চোখের সামনে মৃত্যুপুরী হতে দেখলাম ইতালিকে, ভারতের কিন্তু এখনও সুযোগ আছে

জানা দরকার, বিশ্বের বাকি দেশগুলোর করোনা-মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদের ঠিক-ভুল থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দীপাঞ্জন ভট্টাচার্য

    বিগত ১০ দিন আমি ইতালির মিলান শহরে গৃহবন্দি। করোনাভাইরাসের ভয়াবহ আক্রমণের অন্যতম শিকার ইতালি। গোটা দেশটা এখন লক-ডাউন। ইন্টারনেটের দৌলতে আজকে সারা বিশ্বেই চিন, ইতালি-সহ সমস্ত দেশের প্রতিদিনের করোনা-তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে হু হু করে। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে মিশে যাচ্ছে গুজব। সাধারণ মানুষের পক্ষে যা আলাদা করা কার্যত অসম্ভব।

    গত বছরের শেষে যখন চিনে প্রথম করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে, তখন বাদবাকি বিশ্বে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। কিন্তু তার প্রায় ২-৩ মাস পরে যখন কয়েকটি দেশ হয়ে ভারতেও করোনা এসে পৌঁছে গেল, সেখানে বোঝা দরকার, আমরা ঠিক কোন জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছি। জানা দরকার, বিশ্বের বাকি দেশগুলোর করোনা-মোকাবিলার ক্ষেত্রে তাদের ঠিক-ভুল থেকে আমরা কী শিক্ষা নিতে পারি।

    আন্তর্জাতিক মহামারী হিসেবে ঘোষিত এই অসুখের যে পরিসংখ্যা এখন পাওয়া যাচ্ছে, তা এক মাস আগে এই রোগ সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাকে অনেক ভাবেই পালটে দিচ্ছে। প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছিল, এই রোগ প্রচণ্ড সংক্রামক হলেও এর ভয়াবহতা কম। কারণ তথ্য বলছে এই অসুখে ভুগে মৃত্যুর হার ইনফ্লুয়েঞ্জার থেকে কিঞ্চিৎ বেশি। কিন্তু এখন ইতালি বা বাকি ইউরোপের অন্য দেশগুলোর পরিসংখ্যান এই রোগ ছড়িয়ে পড়া অথবা এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্য কথা বলছে।

    সাধারণ ভাবে একটি ধারণাও তৈরি হচ্ছে, নিশ্চয়ই চিন বা ইতালির মতো সাংঘাতিক মাত্রায় আক্রান্ত দেশগুলির সরকার করোনা রুখতে আগে থেকে তেমন কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা নিয়েছি, তাই আমাদের দেশে নিশ্চয়ই এই রকম পরিস্থতি তৈরি হবে না। এই ধারণাটি ভুল প্রমাণিত হবে বিচ্ছিন্ন দেশের তুলনামূলক গ্রাফ দেখলেই। দেখা যাচ্ছে, হংকং, সিঙ্গাপুর, আর জাপানের মতো ৩টি দেশ ছাড়া, প্রায় সব দেশেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার হার প্রায় একই এবং প্রচণ্ড রকমের বেশি। কোনও দেশে রোগ ছড়িয়ে পড়ার হার সেই দেশে কত আগে থেকে রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, তার সমানুপাতিক।

    দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান আর জাপানের এই মহামারী প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ সাফল্য লাভের একটা প্রধান কারণ হতে পারে এই সব দেশের সাধারণ লোকের পূর্ব অভিজ্ঞতা। ২০০৩ সালের সার্সের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এসব দেশের প্রতিটি লোকের মনে এখনও দগদগে। তাই দেশের সরকার যেমন বাইরে থেকে প্রথম রোগী দেশে ঢোকামাত্রই জনগণকে সতর্ক করে দিয়েছে, তেমনি দেশের জনগণও সেই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে মেনে দেশের মধ্যে সেই রোগ বিস্তার লাভ করতে দেয়নি, রুখে দিয়েছে।

