উত্তমকুমার জড়িয়ে ধরেন! চপল ভেবেছিলেন, এখানেই মাথা রাখেন সুচিত্রা-সুপ্রিয়ার মতো নায়িকারা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    প্রকৃতির সৃষ্টিতে তিনি শারীরিক ভাবে পুরুষ। অথচ তাঁর মনটা বেড়ে উঠেছে নারীর মতো। এই মানসিক ও শারীরিক টানাপড়েনের সঙ্গে যোগ হওয়া সামাজিক টানাপড়েন আজীবন বয়ে চলেন চপল ভাদুড়ি। তিনি আদিযাত্রাসম্রাজ্ঞী চপলরানি। আজ তাঁর জন্মদিন। সমাজের বিরুদ্ধে হাঁটা এক ছক ভাঙা লড়াইয়ের নাম চপল। ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রতি শ্রদ্ধায় ও সম্মানে বহু মানুষ আনত থাকলেও, তার অনেক আগেই লড়াইয়ের পথ দেখিয়েছিলেন চপল ভাদুড়ি।

    মহাকাল এবং প্রকৃতি… একই দেহে তারা ধরা দিয়েছিল বলেই তো আমরা পাই ‘অর্ধনারীশ্বর’ রূপ। তাকে আমরা মন্দিরে রেখে ঘটা করে পুজো করতে পারি, কিন্তু বাস্তবে কোন পুরুষকে নারীসুলভ দেখলেই আমাদের ব্যঙ্গের শিকার বানাই তাকে। পুরুষকে পুরুষসিংহ রূপেই দেখতে চাই। পুরুষ থাকবে ওপরে, নারী নীচে। শিব নীচে আর কালী মূর্তি ওপরে থেকে যতই পূজিত হোক না কেন, তা বাস্তবে চাই না আমরা। ছেলে হবে ছেলের মতো। তার স্বভাব নিজের পছন্দে থাকবে না। সমাজের বাঁধা পুরুষালি ছকে বাঁধা হবে তার স্বভাব। উল্টোপথে চললেই বিদ্রুপের শিকার। তাহলে কি লাভ এই অর্ধনারীশ্বর মূর্তির পুজো করে?

    মেয়েলি বা মহিলাসুলভ আচরণের পুরুষ দেখলেই খুব সহজে টিটকিরি করা যায়। এই টিটিকিরির ডাকগুলো যুগে যুগে পরিবর্ধিত হয়েছে। বৌদি বলা হত আগে নারীসুলভ পুরুষদের। তারপর লেডিস, সেখান থেকে হোমো, গে, হিজড়া। সময় পাল্টে ডাক পাল্টাল। কিন্তু মননে শিক্ষার আলো প্রবেশ করল না। তৃতীয় লিঙ্গ ও রূপান্তরকামীর তফাতই বোঝে না এখনও কতজন!

    ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলা চলচ্চিত্রে গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে পরিচিত মুখ হওয়ায় তিনি অনেক বেশি আদৃত। তবে তাঁকেও ব্যঙ্গের শিকার হতে হয়েছে একসময়ে। আমরা খুব সহজেই কোনও একটি সরলসহজ, নরম ধাতের ছেলে দেখলেই বলে উঠেছি “আরে ও তো ঋতুপর্ণ”। ঋতুর গুণগুলো বিচার্য নয় যেন, তাঁর ওই নারীসুলভ আচরণই বিচার্য। ঋতুপর্ণ এই লড়াইতে সব নারীসুলভ পুরুষদের মুখপাত্র হয়ে উঠেছিলেন যেন।

    তবে ঋতুপর্ণর অনেক আগেই যাত্রা-নাটক-থিয়েটার দাপিয়ে বেড়িয়েছেন আরও এক জন এমন পুরুষ, চপল ভাদুড়ি। তিনি বহু বিখ্যাত যাত্রাপালার মুখ্য নারীচরিত্রে অবতীর্ণ হয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন সেই সময়ে। ১৯৩৯ সালের আজকের দিনেই জন্মেছিলেন সেই চপল ভাদুড়ি।

