লকডাউনেও তেঘরিয়া থেকে নরেন্দ্রপুর আসছি শুধু আপনাদের জন্য! ব্যাঙ্ককর্মীদেরও ঝুঁকি কম নয়

আজ সবে দু'দিন, এখনও বাকি ১৯ দিন। সত্যি বলছি, জানিনা কীভাবে রোজ বা এক দিন ছাড়া হলেও পৌঁছব অফিসে। কিন্তু এটা জানি, আপনাদের নিকটবর্তী যে কোনও ব্যাঙ্কের যে কোনও শাখায় আপনার প্রয়োজনে আমার কোনও না কোনও সহকর্মী অবশ্যই থাকবেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অদ্রীজা ভট্টাচার্য

    বেশ নিশ্চিত হয়েই বলতে পারি, এই রবিবার বিকেলে এ দেশজুড়ে যতই থালা-বাটি-কাঁসরঘন্টা-হাততালি বেজে থাকুক না কেন, আমার একজন সহনাগরিকও সম্ভবত কোনও ব্যাঙ্ককর্মীর জন্যে তা বাজাননি। যদি কেউ বাজিয়ে থাকেন, তাহলে হয় তিনি নিজে ব্যাঙ্ককর্মী নইলে তাঁর কাছের কোনও পরিচিত মানুষকে এই কাজটি করতে দেখেছেন। নইলে ‘জরুরি পরিষেবা’র তালিকায় যে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের কথা উচ্চারিত হয়, তার এক দশমাংশ দিয়েও ব্যাঙ্ককর্মীদের নাম কেউ করেন না।

    করার কথা হয়তো এই জন্যই নয়, ব্যাঙ্ককর্মীদের নিয়ে আমাদের সাধারণ মানুষের অনেক অভিযোগ। তারা কাজ করে না, তারা বসে বসে মাইনে নেয়, তারা অসহযোগী, তাদের চাকরিক্ষেত্রের সুবিধাগুলি অনর্থক– ইত্যাদি নানারকম। সকলে অবশ্যই এভাবে ভাবেন না। কিন্তু হ্যাঁ, অনেকেই ভাবেন। কিন্তু এই মুহূর্তে রাজ্য স্বাস্থ্য ও পরিবার দফতরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ব্যাঙ্ককর্মীরাও জনসাধারণের হিতার্থে জরুরি পরিষেবারই অন্তর্গত। ব্যাঙ্ককর্মীদের এখনও কাজে যেতেই হবে। তাঁদের কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হোমের সুবিধা নেই, নেই গৃহবন্দি থেকে নিজেকে ও নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে নিরাপদে রাখার সুযোগ।

    প্রশ্ন জাগে, ‘কাজ না করা’, ‘সারাবছর বসে থাকা’, ‘অঢেল সুবিধা উপভোগ করা’ এই অলস কর্মচারীরা এতই জরুরি কেন? কোনও কাজ যদি নাই থাকবে, তাহলে এই লকডাউন পর্বে তাঁদের বাদ রাখা যায় না কেন রোজ কর্মক্ষেত্রে গিয়ে যথেষ্ট সময় ধরে কাজ করার দায়িত্ব থেকে? উত্তরটা অনেকের কাছেই হয়তো স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমার কাছে খানিকটা স্পষ্ট। কারণ আমি নিজে একজন ব্যাঙ্ককর্মী। নিজে এই জরুরি পরিষেবার অংশ না হলে হয়তো আমিও বুঝতাম না, আদতেই এই পরিষেবাটা কতটা জরুরি, যার জন্য সারা দেশ লকডাউন অবস্থাতেও রোজ অফিস ছুটতে হচ্ছে আমায়, আমাদের?