    ঠিক এই একই কারণে, পূর্ববর্তী মার্স আর ইবোলা মহামারীর অভিজ্ঞতা থেকে অনেক অনুন্নত আফ্রিকার দেশগুলোও এখনও পর্যন্ত প্রথম অল্প কিছু বহিরাগতদের মধ্যেই এই রোগ আটকে দিতে পেরেছে।

    অথচ এর উল্টো দিকে, অপেক্ষাকৃত শীতপ্রধান ইউরোপ বা আমেরিকাতে ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব, যে কোনও নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম থাকে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ লোকজনেরও বিভিন্ন ছোঁয়াচে রোগ সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। করোনা-সতর্কতা গ্রহণ করে সে সব দেশের সরকার তাদের ডাক্তার বা গবেষকদের পরামর্শ মেনে নির্দেশনামা জারি করলেও, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘরে ঘরে সেটা পালন করার মতো সচেতনতা ইউরোপ, আমেরিকার লোকেরা দেখাতে পারেনি।

    দক্ষিণ কোরিয়াও এই তালিকাতেই ছিল। ফলে সেখানে অসুখ তৃতীয় পেরিয়ে চতুর্থ ধাপে প্রবেশ করলেও, উন্নত পরিকাঠামোর কারণে দেশের প্রায় প্রতিটি জনগণের পরীক্ষা করে আর দেশের সব রকমের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে, কিছু দেরিতে হলেও রোগকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

    সেখানে দুর্ভাগ্য, যে ভারতের মতো দেশে তো সাধারণ মানুষকে পরীক্ষা করতে বা কোয়ারেন্টাইন করতেও পুলিশি শক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে!

    আমি নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে ইতালিতে করোনাভাইরাসের আক্রমণের গ্রাফটা একটু ব্যাখ্যা করতে চাই।

    প্রথম ধাপ: ৩১ শে জানুয়ারি, রোমে প্রথম দু’জন রোগী চিহ্নিত হয়। উহানের বাসিন্দা এক চিনা দম্পতি, ২৩ জানুয়ারি মিলানের মালপেন্সা বিমানবন্দর হয়ে ইতালিতে পৌঁছেছিল। তারপরে, সেখান থেকে ভেরোনা, পরমা হয়ে ২৮ জানুয়ারি রোমে পৌঁছেছিল। স্বভাবতই, তাঁরা উত্তর ভাগের লম্বার্ডি অঞ্চল থেকে শুরু করে মধ্য ইতালির রোম পর্যন্ত এই রোগ ছড়িয়ে এসেছেন।

    দ্বিতীয় ধাপ: ২২শে ফেব্রুয়ারি ইতালিতে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হতে শুরু করে। আসে মৃত্যুর খবর। ইতালি ১১টা টাউনকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে দেয়, আর এই সব অঞ্চলের সব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। মুশকিল হল, এর ফলে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই হস্টেল ছেড়ে তাদের গ্রামের বাড়ির দিকে ফিরে যাওয়া শুরু করে। যেটা পরবর্তী কালে সেই সব অঞ্চলেও সংক্রমণের সৃষ্টি করে।

    তৃতীয় ধাপ: ৭ ই মার্চ দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ২০০ পেরিয়ে যায়। মিলান, লম্বার্ডি-সহ দেশের যে সব অঞ্চলে রোগ ছড়িয়ে পড়ছিল, সরকার সেইসব আক্রান্ত অঞ্চলগুলোকেও ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে দেয়। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন আর বলতে বাধা নেই, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

    চতুর্থ ধাপ: ৯ই মার্চ দেশে রোগীর সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। সারা দেশের নানা অঞ্চল থেকেও রোগী পাওয়া যেতে শুরু করে। বাড়তে থাকে মৃত্যু।

    পঞ্চম ধাপ: ১০ই মার্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়।

    ষষ্ঠ ধাপ: ১১ই মার্চ কিছু জরুরি পরিষেবা ছাড়া সারা দেশে সব কিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়।

    এই সময়সূচিতে উল্লেখ্য ব্যাপার হল, তৃতীয় ধাপ থেকে ষষ্ঠ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৫ দিনের মধ্যে। এই ক’দিনে রোগীর সংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত হারে বাড়তে শুরু করে। এর অর্থ, এক বার রোগ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে সারা দেশ বন্ধ করেও এটা প্রতিরোধ করা আর সম্ভব হয়নি।

