এক রূপে শ্রীকৃষ্ণ, অন্য রূপে বিবেকানন্দ! সর্বদমনকে মনে রেখেছেন অনেকেই, এখন তিনি কোথায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী। তাঁর মূর্তি বা ছবিকে এদিন নানাভাবে পুজো করেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু রামানন্দ সাগরের সেই শ্রীকৃষ্ণকে মনে আছে? বড়বেলার কৃষ্ণকে? নয়ের দশকে শ্রীকৃষ্ণ রূপে তাঁর মুখ টিভির পর্দা থেকে ভক্তদের হৃদয়ে রীতিমতো দেবতার আসন নিয়ে নেয়।

তিনি সর্বদমন বন্দ্যোপাধ্যায়। ওরফে সর্বদমন ডি ব্যানার্জী। যাঁর নাম উচ্চারণ করতে দাঁত ভেঙে যেত অনেক বাঙালির। অবাঙালিদের তো আরওই সমস্যা। অনেকেই অভিধান খুলে দেখতেন, এই নামের মানে কী? ইতিহাস বলে, রাজা দুষ্মন্ত ও বিশ্বামিত্রের কন্যা শকুন্তলার একমাত্র পুত্রের নাম ছিল ‘সর্বদমন’। এই সর্বদমন যখন রাজা হন, তখন তিনি অত্যন্ত বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। সকলেই তাঁকে অতি শ্রদ্ধা করতেন। তাই তখন থেকে ভালোবেসে জনগণ তাঁর নাম দেয় ‘ভরত’ অর্থাৎ যাঁকে সকলে ভালোবাসে। লোকমতে ভরতের রাজ্য থেকে ভারতবর্ষ নাম এসেছে।

ইতিহাস যাই বলুক না কেন, নাইন্টিজ জুড়ে দূরদর্শনের পর্দায় রোববার রাতে টিআরপি-তে সবচেয়ে এগিয়ে থাকতেন রামানন্দ সাগরের সর্বদমন। তাঁর মুখ এতটাই অপাপবিদ্ধ ছিল যে টিভিতেও দর্শকরা হাতজোড় করে প্রণাম করে দেখতে বসতো সিরিয়াল। বাংলায় সিরিয়ালটির জনপ্রিয়তা তো ছিল বটেই, কিন্তু সে সময়ে উত্তর ভারতেও এই কৃষ্ণলীলার ভক্তিরসে আরও আকুল হয় দর্শককূল। শোনা যায়, মথুরা, বৃন্দাবনে ভরে যায় সর্বদমনের মুখের ছবি।

১৯৯৩-এ ‘শ্রীকৃষ্ণ’ সিরিয়াল প্রথম দেখানো শুরু হয় ডিডি মেট্রোয়। পরে সেখান থেকে সরে সম্প্রচারিত হতে থাকে দূরদর্শনে, ১৯৯৬ সাল থেকে। মেগার কাহিনি, চিত্রনাট্য, পরিচালনা একার হাতে সামলেছিলেন রামানন্দ সাগর। এর আগে আশির দশকে নীতিশ ভরদ্বাজ জনপ্রিয় হন বিআর চোপড়ার ‘মহাভারত’ সিরিয়ালে শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করে। আর সর্বদমন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘শ্রীকৃষ্ণ’ সিরিয়ালের নামভূমিকায়। কিন্তু দু’জন কি দুজনের বন্ধু ছিলেন? না, একেবারেই নয়। বরং দু’জন দু’জনের অভিনয়ের সমালোচক ছিলেন। হয়তো নিজেদের অভিনয়ে আরও শান দিয়ে নিতেন এভাবেই।

শ্রীকৃষ্ণ সিরিয়ালের কিছু দিন পরে মিডিয়া থেকে প্রায় সরে যান সর্বদমন। আমরা তাঁর মুখ পরবর্তী কালে সেভাবে আর দেখতে পাই না। কেমন দেখতে সেই প্রথম যৌবনের কৃষ্ণ এখন? কেমন ভাবে সময় কাটে তাঁর এখন? এত দর্শক উন্মাদনার থেকে সরে গিয়ে কেনই বা তিনি অন্তরালে?

