লকডাউন: গৃহে ‘পৌরুষ’ প্রদর্শনের অঢেল সময় এখন

'লকডাউনে বউয়ের সঙ্গে দিনভর থাকব কী করে?' নামক 'রসিকতা'-টি হল একটি নির্যাতনের পিরামিডের ভূমি, যার শীর্ষবিন্দু হল নির্মম গৃহহিংসা। ঠিক যেমন রেপ জোক হল রেপ কালচার নামক পিরামিডের বেস, যার শীর্ষবিন্দু হল ধর্ষণ। এই যে মনস্তাত্ত্বিকরা বারবার বলছেন, 'বহির্মুখী পুরুষ' বাড়িতে থাকতে বাধ্য হওয়ায় হতাশায় ও ক্রোধে এমন মারধর করছেন, সত্যি যদি তাই হয়, তবে তাতে 'সারাটা দিন বউয়ের সঙ্গে থাকব কী করে?' রসিকতারই রেশ মিশে নেই কি?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শতাব্দী দাশ

    করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলির নির্দেশে দেশ জুড়ে লকডাউন। অফিস-কাছারি-স্কুল-কলেজ বন্ধ। সকলেরই হাঁসফাঁস অবস্থা, তবে পুরুষমানুষের হাঁসফাঁস যেন কিছু বেশি৷ টিভির ক্যামেরা মাঝে-মাঝেই ধরে ফেলছে অকারণে বাইরে বেরোনো পুরুষদের। কেউ চা খাওয়া, কেউ খবরের কাগজ পড়ার অজুহাতে বেরিয়েছেন। স্পষ্ট বলছেন, সারাক্ষণ বাড়ি বসে থাকার একঘেয়েমিতে তারা ক্লান্ত। মহিলারা হাঁফিয়ে উঠছেন কিনা, উঠলেও তা কিছুই না করার একঘেয়েমিতে না গৃহকর্মের চাপে, জানা যাচ্ছে না।

    এই হাঁফিয়ে ওঠা পুরুষদের একধরনের ‘সরস’ পিতৃতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়া মিম বা জোক-রূপে প্রায়শই প্রকাশ পাছে; এতটাই নিয়মিত যে, তার একটা জেনেরিক নাম দেওয়া চলে। অঞ্জন চৌধুরির ‘বউ সিরিজ’-এর মতো, ধরা যাক, এই গোত্রের রসিকতার নাম দেওয়া হল, ‘বউ জোকস’ বা ‘বউ মিমস’৷ বিষয়বস্তু নতুন নয়। অসহনীয় বউকে নিয়ে খানিক রঙ্গরসিকতা, যা পাড়ার রোয়াকে বা চায়ের আড্ডায় বা লোকাল ট্রেনে বা আপিস ক্যান্টিনে আগেও প্রায়শই শোনা যেত। এখন ওদিকটা যেহেতু খাঁ-খাঁ, তাই সমাজমাধ্যমেই মূলত রসবোধের পরিচয় মিলছে। করোনার কালের এসব ক্যাজুয়াল মিসোজিনির কিছু নমুনা–

    ১) নিজের তো বাড়িতে বউ নেই (প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে), বুঝবে কী করে বউয়ের সঙ্গে ২১ দিন একটানা থাকার কী জ্বালা!
    ২) এত লোক চায়ের দোকানে কেন? ভাবো এদের বউ কী অখাদ্য চা বানায়!
    ৩) যাক! কাজের মেয়ে না আসায় বউ একটু স্লিম হবে!
    ৪) জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। বাইরে করোনা, ঘরে বউ। ইত্যাদি।

    রঙ্গ-রসিকতার ধরন যে মূলধারার সমাজ-চিন্তনকে সূচিত করে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। মোদ্দা কথা, পুরুষমানুষের রাতের বেলায় বউয়ের সাহচর্য্যে আপত্তি না থাকলেও দিনের বেলায় তারা বউয়ের সঙ্গ উপভোগ করে না, বোঝা গেল৷
    প্রায়শই এর একরকম বৌদ্ধিক অজুহাত পাওয়া যায়। নারী সংসারধর্ম পালন ও বংশবিস্তারে অপরিহার্য হলেও, সাধনার সঙ্গিনী নন। পুরাকালেও মুনি-ঋষিরা বউ ফেলে গহীন অরণ্যে যেতেন সাধনা-টাধনা করতে। রবীন্দ্রনাথের কানের কছে তাঁর বউ দেড় কিলো পেঁয়াজের বরাত নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকলে যে তাঁর রবীন্দ্রনাথ হওয়া হত না, তা কে না জানে! সুতরাং একুশ দিন ২৪ ঘণ্টা বউয়ের সংস্পর্শে থাকতে হল বলে হয়তো অনেকেরই নোবেল, বুকার, ফিল্ডস, অস্কার হাতছাড়া হল। তা নিয়েই এসব সামান্য রসিকতা-টসিকতা।