    চপলের জন্ম বিখ্যাত নাটক পরিবারের পরিমণ্ডলে, উত্তর কলকাতার কালী দত্ত লেনে। তাঁর নিজের জ্যাঠামশাই নাট্যাচার্য শিশির ভাদুড়ি। পিতা তারাকুমার ভাদুড়ি এবং মা প্রভা দেবী। বাবা-মা দু’জনেই যাত্রা শিল্পী ছিলেন। প্রভা দেবী বিখ্যাত মঞ্চাভিনেত্রী। যিনি পরবর্তীকালে প্রভা মা নামে খ্যাত হন।  চপলরা তিন ভাই এবং দুই বোন ছিল। ছোড়দি কেতকী দত্তও নামকরা মঞ্চের অভিনেত্রী। পাশাপাশি বহু বিখ্যাত চলচ্চিত্রেও উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন। এমনকি এযুগে টেলিভিশনেও কাজ করেছেন। মা প্রভা দেবীর সহায়তায় মাত্র সাত বছর বয়সে শ্রীরঙ্গম থিয়েটারে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিন্দুর ছেলে’-তে অপূর্বর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন চপল। জ্যাঠামশাই শিশির ভাদুড়ির পরিচালিত সে নাটক।

    সেদিন চরিত্রাভিনেতা আসেনি বলে, একরকম বাধ্য হয়েই প্রভা দেবী চপলকে নামিয়ে দেন মঞ্চে। কারণ রোজ নাটক দেখে চপলের পার্ট মুখস্থ থাকত। এর পর থেকেই চপলের নেশা হয়ে গেল মঞ্চের। পরে চপল বলেন, “ওই পার্ট যার ছিল সে ফিরে এলে আমাকেও যেতে বারণ করা হয়। কিন্তু একবার কাউকে মদের দোকানে মদ খাওয়ালে আর কি সে মদের নেশা ছাড়া থাকতে পারে! মায়ের অভিনয় দেখতেই থিয়েটার পাড়ায় চলে যেতাম। উইংসের পাশ থেকে দেখতাম সকলে কেমন করে অভিনয় করেন। মায়ের অভিনয় গুলো গ্রামাফোনে রেকর্ড করে শুনতাম, সব ডায়লগ কণ্ঠস্থ করে ফেলতাম।”

    এর পরে দেশ স্বাধীন হল। চপল তখন পড়ত টাউন স্কুলে। খেলতে ভালোবাসত ফুটবল। কিন্তু নারীসুলভ হওয়ায় তাকে কেউ খেলায় নিত না। তাই চপলের সঙ্গী ছিল ঐ গ্রামাফোনে রেকর্ড করা মায়ের ডায়লগ। এর পরে একদিন ছবি বিশ্বাস প্রভা দেবীর সঙ্গে চপলকে দেখে চপলকে তাঁর নাটকে রোল দিলেন। ‘উদয় সিংহ’ নাটক। ছেলেবেলার উদয়ের ভূমিকায় চপল আর নায়িকার মেয়েবেলা কনকের ভূমিকায় বালিকা মাধু অর্থাৎ চারুলতা মাধবী মুখোপাধ্যায়।

    কিন্তু চপলের ভাগ্যলিখনে ছিল নারীর চরিত্র। কণ্ঠে ছিল নারীর কোমলতা, শরীরে ছিল নমনীয়তা। সেটাই কাজে লেগে গেল রুজি-রোজগারে। কিন্তু শিল্প বেচতে বেচতেই পরিস্ফুট হল তাঁর প্রতিভা। আরও স্পষ্ট হল লড়াইয়ের পথ।

    ১৯৫৫ সালে ‘আলিবাবা’ নাটকে মর্জিনার চরিত্রে নেচে, গেয়ে, অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেয় কিশোর চপল। তখন সে পুরোদস্তুর ‘নায়িকা’। একজন ছেলে হয়ে এত লালিত্যপূর্ণ অভিনয় সুপারহিট হয়ে যায় এবং পরপর চপলের কাছে নারী চরিত্র আসতে থাকে। চাঁদবিবি, রাজা দেবীদাস, সুলতানাতে তাঁর অভিনীত ‘রাজিয়া’ এবং ‘কৈকেয়ী’ চরিত্র দু’টি তখনকার সময়ে প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল। একসময় তিনি চপলরানি নামে বাংলার যাত্রায় শীর্ষস্থান দখল করেন। ষাটের দশকে তিনি থিয়েটারের সর্বাধিক বেতনের ‘অভিনেত্রী’ হন পুরুষ হয়েও।

