অকালমৃত সন্তানকে নিয়ে ‘আনন্দরূপ’ লেখেন আশুতোষ, সে সিনেমা করার মুখে চলে যান উত্তমকুমারও

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নাম শুনলেই মনে পড়ে ‘বাংলার বাঘ’-এর মুখ। কিন্তু বাঙালি জাতির গর্ব হিসেবে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ওই এক জনই নেই। স্বর্ণযুগের বহু বাংলা ছবির কাহিনিকার তিনি। সেই আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা সাহিত্য নিয়ে সবথেকে বেশি বিখ্যাত বাংলা ছবি হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে বলিউডেও প্রচুর সুপারহিট ছবি নির্মিত হয়েছে।

এ বছর সাহিত্যিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শতবার্ষিকী। এই মাসেই জন্মেছিলেন তিনি, আজ থেকে একশো বছর আগে। তাঁর লেখা সাহিত্যে যে বাংলা ছবিগুলো সুপারহিট হয়েছিল, পরে সেই সব ছবি হিন্দিতেও নির্মিত হয়। যেমন ‘চলাচল’ ছবির হিন্দি রাজেশ-শর্মিলার ‘সফর’, ‘সাত পাকে বাঁধা’র হিন্দি ‘কোরা কাগজ’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর হিন্দি ‘খামোশি’।

শতবর্ষে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবন কাহিনি ফিরে দেখা যাক।

শুরুর জীবন

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়য়ের জন্ম ঢাকার বজ্রযোগিনী গ্রামে, ১৯২০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। পিতার নাম পরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মাতা তরুবালা দেবী। পিতা পেশায় ছিলেন স্কুল ইনস্পেক্টর। এই সুবাদে আশুতোষকে নানা সময় নানা জায়গায় দিন কাটাতে হয়েছে। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে উত্তরবঙ্গে। পরবর্তী কালে চুঁচুড়া থেকে স্কুলজীবন। এর পরে হুগলির মহসিন কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বিএ-তে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কিন্তু এ সময়ে চোখের সমস্যা দেখা দেওয়ায় পড়াশোনা প্রায় ছেড়ে দেন। অন্য ভাইয়েরা কৃতী হয়ে উঠলেও তিনি তা পারছিলেন না শারীরিক কারণে। ক্রমে এ নিয়ে বাড়িতে সমস্যা তৈরি হয়। কাজ খুঁজতে থাকেন তিনি।

প্রথম জীবনে আশুতোষ একের পর এক মোট ন’জায়গায় চাকরি নেন এবং ছেড়েও দেন। একসময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং নিজের ব্যয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সেখানেও বিশেষ সফলতা পাননি তখন। এর পরে তিনি শুরু করেন গেঞ্জির ব্যবসা। তারও পরে গড়ে তোলেন প্রকাশন সংস্থা ‘ম্যানুস্ক্রিপ্ট’। নিজের মধ্যে জেদ তো ছিলই, সঙ্গে ছিল সৃজনশীল মনও।

তাই শেষ অবধি চাকরি নিলেন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন বহুদিন।

সাহিত্য জীবন

সাহিত্যিক হিসেবে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আত্মপ্রকাশ ‘নার্স মিত্র’ কাহিনি দিয়ে। প্রথম গল্প ‘নার্স মিত্র’ প্রকাশ পায় ১৯৫১ সালে, ‘বসুমতী’ পত্রিকায়। এই কাহিনি নিয়েই অসিত সেন তৈরি করেন সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবি। যে ছবির চরিত্র নার্স রাধা আজও আইকনিক।

এর পরে চলাচল (১৯৫১) উপন্যাসেই প্রথম নাম ও প্রতিষ্ঠা পান আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। সার্থক হয় এত দিনের লড়াই।

এছাড়াও তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে হল পঞ্চতপা, সোনার হরিণ নেই, নগরপারে রূপনগর, দেখা, কাল তুমি আলেয়া, জীবনতৃষ্ণা, অলকাতিলক, অগ্নিমিতা, রোশনাই, নতুন তুলির টান প্রভৃতি। পরকপালে রাজারানি (১৯৮৯) লেখকের জীবনকালে প্রকাশিত শেষ উপন্যাস।

চলচ্চিত্রের রাজা আশুতোষ

স্বর্ণযুগে সিনেমাকে বই বলত লোকে। কারণ সাহিত্য নির্ভর ছবি হত সব। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে সবথেকে বড় বড় হিট কালজয়ী ছবি হয়েছে এ সময়ে।  আশুতোষের কাহিনি নিয়ে অরুন্ধতী দেবী অভিনীত হিট ছবি ‘পঞ্চতপা’ কিংবা ‘চলাচল’। তেমনই উত্তম সুচিত্রা জুটির ‘জীবন তৃষ্ণা’ কিংবা ‘নতুন তুলির টান’ অবলম্বনে ‘নবরাগ’।