    এবার অশ্রুত দিকটির কথাও একটু শোনা যাক। স্ত্রীদের কেমন লাগছে, বা লাগতে পারে ২৪ ঘণ্টা বরেদের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে?

    জাতিসংঘের ড্রাগ ও অপরাধ সংক্রান্ত দপ্তর ২০১৮ সালেই জানিয়েছিল, ঘর নারীর জন্য সবচেয়ে খতরনাক, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। হ্যাঁ, বাহির নয়, নিজের ঘর। সারা বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে একশো সাঁইত্রিশ জন নারী নিজের ঘরে তাদের অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের হাতে খুন হন। আহত হন আরও বেশি। ঘরে চলে যৌন নিপীড়নও৷ অথচ গৃহহিংসা নিয়ে আলোচনা এখনও সামাজিক ট্যাবু আর বৈবাহিক ধর্ষণ এখনও ভারতে ‘ধর্ষণ’ নয়।

    রাষ্ট্র-জুড়ে লকডাউন ঘোষণার পরিকল্পনা যখন চলে, তখন যেকোনও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মাথায় আসার কথা, আর্ত আর প্রান্তিকদের কী কী সমস্যা হতে পারে এই লকডাউনের ফলে ও কীভাবে তা থেকে উত্তরণ সম্ভব। প্রশ্নটা লকডাউনের ঔচিত্য নিয়ে নয়। লকডাউন অবশ্যই উচিত। প্রশ্নটা লকডাউনের সঙ্গে আর কী কী করণীয়, তা নিয়ে।

    কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, অভিবাসী শ্রমিকদের কথা যেমন সরকার ভাবতে ভুলে গেছিলেন, তেমনই ভাবতে ভুলে গেছিলেন তাদের কথা, যাদের জন্য ঘর নিরাপদ নয়, বরং নরকসম৷ ভারতে তাদের আপদকালীন কোনও শেল্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে? না। পুলিশ-প্রশাসনকে কোনও বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, লকডাউনের কালে, সার্বিক গৃহবন্দি অবস্থায়, কোথাও গৃহহিংসার খবর পেলে তারা কীভাবে চটজলদি অ্যাকশন নেবে? না। লকডাউনের সময়ের কোনও বিশেষ সরকারি হেল্পলাইন গৃহহিংসার ভিক্টিমদের জন্য বারবার টিভিতে প্রচারিত হচ্ছে? না৷

    পিটিআই সূত্রে কিন্তু জানা যাচ্ছে, ভারতে লকডাউন পিরিয়ডে মহিলাদের ওপর গৃহহিংসা বৃদ্ধির কথা মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন রেখা শর্মা অস্বীকার করছেন না। বরং বলছেন, মার্চের ২৪ তারিখ থেকে ৩১ তারিখ– আটদিন তাঁরা শুধু ইমেলেই যথেষ্ট সংখ্যক অভিযোগ পেয়েছেন গৃহহিংসার। প্রসঙ্গত, নভেল করোনাভাইরাসের প্রকোপ ঠেকাতে ওই ২৪ মার্চ মধ্যরাত থেকে দেশ জুড়ে ২১ দিন-ব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের ১৩০ কোটি মানুষ গৃহবন্দি হয়েছেন।

    রেখা শর্মা নিজেই বলেছেন, মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের মহিলাদের অধিকাংশই ইমেল করতে পারেন না। বলেছেন, সচরাচর অভিযোগ বেশি আসে ডাকযোগে। ডাক-ব্যবস্থা এখন নিয়মিত নয়, ফলে অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকে সশরীরেও এসে পৌঁছন, সে রাস্তাও বন্ধ।

