কিশোর কুমারের ছবির নায়িকা সুপ্রিয়া, শ্যুটিংয়ের রাতে আচমকা ফোন এল উত্তমের

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ কিশোরকুমারের জন্মদিন। তাঁর নায়ক-গায়ক পরিচয় সকলেই জানে। কিন্তু তার বাইরেও তাঁর ভূমিকা ছিল নানা বিষয়েই। অনেকেই জানেন না, বাংলা ছবির ও বাস্তবের অন্যতম হিট জুটি উত্তম-সুপ্রিয়ার মধ্যে নিজের অজান্তেই তিনি একটি ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছিলেন। না, সেই চিরাচরিত ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার ছিল না। কিন্তু এমন কিছু ছিল, যা উত্তম ও সুপ্রিয়াকে একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ও একাত্ম করেছিল। আজ তাঁর জন্মদিনে রইল সেই অজানা গল্পই।

ঘর ভাঙল বেণুর

বেণুর তখন ঘরে-বাইরে দিশাহীন অবস্থা। প্রথম স্বামী বিশ্বনাথ চৌধুরীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছে সদ্য। বিশ্বনাথ ওরফে বিশুই বেণুর সিনেমার জগতে পা রাখার শুরু থেকে পাশে ছিলেন। বিশ্বনাথ চৌধুরী পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। সুপ্রিয়া অভিনেত্রা। কিন্তু একটা সময়ের পরে সিনেমার ব্যস্ততায় বেণুর সংসারে সময় দিতে না পারা, স্বামী-মেয়ের দেখভাল করতে না পারা চরম অশান্তির কারণ হল তাঁদের মধ্যে।

অন্যদিকে উত্তম কুমারের নায়িকা হয়ে তখন কয়েকটা ছবি পরপর হিট বেণুর। বিশ্ববন্দিত উত্তম-সুচিত্রা জুটির মাঝে জায়গা করে নিচ্ছেন লড়াকু মেয়ে বেণু ওরফে সুপ্রিয়া চৌধুরী। উত্তমের দুর্বলতাও তৈরি হয়েছে সুপ্রিয়ার প্রতি। ছবিতে উত্তমের নায়িকা হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নন সুপ্রিয়া, কিন্তু এদিকে ঘর পুড়ছে। বিশ্বনাথ চৌধুরী যে অমায়িক ভাল মানুষ, সে কথা আজীবন স্বীকার করেছেন সুপ্রিয়া কিন্তু তখন এক ছাদের তোলায় দু’জনের সংসার টেকানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। উত্তম অবশ্য বলেছিলেন বেণুকে, ‘ঘর ছেড়ো না। কেন একা একা থাকবে? চেষ্টা করো মানিয়ে গুছিয়ে চলতে।’

কিন্তু সংসার ভাঙলই। শেষমেষ ডিভোর্স। পাকাপাকি ভাবে নতুন চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে গেলেন বিশ্বনাথ চৌধুরী। যোধপুর পার্কে বাড়ি ভাড়া নিলেন সুপ্রিয়া। মেয়ে সোমার দায়িত্বও সুপ্রিয়াই নিলেন।

ভালবাসার সঙ্গে এল দ্বিধা, অভাব

উত্তম তখন বেণুর অনেক কাছের মানুষ। উত্তম-সুপ্রিয়া প্রেমের প্রথম ভাগ চলছে। কিন্তু এটা কি সত্যি ভালবাসা? দ্বিধা কাটছে না বেণুর। বিবাহিত, সংসারি উত্তমকে কি বিশ্বাস করা যায়! একাই কাটছে দিন। মেয়ে সোমাকে হোস্টেলে পাঠিয়ে আরও একা হয়ে গেলেন বেণু।

একটা সময় এল, যখন বেণুর হাতে কোনও ছবি নেই। ডিভোর্সের কারণে ঠিকমতো শ্যুটিংয়ে যেতে না পারায় সব ছবির অফার চলে গেছে। টাকারও দরকার, সিনেমা করার খিদেও রয়েছে। এমতাবস্থায় বেণুর একা দিশেহারা জীবনে পাশে এসে দাঁড়ালেন এক প্রিয় দাদা। যিনি বেণুর নিজের বড়দার থেকেও আপন।

