বিজ্ঞানচেতনার আলোকে রবীন্দ্রনাথ

উনিশ শতকের মনীষীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের ত্রিবেণী সঙ্গমের একজন তীর্থপথিক।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

নিশীথ কুমার দাশ

কালের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যের মুক্তাঙ্গনে চিরভাস্বর হয়ে বিরাজমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর অন্তর্নিহিত জীবনবোধ বহুমাত্রিক এবং পরিবর্তনশীল ভাবনার তরঙ্গে প্রবহমান। ‘ডিফেন্স অব ননসেন্স’ প্রবন্ধে চেস্টারসন লিখছেন, নিছক কলাকৈবল্যের ওপর নির্ভরশীল শিল্পকর্ম কালজয়ী হতে পারে না। যেকোনও চিরকালীন সাহিত্যের পিছনে থাকে স্রষ্টার এক গভীর জীবনদর্শন। কবিগুরুর অনন্য জীবনবোধ উন্মোচিত হয় ভাববাদী দর্শন, সৃজনশীল শিল্পীসত্ত্বা ও বিজ্ঞানমানসের মিলনভূমির আঙিনায়। তাঁর জীবনগাথা অনুধাবন করলে দেখা যায় সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, কৃষির মতো নানা বিষয়ে তাঁর অমিত কৌতূহল এবং উদ্দীপ্ত স্বপ্ন অবাধ্য হয়ে উঠেছে। তাঁর চিরন্তন রচনার আলোকিত আধারে তিনি কবি, প্রেমিক, সঙ্গীতকার, দার্শনিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক এবং ছোটগল্পের পথিকৃৎ। এরই পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিজ্ঞানাশ্রয়ী সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে অভিনব অভিযাত্রার অগ্রপথিক। সাহিত্যজগতের মানুষ হলেও বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর বিস্ময়কর ঝোঁক তাঁকে আশৈশব বিজ্ঞানের নির্যাসসংগ্রহে আবিষ্ট করে রাখে। তাঁর অমর সৃষ্টির ব্যঞ্জনায় আমরা অনুধাবন করেছি বিজ্ঞান শিক্ষা আর বিজ্ঞানচেতনা পরস্পরের সহগামী হওয়া আবশ্যক নয়। বিজ্ঞানচেতনা বা বিজ্ঞানমনস্কতা বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে একটা সৃজনশীল যুক্তিনিষ্ঠ মনোবৃত্তি তৈরি করে, যার জন্য বিজ্ঞান শিক্ষা অপরিহার্য নয়। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমি বিজ্ঞানের সাধক নই সেকথা বলা বাহুল্য। কিন্তু বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে আমার লোভের অন্ত ছিল না।’
প্রচলিত ধারণায় সাহিত্য ও বিজ্ঞান স্বতন্ত্র দু’টি বিষয়, যারা দুই মেরুতে অবস্থান করে। সাহিত্যে আছে কল্পনার আদিগন্ত প্রান্তর, মননের প্রকাশ। আর বিজ্ঞানের শাণিত ভূমিতে আছে যুক্তি ও প্রমাণের বিশ্বস্ততা। বিজ্ঞানীদের মতো কবিরাও সত্যের অনুসন্ধানেই লিপ্ত থাকেন। কাব্য ও সাহিত্যজগতের মানুষজন সমাজসচেতন সত্ত্বা নিয়ে জীবন ও জগতের সত্যকে চেতনার রঙে রাঙিয়ে সৃষ্টি করেন অমরকাব্য। অপরদিকে বিজ্ঞানীরা এই বিশ্বচরাচরে যাবতীয় চেতন ও অচেতন বস্তু ও ঘটনাপ্রবাহের অন্তরালে কার্যকারণ সম্পর্ক অন্বেষণে রত হন। এভাবেই সাহিত্য ও বিজ্ঞান উভয়েই হয়ে ওঠে সত্যান্বেষী, সাহিত্যের মাধুর্য ও পরমসত্য হয়ে ওঠে সম্পূরক বিষয়। সেই বিশ্বাস স্বীকৃতি পায় কবির লেখনীতে যেখানে দর্শন, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মূলভাবনা একই পটভূমি থেকে উৎসারিত হয়। এই প্রসঙ্গে জগদীশচন্দ্র বসুর ‘অব্যক্ত’ কাব্যগ্রন্থের একটি উক্তি বিশেষ অর্থবহ, ‘কবি এই বিশ্বজগতে তাঁহার হৃদয়ের দৃষ্টি দিয়া একটি অরূপকে দেখিতে পান, তাহাকেই তিনি রূপের মধ্যে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করেন। অন্যের দেখা যেখানে ফুরাইয়া যায় সেখানেও তাঁহার ভাবের দৃষ্টি অবরুদ্ধ হয় না। সেই অপরূপ ভাবনার বার্তা তাঁহার কাব্যের ছন্দে ছন্দে নানা আভাষে অনুরণিত হইতে থাকে। বৈজ্ঞানিকের পন্থা স্বতন্ত্র হইতে পারে, তবুও কবিত্ব সাধনার সহিত তাঁহার সাধনার ঐক্য আছে। দৃষ্টির আলোক যেখানে শেষ হইয়া যায়, সেখানেও তিনি আলোকের অনুসরণ করিতে থাকেন, শ্রুতির শক্তি যেখানে সুরের শেষ সীমায় পৌঁছায় সেখান হইতেও তিনি কম্পমান বাণী আহরণ করিয়া আনেন।’

রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক পরিসর এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ছিল তাঁর বিজ্ঞানচেতনার উন্মেষের উৎসস্থল। তাঁদের পরিবার ধর্মবোধ আর উপনিষদীয় জীবনধারায় আচ্ছন্ন হলেও বিজ্ঞানচর্চার একটা উদার পরিমণ্ডল সেখানে বিরাজমান ছিল। বাল্যবয়সে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার মুখ্যবিষয় ছিল উপনিষদ ও বিজ্ঞান। বালক রবীন্দ্রনাথের পাঠ্যতালিকায় স্থান পেয়েছিল অক্ষয় দত্তের ‘চারুপাঠ’ ও ‘পদার্থবিদ্যা’ এবং সাতকড়ি দত্তের ‘প্রাণীবৃত্তান্ত’। ‘জীবনস্মৃতি’ থেকে জানা যায়, সপ্তাহে একদিন রবিবার সীতানাথ দত্ত মহাশয় এসে যন্ত্রতন্ত্রযোগে তাঁকে প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষা দিতেন। সেই শিক্ষাটি কবির কাছে বিশেষ ঔৎসুক্যজনক ছিল। যে রবিবার সকালে তিনি আসতেন না, সে রবিবার তাঁর কাছে রবিবার বলেই মনে হত না। এছাড়া মানবদেহের বৈজ্ঞানিক পাঠ নেবার জন্য তাঁকে মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে লাশকাটার আদ্যোপান্তও দেখতে যেতে হত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ জ্যোতির্বিজ্ঞানে সুপণ্ডিত ছিলেন, দ্বিজেন্দ্রনাথ মৌলিক গণিতচর্চা ও জ্যামিতি নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেন, এছাড়াও জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রাণীবিজ্ঞানে বুৎপত্তিও আমাদের অজানা নয়। আমরা জানতে পারি, ডালহৌসি বেড়াতে গিয়ে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রহনক্ষত্রদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় করিয়ে দিতেন।
পিতার কাছে জ্যোতির্বিদ্যার সহজপাঠই কবিকে বিজ্ঞানের প্রবন্ধ লিখতে উৎসাহিত করে। সেই বিজ্ঞানচর্চার সূত্র ধরে মাত্র বারো বছর বয়সে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হল গদ্য রচনা, ‘গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি’। সেই শুরু হল সাহিত্যের জগতে নতুন দিশার সন্ধানে পথচলা।

রবীন্দ্রনাথের কিশোর বয়সে অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় ‘বালক’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। সেই পত্রিকায় ছোটদের উপযোগী করে জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ভূ-বিদ্যা, প্রাকৃতিক ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার ভার ছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। একুশ বছর বয়সে সদর স্ট্রিটের বাড়িতে থাকার সময় বিজ্ঞান পড়বার জন্য কবির সবিশেষ উৎসাহ জাগরিত হয়েছিল। তখন তিনি হাক্সলির রচনা থেকে জীবতত্ত্ব এবং লকইয়ার, নিউকোম্বের মতো লেখকের গ্রন্থ থেকে জ্যোতির্বিদ্যা নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করতেন। ফলস্বরূপ বিজ্ঞানের বিস্ময়কর রহস্য অনুসন্ধানের অদম্য আগ্রহ তাঁর সৃজনশীলতাকে দিয়েছে এক দুর্লভ প্রাণশক্তি, বিজ্ঞানের আবহে সম্পৃক্ত হয়েছে তাঁর রচনাসম্ভার। কবি অনুভব করেছিলেন যে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও গতিশীলতার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা যাই থাকুক না কেন, তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও আছে। অসীম শূন্যে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র, সূর্য-তারার সমাবেশ কালে কালান্তরে আবর্তিত হয়ে চলেছে নীরবে এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায়। তাঁর অন্তরে এই বোধ ক্রমে দৃঢ় হতে লাগল যেন কোনও অনন্ত তেজোময় পুরুষ আকাশের গ্রহনক্ষত্রগুলোকে পরিচালিত করে চলেছেন। সেই অনুভূতি বিকশিত হয় কবিতায়, তিনি লেখেন, ‘দেখিলাম চাহি, শত শত নির্বাপিত নক্ষত্রের নেপথ্য প্রাঙ্গণে– নটরাজ নিস্তব্ধ একাকী।’ কবির কল্পনাজগতের সেই অশেষ শক্তির অধিকারী নটরাজ, বিজ্ঞানের পরিভাষায় মাধ্যাকর্ষণ বল হিসেবে আখ্যায়িত হয়। সেই বলের প্রভাব গ্রহ-তারা, সৌরজগৎ এমনকি নীহারিকাগুলোকেও নিজ নিজ স্থানে আবর্তিত হতে বাধ্য করে।

বিজ্ঞানের ঊষালগ্ন থেকে বিশ্বসৃষ্টির বিস্তৃত রহস্যজাল উন্মোচনের অভিপ্রায়ে বিজ্ঞানীদের সাধনার অন্ত নেই। সেই উৎসের সন্ধানে প্রচলিত মহাবিস্ফোরণ (বিগব্যাং) তত্ত্ব অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও মহাবিশ্বে বিরাজমান অনেক বস্তু এবং ঘটমান ঘটনাবলির উৎসমুখের সন্ধান এখনও অধরা। অনেকে এই তত্ত্বকে আলাদিনের প্রদীপ হিসেবে দেখাতে চাইলেও কেন এই বিস্ফোরণ ঘটেছিল কিংবা শূন্য থেকে কীভাবে একটা মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতে পারে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। এই অজানা উৎসের ভাবাবেশে কবি লিখেছেন, ‘প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল সত্ত্বার নূতন আবির্ভাবে– কে তুমি, মেলেনি উত্তর…’। গবেষণায় জানা যায়, মহাকাশে বিদ্যমান কৃষ্ণগহ্বর একটি তারাকে গ্রাস করার সময় আলোকরশ্মি নির্গত হয়, সৃষ্টি হয় অভিঘাত তরঙ্গের। সেই তরঙ্গ বিচ্ছুরিত করে তিমির শক্তি। এই অনামিক অনুভূতির আবেশে কবি গেয়ে ওঠেন, ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো’। সাহিত্য-কাব্যের পাতায় পাতায় এরকম অজস্র বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে রবীন্দ্রনাথ কবিতায়, গানে ও সাহিত্যের আধারে নবকলেবরে পরিবেশন করেছেন। তদুপরি কবিগুরুর ‘বলাকা’ কাব্যে যে সৃজনশীল বিবর্তনবাদ উপস্থিত হয়েছে তাকে কেউ কেউ স্পেনসার-ডারউইনের বিবর্তনবাদের আলোকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। সাহিত্য সমালোচকরা মনে করেন, কবিতার নান্দনিকতা ও সৌন্দর্য্য খর্ব না করেও বিজ্ঞানের বিষয় অবলম্বন করে এমন কবিতা রচনা বোধহয় কবির পক্ষেই সম্ভব। ঘটনাক্রমে রবীন্দ্রনাথের সমকালীন সময়টা ছিল বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। একই সময়ের আধুনিক বিজ্ঞানের যুগান্তকারী আবিষ্কার ও উদ্ভাবনসমূহ কবিমনকে আন্দোলিত করে তোলে। তিনি নিজে বৈজ্ঞানিক ছিলেন না ঠিকই, তবুও তাঁর বিজ্ঞানসচেতন মন তাঁকে বহু স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিকের সান্নিধ্য এনে দিয়েছিল। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু, আজীবন সুহৃদ। ১৯০১ সালে বঙ্গদর্শন-এর আষাঢ় সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘আচার্য জগদীশের জয়বার্তা’ নামে একটি প্রবন্ধ। শ্রাবণ সংখ্যায় জগদীশচন্দ্রের কাজের ওপর ভিত্তি করে রচনা করেন আরও একটি প্রবন্ধ ‘জড় কি সজীব?’ এই প্রবন্ধটি প্রসঙ্গে তিনি জগদীশচন্দ্র বসুকে লিখলেন– ‘তোমার নব আবিষ্কার সম্বন্ধে আমি একটি প্রবন্ধ লিখিয়াছি, …ভুলচুক থাকিবার সম্ভাবনা আছে– দেখিয়া তুমি মনে মনে হাসিবে।’ এর উত্তরে জগদীশচন্দ্র লিখলেন, ‘তুমি যে গত মাসে আমার কার্যের আভাস বঙ্গদর্শনে লিখিয়াছিলে তাহা অতি সুন্দর হইয়াছে। তুমি যে এত সহজে বৈজ্ঞানিক সত্য স্থির রাখিয়া লিখিতে পার, ইহাতে আমি আশ্চর্য হইয়াছি।’ তাঁর লেখনীতে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সাহিত্যের ভাষায় ভূষিত হল। ১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু তাঁর স্বপ্নে লালিত ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন। সে প্রসঙ্গে কবিকে বলতে শুনি– ‘এ তো তোমার একার সংকল্প নয়, এ আমাদের সমস্ত দেশের সংকল্প, তোমার জীবনের মধ্যে দিয়ে এর বিকাশ হতে চলল।’

তাঁদের বন্ধুত্বের গভীর মহানুভবতা উপলব্ধি করা যায় যখন দেখি জগদীশচন্দ্রের গবেষণার কাজে সহায়তা করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য যোগাড় করে দেন। খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সঙ্গে কবির একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়। জীবনদর্শন, সাহিত্য, সঙ্গীত ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ চলাকালীন রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতার বিস্তৃতি আইনস্টাইনকে বিস্মিত করে।
আইনস্টাইনের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপচারিতায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে আপেক্ষিকতাবাদ বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। সেই আপেক্ষিকতাবাদের মূলভাব ফুটে উঠেছে শেষের কবিতায় অমিত ও লাবণ্যর কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। লাবণ্য বলছে, ‘সহজ নয়, সময় লাগবে’, যার উত্তরে অমিত জানায়, ‘সময়টা সকলের সমান লাগা উচিত নয়। একঘড়ি বলে কোনও পদার্থ নেই, ট্যাঁক ঘড়ি আছে, ট্যাঁক অনুসারে তার চাল। আইনস্টাইনের তাই মত।’ এইভাবে আপেক্ষিকতাবাদের ধারণাকে সাহিত্যের আঙ্গিকে অনায়াসভাবে প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ করা যায় যে বিজ্ঞানে ব্যবহৃত রেফারেন্স ফ্রেম বা প্রসঙ্গ কাঠামোকে এখানে তিনি কাব্যসৃষ্টির প্রয়োজনে ট্যাঁক হিসেবে অভিহিত করেছেন। ১৯৩১ সালে একসময় প্রথিতযশা বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উদ্দেশ করে ‘কাব্য ও বিজ্ঞান’ প্রবন্ধে লিখলেন– ‘বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকে কবির প্রতি আমাদের একটি অনুযোগ আছে। কবি তাহার অতুলনীয় শক্তি বিজ্ঞানের স্বরূপ প্রকাশে কখনও নিযুক্ত করেন নাই। …তাহার সঙ্গীত তাঁহার কণ্ঠে আজও বাজে নাই। আমরা আশা করি তাঁহার প্রতিভাধর পূর্বপুরুষ গ্যেটের মত রবীন্দ্রনাথও বিজ্ঞানের প্রতি মনোযোগী হইবেন এবং তুলনাহীন কাব্যে এই দ্বন্দ্বমুখর পৃথিবীর বর্তমান নৈরাশ্য ভেদ করিয়া মিলন, আশা ও আনন্দের বাণী সোচ্চার হইবে।’ পরিতোষের বিষয় যে, রবীন্দ্রনাথ মেঘনাদ সাহাকে হতাশ করেননি। সত্তর বছর বয়সে তিনি তাঁর ভাববাদী ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত হয়ে বিজ্ঞানের জয়গান গেয়ে গেলেন। তিনি লিখলেন– ‘আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর বিশুদ্ধ আধুনিকতাটা কি, তাহলে আমি বলব বিশ্বকে আসক্ত ভাবে না দেখে বিশ্বকে নির্বিকার তদগতভাবে দেখা। এই দেখাটাই বিশুদ্ধ, এই মোহমুক্ত দেখাতেই খাঁটি আনন্দ। আধুনিক বিজ্ঞান যে নিরাসক্ত চিত্তে বাস্তবতাকে বিশ্লেষণ করে, সমসাময়িক কাব্য সেই নিরাসক্ত চিত্তে বিশ্বকে দেখবে, এইটেই শাশ্বতভাবে আধুনিক।’ ছিয়াত্তর বছর বয়সে রচনা করলেন বিজ্ঞান বিষয়ক অনবদ্য গ্রন্থ ‘বিশ্ব পরিচয়’। যা আজও বিজ্ঞান আশ্রিত সাহিত্যের অমূল্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। বইটি পরমাণুলোক, নক্ষত্রলোক, সৌরজগৎ, গ্রহলোক, ভূলোকের মতো বিজ্ঞানের বিস্তীর্ণ পরিসরে আবর্তিত হয়েছে। সেটি তিনি সমাদৃত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু মহাশয়কে উৎসর্গ করেন। এরই পাশাপাশি তিনি শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থপাঠ, প্রবন্ধ রচনা অথবা বিজ্ঞানের তথ্য থেকে কাব্যে উপাদান সংগ্রহ করার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মানবজাতির জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিজ্ঞান যে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা নিতে পারে তা তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। সাধারণ মানুষের বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার অভিপ্রায়ে শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞান অবশ্যপাঠ্য হিসেবে রাখেন এবং ল্যাবরেটরিও তৈরি করিয়ে দেন। রাশিবিজ্ঞানের অপরিহার্যতার কথা ভেবে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার জন্য বন্ধু প্রশানর্তচন্দ্র মহলানবিশকে অনুপ্রাণিত করেন। ১৯৩১ সালে স্থাপিত হয় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউট। বস্তুত তাঁর বিজ্ঞানভাবনা দ্বিমুখী ধারায় প্রবাহিত হয়। একদিকে বিজ্ঞানের তথ্যনির্ভর চিত্তগ্রাহী সাহিত্যসৃষ্টি, অন্যদিকে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, প্রচার এবং প্রসারে সবিশেষ গুরুত্ব প্রদান। আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে তাঁকে বলতে শোনা যায় নতুন নতুন বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে প্রতিদিনের কার্যসমূহের সেতুবন্ধন না হলে জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে পড়ব। সেই ভাবনার ছায়া দেখা যায় যখন ইউরোপীয় দেশগুলোতে ভ্রমণ শেষ করে দেশে ফিরে কবি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘বিজ্ঞান চর্চার দেশে জ্ঞানের টুকরো জিনিসগুলো কেবলই ঝরে ঝরে ছড়িয়ে আছে। তাতে চিত্তভূমিতে বৈজ্ঞানিক উর্বরতার জীবধর্ম জেগে উঠতে থাকে। তারই অভাবে আমাদের মন আছে অবৈজ্ঞানিক হয়ে। এই দৈন্য কেবল বিদ্যার বিভাগে নয়, কাজের ক্ষেত্রে আমাদের অকৃতকার্য করে রাখছে।’ তাঁর এই বিশ্বাস থেকে তিনি রচনা করেছেন উন্নয়নমুখী বিজ্ঞান সাহিত্য, তাঁর লেখনীতে ধরা পড়েছে সমকালীন বিজ্ঞান শিক্ষার সমস্যা ও গুরুত্ব। সেই ভাবধারায় রচিত ‘পল্লী উন্নয়ন’ কাব্যগ্রন্থে কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে লেখা তাঁর আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতার স্বাক্ষর বহন করে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, উনিশ শতকের প্রথম দিকে মার্কিনি নাগরিক মার্গারেট স্যাঙ্গার