পর্দায় খলনায়িকা সঙ্ঘমিত্রা, বাস্তবে তাঁর উদারতা ও মনের জোরকে আজও স্যালুট করে ইন্ডাস্ট্রি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

কুচক্রী, কুটিল, কুকথায় পঞ্চমুখ ডায়লগকে তিনি নিয়ে গেছিলেন শিল্পের পর্যায়ে। তিনি বড় পর্দায় আসা মানেই দর্শক বলবে ‘এবার শুরু হবে আগমবর্ষী ডায়লগ আর ছবির আসল ক্লাইম্যাক্স’। তিনি বাংলা ছবির গ্ল্যামারকুইন ভ্যাম্প সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ, ৮ অগস্ট তাঁর জন্মদিন।

রাজলক্ষ্মী দেবী (বড়), রেণুকা রায়, গীতা দে-র উত্তরসূরী রূপে সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটাই উঠে আসে বাংলা ছবিতে সেরা নেগেটিভ রোলে। তাঁর পরিপূরক আজও আসেনি বাংলা ছবিতে। গীতা দের সঙ্গে সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্যাম্প রোলে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য ছিল।

পরিশীলিত খলনায়িকা

গীতা দে, রেণুকা রায়রা কেউ উচ্চশিক্ষিতা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসার সুযোগ পাননি কিংবা আসেননি। ওঁদের দুয়োরাণী নায়িকাকে খোঁটা দেওয়া, বাঁজা, মুখপুড়ী ইত্যাদি কুকথা বর্ষিত করায় ছিল এক গ্রাম্য, আদি সেকেলে কথার ছাপ। সেগুলো খুবই জনপ্রিয়, সেযুগে অনেক মা মাসিমাই বলতেন রেগে গেলে। তাঁরা লেজেন্ড অবশ্যই। কিন্তু সঙ্ঘমিত্রা আনলেন একটা শিক্ষিত, রুচিশীল, আধুনিক, গ্ল্যামারাস ভ্যাম্প চরিত্রের নতুন যুগ। যার নায়িকার সমমর্যাদাসম্পন্ন স্টেটাস। যা তাঁর আগেও ছিল না, পরেও কেউ আনতে পারেননি।

সঙ্ঘমিত্রার সমসাময়িক অনামিকা সাহাও গ্রামীণ, কুচুটে, ঠোনা মারা কথা-কেন্দ্রিক অভিনয়ে জনপ্রিয়া। মীনাক্ষী গোস্বামীও কিন্তু খুব আলট্রা মর্ডান শিক্ষিতা ছিলেন। কিন্তু উনি মাঝবয়সে চলচ্চিত্র জগতে আসেন। তাই মায়ের রোলে অভিনয় করেন বেশি। সঙ্ঘমিত্রা এসেছিলেন নায়িকা হওয়ার বয়সে। এবং পরিচালকরা বলতেন “সঙ্ঘ তুই ছাড়া এই নেগেটিভ রোল কে জমাতে পারবে?”

রীতা কয়রালও ছিলেন, তবে তিনি সঙ্ঘমিত্রার মতো প্রথমেই বড় লঞ্চ বা প্রধান চরিত্র পাননি। শুরুতে পরিচারিকার চরিত্রও করতে হয়েছিল রীতাকে। পরবর্তীকালে টেলিভিশনে অনেক পরে মৌমিতা গুপ্ত বা নন্দিনী চ্যাটার্জীরা গ্ল্যামারাস ভ্যাম্প হলেও সে সাময়িক উপস্থিতি।

আরও পড়ুন: শুক্রাণু সাঁতার কাটতেই পারে না, ৩৪২ বছরের বিশ্বাস ভাঙল, নতুন খোঁজ বিজ্ঞানীদের

কিন্তু বড় পর্দায় যুগের পর যুগ আধুনিকা, শিক্ষিতা এবং অবশ্যই সুন্দরী ভ্যাম্প একমাত্র সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ই ছিলেন। আজও আছেন। পঁয়ত্রিশ বছরে তিনশো ছবি। সঙ্ঘমিত্রা চিরকাল নিজের স্টারডম নিয়েই চলেছেন। উপরের বাকি ভ্যাম্প অভিনেত্রীদের সঙ্গে কিন্তু সঙ্ঘমিত্রার চিরকাল সুসম্পর্ক ছিল। সঙ্ঘমিত্রা গীতা দেকে বলতেন ‘এবার একটু টাকা জমাও গীতাদি।’