সর্বদমনের ছেলেবেলা থেকে শুরু করতে হয় গল্প। ১৯৬৫ সালের ১৪ মার্চ উত্তরপ্রদেশের উন্নাও শহরের মগরওয়ারা-তে জন্ম হয় সর্বদমন ডি বন্দ্যোপাধ্যায়ের। প্রবাসী ব্রাহ্মণ বাঙালি পরিবারে জন্ম, আদর্শ রবীন্দ্রনাথ। ছোটবেলা কেটেছিল পারিবারিক আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলে। তখন থেকেই ধর্মীয় ইতিহাস আকৃষ্ট করত তাঁকে। স্কুল জীবন কেটেছে কানপুরের সেন্ট অ্যালয়সিয়াস স্কুলে। ছেলেবেলা থেকেই তাঁকে টানত ফিল্ম, ক্যামেরা। স্কুলের গণ্ডি পার করে পুণের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিউটে অভিনয় নিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতক হন।

এর পরেই সর্বদমনের অভিনয়ে হাতেখড়ি। ১৯৮৩ সালে প্রথম অভিনয় সংস্কৃত ভাষার ছবিতে। প্রথমেই বড় সুযোগ, বড় ব্যানার এবং নামভূমিকায় সর্বদমন। সংস্কৃত ভাষার এই ছবির নাম ছিল ‘আদি শঙ্করাচার্য’। এই ছবিতে শঙ্করাচার্য রূপে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সর্বদমন। শ্রেষ্ঠ  ছবির জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিল এই ছবি। এর পরে পরপর তেলেগু ছবির সুযোগ। ‘শ্রী দত্ত দর্শনম’, ‘ও প্রেম কথা’, ‘স্বয়মক্রুশী’, ‘শ্রী ভেন্নেলা’ এবং ‘বল্লভচার্য গুরু’ প্রভৃতি দক্ষিণী ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। বেশিরভাগ ধর্মীয় চরিত্রে তাঁর সাফল্য আসতে লাগল। তবে ‘শ্রী ভেন্নেলা’ ছবিতে এক অন্ধ বাঁশিওয়ালার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

একসময়ে বাংলা ছবি না হলেও, বাংলা কলাকুশলীদের নিয়ে বলিউডের বিখ্যাত ছবি ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ (১৯৯৪)তে বিবেকানন্দর নামভূমিকায় অভিনয় করলেন সর্বদমন। আর এই ছবি ছিল মাল্টিস্টারার ছবি। কলকাতার সিমলা স্ট্রিটের স্বামীজির বাড়ি থেকে ঠাকুরের দক্ষিণেশ্বর হয়ে শিকাগো ধর্মসম্মেলন ছিল ছবির প্রেক্ষাপট। শ্রীরামকৃষ্ণের ভূমিকায় মিঠুন চক্রবর্তী, মিঠুন জাতীয় পুরস্কার পান এই চরিত্রে অভিনয় করে। সারদামণি দেবশ্রী রায়, বিবেকানন্দ সর্বদমন, বিবেকানন্দর পিতা হয়েছিলেন প্রদীপ কুমার, মাতা তনুজা আর মা দক্ষিনা কালীর ভূমিকায় হেমা মালিনী। ছিলেন আরও অনেক স্টার মুখ। শাম্মি কাপুর, শশী কাপুর, রাখি গুলজার, জয়াপ্রদা, মীনাক্ষি শেষাদ্রি প্রমুখ। পরিচালক ছিলেন জিভি আইয়ার, যিনি ছিলেন সর্বদমনের প্রথম ছবি ‘আদি শঙ্করাচার্য’র পরিচালক।

আমাদের দেখা স্বামী বিবেকানন্দর মুখের সঙ্গে অদ্ভুত মিল সর্বদমনের। তাই এই ছবিই সর্বদমনকে দিল সমগ্র ভারতে ও বিদেশে তুমুল জনপ্রিয়তা ও সর্বভারতীয় পরিচিতি। এই ছবিতে সর্বদমনকে দেখে কত বাবা-মা যে তাঁদের ছেলের নাম সর্বদমন রাখেন তখন!