ছিলেন দুনিয়াজুড়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের পথপ্রদর্শক। সমর্থন লাভের আশায় তিনি গান্ধীজি এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একাধিকবার এ বিষয়ে বাক্যালাপ এবং পত্রালাপ করেন। প্রামাণ্য নথি (১৯৩৫) থেকে জানা যায় রবীন্দ্রনাথ সহমত পোষণ করে স্যাঙ্গারকে লেখেন– ‘ভারতের মতো ক্ষুধায় জর্জরিত দেশে যথাযথভাবে যত্ন নেওয়ার চেয়ে আরও বেশি বাচ্চাকে অস্তিত্বে আনা নিষ্ঠুর অপরাধ, যা তাদের প্রতি অফুরন্ত দুর্ভোগ সৃষ্টি করে এবং পুরো পরিবারকে একটি অবনমিত শর্ত চাপিয়ে দেয়।’

আমাদের বিস্ময় জাগে যে, সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নিরিখে দরিদ্র দেশের উন্নতিবিধানে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ যে একটি অতিপ্রয়োজনীয় শর্ত রবীন্দ্রনাথের তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। সহজেই অনুমেয় এই ভাবনা তাঁর বিজ্ঞানসম্মত বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে উৎসারিত হয়েছিল। বলতে গেলে সেই অভিমত আজও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন সমাজ-সংসারে প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি এবং প্রগতির জন্য জনমানসে বিজ্ঞানচেতনার কোনও বিকল্প নেই। এই চেতনার অভাবের কারণেই মানুষ দীন-হীন হয়ে থাকে, নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়। সেজন্য ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ ছিল যে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের যেমন মানবিক তথা শিল্পসংস্কৃতির বিষয়সমূহ সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে, সমভাবে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদেরও বিজ্ঞান সম্পর্কে একটা ধারণা থাকা দরকার। তবেই কেবল আমাদের দেশে আগামী দিনে যোগ্য, দক্ষ, রুচিশীল ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ তৈরি হবে।

পরিশেষে বলা যায় যে, উনিশ শতকের মনীষীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের ত্রিবেণী সঙ্গমের একজন তীর্থপথিক। বিজ্ঞানের নানা খুঁটিনাটি বিষয় তাঁর অভাবিত কল্পনাশক্তি এবং শৈল্পিক দক্ষতার গুণে কবিতায় ও সঙ্গীতে সমুন্নত মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতার দীপ্ত প্রভায় সৃজিত সাহিত্যের ডালি ঋদ্ধ করেছে আমাদের মননকে, প্রসারিত করেছে চেতনার অঙ্গনকে। কবির বিজ্ঞানচেতনায় আলোকিত হয়েছে সাহিত্যের নন্দনকানন, সেখানে গড়ে উঠেছে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের সার্থক মিতালি। বিজ্ঞানের উপাদান ও সাহিত্যের অনুপম কাব্যসুষমায় প্রস্ফুটিত হয়েছে নিরুপম কালজয়ী সঙ্গীত, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ ও ছোটগল্পের মতো সুরভিত পুষ্পরাজি। সেই বিবর্তনের স্রোত প্রবাহিত হয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের কবি ও সাহিত্যিকদের বোধে ও বিশ্বাসে, ভাবে ও ভাবনায়। আশা করা যায়, কবির সেই সৃজনশীল সাহিত্য ও বিজ্ঞানমনস্কতার অভিজ্ঞান মানবজাতির জীবনে অমলিন আলোকবর্তিকা হয়ে যুগ যুগান্তর বিরাজ করবে। হৃদয়ে মুখরিত হবে সেই অনামিক অনুভবের অনুরণন– ‘আকাশ জুড়ে শুনিনু ওই বাজে, তোমারি নাম সকল তারার মাঝে।’

(লেখক বিজ্ঞানী, পরমাণু শক্তি বিভাগ।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More