নেগেটিভ রোলেও স্টারডম অটুট

সঙ্ঘমিত্রার বিখ্যাত ছবিগুলি হল ছোটবউ, মিত্তির বাড়ির ছোটবউ, অশ্লীলতার দায়ে, আত্মজ, সেদিন চৈত্র মাস, অনুতাপ প্রভৃতি। সিনেস্টার হলেও তিনি কিন্তু করেছেন কিছু সিরিয়ালও। ‘জননী’ তে তাঁর করা জুলি চরিত্রটি খুব জনপ্রিয় হয়। এছাড়াও ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’, ‘সীমারেখা’,’ওগো প্রিয়তমা’,’দেবদাসী’ প্রভৃতিও ছিল তালিকায়। শুধু যে টাকার জন্যই ছবি করতেন, তাও নয়। শতাব্দী রায়ের ‘ঢাকি’ ছবি বিনা পারিশ্রমিকে সঙ্ঘমিত্রা করে দেন। নিজে যোগ্যতায় রোজগার সবসময়ই করেছেন তিনি। কোনও দিন নিজেকে গুটিয়েও নেননি। সম্রাজ্ঞীর মতো ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন নেগেটিভ রোল করেও। সম্মান নিয়েই কাজ করেছেন বরাবর।

সঙ্ঘমিত্রার নেগেটিভ রোলের প্রতিটি চরিত্র খেয়াল করলে দেখা যায়, সঙ্ঘমিত্রা সব চরিত্রেই আধুনিকা ভ্যাম্প। ওঁর সমসাময়িক সব বড় পরিচালকরা বলেছেন “সঙ্ঘর সঙ্গে প্রথম আলাপেই একটা শিক্ষিত মার্জিত রুচিশীল ছাপ পেয়েছি, যেটা ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকেরই নেই।”

সঙ্ঘমিত্রা খলনায়িকা হলেও, নায়িকাদের পাশেও কী ভীষণ গ্ল্যামারাস। ফর্সা গায়ের রং ফেটে পড়ত। সঙ্গে লম্বা চুলের হেয়ার স্টাইল। নায়িকাদের ছেড়ে সঙ্ঘমিত্রাই যেন দর্শকদের চোখ টেনে নিতেন। শুধু সিনেমা নয়, যাত্রাতেও কিন্তু সঙ্ঘমিত্রা সুপারহিট। সিনেমায় সঙ্ঘমিত্রা নেগেটিভ রোলে কাস্ট হলেও যাত্রায় চিরকালই সঙ্ঘমিত্রা পজিটিভ নায়িকার লিড রোল করেছেন। করেছেন পেশাদার থিয়েটার ‘মল্লিকা’ থেকে ‘ঘর জামাই’।

একসময় সন্ধ্যা রায়ের ‘সীতা’ যাত্রা আর সঙ্ঘমিত্রা, জর্জ বেকার, অর্পিতা বেকার অভিনীত ‘খলনায়ক’ যাত্রা মফস্বলে কাছাকাছি জায়গায় হচ্ছিল। ‘সীতা’র বেশিরভাগ দর্শক তাই সীতার পরে ‘খলনায়ক’ও দেখতে চলে আসেন। শেষে দেখা যায়, ‘সীতা’ তিন হাজার দর্শক পেলে ‘খলনায়ক’ পেয়েছিল আট থেকে দশ হাজার রেকর্ড দর্শক।

