সুশৃঙ্খলা আর সুব্যবস্থাই জার্মানির করোনা-হাতিয়ার, ভারতের রণসাজও দৃঢ় হোক

অ্যাঞ্জেলা মার্কেল নাগরিকদের সতর্ক করেছেন, অভয় দিয়েছেন। কী সুন্দর সেই বক্তব্য, ফ্রি ওয়ার্ল্ডের যোগ্য নেত্রীর যেমনটা হওয়া উচিত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

ফারহা কাজি

জানুয়ারির গোড়ার দিক থেকেই চিনের খবর পেতে শুরু করেছিলাম। খুব চিন্তাও হচ্ছিল, প্রতিদিন মৃত্যুমিছিল বাড়তে দেখে। চতুর্দিকে আলোচনাও চলছিল। অন্য দেশগুলোয় যখন একজন-দু’জন করে রোগীর খোঁজ মিলতে শুরু করল, স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের চিন্তা তখন, জার্মানিতে আসবে না তো! জানুয়ারির শেষের দিকে আশঙ্কা সত্যি হল। মিউনিখ শহরে ধরা পড়ল করোনাভাইরাস পজ়িটিভ রোগী। সচেতনতা তখনও তেমন ছিল না। তার পরে ধীরে ধীরে মিউনিখের গণ্ডি ছাড়িয়ে করোনা প্রবেশ করল অন্য রাজ্যগুলিতেও।

আমি জার্মানির যে স্টেটে থাকি, তার নাম নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া বা সংক্ষেপে NRW। এখানেই সবথেকে প্রকোপ বেশি করোনাভাইরাসের। ১০ হাজারের বেশি মানুষ এখনও আক্রান্ত। তবে এত বড় হারে হয়তো সংক্রমণ ঘটত না, মানুষ উৎসবে না মাতলে। এই অসুখ মূলত জার্মানিতে ছড়িয়ে পড়ে একটি কার্নিভাল থেকে। NRW স্টেটে বেশ কয়েকটা বড়-বড় কার্নিভাল হয়, তার মধ্যে অন্যতম কোলন কার্নিভাল। তিন-চার দিন ধরে চলে। বহু বাইরের মানুষ আসেন। এবারেও এসেছিলেন। সেখান থেকে দ্রুতহারে ছড়িয়ে পড়ে রোগ।

আজ যখন এই লেখা লিখছি, জার্মানিতে আক্রান্তের সংখ্যাটা বাইশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সংক্রমণ শুরু হওয়ার পরেই জার্মান সরকার মানুষজনকে সচেতন হতে অনুরোধ করছিল। জনসমাগম করতেও বারণ করেছিল। প্রথমে অতটাও গুরুত্ব দেয়নি কেউ। উইক এন্ডে পাবে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা কিংবা রেস্তোঁরায় খেতে যাওয়া– কোনওটাই বন্ধ হয়নি। ফলাফল এখন চোখের সামনে।

আমার শহরের নাম প্যাডারবর্ণ। কিছুদিন আগেও এ শহরে কোনও আক্রান্ত ছিল না। পরীক্ষা চলছিল, বিশ্ববিদ্যালয় খোলা ছিল, জীবনযাত্রা খুবই স্বাভাবিক। আমার জীবনসঙ্গী মিউনিখে থাকেন, স্টেটের নাম বাভারিয়া। সেখানকার ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক রিসার্চ ইনস্টিউটে গবেষণারত পদার্থবিদ তিনি। ওদের অফিস থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় এক মাসের জন্য বাড়ি থেকে কাজ করতে। তখন ও এই শহরে চলে আসে। তখন মিউনিখ স্টেশন সুনসান। বিরল দৃশ্য এটা, কারণ মিউনিখ জার্মানির অন্যতম ব্যস্ত শহর।

