‘কাবুলিওয়ালা’র ছোট্ট মিনি বড় হয়ে বিশ্বজয় করেন ব্রিজ খেলায়! তবে জীবন ফুরোয় অকালেই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“আমার পাঁচ বছর বয়সের ছোটো মেয়ে মিনি এক দণ্ড কথা না কহিয়া থাকিতে পারে না। পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া ভাষা শিক্ষা করিতে সে কেবল একটি বৎসর কাল ব্যয় করিয়াছিল, তাহার পর হইতে যতক্ষণ সে জাগিয়া থাকে এক মুহূর্ত মৌনভাবে নষ্ট করে না। তাহার মা অনেক সময় ধমক দিয়া তাহার মুখ বন্ধ করিয়া দেয়, কিন্তু আমি তাহা পারি না।”

এই ছিল মিনির গল্প। কন্যাসন্তানের প্রতি বাবাদের চিরকালীন অপত্য স্নেহ বুঝিয়ে এসেছে এই গল্পের ‘মিনি’ চরিত্রটি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনি যেন চিরকালের বাপসোহাগী ছোট্ট মেয়েটি। এই মিনির গল্প নিয়ে কালজয়ী ছবিও নির্মাণ করেছিলেন লেজেন্ডারি পরিচালক তপন সিনহা। রবি ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’-র ছোট গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র করার সাহস তপন সিনহাই দেখান প্রথম। চারুচিত্রের নিবেদনে ১৯৫৭ সালের ৪ জানুয়ারি মুক্তি পায় ‘কাবুলিওয়ালা’। ছবি তখন বক্সঅফিস হিট। প্রতিটি বাঙালি বাড়ির স্বপ্নের ছবি হয়ে ওঠে সেটি। আজও দর্শকের মনে রেখাপাত করে ‘কাবুলিওয়ালা’। এই ছবির আবেদন চিরকালীন।

সেই ছবিতেই সামনে আসে ছোট্ট মিনি। মিনির সেই ডায়লগ তো আজও আমাদের কন্ঠস্থ … “কাবুলিওয়ালা, ও কাবুলিওয়ালা, তোমার ও ঝুলির ভিতর কী আছে।” মিনির চরিত্রে সামনে আসে ছোট্ট টিঙ্কু ঠাকুর। কিন্তু তাকে তেমন করেই মনের মধ্যে রেখে দিয়েছে বাঙালি। মিনি না হয় ছোট্ট হয়ে থেকে গেল, কিন্তু টিঙ্কু? তার কী হল? কেমন দেখতে হলেন টিঙ্কু যুবতী বয়সে? কৌতূহল অনেকেরই আছে।

টিঙ্কু ঠাকুরের ভালো নাম ঐন্দ্রিলা ঠাকুর। টিঙ্কুরা ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আত্মীয়। টিঙ্কুর বাবা গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মা ইরা ঠাকুর। টিঙ্কু তাঁদের মেজো মেয়ে। বড় মেয়ে রিঙ্কু, যাঁর ভাল নাম শর্মিলা ঠাকুর। শর্মিলা ঠাকুর তো বিশ্ববন্দিত নায়িকা। আর ছোট বোন রোমিলা ঠাকুরের ডাক নাম চিঙ্কি। এই মেজো মেয়ে টিঙ্কুকেই মিনি হিসেবে বেছেছিলেন তপন সিনহা।

ছবি বিশ্বাসের মতো রাশভারী অভিনেতার সঙ্গে কী দুরন্ত সঙ্গত দিয়ে অভিনয় করেছিলেন ছোট্ট টিঙ্কু! কাবুলিওয়ালা-রূপী ছবি বিশ্বাস এবং মিনি-রূপী টিঙ্কু, দুই অচেনা অসমবয়সী অজানা দেশের মানুষ দুজন দুজনের বন্ধু হয়ে ওঠে। কাবুলিওয়ালার কাছে তাঁর মেয়ের কোনও ছবি নেই, আছে শুধু স্মৃতি আর মেয়ের একটা হাতের ছাপ… মেয়ের আদরের দাগ। ছবি বিশ্বাসের এক্সপ্রেশন, তাকানো, অভিনয় সেই সঙ্গে রবি শঙ্করের মিউজিক ও তপন সিনহার পরিচালনা এক অনবদ্য ছায়াছবি তৈরি করে। টিঙ্কু ঠাকুর, ছবি বিশ্বাস ছাড়াও সিনেমায় অভিনয় করেছেন রাধামোহন ভট্টাচার্য, মঞ্জু দে, আশা দেবী, জীবেন বোস, কালী ব্যানার্জী প্রমুখ।