অধ্যাপিকা হওয়ার স্বপ্ন ছিল, কিন্তু ভবিতব্য সিনেমা

প্রেসিডেন্সি কলেজের ঝকঝকে আধুনিকা তরুণী সঙ্ঘমিত্রা চলে এলেন বাংলা ছবিতে। উত্তমকুমারকে দেখতে গিয়ে তাঁর সঙ্গেই স্ক্রিন শেয়ার। ঐ সময়ে একজন নায়িকাও কি এসছেন টালিগঞ্জ পাড়ায় প্রেসিডেন্সির কৃতী ছাত্রী হয়ে? ব্যতিক্রম সঙ্ঘমিত্রা। সংস্কৃতে অনার্স তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ। ইচ্ছে ছিল ডক্টরেট করবার। সিনেমার চাপে হয়ে ওঠেনি। বাংলা সাহিত্যে করেছেন স্পেশাল ডিপ্লোমা। ভাবতেন কলেজের প্রফেসর হবেন।

জন্ম ১৯৫৬ সালের ৮ই অগস্ট, বেনারসে। বাবা সুভাষকুমার মুখোপাধ্যায় ও মা সান্ত্বনা মুখোপাধ্যায়। সেখান থেকে চলে আসা কলকাতায়। পড়াশোনায় ছোট থেকেই ভাল এবং অদম্য জেদ। ভাবতেন, মেয়েরা যে ছেলেদের থেকে কম নয়, তা দেখিয়ে দিতে হবে। পাশাপাশি শাস্ত্রীয় নৃত্য, কত্থকে পারদর্শিনী। নাচের তালিম নিয়েছেন থাঙ্কমণি কুট্টি, নটরাজ পরিমল কৃষ্ণ এবং রামগোপাল ভট্টাচার্যের কাছে। ১৯৮১ সালে ভারতীয় সংস্কৃতির ডেলিগেট হয়ে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় যান সঙ্ঘমিত্রা। শুধু তাই নয়, টোকিওতে টিচিং ডিপ্লোমাও পান ক্লাসিকাল ডান্সে।

এই নাচের সূত্র ধরেই পেয়ে গেলেন প্রথম ছবিতে সুযোগ। আর যে সে ছবি নয় উত্তমকুমারের ছবি। উত্তম কুমার তাঁর পরিচালিত ছবি ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’র জন্য নতুন মেয়ে খুঁজছিলেন। সঙ্ঘমিত্রা শুধু উত্তম কুমারকে দেখতেই গেছিলেন, অডিশনে পাশ হোক আর না হোক। রক্ষণশীল পরিবারের সদস্যরা সেদিন কেউ বাড়ি ছিলেন না, তাই বাড়ির বারণ টপকে টালিগঞ্জ পাড়ায় পা রাখতে পারেন সঙ্ঘমিত্রা। সঙ্গে ছিলেন যোগাযোগের সূত্রধর, ডান্স ডিরেক্টর শক্তি নাগ। এক শটেই সঙ্ঘমিত্রা পছন্দ হয়ে গেলেন উত্তম কুমারের।

বাংলা ছবিতে উত্তম কুমারের শেষ লঞ্চ করা অভিনেত্রী হলেন সঙ্ঘমিত্রা।

প্রশংসা ভরা কেরিয়ার শুরু

পরিচালক উত্তম কুমারের ক্যামেরায় চোখ। সামনে বাইজী বেশে সঙ্ঘমিত্রা। ‘বেঁধেছি বীণা গান শোনাব তোমায় আজ রাতে’, পারভিন সুলতানার গানে লিপ দিলেন সঙ্ঘমিত্রা। প্রথম ছবিতেই জীবনের সেরা গানটি পেলেন সঙ্ঘমিত্রা যা কিনা আরডি বর্মণের সুরারোপিত। উত্তম কুমারের ছবিতে চান্স পেতে সে যুগে অনেক মেয়ে অনেক কিছুই করত। কিন্তু উত্তম কুমার সঙ্ঘমিত্রাকে দেখে বোঝেন এ মেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের, লড়াকু, স্মার্ট, শিক্ষিতা। তাই তিনিও যথেষ্ট ভালবাসতেন সঙ্ঘমিত্রাকে।