বেণুর বাড়িতে এসে সেই দাদা বললেন ‘নতুন ছবির কথা চলছে। তুই কাজ করতে চাস তো বল? কিন্তু হিন্দি ছবি! পারবি? বম্বে চলে যা। ওখানেই তোর প্রপার জাজমেন্ট হবে। তোর গুণের কদর হবে।’

বেণু তখন হিন্দি কেন, যে কোনও ছবি পেলেই করতে রাজি। কাজের তখন খুব দরকার। বেণু খুলে বললেন সেই দাদাকে নিজের অবস্থার কথা … ‘বম্বে যেতে হলে যাব। হিন্দি ছবি করব। আমি আর পারছি না।’

এক ফোনেই বম্বের নায়িকা হলেন বেণু

সেই দাদা বেণুর বাড়ি থেকেই কাকে যেন ফোন করে বললেন, “হ্যাঁ কিশোর, তুমি তোমার ছবিতে নতুন নায়িকা খুঁজছিলে! নায়িকা পাওয়া গেছে। ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ তো দেখেছো তুমি। নীতা চরিত্র যে মেয়েটি করেছে, সে। সুপ্রিয়া চৌধুরী। আমি বম্বে নিয়ে আসছি। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। রাখছি।”

কী অদ্ভুত! অপর প্রান্তের জন এক কথাতেই রাজী হয়ে গেলেন! সেটা ফোনের কথা শুনে বুঝতে পারলেন সুপ্রিয়া। এই দাদার বম্বেতে এত জোর, যাঁর এক কথায় নায়িকা হওয়া কনফার্ম হয়ে গেল শুধু একটি টেলিফোনে! ফোন রেখে বেণুকে দাদা বললেন, ‘গোছগাছ কর কদিন পরেই আমরা বম্বে যাচ্ছি। শুধু তোকে হিন্দিটা শিখতে হবে আরও।’

বেণুর এই দাদার নাম সারা দেশ জানে হেমন্ত কুমার হিসেবে। তিনি বাংলার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আর ফোনের অপর প্রান্তে যিনি ছিলেন, তিনি নায়ক-গায়ক কিশোর কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। দুই বাঙালি তখন বম্বের নক্ষত্র, বাংলার গর্ব। তাঁরাই এক ফোনে ঠিক করে ফেললেন আগামী ছবিতে বম্বেতে এক বাঙালি নায়িকার অভিষেক পর্ব।

কিশোর কুমার নিজে নিতে এলেন সুপ্রিয়াকে

কিশোর কুমার গায়ক-নায়ক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত হলেও, সেবার তাঁর ভূমিকা ছিল পরিচালকের। কিশোর কুমার তখন তৈরি করছেন তাঁর স্বপ্নের ছবি ‘দূর গগনকি ছাঁও মে’। ছবির পরিচালক, প্রযোজক, নায়ক এবং সঙ্গীত পরিচালক কিশোর কুমার একাই। আর এই ছবিতে তাঁর সুরে গান গেয়েছেন পরম বন্ধু-দাদা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

এমন একটা ঐতিহাসিক ছবিতেই কিশোর কুমারের বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ফাইনাল হয়ে গেল সুপ্রিয়া চৌধুরীর নাম।

বম্বে এয়ারপোর্টে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর সুপ্রিয়া চৌধুরী নেমে দেখলেন তাঁদের রিসিভ করার জন্য নিজে এসেছেন স্বয়ং কিশোর কুমার! সঙ্গে ওঁর ছবির সহকারী এবং সহ-অভিনেতা সুজিত কুমার। এমন অভ্যর্থনা পেয়ে সুপ্রিয়া তো চমকিত। কিশোর কুমার তখন বাংলা আর বম্বে– দু’জায়গারই স্টার। এয়ারপোর্ট থেকে কিশোরকুমার ওঁদের নিয়ে সোজা চলে গেলেন জুহু হোটেলে। সেখানেই থাকবেন তাঁর ছবির নায়িকা সুপ্রিয়া।