ও আসার সময়ে ট্রেনে সরকারের তরফে সব ডিটেলস নেওয়া হয়েছিল, কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে– এসব। আমার তখন পরীক্ষা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক সপ্তাহ পরে হঠাৎই মেল এল, পরীক্ষা স্থগিত। আপাতত কুড়ি এপ্রিল অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠন বন্ধ। তার পর একদিন মেল এল, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জন কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। তাই লাইব্রেরি, ক্যান্টিন, স্পোর্টস সেন্টার সব বন্ধ থাকবে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোরাফেরা করার উপরেও রেস্ট্রিকশন এল। কর্তৃপক্ষ মেল করে ছাত্রছাত্রীদের বাড়ির বাইরে বের না হতে অনুরোধ করলেন।

জার্মানিতে এখনও পর্যন্ত পরিবহণ স্বাভাবিক। তবে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বর্ডার সিল করা হয়েছে এক মাসের জন্য। গ্রসারি, ওষুধের দোকান আর কিছু খাবারের দোকান ছাড়া অধিকাংশ দোকানপত্র, রেস্তোঁরাই বন্ধ। সমস্ত হোটেল বন্ধ, ধর্মীয়-সহ সমস্ত রকমের জমায়েত নিষিদ্ধ। রাস্তায় মানুষজন অন্য সময়ের তুলনায় অনেক কম। মানুষ এখন পাবলিক ট্রান্সপোর্টের জায়গায় যাতায়াতের জন্য নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার করছে।

প্রথম কিছুদিন ধরে লকডাউনের গুজব শুনে আসছিলাম। লোকজন পাগলের মতো জিনিসপত্র কিনছিল, মুহূর্তের মধ্যে চাল-ডাল-নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ফাঁকা । টিস্যু পেপারেরও একই অবস্থা। শেষে গ্রসারিগুলোয় নোটিস টাঙাতে বাধ্য হয়, দুটোর বেশি কেনা যাবে না। কিছু কিছু জিনিস বাজারে কম আসছে, তবে প্রয়োজনীয় সবই আছে। হয়তো পছন্দমাফিক হবে না সব।

মোট কথা, অসুখের আক্রমণ বাড়তে থাকলেও, সামাজিক ভাবে খুব একটা খারাপ অবস্থা নয় এখনও অবধি। প্রায় দু’সপ্তাহ হল আমরা ঘরের ভিতরে। প্রয়োজন ছাড়া বের হই না। নিয়ম মানতেই হবে। নিয়ম মানার জন্যই হয়তো ইউরোপের বাকি দেশগুলোর মধ্যে মৃত্যুহার জার্মানিতে সবথেকে কম। এই প্রতিবেদন লেখার সময়ে মোট ৮৪ জন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, যিনি একজন পদার্থবিদ, তিনি বলেছেন, “Es ist ernst.” অর্থাৎ This is serious. Take this seriously. তিনি নাগরিকদের সতর্ক করেছেন। তিনি নাগরিকদের অভয় দিয়েছেন। কী সুন্দর সেই বক্তব্য, ফ্রি ওয়ার্ল্ডের যোগ্য নেত্রীর যেমনটা হওয়া উচিত।

সরকার থেকে বহু আর্থিক অনুদান ঘোষণা করা হয়েছে। জার্মানি ১.১ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি দেবে সমস্ত বিজনেস এবং কোম্পানিগুলোকে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের ইকোনমিকে সাহায্য করার জন্য আরও ৫০০ বিলিয়ন ইউরো সাহায্য করার ঘোষণা হয়েছে। এছাড়াও ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণার জন্য ১৪৫ মিলিয়ন ইউরোর তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।

এ তো গেল দেশের অর্থনৈতিক সাহায্য। পাশাপাশি  সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুলগুলোতে অনলাইন কোর্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে পড়াশোনার জন্য। এমনকি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-আবাসনে ইন্টারনেট ভর্তুকি ৫০০ জিবি থেকে বাড়িয়ে ২ টিবি করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ছাত্রছাত্রীরা বাড়িতে বসে নিশ্চিন্তে লেখাপড়া করতে পারে এবং অন্যান্য কাজ করতে পারে। সেই সঙ্গে অনুরোধ করা হয়েছে বড় মাপের ডাউনলোডগুলো হ্যাপি আওয়ারে (রাত বারোটা থেকে সকাল দশটা) করতে।

