মেট্রো হলে ইতিহাস গড়ে শরৎচন্দ্রের লেখা চন্দ্রনাথ! খোঁজ মিলবে কি প্রিন্টের

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বাধীন ভারতের বয়স তখন মাত্র ১০ বছর। কলকাতায় সাহেবিয়ানা তখনও বহাল। মধ্য কলকাতার কিছু চিত্রগৃহ ছিল ‘ওনলি ফর ইংলিশ হলিউড মুভি’। মেট্রো সিনেমা হল তার মধ্যে অন্যতম। মেট্রো যেন তখন বিলাসবহুল প্রেক্ষাগৃহের উদাহরণ। প্রেক্ষাগৃহে ঢুকলে পায়ে মখমলের মোলায়েম স্পর্শ। মেট্রো সিনেমা হলে কোনও ভারতীয় ছবি চলা মানে যেন হলের মান পড়ে গেছে, এমনই গণ্য করা হত। গুটিকয়েক বাঙালি যুবক হয়তো মর্নিং শোয়ে যেত মেট্রো হলে ইংরেজি ছবি দেখতে। তাছাড়া মহিলাদের তো ইংরেজি ছবি দেখতে যাওয়ার কোনও অনুমতিই ছিল না। তাছাড়া ওটা তখন সাহেব পাড়া। সাহেবি কেতায় মোড়া আভিজাত্য এবং রাতের বেলা কিছুটা নিষিদ্ধ পাড়াও ছিল চৌরঙ্গি পাড়া বাঙালি মহলে।

এই মেট্রো সিনেমা হলেই ১৯৫৭ সালের ১৫ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছিল প্রথম কোনও ভারতীয় ছবি, বাংলা ছবি ‘চন্দ্রনাথ’। মেট্রো সিনেমার হোর্ডিংয়ে উত্তম-সুচিত্রার ঝলমলে মুখ। পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। কোনও বাঙালি পরিচালকের ছবি প্রথম মুক্তি পেল সাহেবি হল মেট্রোয়। এর আগে মেট্রোয় কোনও হিন্দি ছবিও মুক্তি পায়নি। ভারতীয় ছবি হিসেবে ‘চন্দ্রনাথ’ প্রথম যুগান্তকারী ইতিহাস তৈরি করল।

মেট্রো হলে বাঙালি মহিলাদের টিকিট কাটার লাইনও ছিল চোখে পড়ার মতো, যেটাও ছিল ঐতিহাসিক ঘটনা। উত্তম ও সুচিত্রা অভিনীত ‘চন্দ্রনাথ’ এই ইতিহাস ঘটাতে পেরেছিল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে ‘চন্দ্রনাথ’ মেট্রোয় একটানা সাত সপ্তাহ ধরে হাউসফুল চলেছিল। বাঙালিদের ঢল বয়ে গেল সাহেবি মেট্রো সিনেমা হলে চৌরঙ্গি পাড়ায়।

মেট্রো ছাড়াও ‘চন্দ্রনাথ’ তখন রিলিজ করেছিল দর্পণা, ইন্দিরা, প্রাচী প্রেক্ষাগৃহে। চন্দ্রনাথ কলকাতার সব হলগুলি মিলিয়ে মোট চলেছিল ১৩ সপ্তাহ। ছবি সুপার ডুপার হিটের তকমা পেল। সব কটি হল মিলিয়ে টিকিট বিক্রি হয়েছিল প্রথম ১ সপ্তাহে আড়াই লক্ষ টাকার। সেই যুগে দাঁড়িয়ে যা ছিল ঐতিহাসিক। এর আগে কোনও বাংলা ছবির এত বাণিজ্যিক লাভ হয়নি প্রথম সপ্তাহে। উত্তম-সুচিত্রার ‘সাগরিকা’, ‘সবার উপরে’, ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’ সুপার ডুপার হিট হলেও সেগুলি প্রথম সপ্তাহে এত বাণিজ্য করেনি। এই ছবিগুলির কোনওটিই মেট্রো সিনেমা হলে তো রিলিজ করেইনি। একমাত্র ‘চন্দ্রনাথ’ শরৎ-সাহিত্য মারকাটারি হিট হয়েছিল সাহেব পাড়ায় ‘মেট্রো’ সিনেমা হলে। রবীন্দ্র সাহিত্যও কিন্তু এতটা সাফল্য পায়নি কখনও।

শরৎ সাহিত্যকে অপরিবর্তিত রেখেই তাকে গ্ল্যামারে ঢেলে সাজান পরিচালক কার্তিক চট্টোপাধ্যায়। চিত্রনাট্য লেখেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়।

কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা, ‘চন্দ্রনাথ’ ছবিটি পরে আর কখনও দেখতে পাননি দর্শকরা। ছবিটির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গেছে বলেই শোনা যায়। যা হয় আমাদের দেশে, কোনও ছবিরই ঠিকঠাক সংরক্ষণ নেই। শোনা যায় ‘চন্দ্রনাথ’-এর প্রিন্ট আগুনে পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন একটি ঐতিহাসিক ছবি অথচ তার কোনও অস্তিত্ব আর নেই। মাঝে শোনা গেছিল, এই ছবির একটি প্রিন্ট বাংলাদেশে আছে। পরে খোঁজ পাওয়া যায় সেটি উত্তম-সুচিত্রার ‘চন্দ্রনাথ’ নয়, রজ্জাক-সুচন্দ্রা অভিনীত একই কাহিনি অবলম্বনে ‘চন্দ্রনাথ’।