    মার্চ মাস, ব্যাঙ্কের ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকার কথা এসময়। ইয়ার এন্ডিং বলে কথা। সারা বছরের অজস্র টাকা পয়সার হিসেব-নিকেশ মেলাতে হবে শেষ ক’টা দিনে। কিন্তু এখন এই পরিস্থিতি আমাদের সম্পূর্ণ অচেনা। তদুপরি সাধারণ মানুষের আসহায়তা। তাই ইতিমধ্যেই পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে ২০২০-২০২১ অর্থবর্ষ। পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে আয়কর আদায়ের সময়সীমাও। লোন আদায়ের কাজ, যাকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় বলে ‘রিকভারি’, তা কার্যত বন্ধ এই অবস্থায়। আইবিএ বা ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনে অর্ধেক সংখ্যক কর্মী নিয়ে হলেও এই কঠিন সময়ে অন্তত ন্যূনতম পরিষেবাটুকু চালু রাখার জন্যে।

    ন্যূনতম অর্থে যা যা বোঝায়, সেগুলো হল: ১) টাকা তোলা ও জমা দেওয়া, ২) চেক ক্লিয়ারিং, ৩) রেমিট্যান্স অর্থাৎ এলাকার চেস্ট থেকে প্রয়োজনমতো টাকা আনা, ৪) পণ্য ও পরিষেবা কর, রাজস্ব, নানা রকমের শুল্ক জমা দেওয়ার কাজ, ৫) এটিএমগুলিতে পর্যাপ্ত টাকা ভরে রাখা।

    আপাতত এইটুকুই ব্যাঙ্কের জরুরি পরিষেবা। কিন্তু এইটুকু শব্দটা ব্যবহার করলেও, এটা কোনও ভাবেই বাড়ি থেকে হওয়ার নয়, কর্মীদের পরিশ্রম ছাড়া অন্য কোনও উপায়ে এই কাজ হওয়ার নয়। আমরাও চাই এই সময় এই পরিষেবাটুকু আপনাদের পৌঁছে দিতে। তাই আমাদের ‘ওয়াক ফ্রম হোম’। বহু কর্মীকে আক্ষরিক অর্থেই ওয়াক করে অর্থাৎ হেঁটে এসে পৌঁছতে হচ্ছে ব্যাঙ্কে। আমার সহকর্মী আজই চার ঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে আসছেন অফিসে।

    আমার কথা না বলাই ভাল, তেঘরিয়ার বাসিন্দা আমি। অফিস যেতে হচ্ছে গড়িয়া পার করে নরেন্দ্রপুরে। নির্দেশিকা অনুযায়ী মাঝে মাঝে যেতে হচ্ছে সোনারপুরেও। কোনও দিন কোনও সহকর্মীর মোটরবাইকে, তো কোনও দিন অনেকটা ভাড়া দিয়ে গাড়ি জোগাড় করে এই যাতায়াত। রোজ কোনও না কোনও নতুন উপায় বার করে অফিস করতে হচ্ছে আমায়। এতটা পথ রোজ যাওয়া-আসার জন্য আমি নিজে কি সমস্যার মুখে পড়ছি না? আমার পরিবারের সদস্যরা পড়ছেন না? আমি সবরকম ভাবে নিজেকে স্যানিটাইজ় করার পরেও কি কোনও ভাবে জীবাণুবাহক হয়ে ওঠার ঝুঁকি নিয়ে ফেলছি না?

    প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা। সর্বোপরি, এমনটা আমার একার সঙ্গে ঘটছে না। হাজার হাজার ব্যাঙ্ককর্মী এভাবেই হয়তো জরুরি পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