    ১৯৫২ সালে প্রভা দেবী চলে গেলেন। আর্থিক অনটন প্রকট। তাই চপল যোগ দিলেন যাত্রার নট্ট কোম্পানীতে। সেসময় নাটকে মেয়েরা অভিনয় করলেও যাত্রায় মেয়েরা অভিনয় করতেন না। চপলের কণ্ঠস্বর নারীসুলভ হওয়ায় তাঁকে যাত্রার মুখ্য নারী চরিত্রে কাস্ট করা হল। চপলের আগে যাত্রায় এই পুরুষ হয়েও নারী চরিত্রে নাম করেছিলেন ছবি রানি ওরফে শ্যামাপদ রায়।

    এবার যাত্রাতেও বিশাল নাম করলেন চপল। আর দিনের পর দিন নারী চরিত্রে কাজ করার সাথে বাস্তবেও নারী মন নিয়েই যেন নারী হয়ে উঠলেন। যাত্রা শেষে নারীর পোশাক, লম্বা চুলের উইগ খুলে ফেললেও, ঠোঁটের রং মুছে ফেললেও, ধুতি-ফতুয়াতেও চপল নারী হয়ে গেল।

    মায়ের মৃত্যুর সময়ে চপলকে জোর করে ন্যাড়া করা হয়েছিল। খালি গা করে দেওয়া হয়েছিল। এতে লজ্জায় মরমে বিধ্বস্ত চপল। এর পরে যৌবনের রং এল মনে। সরল চপল ভালোবেসে ফেললেন এক বিবাহিত পুরুষকে। কিন্তু বিবাহিত পুরুষরা এমন কোনও নারীর দায়িত্ব নেয় না, সামাজিক সম্মানও দেয় না। এই কঠিন সত্য চপল বোঝেননি। তাই সেই ধনী ও বিবাহিত পুরুষটির রক্ষিতা হয়েই রয়ে যেতে হল চপলকে। চপল শরীরটাই দিলেন, সম্মান পেলেন না। প্রেমিকের স্ত্রীর সেবা করতে হল। করতে হল প্রেমিকের সংসারে দাসীবৃত্তিও। এক সময়ে সেখানেও বিচ্ছেদ। শেষমেশ টিকল না সম্পর্ক। আঘাতের পর আঘাত। সমাজের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।

    সামাজিক আঘাতের পাশাপাশি অভিনয়ের প্রশংসাও কম পাননি চপল। যাত্রামঞ্চে বহু নামী-দামী মানুষ চপলের অভিনয় দেখতে আসেন। এমনই এক দিন স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমার চপলরানির অভিনয় দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান। বিখ্যাত নট ও পরিচালক স্বপনকুমারের ‘মাইকেল মধুসূদন’ যাত্রাপালা চলছে রবীন্দ্র সদনে সেদিন। দেখতে এসেছেন উত্তমকুমার। সঙ্গে সুপ্রিয়াদেবী।

    রবীন্দ্র সদনে চপলরানি অভিনয় করছেন। কিন্তু উত্তম তখন চেনেন না চপলকে সেভাবে। প্রথম সারিতে বসে চপলের মাইকেলের মায়ের রোলে অভিনয় দেখে চোখে জল এসে যায় উত্তমের। যাত্রা শেষ হতেই সোজা গ্রিনরুমে চলে এলেন মহানায়ক। একজনকে ডেকে বললেন, “জাহ্নবীর রোল যিনি করলেন তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।”

    ততক্ষণে চপল নারীবেশ ছেড়ে পুরুষবেশে। মহানায়ক গ্রিনরুমে এসেছেন শুনে চপল পুরুষবেশেই বেরিয়ে এলেন। দাঁড়ালেন মহানায়কের সামনে নমস্কার করে। কিন্তু উত্তমকুমার বললেন, “আহা বুঝতে পারছেন না, মাইকেলের মার রোলটা যে ভদ্রমহিলা করলেন তাঁর কথা বলছি। ইনি নন।” একজন উত্তম কুমারকে বললেন, ‘দাদা, ইনিই জাহ্নবীর রোলটা করেছেন। নাম চপল ভাদুড়ি। আসলে চপলরানি বলে বিখ্যাত। অভিনেত্রী প্রভাদেবীর ছেলে। ওঁরই দিদি অভিনেত্রী কেতকী দত্ত।’

    উত্তমকুমার কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলেন।

    কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তমবাবু বললেন চপলকে, “বিয়ে করেছো?”

