রাশিয়ায় করোনা ঠেকাতে হাসপাতাল গড়েছে সেনাবাহিনী

রাশিয়া। করোনা-যুদ্ধে আকারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দেশটির লড়াইয়ের কাহিনি বহির্বিশ্বে অজানাই থেকে গিয়েছে। বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে পশ্চিমি দেশগুলো ধরেই নিয়েছে যে, এরা সমস্ত খবর প্রকাশ করছে না। কিন্তু বাস্তব বলছে অন্যকথা। করোনা মোকাবিলায় সেদেশের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন দীর্ঘকাল রাশিয়া নিবাসী বাঙালি গবেষক ও শিক্ষক। আজ প্রথম কিস্তি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

বিজন সাহা

করোনার প্রথম রোগীর কথা জানা যায় চিনে, ১৭ নভেম্বর ২০১৯-এ। তার মানে মানবসমাজের প্রায় ছ’মাস করোনার সঙ্গে বসবাস হয়ে গেল। এই বছরের ৯ মে পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীতে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪০,৭৭,৫৬৮ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ১৪,২০,০২৬ জন আর মারা গিয়েছেন ২,৭৮,৭৯০ জন। বর্তমানে যুদ্ধেও এত অল্প সময়ে এত বেশি লোক মারা যায় না। তবে আমার লেখা বিশ্বের করোনা নিয়ে নয়। রাশিয়ায় করোনার তাণ্ডব আর তা প্রতিরোধে এ দেশের মানুষের লড়াই নিয়ে। কারণ খুব সহজ। নিজে এ দেশে আছি ১৯৮৩ সালে থেকে, অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষী আমরা। যদিও আধুনিক রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়, সমাজতন্ত্রের পথ ছেড়ে প্রায় তিরিশ বছর এ দেশ পুঁজিবাদের পথেই হাঁটছে, তবুও পশ্চিমের দৃষ্টিতে এরা এখনও লৌহ যবনিকা থেকে বেরোতে পারেনি। পুঁজিবাদী দেশ হলেও স্থান পায়নি ইন্দ্ররূপী আমেরিকার রাজসভায়। তাই এ দেশ সম্পর্কে অনেকেই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। এমনকি করোনা যুদ্ধে এদের লড়াইয়ের কাহিনি বহির্বিশ্বে অজানাই থেকে যায়। অনেকেই, বিশেষ করে বাংলাদেশে ও ভারতে এ সম্পর্কে জানতে চান। আপনাদের এ বিষয়ে অবহিত করার ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই লেখা।
মনে রাখতে হবে, রুশ দেশের গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল আমেরিকা আর পশ্চিমি বিশ্বের হাত ধরেই। সোভিয়েত আমলে চিনের সঙ্গে এ দেশের শত্রুতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। যদিও চিনে বিপ্লবের পরপর সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল সে দেশে সমাজতন্ত্রের প্রথম ও একমাত্র স্পনসর। তবে রাজনীতি এক জায়গায় বসে থাকে না। বন্ধুত্বও নয়। সে নিয়মেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চিনের দ্বন্দ্ব। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় ফাটল।
১৯৯১ পরবর্তী রাশিয়া অনেকদিনই আমেরিকার লেজুড়বৃত্তি করেছে, আমেরিকাকে একের পর এক ছাড় দিয়েছে বিশ্বশান্তি রক্ষার তাগিদে। নাইন/ইলেভেনের পর প্রথম সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তাদের প্রতি। কিন্তু উপহারস্বরূপ পেয়েছে বিদ্রূপ, নিজের দোরগোড়ায় ন্যাটোর সামরিক ঘাঁটি। দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকেছে তখন ২০০৭ সালে ভ্লাদিমির পুতিন মিউনিখে তাঁর বহু মেরুর বিশ্ব ব্যবস্থার কথা বলেছেন। তখনই শুরু হয়েছে নতুন ঠান্ডাযুদ্ধ। নতুন বন্ধুর খোঁজে রাশিয়া মুখ ফিরিয়েছে চিনের দিকে। ধীরে ধীরে গ্রেট সেভেনের আদলে গড়ে উঠেছে ব্রিক্স। এরপর আসে ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধ। যদিও তার আগে ছিল কসবোর অভিজ্ঞতা, যুগোস্লাভিয়ায় বোমাবর্ষণ। ইউক্রেইনে উত্তাল পরিবেশ, ক্রিমিয়ার ঘরে ফেরা, সিরিয়া— এইসব। ফলে করোনা রাশিয়ায় আসে অসময়ে, উন্নত বিশ্বের ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হয়ে।