তবে আশার আলো একটা আছে। পুণের জাতীয় আর্কাইভে অনেকগুলি লুপ্তপ্রায় বাংলা ছবির প্রিন্ট জমা পড়েছে। সেগুলির মধ্যে আছে তরুণ মজুমদারের ‘বালিকা বধূ’, মৃণাল সেনের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-কণিকা মজুমদার অভিনীত ‘পুনশ্চ’, অসিত সেন পরিচালিত সুপ্রিয়া-সৌমিত্রর ‘স্বরলিপি’ এবং উত্তম-সুচিত্রার ‘চন্দ্রনাথ’। ১৬ মিলিমিটারের চন্দ্রনাথের প্রিন্ট আর্কাইভে জমা পড়েছে কয়েক বছর আগেই। সেগুলো উদ্ধার কতটা করা যাবে, সেটাই প্রশ্ন! তবে উদ্ধার সম্ভব হলেও পাবলিক রিলিজ বা ইউটিউব রিলিজ হয়তো হবে না প্রথমেই। কোনও ফেস্টিভ্যালে প্রথমে দেখানো হবে।

উত্তম সুচিত্রার ‘চন্দ্রনাথ’ ছবিটি কয়েক দশক পরেও ফের রিলিজ করেছিল। তখনও হাউসফুল ছিল। একবার বহু যুগ আগে কলকাতা দূরদর্শনে সম্প্রচারিতও হয়। তবে এই ছবিটি এযুগের কেউই প্রায় দেখেননি। তাই আজও এই ছবি নিয়ে উন্মাদনা শিখরে।

চন্দ্রনাথ উত্তমকুমার, সরযুর ভূমিকায় সুচিত্রা। এছাড়া অন্যান্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তুলসী চক্রবর্তী, চন্দ্রাবতী দেবী, মলিনা দেবী প্রমুখ। দেশভ্রমণে গিয়ে জমিদার চন্দ্রনাথ কাশীতে এক বিধবা কন্যা সুন্দরী সরযুকে দেখে প্রেমে পড়ে। বিধবা সরযুকে বিয়ে করে দেশে ফেরে চন্দ্রনাথ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই চন্দ্রনাথ জানতে পারে সরযু এক কুলত্যাগিনী নারীর সন্তান। এটা শুনে সরযুকে ত্যাগ করে চন্দ্রনাথ। সরযু তখন সন্তানসম্ভবা। কাশীতে ফিরে সে একটি সন্তানের জন্ম দেয়, নাম রাখে বিশ্বনাথ। কিন্তু বেশ কিছুদিন পর চন্দ্রনাথ নিজের ভুল বুঝতে পেরে পুত্রসমেত সরযুকে ফিরিয়ে আনে।

এই ছবিটা যখন রিলিজ করে তার আগে উত্তম-সুচিত্রার মধ্যেও ছিল চাপা অস্থিরতা। দুজনের মধ্যে মন কষাকষি তুঙ্গে। ১৯৫৭ সালে রিলিজ করেছিল উত্তম সুচিত্রার তিনটি সুপার ডুপার হিট রোম্যান্টিক ছবি। ‘হারানো সুর’ (৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৭), ‘চন্দ্রনাথ’ ( ১৫ নভেম্বর ১৯৫৭) এবং ‘পথে হল দেরি’ (৫ ই ডিসেম্বর ১৯৫৭)। কিন্তু ছবি গুলি দেখে বোঝার উপায় নেই শ্যুটিংয়ের সময়ে উত্তম-সুচিত্রার মান অভিমান ছিল তুঙ্গে।

‘পথে হলো দেরি’ ছবির শ্যুটিংয়ে উত্তমের ফোটোগ্রাফার বন্ধু  শম্ভু মুখোপাধ্যায় সুচিত্রার অনুমতি না নিয়ে আউটডোরে একটি ছবি তোলেন। সুচিত্রা তা নিয়ে প্রচণ্ড রেগে গিয়ে আপত্তি তোলেন কারণ তাঁর অনুমতি না নিয়ে তাঁর ছবি তোলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত শম্ভু বাবুকে ক্যামেরা থেকে রিল খুলে তা নষ্ট করে দিতে বাধ্য করেন সুচিত্রা। উত্তমের খুব খারাপ লেগেছিল এই ঘটনা। সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেন ওই শুটিং এই ছবি তুলছিলেন তাঁর ৮ মিলিমিটার ক্যামেরায়। তখন উত্তমও আপত্তি তোলেন। তাতে সুচিত্রা অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেন যে আউটডোর শুটিং শেষ না করেই কলকাতায় ফিরে আসেন। পরিচালক অগ্রদূত গোষ্ঠীর অনেক চেষ্টায় এই ছবির কাজ শেষ হয়।

সে যাই হোক, এই সময়েই রিলিজ করা চন্দ্রনাথ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, পর্দার পেছনের এই বিবাদ। চন্দ্রনাথ ছবিটি পাওয়া না গেলেও ছবির গানগুলি ইউটিউবে পাওয়া যায় অডিও ভার্সনে। ছবিতে গান গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য।

সিনেমার মতোই হারিয়ে গেছে সেই মেট্রো সিনেমার ঐতিহ্যও। বহুদিন বন্ধ থাকার পরে সে হল চাপাই পড়ে যায় জামা কাপড়ের দোকান, শপিং মলের আড়ালে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More