    মাথা নেড়ে না বললেন চপল।

    মহানায়ক আরও অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, “তুমি অবিবাহিত হয়েও তোমার এত মাতৃত্ব! এমন মাতৃভাব কেমন করে আনলে! তোমার অভিনয়ে মাতৃত্ব দেখে আমি মুগ্ধ।”

    চপলের দু’চোখে জল। এমন মানুষের থেকে প্রশংসায় যেন সব কষ্ট জল।

    উত্তম কুমারকে প্রণাম করলেন চপল। চপলকে  বুকে জড়িয়ে ধরলেন উত্তম কুমার। উত্তম কুমারের বুকে মাথা রেখে চপল ভাবলেন ” এই বুকে সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, সাবিত্রীরা মাথা রাখে সেখানে আমি মাথা রেখেছি! এ কী সত্যি!”
    মহানায়কের ভালোবাসা আজীবন মনে রেখেছেন চপল ভাদুড়ি।

    এরপর যাত্রায় মহিলারা আসতে লাগল চপলের দর কমল। সিনেমা থেকে নায়িকারা আসতে লাগলেন। চপলের কাজের জমানা শেষ হল। কুড়ি বছর প্রায় বেকার জীবন কাটিয়েছেন চপল। তার পরে আশ্রয় দিলেন ছোড়দি কেতকী দত্ত। চপল তখন ছোট দলে নাটক করতেন অল্প টাকায়।

    কেতকী দত্তর সূত্রে সিগাল মিডিয়া আর্ট এম্পোরিয়ামের নবীনকিশোরের সঙ্গে চপলের পরিচয় হয়। তাঁকে ‘শীতলামঙ্গল’ পালার শো দেখান চপল। তিনি ক্যামেরায় তুলে রাখলেন, কেমন করে একজন পুরুষ মেক-আপ করে, পোশাক পরে মহিলায় পরিণত হচ্ছেন। শীতলা বেশে চপলের ডায়লগও রেকর্ড করলেন।

    সেই সূত্রেই বিদেশে নানা জায়গায় চপলের ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই সব ছবির কপি রাইট থেকে প্রাপ্ত টাকায় চপলের উপার্জন হয় কিছু। এই শীতলা পালা কানাডায় পুরস্কৃতও হয়। দেশের নানা প্রান্তে শো হয়, প্রশংসিত হয়। পুণেতে শ্রীরাম লাগু তাঁর থিয়েটারে ওয়ার্কশপ করার ব্যবস্থা করে দেন চপলকে।

    এরপর নান্দীপট নাট্যগোষ্ঠীর ‘রমণীমোহন’ নাটকে প্রকাশ ভট্টাচার্যের পরিচালনায় পুরুষ ও মহিলা চরিত্রে অভিনয় করেন চপল। সঙ্গে ছোট পর্দায় চপলকে নিয়ে ‘উষ্ণতার জন্য’ এবং ‘ঘরে বাইরে’-তে কাজ করান কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। এরপর প্রায় এক দশক পরে ‘সুন্দরববিবির পালা’ করে আবার প্রচারে আসেন তিনি। ‘উষ্ণতার জন্য’ টেলিছবির পরে ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ চলচ্চিত্র রূপে মুক্তি পায় কৌশিক গাঙ্গুলির পরিচালনায়। দুই জমানার দুই প্রান্তিক মানুষ, চপলরানি ও ঋতুপর্ণ ঘোষকে নিয়ে আলোড়ন তৈরি করে এই ছবি।

    চপল ভাদুড়ির এখন দিন কাটে বৃদ্ধাশ্রমে। ভালোবেসে জুনিয়রদের করা ‘ঋতুপর্ণ ঘোষ’ বা ‘চপল ভাদুড়ি’ নামের নাটকে অভিনয় করেছেন। তিনি আর কাউকেই ফেরান না এই বিজয়াবেলায়। হরি ঘোষ স্ট্রিটের বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে অতীতের কথা ভেবে দিন কাটান যাত্রার শেষ জীবিত নারী চরিত্রে অবতীর্ণা পুরুষ শরীরের কিংবদন্তী চপলরানি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More