আরও পড়ুন: শুক্রাণু সাঁতার কাটতেই পারে না, ৩৪২ বছরের বিশ্বাস ভাঙল, নতুন খোঁজ বিজ্ঞানীদের

জানা যায়, মঞ্জু দের অবদানও ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে অনেকটা। তিনিই তপন সিনহাকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করেন, সাহস যোগান। ‘কাবুলিওয়ালা’-য় মিনির মা যেমন হন তিনি, তেমন বাস্তবের টিঙ্কুকেও নাচ শিখিয়ে, অভিনয় শিখিয়ে ছবির উপযুক্ত করে তোলেন মঞ্জু দে। বাকিটা তপন সিনহার কৃতিত্ব। ছোট্ট টিঙ্কুর ট্যালেন্ট আর মিষ্টি মুখ তো ছিলই আকর্ষণের বড় কেন্দ্রবিন্দু।

শুধু তাই নয়, সিনেমায় মিনির সঙ্গে ‘খরবায়ু বয় বেগে’ গানে লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যও নাচ করেছিলেন ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে। মঞ্চে বাচ্চাদের নাচের দৃশ্যায়নে মিনির পাশে দু’টি বালিকার একটি ছিলেন ‘দহন’, ‘কাছের মানুষ’, ‘মিতিন মাসি’র লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য।

টিঙ্কু ঠাকুর কিন্তু বাবা ও মা, দু’দিক থেকেই ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে জড়িত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সন্তান দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতনি ছিলেন লতিকা ঠাকুর। লতিকা বিয়ে করেন অসমের জ্ঞানদাভিরাম বড়ুয়াকে। জ্ঞানদাভিরাম ছিলেন গুয়াহাটির আর্ল ল কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। জ্ঞানদাভিরাম এবং লতিকার কন্যা হলেন ইরা। তাঁর আবার বিয়ে হল মামাবাড়ির দিকে জ্ঞাতি পরিবারে।

ইরার স্বামী গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা কনকেন্দ্রনাথ, তাঁর বাবা গগনেন্দ্রনাথ অর্থাৎ গগন ঠাকুর। গগন ঠাকুরের বাবা ছিলেন গুণেন্দ্রনাথ, তাঁর বাবা গিরীন্দ্রনাথ। এই গিরীন্দ্রনাথের দাদা স্বয়ং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি কিনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা।

আরও পড়ুন: ‘তোমাদের ঋতুপর্ণ তো আমায় ঠকিয়েছে!’ আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন গীতা দে

অর্থাৎ সহজ ভাবে বলতে গেলে, দাদুর বাবার ভাইয়ের নাতির নাতিকে বিয়ে করেছিলেন লতিকা ঠাকুরের কন্যা ইরা। সেই গীতিন্দ্রনাথ-ইরার মেয়েরা হলেন শর্মিলা, ঐন্দ্রিলা ও রোমিলা। তার মানে দাঁড়াল‚ টিঙ্কু ঠাকুর হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদার মেয়ের নাতনি।

শর্মিলা ঠাকুর পরে পেশাদার অভিনেত্রী হলেও, তাঁর অনেক আগেই ছবির জগতে আসেন টিঙ্কু ওরফে ঐন্দ্রিলা ঠাকুর। তপন সিনহার ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে ছোট্ট টিঙ্কুকে দেখে দেখে সত্যজিৎ রায় ভাবেন এই বাচ্চা মেয়েটির বয়স একটু বেশি হলে একে নিয়ে ‘অপুর সংসার’-এ অপর্ণার চরিত্রটি করানো যেত। কিন্তু কবে শিশু টিঙ্কু কিশোরী হবে, ততদিন তো অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই সত্যজিৎ রায় খোঁজ করলেন টিঙ্কুর কোনও দিদি আছে কিনা, যাকে দিয়ে অপুর অপর্ণার রোল করানো যায়। এভাবেই তপন বাবু মারফৎ টিঙ্কুর সূত্রে সত্যজিৎ রায় খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর অপর্ণা, অর্থাৎ শর্মিলা ঠাকুরকে।

Apur Sansar: Satyajit Ray's famed Apu Trilogy ends with a ...

