করোনার আবহে একুশের উত্তাপ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দেবত্র দে

    এই ঘোর মহামারীতেও এ রাজ্যে একুশের বিধানসভার উত্তাপ এখন থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছে। রাজনীতির নানা ছক, নিত্য নতুন সমীকরণ, দলবদল এসবের একটাই উপলক্ষ: আগামী বিধানসভা নির্বাচন। সম্ভবত এ রাজ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই নির্বাচন সব দিক থেকেই সবচেয়ে টানটান থাকবে। কারণ সব দলই উজাড় করে দেবে নিজের সামর্থ।

    ‘১১ সালে পালাবদল একপ্রকার নিশ্চিত ছিল। ২০০৮-এর পঞ্চায়েত থেকে সেইসময় বামেদের জনভিত্তিতে যে ভাটা শুরু হয়েছিল, বিধানসভা নির্বাচনে সাড়ে তিন দশকের রাজত্ব হারানো ছিল এই অধ্যায়ের চূড়ান্ত পরিণতি। এবারের পরিস্থিতি কিন্তু গুণগত ভাবে জটিলতর। সবমিলিয়ে হয়তো এক রোমহর্ষক রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে বাংলা।

    রাজ্য প্রশাসন করোনার সঙ্গে দু’মাস যুদ্ধ করার মধ্যেই আমফানের হামলা। যদিও উমফান মূলত বিপর্যস্ত করেছিল কলকাতাকেন্দ্রিক চার-পাঁচটি জেলাকে। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুই চব্বিশ পরগনা ও কলকাতা। কিন্তু এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে গোটা রাজ্য জুড়েই। উমফান পরবর্তী রাজনৈতিক তরজায় রাজ্যের শাসক দল যে আতান্তরে পড়েছে ‘দিদিকে বলো’ দিয়ে তার মোকাবিলা করা গেল না। ফলে দলের ভিতরকার রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব অনেকটাই বেআব্রু হয়ে গেল।

    তার উপর সুশান্ত সিং রাজপুতের মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে ‘স্বজনপোষণ’ এক নতুন মাত্রা পেল এই সময়ে। অনুমান করা যায়, এটাই হয়তো শাসক দলের অন্দরে সাম্প্রতিক টালমাটালের মূল কারণ। এই প্রজন্ম সম্ভবত রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকার প্রবল ভাবে অপছন্দ করছে। যে কারণেই হয়তো জাতীয় কংগ্রেস গত দুটো সাধারণ নির্বাচনে বিরোধী দলনেতার পদ পাওয়ার মত আসনও পেল না। রাজ্যের শাসক দল যত দ্রুত এই সত্য অনুধাবন করবে তাদের ভবিষ্যতের পক্ষে ততই মঙ্গল।

    একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সারা দেশেই কিন্তু এই পরিবারকেন্দ্রিক দলগুলো একই অসুখে ভুগছে। যে দেশে এই মুহূর্তে অল্পবয়সিদের জনসংখ্যার আধিপত্য রয়েছে, সে দেশ কখনও সামন্ততান্ত্রিক এই ধারাকে অনুসরণ করবে না কারণ নবীনরাই তো নবযৌবনেরই দূত।

    এখনও অবধি এটুকু আভাস পাওয়া যাচ্ছে, লড়াই হবে ত্রিমুখী। লোকসভা নির্বাচনে ১৮টি আসন পাওয়া ভারতীয় জনতা পার্টি সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপাবে বাংলার মসনদ দখল করতে। কিন্তু সে পথে অসংখ্য কাঁটা ছড়ানো। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এরাজ্যে ২১টি আসন পেয়ে পরবর্তী দু’বছরের জন্য তৎকালীন শাসক বামেদের প্রায় নিভৃতবাসে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বামেরা ২০১০ সালের পৌর নির্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়ে। তার দশ বছর পরের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তৃণমূলের চেয়ে মাত্র তিনটি আসন কম পেয়েও গত এক বছরে রাজ্যে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু কর্মসূচি নিলেও তা দাগ কাটার মতো নয়। বিজেপি যে ভোট পেয়েছিল তা মূলত তৃণমূল বিরোধী নেগেটিভ ভোট, এই নেগেটিভ ভোটকে পজিটিভ ভোটে রূপান্তরিত করার নামই রাজনীতি।