    প্রাপ্ত অভিযোগের বেশিরভাগ পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্য থেকে এসেছে। রেখাজি বলেন, ‘বাড়িতে বসে হতাশায় ভুগছেন পুরুষরা। তাই মহিলাদের ওপর যাবতীয় হতাশা উগরে দিচ্ছেন’। তিনি আরও নিদান দিয়েছেন, যারা জাতীয় মহিলা কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না, তারা যেন অন্তত স্থানীয় পুলিশ ও রাজ্য মহিলা কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

    জাতীয় মহিলা কমিশনে মেয়ের হয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন এক বাবা। পিটিআইয়ের তরফে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে হলে ওই ব্যক্তি জানান, রাজস্থানের সীকরে-তে বিয়ে হয়েছে তার মেয়ের। পেশায় শিক্ষক জামাইটি লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পর গতকয়েক দিন ধরে স্ত্রীর উপর অকথ্য অত্যাচার চালাচ্ছে, এমনকী স্ত্রীকে অভুক্ত রেখেছে সে।

    সমাজকর্মীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন অনেক নির্যাতিতা। অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ উইমেনস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কবিতা কৃষ্ণণ একটা উল্লেখযোগ্য কথা বলেছেন, ‘লকডাউন ঘোষণা হবে, এটা আগে থেকে জানলে সময় থাকতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারতেন এরা।’ কথাটি প্রণিধানযোগ্য, কেন্দ্রীয় সরকার চার ঘণ্টার নোটিশেই কার্যত লকডাউন করেছিলেন। আগে থেকে জানলে হয়তো কেউ কেউ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু সকলে নয়। একথা মনে রাখতে হবে, যাওয়ার বিকল্প জায়গা নেই বলেই এদেশে অধিকাংশ গৃহহিংসায় নির্যাতিতা বৈবাহিক সম্পর্ক ভাঙতে সাহস করেন না৷

    ‘সহেলি’র সংস্থার বাণী সুব্রহ্মণ্যমের মতে, ‘ঘরবন্দি অবস্থায় অনেকেই মাথা ঠিক রাখতে পারেন না।’ একই সুর শোনা গেছে কলকাতার মনোবিদদের কণ্ঠেও। না, কোনওভাবেই তাঁরা মারধরকে জাস্টিফাই করছেন না নিশ্চয়। তাঁরা প্রত্যক্ষ স্টিমুলিগুলির কথা বলছেন, যা গৃহহিংসা বাড়াচ্ছে। গৃহবন্দি পুরুষের হতাশা, একঘেয়েমি, স্ট্রেস, বিরক্তি, উৎকণ্ঠা। একইভাবে এসে পড়ছে কাজ হারানোর ভয় বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গও। ‘জাস্টিফিকেশন’ হিসেবেই নয়, ‘স্টিমুলাস’ হিসেবেই, কিন্তু এসে পড়ছে৷

    গৃহহিংসা বিষয়ক সমাজকর্মী হিসেবে আরেকবার মনে করাতে চাই, এগুলো গৃহহিংসার ‘কারণ’ নয়। হঠাৎ রাগে, হতাশায়, পারিপার্শ্বিক চাপে কেউ বউ পেটায় না। ভেবে দেখুন, একই পরিস্থিতিতে পুরুষমানুষ বাড়ির অন্য সদস্যদের মারধর করে না৷ শুধু স্ত্রী (বা শিশু)-ই তার অত্যাচারের শিকার। কেন? কারণ গৃহহিংসা আসলে ক্ষমতা (power) ও নিয়ন্ত্রণের (control) খেলা। গৃহহিংসায় আকস্মিকতার কোনও উপাদান নেই। গৃহহিংসা একটি learned behaviour/ অর্জিত আচরণ। পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানে যার অবস্থান সবার নীচে, সে হল বাড়ির বধূটি। যাকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে পুরুষ অভ্যস্ত, সেই হল বউ। যাকে মারলে সেই প্রহারটি ‘অধিকার’ বা ‘উচিত শাস্তি’ বা ‘পৌরুষ’ বা ‘সামান্য চ্যুতি’ হিসেবে গণ্য হবে, সে আর কেউ নয়, বিবাহিত বউ। এসব শিক্ষা পুরুষটি অর্জন করেছে আশৈশব। তাই গৃহহিংসার শিকার নির্দিষ্ট৷ আর লক্ষ্যও নির্দিষ্ট: ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।