কিশোরজি সুপ্রিয়ার হিন্দি শেখার জন্য শিক্ষকও ঠিক করে রেখেছিলেন। এমন শিক্ষক, যিনি ছাত্রীকে হিন্দি ও উর্দু দুই ভাষাই রপ্ত করাতে পারেন। সঙ্গে চলল ডান্স ক্লাস। ওই হোটেলে সুপ্রিয়া একাই থাকতেন। চলত শ্যুটিং আর হিন্দি শেখা, পাশাপাশি। ইতিমধ্যেই আরও দুটো হিন্দি ছবির অফার সাইন করলেন সুপ্রিয়া। ‘বেগানা’ ও ‘আপ কি পরছাঁইয়া’।

কিশোর কুমার মানেই যেন অনাবিল আনন্দ

‘দূর গগনকি ছাঁও মে’-র শ্যুটিংয়ে কিশোর কুমারই নায়ক। কিশোর কোনও চিত্রনাট্য ফলো করতেন না অনেক সময়। তিনি এতই প্রত্যুৎপন্নমতিসম্পন্ন, যে কখন মজা করে কোন ডায়লগ বলবেন সেটা স্ক্রিপ্টে থাকত না। কিশোরের ওই সব কেরামতির সঙ্গে পাল্লা দিতে হত সদ্য বম্বে যাওয়া সুপ্রিয়াকেও।

‘দূর গগনকি ছাঁও মে’-তে কিশোর শিশুশিল্পী রূপে নিজের ছেলে অমিতকুমারকে প্রথম ছবিতে অভিনয় করান। বাচ্চা ছেলেটিকে ঘিরেই গল্প। আজও এই ছবির কথা সব সময় সব ইন্টারভিউতে বলে থাকেন অমিত কুমার। ছোটবেলায় অমিত ছিলেন লাজুক। অমিতের সঙ্গে সুপ্রিয়া ভাব করার চেষ্টা করতেন, যাতে সিনটা ভাল হয়। কিন্তু শিশু অমিত ছিল বাবার খুব ন্যাওটা তাই অমিতকে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করাতে কিশোরকেই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হত।

একদিন একটা মজার কাণ্ড ঘটল। কিশোর কোথা থেকে একটা বড় কাঁচি নিয়ে এসে হেয়ার ড্রেসারের তোয়াক্কা না করে অমিতের মাথার চুল প্রায় সব কেটে দিলেন। সুপ্রিয়া তো হেসে বাঁচেন না। আর অমিত মাথায় হাত দিয়ে কেবল কাঁদতেন। কিশোর অমিতকে অনেক করে বুঝিয়ে বললেন, “গাঁয়ের ছেলের অত বড় চুল থাকে না। তাই কেটে দিয়েছি।”

গায়ক কিশোরের দক্ষতা নিয়ে অনেক চর্চা হয়, কিন্তু পরিচালক কিশোরের কতটা ডেডিকেশান আর সূক্ষ্ম নজর ছিল, তা অনেকেই জানেন না।

সুপ্রিয়ার দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল

একদিন কিশোর কুমার আর সুপ্রিয়া দেবী একসঙ্গে গাড়ি করে ফিরছিলেন। কলকাতার মেয়ে বেণু, বম্বের রাস্তাঘাট অচেনা। গাড়ি চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেল। তখন প্রায় রাত দশটা। ঘন অন্ধকার। এখনকার মতো জনবহুল মুম্বই নগরী তখন নয়। ওই সব জায়গায় তখন কোনও হোটেল, মল কিছুই তৈরি হয়নি। ফাঁকা মাঠ আর জঙ্গল দু’পাশে।

কিশোর ড্রাইভার আবদুলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক‍্যায়া হুয়া আবদুল?’ আবদুল জবাব দিলেন, ‘গাড়ি খারাপ হো গ্যয়ি। চলেগি নেহি।’ কিশোর সুপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে নির্বিকার ভাবে বললেন, ‘এখন কী হবে? গাড়ি তো চলবে না। আপনাকে তো এখন হেঁটে যেতে হবে।’ সুপ্রিয়া অবাক, ‘হোটেল তো অনেক দূর। কী করে এতটা হেঁটে যাব?’

