সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘মেঘ কালো’র ৫০ বছর, এই সিনেমার শ্যুটিংয়েই খবর পান স্বামীর মৃত্যুর

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

“আমি আপন করিয়া চাহিনি তবু তুমি তো আপন হয়েছো, জীবনের পথে ডাকিনি তোমায়, সাথে সাথে তুমি রয়েছো।”

‘মেঘ কালো’ ছবিতে সুচিত্রা সেনের লিপে আশা ভোঁসলের কণ্ঠে এ যেন এক পবিত্র পুজোর গান। গানের কথা প্রণব রায় আর সুর পবিত্র চট্যোপাধ্যায়ের। এ গানের ৫০ বছর পূর্ণ হল। পাশাপাশি পূর্ণ হল ‘মেঘ কালো’ ছায়াছবির সুবর্ণ জয়ন্তী। সুশীল মুখোপাধ্যায় পরিচালিত সুচিত্রা সেন ও বসন্ত চৌধুরী অভিনীত ‘মেঘ কালো’ ছবি রিলিজ করেছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। কলকাতার রাধা, পূর্ণ প্রভৃতি চিত্রগৃহে হইহই করে চলেছিল এ সিনেমা।

সুচিত্রা সেনের আগ্রহেই তৈরি হয় ‘মেঘ কালো’

পরিচালক সুশীল মুখোপাধ্যায় ‘মেঘ কালো’ ছবি করেছিলেন সুচিত্রা সেনের ইচ্ছেতেই! সুশীল বাবুকে সুচিত্রা সেন নিজে বলেছিলেন ‘আপনি ছবি করুন আমাকে নিয়ে, আমি আপনার ছবির জন্য সময় দেব।’ যখন সুচিত্রা সেনের ডেট পাওয়ার জন্য পরিচালক, প্রযোজকরা হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সে সময়ে ম্যাডাম নিজে যেচে এমন প্রস্তাব দেন সুশীল বাবুকে।

সুশীল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের পরিচয় অনেক কাল আগে থেকে। যখন কানন দেবীর ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ থেকে সহকারী পরিচালকের পদ ছেড়ে তরুণ মজুমদার, দিলীপ মুখোপাধ্যায়, শচীন মুখোপাধ্যায়রা চলে গেলেন, তখন কানন দেবী সুশীল বাবুকে তাঁর ইউনিটে ডেকে নিলেন। এই ভাবেই কানন দেবীর স্বামী পরিচালক হরিদাস ভট্টাচার্যর সহকারী হিসেবে কাজে যোগ দিলেন সুশীল। হরিদাসের ‘সন্ধ্যা দীপের শিখা’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় কাজ করলেন সুচিত্রা সেন। এই ছবিটা ছিল সুচিত্রা ও মুনমুন দুজনেরই খুব প্রাণের ছবি। সেই ছবিতে সহকারী পরিচালক ছিলেন সুশীল বাবু। সে সূত্র ধরেই সুশীল বাবুর প্রথম দেখা মিসেস সেনকে।

মাঝে অনেক দিন যোগাযোগ ছিল না মিসেস সেনের সঙ্গে সুশীলবাবুর। কানন দেবী ছেলের অসুস্থতা দরুণ বিদেশ গেলেন, তাই কানন সুশীলকে পাঠালেন অসিত চৌধুরীর কাছে। অসিত চৌধুরীর চারুচিত্রমের ব্যানারে পূর্ব ভারতে তৈরি প্রথম ইস্টম্যান কালার ছবি ‘মমতা’। তাতেই সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেলেন সুশীল বাবু। উত্তর ফাল্গুনী সিনেমার হিন্দি ভার্সন ছিল ‘মমতা’। এরপর চারুচিত্রমের পরের ছবি ‘কমললতা’তেও কাজ করলেন সুশীল।