এর পরে দিলীপ রায় পরিচালিত ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ ছবিতে রামজী দাসী সাধিকার রোলে নতুন মুখ সঙ্ঘমিত্রা সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। প্রিমিয়ারে হাজির ছিলেন ছবির লেখক কালকূট সমরেশ বসু থেকে অরুন্ধতী দেবীর মতো ব্যক্তিত্ব। ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’ ছিল মাল্টিস্টারার ছবি। শুভেন্দু, অপর্ণা, মহুয়া, সুমিত্রা– কে নেই।

কিন্তু সমরেশ বসু দিলীপ রায়কে বললেন, ‘রামজী দাসী নতুন মেয়েটি কে?’ দিলীপ রায় বললেন ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী সঙ্ঘমিত্রা। বাচ্চা মেয়ে।’ সমরেশ বসু সঙ্ঘকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন ‘আমার দেখা কুম্ভমেলায় রামজী দাসীর সঙ্গে তুমি একাত্ম হয়ে গেছ।’

তবু সফল খলনায়িকা

এত প্রশংসা পাওয়ার পরেও, টলিউডে সঙ্ঘমিত্রা হয়ে উঠলেন জাঁদরেল ভ্যাম্প। নেগেটিভ রোলে তাঁর ধারেকাছে কেউ আসতে পারল না। পরপর ছবি হিট। কিন্তু সঙ্ঘমিত্রা যে পজিটিভ রোল পারতেন না, তা মোটেই নয়। তবে শিল্পীদের যেমন পাত্রে রাখা হয়, তাঁরে তাতেই সেরা হয়ে ওঠেন।

অঞ্জন চৌধুরী, সুজিত গুহ ঘরানায় ছোট বউ, বৌদি, বিধিলিপি– একের পর এক ছবিতে নেগেটিভ বৌ-এর রোলগুলো বিশাল খ্যাতি এনে দিল সঙ্ঘমিত্রাকে। পরিচালকরা ওই রকম রোল করার জন্য সঙ্ঘমিত্রার বিকল্প খুঁজে পেলেন না। কিন্তু তরুণ মজুমদার তাঁর ছবি ‘আপন আমার আপন’-এ সঙ্ঘমিত্রাকে দিলেন একটি গানের বাড়ির পজিটিভ বড়দির স্নিগ্ধ রোল, যা আজও আইকনিক।

তুখোড় ঘরণী, আদর্শ মা

অনেকের ধারণা, সঙ্ঘমিত্রা আদতেই খুব কুচুটে ও ঝগড়ুটে মহিলা কিন্তু বাস্তবে সঙ্ঘমিত্রা ছিলেন জীবনরসিক। নিজের সেলফ কাউনন্সেলিং নিজেই করতেন, যা আমরা অনেকেই পারি না। খুব হৈচৈ করতে ভালোবাসতেন। পরিবারে সময় দিতেন।

সঙ্ঘমিত্রার বিয়ে হয় এলাহাবাদের জয়ন্ত ব্যানার্জীর সঙ্গে। সিনেমায় আসার শুরুতেই বিয়ে। কিন্তু তাতে সঙ্ঘমিত্রার সাহসী সৌন্দর্য বা স্টারডম ক্ষুণ্ণ হয়নি। কর্মসূত্রে স্বামীকে বেশিরভাগ সময় এলাহাবাদে কাটাতে হত, তাই একমাত্র ছেলে অনুরাগ ব্যানার্জীকে সঙ্ঘমিত্রা একা হাতেই মানুষ করেন। মা চলে যাওয়ার পরে সমস্ত স্মৃতি রক্ষা করছেন এই অনুরাগই।

ছেলে অনুরাগের সঙ্গে সঙ্ঘমিত্রা।

সিনেমায় বড় বউকে দিয়ে রান্না করিয়ে যতই মেজো বউ খাটিয়ে নিক না কেন, বাস্তবে সঙ্ঘমিত্রা ছিলেন পাকা রাঁধুনি। রান্নার খুব শখ ছিল তাঁর। নিজের জন্মদিন, লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো– সবেতেই একা হাতে রান্না করতেন। পুত্র অনুরাগের ত্রিশ বছরের জন্মদিনে ত্রিশ ঘণ্টার পার্টি দেন বাড়িতে, নিজের হাতে রেঁধেবেড়ে অনুরাগের বন্ধুদের খাওয়ান মা সঙ্ঘমিত্রা। সঙ্ঘমিত্রার হাতের বেস্ট রেসিপি ছিল যে কোনও বড় মাছের হরগৌরী।