সুপ্রিয়ার তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। কী করে যাবেন এত রাস্তা হেঁটে! তার ওপর অজানা শহর। কিশোর কুমার গাড়ি সারাবেন বলে সুপ্রিয়াকে নামিয়ে দিলেন গাড়ি থেকে। আর বললেন ‘এবার হাঁটুন ঠিক পৌঁছে যাবেন।’ সুপ্রিয়ার তো রাগে শরীর জ্বলছে, মাথা গরম হয়ে গেছে। অগত্যা হাতে মেক আপ বক্স নিয়ে সুপ্রিয়া হাঁটতে লাগলেন। সারাদিনের শ্যুটিংয়ের ক্লান্তি, পা চলছে না, তার ওপর অচেনা জায়গায় অন্ধকার রাস্তা।

হঠাৎ সুপ্রিয়া দেখলেন কিশোর কুমার গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে আসছেন। সুপ্রিয়া তো অবাক। কী করে গাড়ী ঠিক হল এর মধ্যে! কিশোর কুমার বেণুকে ক্রস করার সময় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন ‘হাঁটুন হাঁটুন, আপনার কাছে তো হাঁটা কোনও ব্যাপারই নয়। যে মেয়ে বার্মা থেকে কলকাতা পায়ে হেঁটে আসতে পারে তাঁর কাছে এটুকু হাঁটা কিছুইনা। হাঁটুন হাঁটুন। আপনিই তো পারবেন হেঁটে যেতে! তাছাড়া এখন তো আপনার স্ট্রাগল করার সময়।’

রাগে সুপ্রিয়ার দু’চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। এর পরে গাড়ি থামিয়ে কিশোরজি গাড়ি থেকে নেমে সুপ্রিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আবদুল ও কিশোর দু’জনেরই হাসিহাসি মুখ। কিশোর দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘কেমন জব্দ, কতখানি হাঁটালাম আপনাকে জানেন?’ আমার গাড়ির কিচ্ছু হয়নি, আবদুলকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম!’

সুপ্রিয়া তেজের সঙ্গে বললেন ‘বাকি রাস্তাটুকু আমি হেঁটেই ফিরব, আমার গাড়ির দরকার নেই।’ কিশোর ঘাবড়ে গিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে দু’টি কানে হাত দিয়ে এমনভাবে ক্ষমা চাইলেন তখন যে সুপ্রিয়া আর না হেসে পারেন না। সুপ্রিয়া বুঝলেন, পুরোটাই কিশোরের দুষ্টুবুদ্ধি।

জ্যোৎস্নার তলায় বেদনা ভাগ করে নিলেন দু’টি ঘরভাঙা মানুষ

এত মজার মানুষ কিশোর কুমার মাঝে মাঝেই বড় আনমনা হয়ে পড়তেন। সেই কিশোরের আনমনা রূপ দেখেছিলেন সুপ্রিয়া। এই সময় কিশোরের সঙ্গে প্রথমা স্ত্রী রুমা গুহঠাকুরতার ডিভোর্স হয়ে গেছে। কিশোর বিয়ে করেছেন মধুবালাকে। পরমা সুন্দরী মধুবালার সঙ্গে এখানে এসে আলাপ হয়েছে সুপ্রিয়ার।

সেদিন সন্ধ‍্যে থেকে শুটিং চলছে। রাত দশটার সময় ডিনারের ছুটি হল। ডিনার শেষে সুপ্রিয়া আর কিশোর খোলা জায়গায় দুটো চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। উদাসী কিশোর গম্ভীর চুপ!