২০১৯ সালের নভেম্বরে যখন চিনে করোনা রোগী ধরা পড়ে তখন এখানে তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা-কল্পনা। দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমানাই শুধু নয়, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেহেতু রাশিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ চিনের সঙ্গে যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি করে জড়িত, এমনকি নির্ভরশীল যে হঠাৎ করে যে কোনও পদক্ষেপ নেওয়াটা সহজ কথা নয়। মনে রাখতে হবে, আমেরিকার হেজেমনি মোকাবিলায় দু’দেশই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তবে এখন যেহেতু অর্থনীতিই রাজনীতির গতি নির্ধারণ করে তাই এখানে চিনই বড়ভাইয়ের ভূমিকা পালন করে। তারপরেও বিভিন্ন দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর ৩০ জানুয়ারি রাশিয়া চিনের সঙ্গে সীমান্ত বলতে গেলে বন্ধই করে দেয়।
সরকারি সম্পর্কের বাইরেও হাজার হাজার চিনা নাগরিক প্রতিবছর রাশিয়া সফর করেন, হাজার হাজার চিনা নাগরিক ভ্লাদিভোস্তক, খাবারভস্ক প্রভৃতি রাশিয়ার একেবারে পূর্বপ্রান্তের অঞ্চলগুলিতে বলতে গেলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সে সব অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা। তাই এ সিদ্ধান্ত যে খুব সহজে আসেনি সেটা বলাই বাহুল্য। আর সেটা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির কারণে। সব কিছুর, বিশেষ করে অর্থনীতির ওপরে মানুষের স্বাস্থ্যকে স্থান দেওয়ার জন্যে। যদিও বিগত সময়ে বিশ্বে যে সময়ে বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাব হয়েছিল, সে সময় রাশিয়া তুলনামূলকভাবে অল্প মূল্যেই সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তবে করোনার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। এর কোনও অ্যানালগ আগে ছিল না। ফলে যেকোনও পদক্ষেপই নিতে হচ্ছে trial and error method পদ্ধতিতে। প্রথম থেকেই তাই এরা দেখছে বিভিন্ন দেশে গৃহীত পদ্ধতিগুলো।

বিমানবন্দরের কাস্টমসে বহিরাগত যাত্রীদের করোনা সংবর্ধনা।

চিন-সহ বিভিন্ন দেশে ছিল শক্ত লকডাউন। ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকায় প্রথমে সব ছিল ঢিলেঢালা। ফলে খুব দ্রুত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়, বহু রোগী মারাও যান। রাশিয়ায় খুব টাইটফিট লকডাউন প্রথমে ছিল না। এরা চেষ্টা করেছে পিক দ্রুত আসতে না দিয়ে সেটাকে বিলম্বিত করতে। তাতে যেমন নতুন হাসপাতাল গড়ার সময় পাওয়া যাবে তেমনই রোগীর ভিড় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলে চিকিৎসা দেওয়ায় সুবিধা হবে। একটা সময় পর্যন্ত মনে হয়েছিল, এরা বেশ ভালভাবেই করোনাকে সামলাতে পারবে, তবে সেটা শেষপর্যন্ত হল না। এখানে মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ সময় লৌহ যবনিকার আড়ালে থেকে এখন যেকোনও বিধিনিষেধকে এরা আর ভাল চোখে দেখে না। তাই প্রথম দিকে সরকার তেমন কড়াকড়ি ব্যবস্থা অবলম্বন করেনি, তবে জনগণকে অনুরোধ করেছে, এ সময়ে বাইরে, বিশেষ করে যে সমস্ত দেশ করোনা আক্রান্ত, সেখানে না যেতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ফলে লাখখানেক লোক নববর্ষের ছুটিতে বিভিন্ন দেশে বেড়াতে যান। বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অনেকেই সেখানে আটকে পড়েন। আর যারা ফিরে এলেন তারা সবাই ছিলেন পোটেনশিয়াল করোনা বাহক। অনেকেই আসতে পারেননি। অনেক দেশ তাদের হোটেলে রাখতে অস্বীকার করে। এখানেও সরকারকে এগিয়ে আসতে হয়।