সুচিত্রা সেনকে সে সময়ে ‘উত্তম’ বলয়ের থেকে বার করে আনতে পেরেছিল একমাত্র আশুতোষের কাহিনি। প্রথম ‘দীপ জ্বেলে যাই’ একক সুচিত্রা সেন অভিনীত সুপারহিট ছবি করেই সুচিত্রা নিজের জোর খুঁজে পেলেন। এর পরে ‘সাত পাকে বাঁধা’, সেটিও আশুতোষ কাহিনি, যে ছবি সুচিত্রাকে এনে দিল ‘মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভাল’ থেকে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার।

কিন্তু আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এই নিয়ে আফশোস করে বলেছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। “শ্রীমতী সেনের ‘সাত পাকে বাঁধা’ বিশ্বখ্যাতি অর্জন করল কিন্তু অর্চনাই কি তাঁর জীবনে শ্রেষ্ঠতম অভিনয় যা বিশ্বের লোকরা দেখল? ‘দীপ জ্বেলে যাই’ তে শ্রীমতী সেনের সুষমাদীপ্ত অভিনয়ে সেই জীবনবেদনা আত্মার উপর কি গভীর ছাপ রেখে যেতে পারে তা বিশ্ব বিচারকরা দেখতে পেলেন না। অর্চনা আর নার্স রাধা মিত্র কে পাশাপাশি দাঁড় করাতেই হবে যদি সুচিত্রা সেনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় বলতে হয়। যা আর কোনও অভিনেত্রী পারতেন না।”

নগরপারে রূপনগর নিয়ে ধারাবাহিক হয়েছিল কলকাতা দূরদর্শনে যাতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দেবশ্রী রায়। সে সিরিয়াল আজও অনেকের মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল।

মায়া-মমতার সংসার

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনযুদ্ধ অমানুষিক। শুরুর জীবন থেকেই এত আঘাত, বিশেষত রোগভোগ খুবই সমস্যা তৈরি করে। প্রথমে নিজের চোখের সমস্যা থেকে পড়াশোনায় বাধা। তার পরেও তিনি যৌথ পরিবারে সকলের গঞ্জনা অতিক্রম করে লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। কিন্তু পাকা চাকরি তাঁর জীবনে ছিল না। তাই বিয়ে করার জন্য আদর্শ পাত্র তিনি হয়তো ছিলেন না সমাজের চোখে।

কিন্তু তাঁকেই ভরসা করেছিলেন লখনউয়ের মেয়ে মমতা মুখোপাধ্যায়। বাড়ির আপত্তি অগ্রাহ্য করে কলকাতায় এসেছিলেন কোনও এক স্কুলে হিন্দি পড়াতে। কলকাতায় এসে তাঁর বিয়ের যোগাযোগ হল স্বল্প রোজগেরে আশুতোষের সঙ্গে। বিয়ের আগে মমতা বলেছিলেন ‘পড়তে আর চাকরি করতে দিতে হবে।’ আশুতোষ বলেছিলেন ‘আমার তো পাকা চাকরি নয়, অবশ্যই তুমি চাকরি করবে।’ বিয়ে হল। শ্বশুরবাড়িতে তাঁর নাম দেওয়া হল রেণু।

বিয়ের পর শুরু হল রেণুর নতুন লড়াই। পায়ে অসুবিধে নিয়ে জন্মাল এক কন্যাসন্তান। পায়ের পাতা উল্টো তার। ওদিকে আশুতোষের লেখার ব্যস্ততা। সংসার একার কাঁধে তুলে নিলেন মমতা। চাকরি আর করা হল না। যৌথ পরিবারে কতই বা সবাই মেনে নিত তখন বউয়ের চাকরি করতে বেরেনো? তার ওপর মেয়ের অসুস্থতা।

জীবনভর কষ্ট

পরে আরও একটি পুত্র হল ওঁদের। সে তো খুশির খবর, মেয়ে সর্বাণী আর পুত্র জয়। ছোট থেকেই জয় ছিল গানপাগল। কিছুদিনের মধ্যেই তার ধরা পড়ল দুরারোগ্য বিরল অসুখ, ‘মাসকুলার ডিসট্রফি’। যার পরিণাম অবধারিত মৃত্যু। মমতা দেবী মনের জোর হারাননি। স্বামীকে বললেন, “তুমি লেখো সংসার আমি দেখব।”

রেণু কখনও স্বামীর সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রিমিয়ারে যাননি। অসুস্থ সন্তানদের তাহলে কে দেখবে। মেয়ে তবু সুস্থ হল, ছেলে আর হল না। মমতা দেবী ভাবতেন তিনি না থাকলে তাদের কে দেখবে। পুত্রের অকালমৃত্যু হয় একসময়। মমতা মনের জোরে ও আগামীর দিকে তাকিয়ে সে চরম শোক সামলে নিতে পারলেও আশুতোষ ভেঙে পড়েছিলেন বিধস্তভাবে। তাই মমতা ভাবতেন, তিনি যদি আগে চলে যান স্বামীকে কে দেখবে? স্বামীর মৃত্যু যাত্রায় যেন নিজের কর্তব্য শেষ করে বৈধব্যকে নিশ্চিন্ত পথ মেনেছিলেন মমতা দেবী।