হঠাৎ কিশোর সুপ্রিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আপনাদের ছাড়াছাড়ি হল কেন বলুন তো? মানে বিশুবাবুর সঙ্গে আপনার, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আপনি সুখী হবেন না।’ ব‍্যস আবার চুপচাপ। কিছু ক্ষণ পর দরাজ গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠলেন কিশোর। ‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে…।’ তার পরেই বললেন সুপ্রিয়াকে, ‘জানেন আমি এখনও শান্তি পাই না। মাঝেমাঝে আমি জীবনের কোনও মানে খুঁজে পাই না। অথচ দেখুন, জীবনকে আমি খুব ভালবাসি। আমি বাঁচতে ভালবাসি। নীতার মতো। আমি আপনার ‘মেঘে ঢাকা তারা’ দেখেছি। অসাধারণ ছবি।’ বলেই আবার চুপ করে গেলেন। সুপ্রিয়া বললেন ‘কিশোর বাবু আপনি এত সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত করেন তাহলে কেন গান না রবি ঠাকুরের গান?

কিশোর কুমার বললেন ‘আমি একটা বাংলা ছবি করেছিলাম ‘লুকোচরি’ তাতে রুমার সঙ্গে নিজে গেয়েছিলাম ‘মায়াবন বিহারিনী হরিণী’। ছবিটা আপনি দেখেননি?’ সুপ্রিয়া হেসে ফেলে বললেন ‘লুকোচুরি খুব সুন্দর ছবি। শুধু তাই নয়, আপনি ওই ছবিতে দারুণ!’

সেদিনের রাতটা ছিল জ‍্যোৎস্নাস্নাত রাত, চাঁদের আলোয় দুই ঘরভাঙা সহকর্মী গল্পে-গল্পে কাছের বন্ধু হয়ে উঠলেন।

উত্তম নিজে ফোন করলেন সুপ্রিয়াকে

সকাল গড়িয়ে রাত অবধি শ্যুটিং চলত ‘দূর গগনকী ছাঁও মে’-র। রাতে হোটেলে ফিরে বিছানায় ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিতেন সুপ্রিয়া কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠত। ঝড়ের রাতে বিদ্যুতের মত উত্তমের কথা মনে ঝিলিক মারত। বুকের মধ্যে কোথায় যেন একটা ব‍্যথা অনুভব করতেন সুপ্রিয়া। এমনই এক রাতে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফোন এল সুপ্রিয়ার কাছে। তিনি বললেন, ‘বেণু তুমি বম্বেতে শ্যুটিং করছো আর এদিকে তো উত্তমের এখানে কাজে মন নেই, এক মুখ দাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিরছো কবে?’

উত্তমের অবস্থা তাঁর জন্য এমন হতে পারে, এ তো কোনও দিনও ভাবেননি বেণু। কিন্তু এখন তো ফেরা সম্ভব নয়! হেমন্তদা তাঁকে যে জায়গাটা করে দিয়েছেন, কিশোরজী যে ভরসা করেছেন, সেসব ডুবিয়ে কলকাতা ফেরেন কী করে! ছবির শ্যুটিংও বাকি।

‘দূর গগনকি ছাঁও মে’-র শ্যুটিং শেষ পর্যায়। এক দিন স্বয়ং উত্তমের ফোন সুপ্রিয়াকে, ‘আপনি তো খুব ব্যস্ত। বম্বেতে বড় স্টার হতে চলেছেন।’ উত্তমের গলায় একটা ক্ষোভের সুর। সুপ্রিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল। সুপ্রিয়া বলেছিলেন, ‘কিশোরজীর ছবিটাতে হেমন্তদাই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

প্রেমের টানে ছেড়ে এলেন উজ্জ্বল কেরিয়ার

শেষমেষ বম্বের ছবিগুলোর শ্যুট শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলেন সুপ্রিয়া। যেন বম্বের পাট একেবারেই চুকিয়ে চলে এলেন শুধু উত্তমের জন্য। সুপ্রিয়া যে উত্তম প্রেমে নিজের বলিউড কেরিয়ার, ভাল ছবিতে নায়িকার রোল পাওয়ার সুযোগ জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন, তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটাই হয়তো তখন সুপ্রিয়ার কাছে ঠিক মনে হয়েছিল।