মানুষের পাশে সঙ্ঘমিত্রা

পর্দায় সঙ্ঘমিত্রা জাঁদরেল, দজ্জাল। সংসারে আগুন লাগান। কিন্তু বাস্তবে বহু শিক্ষার্থীর স্কুল-কলেজে টাকা বাকি পড়লে দিতেন তিনি। বহু বিবাহযোগ্যা মেয়ের বিয়েতে টাকা দিয়েছেন। নিঃশব্দে পাশে থেকেছেন বহু মানুষের। কেউ জানতেও পারেনি। একবার এক বাবা তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু অর্থ সাহায্য চেয়েছিলেন সঙ্ঘমিত্রার কাছে। টাকা পেয়ে বিস্মিত ভদ্রলোক নিজেই বললেন, ‘এত কেন দিলেন?’ সঙ্ঘমিত্রা বলেছিলেন ‘বাকিটা আমার তরফ থেকে নমস্কারীর জন্য। মেয়ে যেন মাথা উঁচু করে শ্বশুরবাড়িতে যায়।’

মেলানো যায় এই সঙ্ঘমিত্রাকে ‘ছোট বউ’ র মেজ বউ বা ‘সুন্দর বউ’ সিনেমার দজ্জাল শাশুড়ির সঙ্গে?

পেশাদার সঙ্ঘমিত্রা

তিনি যে জীবনরসিক তা তাঁর জীবনের ঘটনা থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। নিজের দুঃখ যন্ত্রণা কাউকে টের পেতে দিতেন না। মা সান্ত্বনা মুখার্জ্জী মারা যাওয়ার খবর শুনেই ছুটে যান সঙ্ঘমিত্রা। দু’চোখে অঝোরে জল। কিন্তু চোখের জল মুছে বেরিয়ে গেলেন সঙ্ঘমিত্রা সেদিনের থিয়েটারের শো করতে। কারণ দর্শকরা টিকিট কেটে বসে আছে। স্বাভাবিক অভিনয় করে গেলেন। কয়েক দিন পরে সহ-অভিনেতারা জানতে চাইলেন ব্যাপারটা। জানতে পেরে সকলে স্তব্ধ। সঙ্ঘমিত্রা ব্যথা গিলে হাসি মুখে বললেন “কাজের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতি গুলিয়ে ফেললে চলবে কেন?”

বাবা সুভাষ কুমার মুখোপাধ্যায়ের বেলাতেও এক ব্যাপার ঘটে। বাবা চলে যাওয়ার দিনেও যাত্রার শোতে গিয়েছিলেন সঙ্ঘমিত্রা, কারণ কমিটমেন্ট। ছেলে অনুরাগকে পাঠালেন শশ্মানে। সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করলে বললেন “বাবা চলে গেছে। আর ফিরবে না।” তাঁরা বললেন “মেশোমশাই কোথায় গেছেন?” সঙ্ঘমিত্রার উত্তর “চিরদিনের জন্য ছুটি নিয়ে চলে গেছেন।”

নিজের সব কষ্ট এভাবেই হাসি মুখে জয় করেছেন। এই মনের জোর কোথা থেকে পেতেন সঙ্ঘমিত্রা?

মারণরোগের যন্ত্রণাতেও মনের জোর অটুট

ছেলের বিয়ে দিলেন বৌমা শুক্লাকে ঘরে আনলেন। সুখী পরিবার। সঙ্ঘমিত্রা শাশুড়ি মোটেই দজ্জাল নন বরং বউমার বন্ধু। কিন্তু এর পেরই সঙ্ঘমিত্রার নিজের ধরা পড়ল ব্রেস্ট ক্যান্সার। ছেলে বৌমাকে বললেন “প্যানিক কোরো না। যা হবে দেখা যাবে। ভয় পেয়ো না। আমি ঠিক আছি।” কী অসম্ভব মনের জোর!