তবে ছোট্ট টিঙ্কুর এত প্রতিভা একটা ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকল। মিনি হিসেবেই রয়ে গেছেন আজও সকলের মনে। টিঙ্কুর অভিনয় প্রতিভা বড় বেলায় ঢেকে গেল দিদি রিঙ্কু শর্মিলা ঠাকুরের আলোকে। অথচ টিঙ্কুর সূত্রেই শর্মিলা এসেছিলেন চলচ্চিত্রে। টিঙ্কু ঠাকুরকে তেমন ভাবে পাওয়া গেল না চলচ্চিত্র জগতে। বরং শর্মিলা ঠাকুরের বোন বলেই তিনি পরিচিত হলেন পরবর্তী কালে। আর তাঁদের ছোট বোন রোমিলা ঠাকুর পরে হন রোমিলা সেন, নিখিল সেনের স্ত্রী। নিখিল সেন একজন কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব ছিলেন, ব্রিটানিয়া ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ অপারেটিং অফিসার ছিলেন। রোমিলা প্রায় কুড়ি বছরের ছোট ছিলেন শর্মিলার থেকে।

কিশোরী বেলায় টিঙ্কু ঠাকুর মুনমুন সেনের সঙ্গে দার্জিলিং কনভেন্টে পড়তেন। দু’জনে বেস্টফ্রেন্ডও ছিলেন। পরেও যোগাযোগ ছিল দুজনের। মুনমুনও কিন্তু পরে তপন সিনহার ছবি করেন, ‘বৈদুর্য্য রহস্য।’

তাহলে টিঙ্কু ঠাকুর বড় হয়ে কী করলেন? কেমন দেখতে হলেন রহমতের সেই ছোট্ট, মিষ্টি, আদুরে মিনি?

চলচ্চিত্রে আর ফেরেননি ঐন্দ্রিলা টিঙ্কু ঠাকুর। একদম একটা অন্য পেশায় তাঁর ভালবাসা সঞ্চারিত হল। ব্রিজ খেলোয়াড় হলেন টিঙ্কু ঠাকুর। শুধু তাই নয়, বেশ নাম করলেন খেলাধূলার মহলে। মহিলা ব্রিজ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। কোনও বাঙালি মেয়ে যে এমন পেশায় যেতে পারেন, তা ভাবাও যেত না। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির এই মেয়ে এমনটাই ভেবেছিলেন। তিনি টুর্নামেন্টেও খেলতেন।

টিঙ্কু ঠাকুরের বিয়ে হয়েছিল কালীঘাট ট্রামডিপোর পাশের রাস্তায়, কুণ্ডু বাড়িতে। তাঁর স্বামীর নাম দিলীপ কুণ্ডু। ডিকে কুণ্ডু বলে পরিচিত তিনি। তাঁদের পুত্র মিকি কুণ্ডু। কেমন দেখতে হন ছোট্ট মিনি বড়বেলায়?

ঐন্দ্রিলা কুণ্ডু ঠাকুরের বড়বেলার এক্সক্লুসিভ, দুষ্প্রাপ্য, অদেখা ছবিটি দেখুন।

টিঙ্কু অনেক গুণী মেয়ে হয়েও কম প্রচারের আলো পেয়েছেন। তাঁর কারণ অল্প বয়সেই প্রয়াত হন টিঙ্কু। বয়স তখন মাত্র চল্লিশের কাছাকাছি। শোনা যায়, কোনও এক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে হঠাৎই মৃত্যু হয় তাঁর।

আরও পড়ুন:

পর্দায় খলনায়িকা সঙ্ঘমিত্রা, বাস্তবে তাঁর উদারতা ও মনের জোরকে আজও স্যালুট করে ইন্ডাস্ট্রি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More