‘দূর গগনকি ছাঁও মে’ ছবি বম্বে আর বাংলা দু’জায়গাতেই মুক্তি পেল। কিশোরের স্বপ্ন সত্যি হল এতদিনে। ছবিটা কিন্তু সেভাবে সুপারহিট হয়নি। তবে সমালোচকমহলে উচ্চ প্রশংসিত হল। ছবির প্রতিটি গান সুপারহিট। বিশেষ করে কিশোরের কন্ঠে ‘আ চলকে তুঝে… ম্যায় লেকে চলু… এক এয়সে গগনকে তলে’ কিংবা ‘কৌই লওটা দে মেরে বিতে হুয়ে দিন’। সুপ্রিয়া বম্বেতে কিশোরের নায়িকা হিসেবে এবং নিজের রূপে-গুণে প্রশংসিত হলেন। বাকি দু’টি ছবিতেও ধর্মেন্দ্রর বিপরীতে সুপ্রিয়া হিট।

এখনও অভিমানী উত্তম

কিন্তু ততদিনে উত্তমকে ছেড়ে বম্বে আর ফেরা সম্ভব নয় সুপ্রিয়ার পক্ষে। কলকাতায় ছবির শ্যুটিং শুরু করলেন সুপ্রিয়া। কিন্তু উত্তম ইউনিটে সবার সঙ্গে কথা বললেও সুপ্রিয়ার সঙ্গে সেভাবে কথা বলেন না। একদিন অনেক রাতে শ্যুট শেষে বাড়ি ফিরে একটা চিঠি পেলেন সুপ্রিয়া। ভাবলেন, কোনও ভক্তের পাঠানো চিঠি হয়তো। কিন্তু সইটা দেখে চমকে উঠলেন। সইটা উত্তমকুমারের। অভিমান মাখানো কয়েক লাইনের চিঠি।

লেখা আছে, ‘তোমার চারপাশে অনেক বড়বড় গাছ। আমি তাঁদের কাছে তৃণসমান। মনে হয় আমাদের বন্ধুত্বের এখানেই ইতি হওয়া উচিত। ইতি উত্তম।’

মধুরেণ সমাপয়েৎ

তবে ‘দূর গগনকি ছাঁও মে’-র পরেও কিশোর, সুপ্রিয়া, উত্তমের বন্ধুত্ব আবারও জুড়ে যায়। কলকাতায় এলে উত্তম কুমারের ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে বেণুদির হাতের রান্না কিশোর কুমারের জন্য বাঁধা ছিল। আপ্যায়নের ত্রুটি রাখতেন না উত্তম-বেণু। মাটিতে আসন পেতে বসে বাঙালি খাবারের নিমন্ত্রণে যোগ দিতেন তরুণ কুমারও।

কিশোরের কণ্ঠে উত্তমের লিপে প্রথম গান ‘রাজকুমারী’ ছবিতে ‘তবু বলে কেন সহসাই থেমে গেলে’। গানটি অসাধারন সুন্দর। তবে আরডি বর্মণের সেই গান হিট হয়নি। দর্শকরা তখনও উত্তমে লিপে হেমন্ত, মান্না, শ্যামলকেই চাইছেন। কিন্তু বম্বে গিয়ে সেই উত্তমের লিপেই কিশোরের গান একের পর এক মাইলস্টোন হয়ে রইল। ‘অমানুষ’-এর সুরকার শ্যামল মিত্র যে হিন্দি গানে বলিউডে খ্যাতি পেলেন, সেটাও কিশোরেই গাওয়া গান। ‘দিল অ্যায়সা কিসি নে মেরা তোড়া’। উত্তমেরই লিপে।

মহানায়কের শেষ ছবি ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র গায়কও কিশোর কুমারই ছিলেন। সুপ্রিয়াকে নিয়ে কিশোরের বিরুদ্ধে যে অভিমান ঘনিয়েছিল মহানায়কের মনের মধ্যে, তা কখনওই স্থায়ী হয়নি। তিন জন অতি উচ্চদরের শিল্পী তাঁদের নিজের কাজে একই সঙ্গে চরম পেশাদার ও আন্তরিক হলে বোধহয় এমনটাই হওয়ার কথা!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More