আরও পড়ুন: চোখের সামনে মৃত্যুপুরী হতে দেখলাম ইতালিকে, ভারতের কিন্তু এখনও সুযোগ আছে

আমার পরিচিত এক ভাই বার্লিনে পড়াশোনার পাশাপাশি ম্যাকডোনাল্ডে চাকরি করে। তাদের মাইনে সমেত কিছুদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। মোটকথা সরকার সমস্ত রকমই সাহায্য করছে। জার্মানির চিকিৎসাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশগুলির মধ্যে একটা। সেটা কাজে লাগিয়েই তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা যায় অসুখ। কিন্তু প্রতিদিন বহু নতুন রোগী আসছে বলে খবর পাচ্ছি। জানি না তারা কত দিন এইভাবে সার্ভিস দিতে পারবে।

পাশের দেশ ইতালির উদাহরণ ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুপুরী হয়ে উঠেছে দেশটি। যেভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে সে দেশে, তা মাথায় রাখলে বোঝা যায়, ওই একই রকম পরিণতি ভারতেরও হতে পারে যদি না সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ও তা প্রয়োগ করা হয়। ইতালিও অনেকটা ভারতের মতো, কমিউনিটি-নির্ভর দেশ। এরা পাড়া-পড়শির সঙ্গে আলাপ করে, আড্ডা দেয়। আমার দেশে চায়ের দোকানের ঠেকের মতোই। ফলে রোগটা অনেক দ্রুত ছড়িয়েছে।

এই মুহূর্তে ভারতের নাগরিকদের গড় আয়ু ২৮ বছর, যেখানে ইতালির ৪৭। তাই হয়তো ইতালির মতো ভয়াবহ পরিণতি নাও হতে পারে, মৃত্যুর সংখ্যা কম হতে পারে অনেক। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে কোনও কিছুই ‘হতে পারে’র ভরসায় রাখা ঠিক নয়। ভারত সরকারের উচিত এই দেশগুলো দেখে শিক্ষা নিয়ে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া। অস্থায়ী হাসপাতালের ব্যবস্থা করাই হোক বা দেশের বয়স্ক এবং অসুস্থদের প্রতি মনোযোগ দেওয়াই হোক।

আরও একটা সমস্যা হল, আমাদের দেশের একটা বড় অংশ গরিব মানুষ। ভর্তুকি দিয়ে এই কঠিন মুহূর্তে তাঁদের জীবন রক্ষা করাটাও সরকারেরই দায়িত্ব। সেইসঙ্গে খেয়াল রাখা এই দুর্দিনে যাতে কেউ চাকরি না হারান, কিংবা কোনও ব্যবসা বন্ধ না হয়ে যায়। তার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেই হবে। আর খুব গুরুত্বপূর্ণ হল,  চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, এবং আপৎকালীন জরুরি পরিষেবাদানকারীদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা প্রদান করতেই হবে। নইলে এই মহামারী আটকানো কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে।

চিন্তাই হচ্ছে দূরে বসে। দেশে ফেরার কথা এখন ভাবছিও না। বিপদের মধ্যেই বসে আছি, আর এক বিপদে পৌঁছনোর চেষ্টা করা মানে আরও কিছু মানুষের বিপদ বাড়ানোর ঝুঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই দেশের জন্য সব চিন্তাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা আর সংবাদমাধ্যমে ভাগ করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। এ দেশের সুশৃঙ্খল ও সুব্যবস্থায় বসে মনে পড়ে, জনবহুল ও দরিদ্র দেশ আমার, যার অনেকটা অংশজুড়ে এখনও খিদের লড়াই, কুসংস্কারের ছায়া। তবু এ বিপর্যয় সামাল দিতেই হবে ভারতকে। নইলে ক্ষতি মাপা যাবে না।

(লেখিকা জার্মানিতে বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More