সর্বদমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিরকালের স্বপ্ন ছিল বড় পর্দাতেই অভিনয় করা। ছোট পর্দায় মুখ দেখাতে চানইনি তিনি। তিনি মনে করতেন সিনেমার একটা শট একশো বছর থাকে। সিরিয়ালের কোনও সংরক্ষণ নেই। দু’বার করেও মানুষ দেখে না, সে ভাবে দেখার সুযোগও থাকে না। সিরিয়ালকে আর্ট বা শিল্প বলে কখনও মনেই হয়নি সর্বদমনের।

কিন্তু ব্যতিক্রম হল রামানন্দ সাগরের কাছে। রামানন্দ সাগর ছিলেন ‘রামায়ণ’ এবং ‘শ্রীকৃষ্ণ’ সিরিয়ালের স্রষ্টা। হিন্দি রামায়ণ চলেছিল দুই থেকে তিন বছর। আর হিন্দি ‘শ্রীকৃষ্ণ’ মেগা দূরদর্শনে চলে দশ বছর ধরে। সম্প্রতি লকডাউনেও সেগুলো আবার সম্প্রচারিত হয় এবং হিটও হয়। সেই সিরিয়ালে বালক কৃষ্ণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্বপ্নিল যোশী আর বড় কৃষ্ণের চরিত্রে সর্বদমন ব্যানার্জী।

শোনা যায়, রামানন্দ সাগর যখন সর্বদমনকে তাঁর সিরিয়ালের জন্য দেখা করতে ডাকেন, তখন সর্বদমন যাননি। কারণ টিভি সিরিজ করার কোনও ইচ্ছেই তাঁর ছিল না। কিন্তু রামানন্দ সাগরও ছাড়ার পাত্র নন। লোক পাঠিয়ে ধরে নিয়ে এলেন সর্বদমনকে। সর্বদমন ‘শ্রীকৃষ্ণ’ সিরিয়ালের সেটে হাজির হতেই রামানন্দ সাগর এক দিস্তে কাগজ দিয়ে তাঁকে বললেন “এই নিন আপনার ডায়লগ”। এসব দেখে ফের পালাতে চান সর্বদমন, কিন্তু আটকে দেন রামানন্দ। এর পরে তো ইতিহাস। ভুল ভাঙে সর্বদমনের। শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র করায় সাধারণ মানুষ তাঁকে কোথাও দেখলেই ঢিপ ঢিপ করে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেন। সর্বদমনের কৃষ্ণরূপে ঐ মিষ্ট হাসি যেন প্রশান্তির চাবিকাঠি।

‘শ্রীকৃষ্ণ’ করার সময়ে প্রতিটি পর্বে মেডিটেশন করে অভিনয় শুরু করতেন সর্বদমন। তাঁর কৃষ্ণ চরিত্র ভারত জুড়ে এবং বিদেশেও এত জনপ্রিয় হয়, যে বলার নয়। তবে নিজের অভিনয় করা ‘শ্রীকৃষ্ণ’ সিরিয়াল কখনও নিজে বসে দেখেননি সর্বদমন। আসলে স্টার হতে হবে, অনেক টাকা রোজগার করতে হবে, অনেক কাজ করতে হবে– এমন ইচ্ছে তাঁর কখনওই হয়তো ছিল না। বরং ভাল ও অল্প কাজ করেও সুখী থাকাই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র।

এই ‘শ্রীকৃষ্ণ’ই ছিল সর্বদমন ব্যানার্জীর শেষ বড় সাফল্য, খ্যাতি, যশ। এর পরে আর সেরকম বড় কাজ করেননি তিনি। ছোট চরিত্রে কাজ করেন ২০০১ সালে, ‘জয় গঙ্গা মাইয়া’ এবং ২০০৫ সালে ‘ওম নমঃ শিবায়’ ছবিতে। এর পরে একরকম বিদায় জানিয়ে দেন তিনি ফিল্ম, সিরিয়াল, গ্ল্যামার জগতকে। সর্বদমন বলতেন “রুপোলি জগতে গ্ল্যামারের জন্য কাজ করিনি, দর্শকের ভালোবাসার জন্য কাজ করেছি।”

কিন্তু সর্বদমনের ওই স্নিগ্ধ হাসি মাখা মুখ, উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ, অতলস্পর্শী চোখ এখনও অনেকে মনে রেখে দিয়েছেন। তিনিই শ্রীকৃষ্ণর ভক্তিভাব আবার তিনিই বিবেকানন্দর পৌরুষ। সবমিলিয়ে সর্বদমন যেন ছিলেন আইয়ার সাহেবের একটা আবিষ্কার। কিন্তু এই একই ধর্মীয় চরিত্র করে যাওয়া এবং একই ধর্মীয় ছবির অফার পাওয়াই কি তাঁর লম্বা কেরিয়ারে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ হল?