এই সব ছবিতেই নায়িকা সুচিত্রা সেন। এই ছবিগুলির মাধ্যমেই সুচিত্রা সেনের খুব কাছে চলে এলেন সুশীল মুখোপাধ্যায়। নিজে ছবি পরিচালনা করার ইচ্ছে ক্রমেই বাড়ছিল সুশীল বাবুর। কিন্তু তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন, যে প্রথম ছবি বড় স্টার এবং বড় ডিস্ট্রিবিউটর নিয়েই করবেন, নইলে আজীবন সহকারী পরিচালক হয়েই থেকে যাবেন।

মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাইরেটা যতই কঠিন, ভিতরটা কিন্তু কোমল ছিব। শ্যুটিংয়ের ব্রেকে নিজের মনের নানা কথা অনেক সময়েই শেয়ার করতেন তিনি সুশীল বাবুর সঙ্গে। কমললতা বা মমতার সেটে এভাবেই বেড়েছিল সখ্য। এমনই একদিন সুচিত্রা বললেন সুশীল বাবুকে “আপনি নিজে ছবি করুন, আমি আপনার ছবিতে কাজ করব।” সুশীল বাবু বললেন, “ম্যাডাম আপনারা তো কত কথাই বলেন। সত্যি করবেন তো?” সুচিত্রা বললেন, “হ্যাঁ, আপনি ব্যবস্থা করুন। আমি অভিনয় করব।”

ডক্টর নীহাররঞ্জন গুপ্ত দিলেন ডাক্তারি টিপস

সুশীল মুখোপাধ্যায় গল্প বাছলেন ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তর লেখা, ‘মেঘ কালো’। নীহাররঞ্জন গুপ্তকে তিনি বললেন “আমার প্রথম ছবি, আপনার প্রাপ্য কিছু কম করে নিতে হবে।” নীহাররঞ্জন গুপ্ত বললেন “আমার গল্প নেওয়ার যা নিয়ম তাতে আপনাকে একটা গিনি দিয়ে গল্পের চিত্রস্বত্ব নিতে হবে।” তাই নিয়েছিলেন সুশীল বাবু এবং প্রাপ্য কিছুটা কমই নেন নীহার বাবু।

শুধু তাই নয়, ‘মেঘ কালো’ ছিল ডাক্তারি পেশাকেন্দ্রিক প্রেমের কাহিনি। ছবির নায়ক ও নায়িকা দুজনেই ডাক্তার। তাই ছবির শ্যুটে হসপিটাল দরকার ছিল। নীহাররঞ্জন গুপ্ত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নীলরতন সরকার হসপিটালে শ্যুটিংয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও ছবিতে দেখানোর জন্য চিত্রনাট্যে বিভিন্ন ডাক্তারি পরামর্শ দিতে নীহাররঞ্জন গুপ্ত নিজে চলে আসতেন। লেখকের গল্প যাতে বিকৃত না হয়, লেখকের লেখার ভাবটা যেন ছবিতে থাকে, পরিচালক নিজেও তা খেয়াল রাখতেন। সেই সঙ্গে লেখকও পরামর্শ দিতেন প্রায়ই।

মেঘ কালো ছবির নায়ক প্রথমে ছিলেন সৌমিত্র

এ ছবিতে সুচিত্রার বিপরীতে প্রথমে নায়ক হিসেবে কাস্ট করা হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। সুশীল বাবু সৌমিত্র-সুচিত্রা জুটি নিয়েই ‘মেঘ কালো’ ছবি করবেন ভাবেন। কিন্তু সেসময় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ফিল্ম সংরক্ষণ নিয়ে তুমুল আলোড়ন চলছিল। সংরক্ষণের মূল কথা ছিল প্রযোজক, পরিবেশক, পরিচালক, হল মালিকদের যে সম্মিলিত চেন সিস্টেম, তাতে লাভ-ক্ষতিতে একটা সমতা আনা। এই নিয়ে টালিগঞ্জ পাড়ায় হয়ে গেল দুটো পক্ষ। এক পক্ষ অসিত চৌধুরীর এবং অন্য পক্ষ পেয়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের মতো নামী পরিচালককে।