নিজের মারণ রোগের কথা ইন্ডাস্ট্রির কাউকে বলেননি। চাননি কারও সহানুভূতি পেতে বা বন্ধুদের ভয় পাওয়াতে। নিজে হাসিমুখে শ্যুটিং করে গেছেন। নিজের মনের জোর দিয়ে সব জয় করেছেন। চাননি ইন্ডাস্ট্রি থেকে কোনও আর্থিক সাহায্যও। নিজের সেই স্টারডম বজায় রেখেছেন শেষ দিন অবধি।

শেষ ঘণ্টা বাজল। চলে যেতে হল আলোলিকা সঙ্ঘমিত্রাকে। তখনও ৬০ পেরোয়নি। জরা তাঁকে কোনও দিনও স্পর্শ করতে পারল না। ২০১৬ সালের ২৭ অক্টোবর। কিন্তু তাঁর বারণ ছিল, যেন তাঁর শেষ সজ্জা কাউকে দেখানো না হয়। না কোনও মিডিয়া, না ইন্ডাস্ট্রির কেউ। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে সব মিটে গেলে ইন্ডাস্ট্রি এবং মিডিয়া জানতে পারল পুত্র অনুরাগ মারফত, তিনি আর নেই। এ নিয়ে আজও অনেকের মনে প্রশ্ন আছে, কেন এত কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁদের বন্ধু-সহকর্মী সঙ্ঘমিত্রা? কারও শেষের চোখের জলটুকুও চাইলেন না তিনি?

সঙ্ঘমিত্রা বিশ্বাস করতেন, মৃত্যু নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া। টলিউডে কজন শেষ শ্রদ্ধা আদৌ ঠিক মতো পেয়েছেন সে তো নিজ চোখেই দেখেছিলেন সঙ্ঘমিত্রা! তাই সে সবের ধার ধারেননি তিনি। যা হয়তো অতিক্রম করতে পারেননি সুচিত্রা সেনও। সঙ্ঘমিত্রা পেরেছেন। বরং পুত্র অনুরাগ মায়ের কথা ভেবে আরও ক্যানসার রোগীদের সবসময় আর্থিক সাহায্য ও সবরকমের সহযোগিতা করে চলেছেন।

আসছে সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জীর জীবনী

লড়াকু মেয়ে, গ্ল্যামারাস নায়িকা আবার একজন মা। কখনও একলা মায়ের লড়াই, কখনও তুখোড় ভ্যাম্প, কখনও নিজের আলোকময় জীবন ছাড়িয়ে এক অন্য পথের আলোর সন্ধানে তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে অলিগলিতে না ঢুকে সোজা পথে হাঁটার লড়াই কেমন ছিল? শেষ বিদায়ে কেন চাইলেন না শেষযাত্রা স্টুডিওপাড়ায় কেউ দেখুক? নানা অজানা গল্পের ভাণ্ডার নিয়ে আসছে সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জীর জীবনী। আগামী বছর সঙ্ঘমিত্রার ৬৫তম জন্মদিনে প্রকাশিত হবে বইটি। ইন্ডাস্ট্রির অজানা গল্পে উঠে এসেছে অচেনা সঙ্ঘমিত্রা। প্রতিবেদকেরই লেখা সেই বইটি প্রকাশ করছেন সঙ্ঘমিত্রার পুত্র অনুরাগ বন্দ্যোপাধ্যায়।

এত কিছুর পরেও সঙ্ঘমিত্রা ব্যানার্জীকে নিয়ে কোনও দিনও গসিপ তৈরি হয়নি ইন্ডাস্ট্রিতে। তাঁর চরিত্রে কোনও দিনও কাদা ছেটাতে পারেনি কেউ। পর্দায় ভ্যাম্প হলেও, পাটরানির মতো ইন্ডাস্ট্রিতে ছিলেন। তাঁর সহকর্মীরা আজও বলেন, ‘সঙ্ঘর কী মনের জোর, আমরা কেউ জানতেই পারলাম না, শেষ দেখাটুকুও দেখতে দিল না আমাদের সঙ্ঘ।’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More