    আমি নিজে ইতালিতে করোনা ভাইরাসের মহামারী একদম সামনে থেকে দেখছি। ইতালিতে প্রথম দিকে ১-২ জন মারা যাওয়ার পরেই সরকার যখন একের পর এক শহর বন্ধ করে দিচ্ছিল, তখন আমার কোনও ধারণাই ছিল না পরিস্থিতি এই ভয়ানক দিকে যেতে পারে। বিশেষত যেখানে ইতালির মিলান অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই উন্নত আর দেশের সব লোকের জন্যই উন্নত সরকারি চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই হয়ে থাকে।

    এখন আইসিইউগুলো পুরো ভর্তি, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার উপযোগী গুরুতর রোগীদেরও হাসপাতালের করিডরে অস্থায়ী ব্যবস্থা করে রাখা হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিট খালি করে সেখানে করোনাভাইরাস সংক্রামিত রোগীদের থাকার জন্য জায়গা তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরাই নয়, দেশের অন্যান্য গুরুতর রোগের রোগীরাও প্রচন্ড বিপদে পড়ছে। যাদের করোনা পজিটিভ কিন্তু আপাত ভাবে কোন বাহ্যিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না, সেসব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে বলা হচ্ছে। তাতেও রোগীর সংখ্যা না কমাতে, সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে যে বৃদ্ধ রোগী অথবা যেসব রোগীদের বাঁচার সম্ভবনা খুবই কম, তাঁদের হাসপাতালের সুবিধে না দিয়ে সেই সুবিধে কমবয়স্কদের এবং যাদের আইসিইউ সুবিধে দিলে বাঁচিয়ে দেওয়া সম্ভব, তাদেরই দেওয়া হচ্ছে।

    এখন স্পষ্ট হয়েছে, এই রোগ প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে রুখতে না পারলে, জগৎসেরা চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়েও কিছু হবে না। কারণ এর পরে, ব্যাপারটা চিকিৎসার নাগালের বাইরে চলে যাবে।

    তবে খাবার বা অন্যান্য জিনিসের আকাল সরকার মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে এখানে। লক আউট শুরু হওয়ার প্রথমেই লোকজন বাড়িতে প্রচুর জিনিস মজুত করা শুরু করে কিছুদিনের জন্য একটি কৃত্রিম অভাব তৈরি করে ফেললেও মিলান বা তৎসংলগ্ন এলাকাতে এখন দোকানগুলোতে খাবার মজুত আছে। লোকে সাবধানতা অবলম্বন করে কেবল স্থানীয় দোকান থেকে খাদ্যদ্রব্য আর ওষুধ সংগ্রহ করতে পারছে। এখনও গ্লাভস, মাস্কের সংখ্যা তুলনায় কম আছে, তাই আইন করে ওষুধের দোকান থেকে প্রতি ব্যক্তির জন্য কেবল একটি করেই মাস্ক বা গ্লাভস দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত ভাবে আমার ঘরেও পরবর্তী ২ সপ্তাহের মতো খাবার মজুত আছে। নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবেই নিজের বাড়িতে আবদ্ধ রেখে দিয়েছি। কিছু ক্ষণ ছাড়াছাড়াই বাড়ির পাশ দিয়ে সাইরেন বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ শোনা ছাড়া আর তেমন বৈচিত্র নেই।

    নিজের দেশে ফেরার কথা ভুলেও ভাবছি না। এই দুঃসময় আগে পার করতে হবে। দেশকে সুরক্ষিত রাখার স্বার্থেই দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

    সেই দেশ ভারতের অবস্থা এখন দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। আর দু’সপ্তাহ সময়ও হাতে নেই আমাদের। তদুপরি, ইতালিতে প্রথম ধাপের পর থেকেই প্রচুর হারে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা হয়েছিল, যা ভারতের পরিকাঠামোতে হওয়া সম্ভব না। তাই ভারতের বিপদ অনেক বেশি। হয়তো যে সংখ্যাটা আমরা এখনও অবধি জানতে পেরেছি, আসল সংখ্যা তার চেয়ে বেশি!