রেণু যে সেবা আর মনের জোর দিয়েছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে, তাই যেন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। মমতা-আশুতোষের কন্যা সর্বাণী মুখোপাধ্যায়ও পরে বিখ্যাত লেখিকা হন। বাবা-কেন্দ্রিক লেখাই বেশী সর্বাণীর।

জলচৌকিতে বসেই শব্দসৃষ্টি

আশুতোষের লেখার একটা বিশেষত্ব ছিল, তিনি বাড়িতে জলচৌকিতে বসে লিখতেন। তাঁর কন্যা সর্বাণী মুখোপাধ্যায় লেখা উদ্ধৃত করে বলা যায়, “লেখার জন্য নিজের খাটের ওপর একটা জলচৌকি, এ-ফোর সাইজের রাইটিং প্যাড আর নিজস্ব কয়েকটা কলম। ব্যস, আর কিচ্ছু না। তাতেই যা হওয়ার হয়েছে। সরস্বতী পুজোর দিন দেখতাম, প্রতি বছর একটা না একটা গল্প বা উপন্যাসের লাইন লিখত ওই জলচৌকি টেনে নিয়ে। ওটাই ছিল বাবার অর্ঘ্য। অঞ্জলি দিতেন পেট পুরে খেয়েদেয়ে।”

আক্ষেপের জীবন

সাহিত্য তো ছবি হলে অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেই আক্ষেপই ছিল আশুতোষের। প্রথম আক্ষেপ  ওঁর লেখা সাহিত্য যখন ‘নগর দর্পণে’ ছবি হয় উত্তম কুমার ও কাবেরী বসু অভিনীত, তখন ‘নগর দর্পণে’ ছবির চিত্রনাট্য বদলে দিয়েছিলেন পরিচালক যাত্রিক গোষ্ঠী। তাই অসন্তুষ্ট হন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ছবি হিট হলেও সাহিত্যিকের পছন্দ হয়নি ছবির চিত্ররূপ ও বিন্যাস।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র জয় ছিল খুব গান পাগল। আশুতোষ বাবুর কাহিনি নিয়ে যখন ছবি হয় ‘দীপ জ্বেলে যাই’, সেই ছবির সুরকার ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই থেকে আশুতোষ পুত্র জয়ের হেমন্ত কাকা হয়ে গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত কত কাজ ফেলেও অসুস্থ গানপাগল ছেলেকে গান শোনাতে এসেছেন। এমনকি জয়ের মন ভালো রাখতে হেমন্ত কাকা লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে-কে আশুতোষের বাড়িতে নিয়ে এসেছেন শুধুমাত্র জয়কে গান শোনাতে। যা শুনলে গল্পকথা মনে হয়।

ছেলে অকালে চলে গেলে তাকে নিয়েই একটি উপন্যাস লিখেছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ‘আনন্দরূপ’। ছেলে চলে গেলেও ছেলের স্মৃতি হিসেবে উপন্যাসটি শেষ করেন এবং সেই বইটা চলচ্চিত্র হবে বলে পাকা কথা হয় স্বয়ং উত্তম কুমারের সাথে। আনন্দরূপের মূখ্য ভূমিকায় ভাবা হয় উত্তম কুমারকেই। তাই আনন্দরূপ উপন্যাসটা পড়তেও শুরু করেছিলেন উত্তম।

কিন্তু অদৃষ্টের এমনই নির্মমতা যে তার কিছু দিনের মধ্যে উত্তম কুমারের অকাল প্রয়াণ হল। ছবি হল না ‘আনন্দরূপ’। দর্শকরা বঞ্চিত হল সুন্দর এক সৃষ্টি থেকে।

শতবর্ষে শ্রদ্ধা ও প্রণাম

১৯৮৯ সালের ৪ মে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনাবসান হয় প্রখ্যাত সাহিত্যিকের। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় যা খ্যাতি পেয়েছেন, দুঃখও পেয়েছেন তার দ্বিগুণ। কিন্তু তাতেও তাঁর লড়াই থামেনি। চেষ্টা ও অধ্যবসায় করে গেছেন, স্রষ্টা রূপে ও লেখক রূপে তিনি পূজনীয়।

বিশাল একান্নবর্তী কৃতী পরিবারের একমাত্র অ-কৃতী সেজো ছেলে আশুতোষের জন্যই আজ মুখোপাধ্যায় পরিবার বিখ্যাত। এটাও তাঁরই জয়। বাংলা সাহিত্য ও বাংলা এবং হিন্দি ফিল্ম দুনিয়া তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবে। শতবর্ষে শ্রদ্ধা ও প্রণাম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ভাইঝি অনুরাধা ভট্টাচার্য।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More