    রাজ্যের বর্তমান শাসকদল এটা অনুধাবন করেই সম্ভবত ক্ষমতায় এসে বহু নতুন ধরনের প্রকল্পের সূচনা করে। যেমন কন্যাশ্রী বা সবুজসাথী, যা তাদের জনভিত্তিকে সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যদিও বিরোধীদের নানা অভিযোগ আছে এসব নিয়ে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বাভাবিক। কিন্তু রাজ্যের বর্তমান শাসক দল ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে এর লাভের কড়ি পেয়েছিল।

    স্মরণে থাকতে পারে, আজ থেকে চার দশক আগে বামেরাও কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধতা থেকেই ক্ষমতায় এসেছিল। সে অর্থে ১৯৭৭ সালে তাদের কোন ক্রেডিবিলিটি ছিল না। কিন্তু অপারেশন বর্গা ও পঞ্চায়েত গঠন করে সেই গুড় তারা খেয়েছিল পরবর্তী তিন দশক জুড়ে।

    বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় নেই, এটা সত্য। ফলে তাদের হাত পা অনেকটাই বাঁধা। কিন্তু তাদের কর্মসূচিতে বিকল্পের দিশা কোথায়? তাদের সাফল্য তো পুরোটাই নির্ভর করতে হচ্ছে অন্য দলগুলোকে কতটা ভাঙানো যায় তার ওপর। যে মানুষ বর্তমান শাসক দলের ওপর বিরক্ত হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, যদি সেই দল থেকেই নেতা ভাঙানো হয়, তা কি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা নয়? আর এটাই এ রাজ্যে বিজেপির অগ্রগমনের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ও অন্তরায়।

    এবার তৃতীয় পক্ষ রইল বাম ও কংগ্রেসের জোট। করোনা ও আমফানের সময়কালে সারা রাজ্য জুড়ে বাম ছাত্র যুবদের ধারাবাহিক উজ্জীবিত উপস্থিতি বিশেষত আর্ত মানুষের কাছে তৈরি খাবার পৌঁছে দেওয়া থেকে রক্তদান– এই সব কর্মকাণ্ড বাম দলগুলোকে নিশ্চিত ভাবে বাড়তি অক্সিজেন দেবে। পুরনো মুখের বদলে সামাজিক মাধ্যমে সড়গড় এই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বা এলাকায় রাজনীতি করা এই যুবদের উদ্যোগকে ভোটের বাক্সে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর।

    প্রশ্ন হল, রাজ্যে প্রধান বিরোধী হওয়ার লড়াইয়ে এই জোট কতটা আন্তরিক? এক বছর আগের লোকসভা নির্বাচনে বাম ও কংগ্রেস দু’দলই আলাদা হয়ে লড়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তবে এই জোটের ভোট পাওয়ার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে রাজ্যে একুশ সালে পালাবদল হবে কিনা। নিজেদের ছেড়ে যাওয়া সমর্থকদের ‘ঘর ওয়াপসি’ ঘটিয়ে বামেরা কি তাদের আদর্শের একদম বিপ্রতীপে থাকা একটি দলকে রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়া থেকে বিরত রেখে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে? বামেরা যদি তা পারে তা হলে নির্বাচনে আসন কম পেলেও তা হবে গৌরবের।

    এই সার্বিক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হবে একুশের বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে বিহারের ফলাফল খানিকটা হলেও প্রভাব ফেলবে এ রাজ্যের একটা ভাল অংশের ভোটারদের মধ্যে। বাড়তে পারে রাজনৈতিক হিংসাও। আর যারা সরকার গড়ার কারিগর, সেই আমজনতা সব হিসেব রাখছেন তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। তাঁরা সেসব মিলিয়ে দেখবেন ইভিএম মেশিনে বোতাম টেপার আগে।

    সেই জনতা জনার্দনের মনের কাছাকাছি যে দল পৌঁছতে পারবে সে-ই কিন্তু দৌড়ে সবার আগে দড়ি ছোঁবে।

    (মতামত লেখকের নিজস্ব। লেখক বগুলা’র শ্রীকৃষ্ণ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক।)

    আরও পড়ুন: এ রাজ্যে বামেদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More