সুচিত্রা সেন অসিত চৌধুরীর ছবির নায়িকা। এবং সৌমিত্র অবশ্যম্ভাবী ভাবে সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে, তাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সুশীল মুখোপাধ্যায়কে বলে দিলেন, তিনি ‘মেঘ কালো’ ছবিতে অভিনয় করতে পারবেন না। সৌমিত্র না করায় বসন্ত চৌধুরীকে নায়ক করলেন সুশীল মুখোপাধ্যায়। ‘মেঘ কালো’ সিলভার জুবিলি হিট হয়েছিল, তবু সৌমিত্রকে ‘মেঘ কালো’-তে নায়ক করতে না পারার আফশোস ছিল সুশীল বাবুর মনে। যদিও পরে সুশীল বাবুর ‘সুদূর নীহারিকা’তে নায়ক হন সৌমিত্র।

সুচিত্রা-সুব্রতার মারপিট

নির্মাল্য ভালো মেয়ে। পড়াশোনা, গান সবেতে প্রথমা। মেডিক্যাল কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সব কিছুতে নির্মাল্য সবেতে প্রথম হবেই। অথচ নির্মাল্য জনমদুখিনী। বাপ মা ফেলে দিয়ে চলে গেছে, পিসিঠাকুমার কাছে মানুষ। 

একতলায় জ্যাঠা থাকতে দিয়েছে ঘুপচি ঘরে। সেই একটা ঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েই নির্মাল্য ডাক্তার হয়েছে স্কলারশিপের টাকায়। জ্যাঠা যাও বা স্নেহ দেন, জেঠিমার চক্ষুশুল নির্মাল্য। দোতলায় জেঠতুতো বোন নিরুপমা তার চির প্রতিদ্বন্দ্বী। নিরুপমার সব থেকেও নির্মাল্যর রূপ আর মেধায় হিংসে তাঁর।

নায়িকার নির্মাল্য নামে বেশ হোঁচট খেয়েছিল দর্শকেরা তখন। নির্মাল্য তো সচরাচর ছেলেদের নাম হয়। পবিত্র পুজোর ফুলের মতোই নির্মাল্য চরিত্রে সুচিত্রা অপাপবিদ্ধা ছিলেন। বিপরীতে নিরুপমা চরিত্রে সুব্রতা চ্যাটার্জী গ্ল্যামারাস। আধুনিকার হট লুকে দারুন লেগেছিল সুব্রতাকে, সুচিত্রা সেনের পাশেও। দুজনের একই প্রেমিক, কুন্তল। গরিব বন্ধুপুত্র কুন্তলকে জামাই করবে বলেই নিরুপমার পিতা কুন্তলকে টাকা দিয়ে ডাক্তারি পড়িয়েছে। কিন্তু কুন্তল নির্মাল্যর প্রেমে মুগ্ধ একইসঙ্গে কুন্তল নিরুপমাদের কাছে ঋণে আবদ্ধ।

এই প্লটেই তুমুল মারপিট হবে কুন্তলের জন্য সুচিত্রা ও সুব্রতার। নায়ক আর ভিলেনের মধ্যে নায়িকার জন্য মারপিট হয় বটে, কিন্তু মেয়েতে-মেয়েতে ধস্তাধস্তি ওই সময় দাঁড়িয়ে বাংলা ছবিতে দেখে দর্শকরা তাজ্জব হয়ে গেছিল। বিকাশ রায়,ছায়া দেবী, মলিনা দেবী এবং বসন্ত চৌধুরী অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন।

মধু বনে বাঁশি বাজে

‘মেঘ কালো’ ছবি সুচিত্রা সেনের একটু প্রান্তবেলার ছবি। সুশীল মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ছবির পরিচালনা ভাল হলেও এ ছবিটিকে সুপারহিট করায় এবং অন্য উচ্চতায় তুলে দেয় ছবির অসাধারণ সোনাঝরা গান।

আশা ভোঁসলের কণ্ঠে পবিত্র গান ও ক্যাবারে লুকের গান দুই-ই এ ছবিতে দুর্দান্ত। সুচিত্রার লিপে আশার কণ্ঠে ‘মধু বনে বাঁশি বাজে’ কিংবা ‘আমি আপন করিয়া’ শুনলে কান-মন পবিত্র হয়ে যায়। পর্দায় সুচিত্রা সেন তো আছেনই চোখ সার্থক করার জন্য।