    তা হলে এক্ষেত্রে লকডাউনের ভূমিকা ঠিক কী? স্ট্রেস, বিরক্তি, হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা এগুলো কি স্টিমুলি নয়? অবশ্যই এরা স্টিমুলি। কিন্তু রসায়নে স্টিমুলাসের ভূমিকা শুধু বিক্রিয়াটিকে ত্বরাণ্বিত করার, বিক্রিয়া ঘটানোর দায় অন্যান্য উপাদানের। উপরন্তু এই সময় গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায়, নির্যাতক নির্যাতিতাকে অত্যাচার করার আরও বেশি সাহস পাবে।

    ফেরা যাক, গোড়ার প্রশ্নটিতে। কেমন লাগছে এই স্ত্রীদের, ২৪ ঘণ্টা এরকম সঙ্গীর সঙ্গে কাটাতে? যেমন লাগে একজন নির্যাতিতের, হোস্টেজে নির্যাতকের সঙ্গে থাকতে। প্রতিমুহূর্তে তারা একটা কাচের মেঝের উপর দিয়ে পা টিপে টিপে হাঁটছেন, যেকোনও মুহূর্তে যা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে আর তিনি পড়ে যাবেন অতল খাদে। গৃহহিংসায় নির্যাতিতর মানসিক অবস্থা বোঝাতে ‘ওয়াকিং অন দ্য গ্লাস ফ্লোর’ একটি প্রচলিত টার্ম।

    করোনাভাইরাসে ‘এক্সপোজার’ নিয়ে সমগ্র মানবপ্রজাতি সন্ত্রস্ত। অথচ এই মহিলাদের কিন্তু জেনেশুনেই ২৪ ঘণ্টা ‘এক্সপোজড’ থাকতে হচ্ছে তাদের নির্যাতকের সান্নিধ্যে। মার খেলেও তাদের পালানোর উপায় নেই। আত্মীয়-বন্ধুরাও আছেন লকডাউনে, তাই সাহায্য চাওয়ার উপায় নেই। পুলিশ ব্যস্ত লকডাউন কার্যকর করতে। অবশ্য লকডাউনের আগেও আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে পুলিশ– আমাদের সমাজে সকলেই, ‘মানিয়ে নেওয়ার’-ই পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এইমুহূর্তে এই যে চাইলেও কোথাও পালানো যাবে না, এই বোধ তাদের মধ্যে বাড়তি হতাশা তৈরি করবেই। লকডাউনে বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, তাই গৃহহিংসা দেখতে বাধ্য হওয়ার পর তাদেরও আর কোনও আশ্রয় নেই, যেখানে তারা কথা বলে হালকা হতে পারে। তারাও ভুগবে অবসাদে।

    আবার ভাবুন, এই নির্যাতিত মহিলা যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন মারণব্যাধিটিতে? তা হলে কী করা হতে পারে? তাকে কি বাড়ি থেকে বের করে দেওয়াও হতে পারে না?

    এমনকী বিবাহবিচ্ছেদের পরেও প্রাক্তন স্বামীর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ নয়, গৃহহিংসা এমন এক ফাঁদ। অনেকেই আইনি নির্দেশে শিশুকে বাবার সঙ্গে দেখা করতে দিতে বাধ্য থাকেন। লকডাউনে বাচ্চার সঙ্গে দেখা হচ্ছে না, এই অজুহাতে ফোন করে অকথ্য গালিগালাজ করছেন বা হুমকি দিচ্ছেন প্রাক্তন স্বামী, এমন রিপোর্টও এসেছে পৃথিবীর নানা দেশে।