    যে কোনও দেশেই মৃত্যুর হার অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে, কিন্তু এই করোনাভাইরাস প্রথমেই আটকাতে না পারলে, পরবর্তী ধাপে রোগ ছড়িয়ে পড়ার হার যে ভয়ানক রকম ভাবে বেড়েছে, তা প্রায় সব দেশেই সমান। ভারত ব্যতিক্রম হবে, এমন দুরাশা করা ভুল। এত বড়, এত জনঘনত্বপূর্ণ দেশে, চিকিৎসার বেহাল পরিকাঠামোর দেশে এই ভাইরাস একবার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলে সেটা প্রতিরোধ করা কার্যত অসম্ভব।

    তার পরেও ভারতে এই অসুখ সর্বনাশের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল, এই ভাইরাসের সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত খুব কম গবেষণাই হয়েছে। এবং বিশ্বে এই ভাইরাসের ইতিহাস মাত্র ৩-৪ মাস হওয়া, এই ভাইরাসের চরিত্র সম্পর্কে খুব কম তথ্যই বৈজ্ঞানিকদের কাছে আছে। এই রোগের এখনও কোনও ওষুধও নেই। হাসপাতাল কেবল আইসোলেশনে রেখে রোগীকে সাধারণ জীবনদায়ী সাপোর্ট দিতে পারে। কিন্তু এই রোগ হয়ে গেলে এখনও পর্যন্ত রোগ মুক্তির একমাত্র উপায় দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি।

    আরও পড়ুন: সুশৃঙ্খলা আর সুব্যবস্থাই জার্মানির করোনা-হাতিয়ার, ভারতের রণসাজও দৃঢ় হোক

    তবুও, বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, অভিজ্ঞ ডাক্তার আর বিশ্ব স্বাস্থ্য-সংস্থার থেকে পাওয়া নির্দেশাবলী থেকেই এই রোগ সম্পর্কে যে সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে:

    ১। করোনাভাইরাস ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা নয়। তার থেকে অনেক বেশি রকমের ছোঁয়াচে। নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসারে আমেরিকাতে ‘সিজনাল ফ্লুতে’ মৃত্যুর হার প্রায় 0.১%। আর উন্নত দেশগুলোতে সারা দেশ বন্ধ করে দিয়ে, ইনটেন্সিভ কেয়ারে রোগীদের রেখেও করোনাভাইরাসের ফলে যে হারে মৃত্যু হচ্ছে, তাতে কখনই এই দুই-রোগের কোনও তুলনা হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, বাড়িতে এক জন ইনফ্লুয়েঞ্জার রোগী থাকলেও বাড়ির বাকিরা মোটামুটি নিরাপদেই থাকেন। কিন্তু এখানে ন্যূনতম করমর্দন থেকেই সংক্রমণ শুরু হতে পারে। তাই এই ভাইরাস প্রতিরোধের এক ও একমাত্র উপায় হল সংক্রমণ সীমাবদ্ধ করা। যার সর্বপ্রধান উপায় হল, আক্রান্ত রোগীর থেকে দূরে থাকা। আর সেই কারণেই ভিড় থেকে দূরে থাকা, আর সরকারি নির্দেশ অনুসারে কিছু সময়ের জন্য নিজেকে গৃহবন্দি করাই শ্রেয়।

    ২। করোনাভাইরাস গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়াযুক্ত অঞ্চলে সংক্রমণ ঘটাতে পারে, আবার হিমশীতল আবহাওয়া বা তুষারপাতও একে হত্যা করতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা ৫ মার্চ বলেছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি হলে এই রোগের সংক্রমণ কমে যাবে এরকম ভাবার পিছনে কোনও যুক্তি নেই। এইমসের ডিরেক্টর ডঃ রণদীপ গুলেরিয়াও এক কথা বলেছেন যে ভারতের মতো গরম দেশে এই রোগ ছড়িয়ে পড়বে না, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।

    ৩। গরম জলে স্নান করে আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এই ভাইরাসের দূরীকরণ সম্ভব না। তবে, যে কোনও সুস্থলোকের ক্ষেত্রে পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, আর আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে দূরে থাকাই এই রোগ দ্বারা সংক্রামিত না হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি।