আবার সুব্রতার লিপে আশাজির ‘রাত যে মধুমতী’ যৌবনমত্তা নেশা ধরায়। মান্না দের গানটি অবশ্য সেভাবে জনপ্রিয় হয়নি। ছবির গানের মান এত ভালো কারণ প্রণব রায়ের কথা এবং পবিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সুর।

নির্মাল্য ডাক্তার সুচিত্রা সেবিকা

সুচিত্রা সেন নিজের জীবনেও সঠিক প্রেমিক পাননি এত সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও। একাকী পথের অভিসারিকা ছিলেন সুচিত্রা। তাঁর বেশিরভাগ নায়িকাকেন্দ্রিক ছবিগুলো হসপিটাল, উত্তর ফাল্গুনি, মেঘ কালো, দীপ জ্বেলে যাই। সুচিত্রা প্রেমকে ও ভালোবাসাকে সেবায় রূপান্তরিত করেছেন। এক মহৎ অচ্যুত ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেয়েছে নির্মাল্য চরিত্রেও।

সুশীল মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘মেঘ কালো’র শ্যুটিংয়ে মিসেস সেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের রের্কড এনে বাজিয়ে শুনতেন মেক আপ রুমে। কান্নার দৃশ্য বা কোনও কঠিন দৃশ্য করার আগে কোনও দিনও গ্লিসারিন লাগেনি চোখে। তিনি ম্যুড তৈরি করে ফেলতেন রবি ঠাকুরের গানের কথায়। সুচিত্রা অন্তরালে যাওয়ার পরও সুশীল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতেন সুচিত্রা। তিনি কি আর ছবির জগতে ফিরতে চাইতেন? সুশীল বাবুও আজ প্রয়াত। ম্যাডামের মন কি তিনি পড়তে পেরেছিলেন? জানা নেই।

বসন্ত চৌধুরী বলেছেন, “সুচিত্রার প্রথম দিকের ছবির নায়ক আমি, উত্তম কুমারের আগেই। আবার শেষ দিকের ‘মেঘ কালো’ করতে গিয়ে বুঝেছিলাম সুচিত্রা আধ্যাত্মিক জগতে চলে যাচ্ছেv, ওঁর মন আর রুপোলি জগতে নেই। ওঁর চিন্তার তল আমরা পেতাম না।” আজ পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও ‘মেঘ কালো’ ইউটিউবে প্রচুর ভিউ পায়। সুচিত্রা সেনের অভিনয় আর সুশীল মুখোপাধ্যায়ের ভাল পরিচালনা আজও সমাদৃত সমান ভাবে। নির্মাল্য সুচিত্রার অপাপবিদ্ধতা আজও ছুঁয়ে যায় দর্শককে।

পর্দার মতো জীবনেও বিপর্যয়

‘মেঘ কালো’র শ্যুটিং চলাকালীন সুচিত্রার স্বামীবিয়োগ ঘটে ১৯৬৯ সালে। বহুকালই সেপারেশন ছিল তাঁদের। জাহাজে ট্র্যাভেল করার সময়ে হৃদরোগে মৃত্যু ঘটে সুচিত্রা স্বামী দিবানাথ সেনের। সুচিত্রা সেদিন একটা কথাও বলেননি। শুধু বলেছিলেন “আমার জীবনের একটা চাবি হারিয়ে গেল।” মুনমুনের ইচ্ছেতে দিবানাথের মরদেহ এনে শেষকৃত্য করেন সুচিত্রা ও মুনমুন। কিন্ত শ্যুটিংয়ে তার রেশ পড়তে দেননি। বিধবা সুচিত্রা সেন ছবিতে মেডিক্যাল স্টুডেন্ট থেকে লেডি গায়নোকোলজিস্ট সার্জন হিসেবে অভিনয় করে যান।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সুশীল মুখোপাধ্যায়ের পুত্র সুমিত মুখোপাধ্যায় ও কন্যা অপর্ণা দত্ত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More