    শুধু ভারতে নয়। ইউকে, ইউএসএ, বা চিন– সর্বত্রই গৃহহিংসা বেড়েছে। ব্রাজিল থেকে জার্মানি, স্পেন থেকে গ্রিস, কেউই ব্যতিক্রম নয়। ‘এক্সপোনেনশিয়ালি’ না হলেও, পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন দেশে গৃহহিংসা দুই-তিনগুণ বেড়েছে। ইউএসএ-এর শিশুরা শিশুদেরই হেল্পলাইনে জানাচ্ছে মায়েদের দুর্দশার কথা। সবাই চিনে ফাইল হওয়া ডিভোর্স কেসের সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়ে মজা করছেন, অথচ যা উহ্য থেকে যাচ্ছে তা হল, যে হুবেই প্রদেশে প্রাথমিকভাবে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, সেখানে তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে গৃহহিংসার অভিযোগ। ব্রাজিল জানাচ্ছে, এরকম অভিযোগ বেড়েছে ৪০% থেকে ৫০%। সাইপ্রাসে ৩০%। ইটালিতে আবার অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, আগের চেয়ে হেল্পলাইনে ফোন কল কমেছে, কিন্তু প্রবলভাবে বেড়েছে টেক্সট মেসেজ। কারণ নির্যাতিতা নির্যাতকের ভয়ে কলও করতে পারছেন না। স্পেনে এইমুহূর্তে সবচেয়ে কড়া লকডাউন আইন, অমান্য করলে কঠোর শাস্তি। অথচ স্পেনের সরকার বলেছে, মহিলারা গৃহহিংসা রিপোর্ট করতে পথে বেরোতে পারেন, তাদের ছাড় আছে। কারণ সেটি একটি জরুরি অবস্থা। এই স্পেনেই, উপকূলবর্তী ভ্যালেনিকা অঞ্চলে, কিছুদিন আগে সন্তানদের সামনেই স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করেছেন এক ব্যক্তি। স্পেনে আরও বলা হয়েছে, ওষুধের দোকানে গিয়ে যদি কোনও মহিলা ‘মাস্ক-১৯’ চান, তা হলে সেটাকে গৃহহিংসার ভুক্তভোগীর সাংকেতিক ভাষা বলে ধরে নিতে হবে, অর্থাৎ তিনি সংকেতের মাধ্যমে সাহায্য চাইছেন। ওষুধ-দোকানিকে এমতাবস্থায় হেল্পলাইনে ফোন করতে হবে।

    লকডাউন অর্থনৈতিকভাবে আমাদের বিশ-পঁচিশ বছর পিছিয়ে দিতে পারে, শোনা যাচ্ছে। কিন্তু লকডাউন যেন সামাজিকভাবে আমাদের জেন্ডার-রোলকে ১৯৫০ সাল নাগাদ নিয়ে গিয়ে না ফেলতে পারে, যখন নারী যাবতীয় গৃহকার্যে বাধ্য থাকত, আর পুরুষ পায়ের উপর পা তুলে তার খুঁত ধরতে ও শাস্তি প্রদান করতে ব্যস্ত থাকত। সেযুগে আমাদের দেশের পুরুষ গর্ব করে বলত: রান্নাঘরে একটা মোটা লাঠি রাখা থাকে, মারারও দরকার পড়ে না। লাঠিখানা দেখলেই মারের ভয়ে বউয়ের রান্নার সোয়াদ আসে ঠিকমতো। আবার ইংরেজিতে ‘থাম্ব রুল’ কথাটি এসেছে কেমন করে? বুড়ো আঙুলের মতো পরিধি যে লাঠির, তেমন লাঠি দিয়ে বউ পেটানো ছিল স্বীকৃত, ‘স্বাভাবিক’।

    সেই অতীতে ফিরে যাতে না যেতে হয়, তার জন্য রাষ্ট্রকে গৃহহিংসা থামানোর জন্য উদ্যোগী হতে হবে তো বটেই। কিন্তু সবকিছু আইন করে হয় না। মধ্যবিত্ত বাড়িতে কাজের লোকের ছুটি এখন। এমতাবস্থায় নারীদের উপর কাজের চাপ বেড়েছে। আইনত পুরুষদের বাসন মাজতে বাধ্য করা যায় না, সেজন্য চাই সচেতনতা আর সংবেদনশীলতা। না, বাসন মাজতে গররাজি প্রত্যেক পুরুষই বউ পেটান না৷ কিন্তু কোথাও না কোথাও তারা সংবেদনের অভাবে ভোগেন, যে অসংবেদনশীলতা থেকে ‘বউ জোক’-ও সৃষ্ট হয়। সেই অসংবেদনশীলতার চরমতম রূপ হল শারীরিক হিংসা। জেন্ডার রোলস বা লিঙ্গভূমিকা যে বাড়িতে যত কঠোর, সেখানে শারীরিক-মানসিক-যৌন, নানা পদ্ধতিতে গৃহহিংসার সম্ভাবনাও তত প্রবল।

