাসরি শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে যাওয়া উচিত।

কেবল সে প্রকল্পই নয়, প্রথম ইউপিএ জমানায় প্রধানমন্ত্রী সড়ক নির্মাণ, আজীবিকা, গ্রামীণ গৃহনির্মাণ এবং নির্মল গ্রাম প্রকল্পেও অতিশয় গুরুত্ব দিয়েছিলেন রঘুবংশবাবু। মাঝেমধ্যে রাজ্য সফরে চলেও যেতেন কাজ দেখতে। কোথাও কারও কাজে কোনও খামতি থাকলে ভীষণ রাগারাগি করতেন তিনি। আবার গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম কার্পণ্য করলে তাঁকেও রেয়াত করেননি রঘুবংশ। চিদম্বরমকে বলতেন, “আপনি অ্যান্টি পুওর, অ্যান্টি রুরাল।”

বাজপেয়ী জমানায় কাশীরাম রানা থেকে শুরু ইউপিএ জমানায় বিলাসরাও দেশমুখ, জয়রাম রমেশ, পবন বনশল, পরে মোদী জমানায় চৌধুরী বীরেন্দ্র সিংহ, নরেন্দ্র সিংহ তোমারকে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী পদে দেখেছি। কিন্তু রঘুবংশবাবু যেন ছিলেন আদর্শ গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী। গ্রামের মানুষের প্রকৃত সমস্যার কথা বুঝতেন তিনি। সে ভাবেই ব্যবস্থা নিতেন। কখনও কখনও কৌশলগত ভাবেই পপুলিস্ট সিদ্ধান্ত নিতেন। তবে হ্যাঁ, গ্রামের মানুষের পক্ষে তিনি থাকলেও, বাস্তবাদীও ছিলেন। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ যে জরুরি তা তিনি মনে করতেন। এ ব্যাপারে একগুঁয়ে ছিলেন না। বলতেন, শিল্পের জন্য ভিন্ গ্রহে তো জমি দেওয়া যাবে না। কোথাও কোথাও চাষের জমিও দিতে হবে। তবে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে।

সনিয়া গান্ধীও বুঝতেন রঘুবংশবাবুর বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে আরও একটা ঘটনা খুবই প্রাসঙ্গিক। ২০০৯ সালে লোকসভা ভোটে বিহারে লালু প্রসাদের সঙ্গে আর কংগ্রেসের জোট ছিল না। আগের ভোটে ২৫ টি আসন জেতার দম্ভে লালু তখনও ডগমগ। তাই কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে বার বিহারে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দিল্লিতে কংগ্রেসের নির্বাচন কমিটির বৈঠক বসেছে। দলের বিহারের এক নেতা বৈঠকে সনিয়ার উদ্দেশে বলেন, “বৈশালি আসনে এমন প্রার্থী দিচ্ছি যিনি যাদব ভোট কেটে নেবেন?” সনিয়া দৃশ্যত উদ্বিগ্ন হয়ে বলেন, “তা হলে রঘুবংশবাবু হেরে যাবেন?!” পরে ওই বিহারের নেতা বলেছিলেন, “সেদিন সনিয়া গান্ধীকে দেখে মনে হয়েছিল, উনি চাননি রঘুবংশবাবু হারানোর চেষ্টা করা হোক।” যাই হোক, সে বার কম ব্যবধানে হলেও জিতেছিলেন রঘুবংশবাবু।

লালু প্রসাদের দলে সব থেকে সৎ রাজনীতিক বলে বরাবরই পরিচিত রঘুবংশবাবু। নিজের বেতন ও ভাতার বাইরে জীবনযাপনের জন্য অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা কখনও তাঁর ছিল না। রাজনৈতিক কাজেও নয়। খুবই সাদামাঠা জীবনযাপন করতেন রঘুবংশবাবু। বাড়িতে একমাত্র উৎসব বলতে ছিল মকর সংক্রান্তির অনুষ্ঠান। প্রতিবার মকর সংক্রান্তির আগে তাঁর ফোন আসত। অশোক রোডে তাঁর বাংলোর উঠোনে শীতের রোদ পোহাতে পোহাতে দই, চিড়ে, তিলকুট, সবজি, খিচুড়ি দিয়ে খাওয়া দাওয়া হতো। সবাইকে যাচাই করে খাইয়ে খুবই তৃপ্তি পেতেন রঘুবংশবাবু।

কেন্দ্রে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে অশোক রোডে বিজেপি পুরনো সদর দফতরের বিপরীতে বিশাল সরকারি বাসভবনে থাকতেন রঘুবংশবাবু। তাঁর স্ত্রী, ছেলেমেয়েরা সে বাড়িতে বিশেষ থাকতেন না। তাঁরা থাকতেন বিহারে। রঘুবংশবাবু কখনও চাইতেনও না ছেলেমেয়েরা রাজনীতিতে আসুক। বিহারে মন্ত্রী হওয়ার পরেও নিয়ম করে বাড়িতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে অঙ্ক করাতে বসাতেন তিনি। তাঁর কাছ থেকেই শোনা, একবার নাকি ছেলেকে অঙ্ক করাতে বসে এত মাথা গরম হয়েছিল যে বেত নিয়ে তাড়া করেছিলেন তাকে। তখনও নাকি রাজ্যে মন্ত্রী তিনি! লোকে দেখেছে মন্ত্রী বেত হাতে ছেলের পিছনে ছুটছেন। তা নিয়ে লেখালেখিও হয়েছিল বিহারের বিভিন্ন সংবাদপত্রে।

রঘুবংশবাবু ছিলেন এমনই। সৎ, সাদামাঠা, কর্মনিষ্ঠ। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে পরাস্ত হয়েছিলেন তিনি। তার পর থেকে দিল্লিতে বিশেষ আর আসতেন না। তাই তার পর আর দেখাও হয়নি তাঁর সঙ্গে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More