    অথচ হাসপাতালের কর্মচারীদের মতো আমাদের কিন্তু কোনও অ্যাম্বুল্যান্স বা গাড়িতে করে নির্দিষ্ট শাখায় পৌঁছে দেওয়ার মতো পরিষেবা নেই। নেই মাস্ক, স্যানিটাইজ়ার, গ্লাভসের সরকারি সুরক্ষা। থার্মাল স্ক্যানার বসেনি কোনও ব্যাঙ্কে। এই কথায় আমি কোনও ভাবেই কোনও স্বাস্থ্যকর্মী বা হাসপাতাল পরিষেবার প্রতি কোনও অসূয়া পোষণ করছি না, তাঁদের গুরুত্ব আমি বুঝি। কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও বলার, যে আমাদের মধ্যে অধিকাংশ কর্মচারীই বাড়ি থেকে দূরে পোস্টেড, সে ক্ষেত্রে ট্রেন, মেট্রোরেল ও বাসের মত যানবাহনেই তাঁদের নিত্যদিন যাওয়া আসার জন্য ভরসা করতে হয়, যেগুলি কোনওটাই এখন চলছে না। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার বা অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের তরফেই ব্যাঙ্ককর্মীদের জন্য আলাদা কোনও রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এ বিষয়ে। অতএব শহরাঞ্চল হোক বা গ্রামীণ এলাকা, সমস্ত কর্মচারীকেই সময়মতো শাখায় পৌঁছতে অসুবিধার মুখে পড়তে হয়েছে এবং রোজ হচ্ছে। ঝুঁকির কথা তো বলেইছি।

    লকডাউন ঘোষণা হওয়ার পরে, দফায় দফায় মিটিং করে স্টেট লেভেল ব্যাঙ্কার্স কমিটি থেকে এই অসুবিধা ও ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে জানানো হয়েছে, যে লকডাউনের দিনগুলিতে আর্থিক লেনদেনের সময়কাল ১০টা থেকে বেলা ২টোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাছাড়াও ৫ কিলোমিটার পরিধির মধ্যে ব্যাঙ্কের যে সব শাখা আছে, তারা একত্রিত ভাবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে কিছু শাখা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেবে ব্যাঙ্ক নিজেই। বন্ধ শাখার কর্মচারীদের একদিন ছাড়া ছাড়া নিকটবর্তী যে কোনও শাখায় হাজিরা দিতে হতে পারে।

    আজ সবে দু’দিন, এখনও বাকি ১৯ দিন। সত্যি বলছি, জানিনা কীভাবে রোজ বা এক দিন ছাড়া হলেও পৌঁছব অফিসে। কিন্তু এটা জানি, আপনাদের নিকটবর্তী যে কোনও ব্যাঙ্কের যে কোনও শাখায় আপনার প্রয়োজনে আমার কোনও না কোনও সহকর্মী অবশ্যই থাকবেন। শুধু অনুরোধ করব, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বেরোবেন না ব্যাঙ্কের কাজে। বাড়িতে থাকুন, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংয়ের নিয়মাবলী মেনে চলুন। এই অসম লড়াই জিতে ফিরতে পারলে লকার, ফিক্সড ডিপোজ়িট, নতুন অ্যাকাউন্ট, পাসবুক প্রিন্টিং– এই সব কাজ আবার করা যাবে। এই ক’টা কাজ পরে করার কথা বিশেষ করে বললাম, কারণ এগুলো কোনওটাই এই মুহূর্তে জরুরিতম নয়। বরং বেশি জরুরি হল, আপনারা যাঁরা এখনও ততটা সড়গড় নন, তাঁরা এই সুযোগে ই-ব্যাঙ্কিং, নেট-ব্যাঙ্কিংয়ের মতো সুবিধাগুলিতে রপ্ত হয়ে উঠতে পারেন। নইলে আমাদের কাজটা আরও অনেকটা বেশি কঠিন হয়ে উঠছে এই কঠিন সময়ে।