    সুতরাং ‘লকডাউনে বউয়ের সঙ্গে দিনভর থাকব কী করে?’ নামক ‘রসিকতা’-টি হল একটি নির্যাতনের পিরামিডের ভূমি, যার শীর্ষবিন্দু হল নির্মম গৃহহিংসা। ঠিক যেমন রেপ জোক হল রেপ কালচার নামক পিরামিডের বেস, যার শীর্ষবিন্দু হল ধর্ষণ। এই যে মনস্তাত্ত্বিকরা বারবার বলছেন, ‘বহির্মুখী পুরুষ’ বাড়িতে থাকতে বাধ্য হওয়ায় হতাশায় ও ক্রোধে এমন মারধর করছেন, সত্যি যদি তাই হয়, তবে তাতে ‘সারাটা দিন বউয়ের সঙ্গে থাকব কী করে?’ রসিকতারই রেশ মিশে নেই কি?

    ***
    তা হলে কী করা যায়? প্রাথমিকভাবে গৃহহিংসা বিষয়ে কিছু ভ্রান্তি দূর করতে হবে। যেমন, গৃহহিংসা ‘ছোটলোকদের ছোটোলোকামি’ নয়। উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত বাড়িতেও তা আকছার ঘটে। আবার, তা ব্যক্তিগত ব্যাপারও নয়, বরং ক্রিমিনাল অফেন্স। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: কোনও মহিলা যেকোনও সময়ে, যেকোনও পরিস্থিতিতে গার্হস্থ্য অত্যাচারের কথা বললে, প্রাথমিকভাবে তাকে বিশ্বাস করতে হবে। ‘আগে বলোনি তো?’ জাতীয় প্রশ্ন না করেই বিশ্বাস করতে হবে। এই প্রাথমিক বোধগুলি থাকলে, তবেই তো গৃহহিংসায় নির্যাতিতদের জন্য পরিষেবাকে লকডাউনের কালে ‘জরুরি পরিষেবা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে!

    দু’-তিনজন বর্তমান লেখকের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন মেসেঞ্জারে, নিজের বা আত্মীয়ার অবস্থা জানাতে। পুলিস লক-ডাউন বাস্তবায়িত করতে ব্যস্ত আছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার অফিসগুলো বন্ধ স্বাভাবিক কারণেই। এরা কার কাছে যাবেন? গৃহহিংসা নিয়ে কাজ করে, কলকাতার এমন এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল। তাদের প্রধান সংস্থাটির নিজস্ব কিছু হেল্পলাইনের ব্যবস্থা করলেন।

    অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা যখন বলেছিলেন, ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এভাবেই চলতে দিলে পৃথিবীর আয়ু আর মেরেকেটে একত্রিশ-বত্রিশ বছর, তখন অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছিলেন, এই যে নারীদের, ট্রান্সদের, দরিদ্রদের, সর্বহারাদের আলাদা আলাদা যে রাজনীতি– তা এই পরিস্থিতিতে মুলতুবি রেখে, বা ফোকাসের বাইরে রেখে, সবাই পৃথিবীকে সুরক্ষিত করতে তৎপর হই না কেন? তখনও বলেছিলাম, আজ প্রজাতির আর এক সঙ্কটকালেও বলতে হচ্ছে, খুব ভাল হত, সার্বিকভাবে শুধু প্রজাতিকে বাঁচানোর কাজটা করতে পারলে, কিন্তু ডুমস-ডে-র আগের দিনও কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হবে৷ কেউ না কেউ বরের হাতে মার খাবে। তাই প্রান্তিকদের সেই তথাকথিত ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ সমস্যাগুলির কথা সরকার ও জনসাধারণকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, কী আর করা!

    (শতাব্দী দাশ প্রাবন্ধিক ও গল্পকার।মতামত লেখকের নিজস্ব।)

    আরও পড়ুন… ন্যায্য মুখরতার নামই নারীবাদ: একটি ‘ছু-মন্তর’ বিষয়ক সংলাপ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More