    ৪। করোনা ভাইরাস মশা বা অন্য পোকামাকড়ের মাধ্যমে বাহক হয়ে এক জনের দেহ থেকে অন্য কারুর দেহে যেতে পারে না।

    ৫। কোভিড ১৯ অসুখে সমস্ত বয়সের লোকেরা আক্রান্ত হতে পারে। প্রবীণ ব্যক্তিরা এবং বিশেষত যাদের কিছু না কিছু রোগের চিকিৎসা চলছে, তাদের বিপদ আরও বেশি (যেমন হাঁপানি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ)। এই রোগের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই দেখে যাচ্ছে যে অনেক অল্প বয়সের লোকেরা এই রোগে আক্রান্ত হলেও কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু বিপদ হল, এরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করলে এই রোগের বাহক হয়ে অন্য অনেক লোকের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। পরোক্ষে মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।

    ৬। করোনা সংক্রমণে কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলে, এমন লোকদের শনাক্তকরণে থার্মাল স্ক্যানার বা থার্মোমিটার কার্যকর যন্ত্র। কিন্তু এই যন্ত্র সংক্রামিত মাত্রেই শনাক্ত করতে পারে না। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেই এই ভাইরাস দেহে প্রবেশের অনেক দিন পর্যন্ত সংক্রমণের কোন লক্ষণই দেখা যায় না। জ্বরও হয় না। থার্মার স্ক্যানারের ছাঁকনিতে তাঁরা পাশ করে যান।

    ৭। মাছ, মাংস ইত্যাদি কোনও খাদ্যের সাথে এই রোগের কোনই সম্পর্ক নেই। তবে, বাজার থেকে খাবার কিনে আনলে ভাল ভাবে পরিষ্কার করে এবং সুসিদ্ধ করে তবেই খাবার খাওয়া উচিত।

    ৮। যেহেতু এখনও এই রোগের কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি, ফলে কোনও রকমের হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক বা অন্য কোনও হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছ থেকে এই রোগের চিকিৎসা করাতে যাবেন না। ভারতের প্রসঙ্গে বলে দেওয়া ভাল, গোমূত্র বা গোবর অন্য অনেক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হলেও (জৈব সার, ঘুঁটে বা গোবর গ্যাস ইত্যাদি), এগুলো কোনটিই কোনও রোগের ওষুধ নয়। বরং এই ধরনের কোনও প্রাণীর বর্জ্য পদার্থ খেলে অন্য কোনও অসুখ হতে পারে।

    ৯। অ্যান্টিবায়োটিক কেবল মাত্র ব্যাক্টেরিয়ার প্রতিরোধ করতে পারে, ভাইরাসের ক্ষেত্রে পারে না। তাই অহেতুক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে কোনও কাজ হবে না, বরং দেহের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া মেরে ফেলে নিজেকে শারীরিক ভাবে দুর্বল করে ফেলা হবে।

    ১০। কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে, তার পরে সারা শরীরে অ্যালকোহল বা ক্লোরিন স্প্রে করে এই ভাইরাসকে হত্যা করা সম্ভব না। বরং এতে ত্বকের ক্ষতি হবে। তবে, সতর্ক ভাবে উপযুক্ত নির্দেশ মেনে আগে থেকে ব্যবহার করতে পারলে, অ্যালকোহল বা ক্লোরিন ব্যবহার করে রোগীর দ্বারা স্পর্শ করা বস্তু পরিষ্কার করা সম্ভব। সংক্রমণ নষ্ট করা সম্ভব নয়।

    একটা সম্ভাব্য বিপদের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ভারত। এখনও স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছইনি আমরা। তাই কঠিন হলেও অসম্ভব নয় এই সর্বনাশ রোখার লড়াই। মানুষের সতর্কতা, সচেতনতা আর বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাভাবনা একসঙ্গে কাজে লাগালে এই মহামারী থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি।

    ইতালির মিলান শহরে বসবাসরত লেখক বিজ্ঞান গবেষণার সঙ্গে যুক্ত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More