    লকডাউন ঘোষণার পরের দিন যুদ্ধ করে অফিস পৌঁছে দেখেছিলাম, মানুষের লাইন পৌঁছে গেছে ব্যাঙ্কের গেটের বাইরে। অথচ সরকার থেকে একদিকে সচেতন করা হচ্ছে চার-পাঁচ জনের বেশি কোথাও জমায়েত না করতে, এদিকে কালোবাজারি-সহ আরা নানা অজানা আশঙ্কায় লকডাউন পরিস্থিতিতে বহু মানুষ চাইছেন সাধ্যমতো টাকা তুলে মজুত করে নিতে প্ৰয়োজনীয় সামগ্রী। ফলে বাধ্য হয়েই আপৎকালীন তৎপরতায় চেস্ট থেকে ব্রাঞ্চগুলিতে টাকা সরবরাহ করতে হচ্ছে আমাদেরই। এই অবস্থায় হয়তো সমস্ত ব্রাঞ্চ খোলা আর সম্ভব হবে না আগামী ক’টা দিন। কারণ, আমরা চাইলেও আমাদের পৌঁছনোর উপায় নেই সকলের। যান চলাচলের কোনও ব্যবস্থা ছাড়া আমরা অসহায়। সরকারকে অনুরোধ করব, আমাদের এবং আমাদের মতো জরুরি-কর্মীদের কথা মাথায় রেখে যদি কিছু বাস, গাড়ি চালানো যায়।

    তাই অনুরোধ করব, যথাসাধ্য আমাদের সঙ্গে একটু সহযোগিতা করুন সকলে। লকডাউন অবস্থায় আমরাও চেষ্টা করছি ঝুঁকি আর সমস্যা নিয়েই আপনাদের পাশে থাকতে। আমাদের বাড়িতেও ছোট বাচ্চা বা বয়স্ক বাবা-মা আছেন। যাঁরা গৃহবন্দি থাকলেও আমাদের বয়ে আনা সংক্রমণে বিপদে পড়তে পারেন। একইভাবে আপনারাও বাহক হয়ে উঠতে পারেন ব্যাঙ্ক থেকেই কারণ বিভিন্ন প্রান্ত ও রাজ্যের মানুষ এখানেই আসেন লেনদেনের জন্য। শয়ে শয়ে মানুষের হাতে ঘুরে যে টাকা আমাদের হাতে আসছে, আমি বা আপনি কিন্তু জানতেও পারছি না কোভিড ১৯-এর মতো মারণরোগের জীবাণু তাতে বাসা বেঁধেছে কিনা। তাই অনুরোধ, প্রয়োজন না হলে বেরোবেন না।

    তবু যদি বাধ্য হন আপানদের মধ্যে কেউ ব্যাঙ্কিংয়ের কোনও কাজে ঘরের বাইরে বেরোতে, তাহলেও একটু ধৈর্য্য রাখবেন দয়া করে। এটিএম-এ টাকা ফুরিয়ে গেলে জানবেন, আপনার-আমার মতোই কোনও কর্মচারী সেখানে টাকা ভরেন। হয়তো দেরি হচ্ছে এই পরিস্থিতিতে তাঁর, কিন্তু তিনি ঠিক পৌঁছে যাবেন। আপনি অনলাইন ট্রান্সফারের সময়ে বিশ্বাস রাখবেন, এই পরিষেবাটা দিতে আমরা ব্যাঙ্ক কর্মচারীরা এবং আমাদেরই মতো কিছু জরুরিকালীন আইটি কর্মী ২৪ ঘণ্টা লড়ে যাচ্ছেন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কাজ করতে। আপনি অতি জরুরি কোনও কাজ নিয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ব্যাঙ্কে পৌঁছেও যদি দেখেন এই পরিস্থিতিতে লিঙ্ক ফেল, তাহলে দয়া করে বুঝবেন, দিল্লি বা মুম্বইয়ের হেডঅফিসেও হয়তো এই লকডাউনের কারণেই কোনও কর্মীর পৌঁছতে দেরি হয়েছে।

    এই সময় আমাদের একসঙ্গে পার করতে হবে। আমরা জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু এই জরুরি পরিষেবাটিও আপনাকে জরুরি অবস্থাতেই এবং জরুরি সতর্কতার সঙ্গেই গ্রহণ করতে হবে। কারণ এ পর্যন্ত পৃথিবীর এই অন্যতম জরুরি লড়াইটায় আমাদের জয়টাও খুব জরুরি।

    (লেখিকা এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের অফিসার)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More