টলিউড হোক বা বলিউড, বরাবরই একটা গোত্রে অভিনেতা অভিনেত্রীদের ফেলে দেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। সেটা থেকে বেরোতে সবাই পারেন না। বেরোতে দেওয়া হয় না। সর্বদমনকে অন্যরকম মানবিক চরিত্রে বা নায়কের রোলে কেউ সে ভাবে ভাবেননি। অথচ নয়ের দশকে এই হিন্দি ‘শ্রীকৃষ্ণ’ পশ্চিমবাংলায় বাংলা ডাবিং করেও বেশ কিছুকাল সম্প্রচারিত হয়। আট থেকে আশি– সকলে দেখত সর্বদমনকে। তখনকার টিনেজারদের মধ্যেও সর্বদমন হার্টথ্রব ছিলেন। কেউ যেমন তাঁকে দেখলে প্রণাম করতেন, আবার কেউ কেউ কৃষ্ণপ্রেমেও নিমজ্জিত হতেন। বাংলা ছবির পরিচালকরা চাইলে হয়তো তাঁকে নিয়ে ছবি করতেই পারতেন।

কিন্তু আজ কোথায় সেই নায়ক?

‘শ্রীকৃষ্ণ’র পর এক্কেবারে অন্য রুটে হাঁটা শুরু করেন সর্বদমন বন্দ্যোপাধ্যায়। সমাজসেবাকেই বেছে নেন নিজের প্রধান জীবিকা হিসেবে। উত্তরাখণ্ডের হৃষীকেশে চিল্লা জঙ্গলের কাছেই থাকতে শুরু করেন সর্বদমন ডি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর একটি এনজিও রয়েছে সেখানে। তিনি যোগশিক্ষা দেন কচিকাঁচাদের। তাঁর এনজিওতে বিনামূল্যে বস্তির ২০০ জন শিশুর দেখভাল করা হয়। দুঃস্থ মহিলাদের জীবিকা নির্ধারণের রীতিনীতিও শেখান সর্বদমন। মেডিটেশন ও যোগসাধনাকেই বেছে নিয়েছেন তাঁর জীবনদর্শন হিসেবে। স্ত্রী অলঙ্কৃতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী রূপে পাশে রয়েছেন।

বৃক্ষরোপণ, পশুসেবা, দরিদ্রদের সাহায্য এবং যোগসাধনার শিক্ষাকেন্দ্র– এসবই এখন সর্বদমন ও অলঙ্কৃতার জীবন। তবে অবসরে লং ড্রাইভ থেকে সন্তুর বাজানো কিংবা ট্রেকিংও পছন্দ সর্বদমনের। শরীর ঠিক রাখতে রোজ সময় করে জিমে শরীরচর্চা করতেও ভোলেন না পঞ্চান্নর কৃষ্ণ। কপালের ওপর হয়তো এসে পড়েছে কিছু রুপোলি চুল, কিন্তু সেই হাসি আজও অমলিন। সেই দীপ্ত পৌরুষ অটুট, সেই রোম্যান্টিক লুকও একইরকম।

তবে এসব কিছুর মধ্যেও সর্বদমন কয়েক বছর আগে আরও একবার ফিরে আসেন পর্দায়। ২০১৬ সালে সুশান্ত সিং রাজপুত অভিনীত ‘এম এস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ ছবিতে সর্বদমনকে দেখা গিয়েছিল ধোনির কোচের ভূমিকায়। তাঁর চরিত্রের নাম ছিল চঞ্চল ভট্টাচার্য। কিন্তু ওইটুকুই। সেই চরিত্রে প্রশংসা পেয়েও তিনি আর ভাবেননি নিয়মিত অভিনয় করার কথা।

সর্বদমন কিন্তু হারিয়ে যাননি আজও। হেরেও যাননি। বরং তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, এক নম্বরে থাকাটাই সব নয় জীবনে। মিডিয়াকে গুডবাই জানিয়েছেন, একলা করেছেন নিজেকে। কিন্তু যুগাবতার শ্রীকৃষ্ণ এবং মহামানব স্বামী বিবেকানন্দ রূপে তিনি আজ আর্ত দরিদ্রের পাশে, অনাথ শিশুদের পাশে মানুষকে নতুন জীবন দিচ্ছেন, সঠিক দিশা দেখাচ্ছেন। শ্রীকৃষ্ণ, স্বামীজি, শঙ্করাচার্যের জীবন দর্শনকে যেন নিজের জীবনে ও মননে আত্মস্থ করেছেন তিনি।

গ্ল্যামার জগতের আলোটুকু নিয়ে, পাঁকগুলো দমন করে তিনি যেন সত্যিই সর্বদমন হয়ে উঠেছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More