মস্কোর রাস্তায় পাস চেক।

প্রথম দিকে এদের মূল নজর ছিল সেইসব মানুষের দিকে যারা বাইরে থেকে দেশে ফিরছিলেন, বিশেষ করে চিন, ইতালি, স্পেন, আমেরিকা-সহ করোনা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগত নাগরিকদের দিকে। ওই সময় যাদের জ্বর, কাশি ইত্যাদি লক্ষণ ছিল তাদের হয় সরকারি ব্যবস্থায় আলাদা রাখা হয় আর নয়তো বলা হয় তারা যেন নিজেরাই গৃহবন্দি থাকেন। তখনও পর্যাপ্ত পরিমাণ কিট্‌স ছিল না। সব মিলিয়ে যেটুকু ব্যবস্থা তার প্রায় পুরোটাই ছিল মানুষের শুভবুদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। তবে সেটা যে সফল ছিল তা বলা চলে না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক কাজকর্ম করতে থাকে। ফলে দিনের পর দিন বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। প্রথম দিকে সেটা ছিল মূলত মস্কোয়। এখনও মোট করোনা আক্রান্তের অর্ধেকের বেশি মস্কোবাসী।
যখন মস্কোয় করোনা অপেক্ষাকৃত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে তখন ধীরে ধীরে সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। একের পর এক বন্ধ হতে থাকে কলকারখানা, সুপারমার্কেট ইত্যাদি। ফলে রাশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত লোকজন ফিরতে শুরু করেন নিজেদের শহরে। তাদের সঙ্গে সঙ্গে করোনা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য জায়গায়। এখানে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে তা হল করোনা সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব। চিন যেভাবে তার নাগরিকদের ঘরে থাকতে বাধ্য করেছিল, রাশিয়ায় সেটা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া চিনের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই রাশিয়ার, বিশেষ করে ২০১৪ থেকে টানা অবরোধ এদের অর্থনীতিকে অনেকটাই ঘায়েল করেছে। যদিও এই সুযোগে রাশিয়া অনেক ব্যাপারে স্বাবলম্বী হতে পেরেছে। আগে যেসব জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি হত তার অনেকটাই এখন দেশে তৈরি হচ্ছে। কৃষিতে, বিশেষ করে শস্য উৎপাদনে রাশিয়া আমদানিকারী দেশ থেকে রপ্তানিকারী দেশে পরিণত হয়েছে। তাই ধীরে ধীরে গতি পাওয়া অর্থনীতির চাকা বন্ধ করার ব্যাপারটা সোজা ছিল না। আর ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার চাপ। কেন, না যেকোনও ব্যর্থতাকেই তারা পুতিনের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে প্রচার চালিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টিতে ওঁত পেতে বসে থাকে। সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল সাবধানে, অগ্রপশ্চাৎ সব ভেবে।

হাসপাতালে করোনা যোদ্ধারা।

যদিও শুরুতেই এরা লকডাউনে চলে যায়নি, তবুও কিছু কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এরা অনেক দেশের মতো করোনাভাইরাসকে হালকাভাবে নেয়নি। দেশের সবাইকে বাইরে না যেতে বলার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার কথাও বলে। একটু একটু করে শুরু হয় টেস্ট, মূলত যাদের উপসর্গ ছিল তাদের। এর প্রধান কারণ হল তখন কিট পর্যাপ্ত ছিল না। তাই সিলেক্টিভ টেস্ট।
আমি ডাক্তার নই, স্বাস্থ্যকর্মী নই। পদার্থবিদ্যা, বিশেষ করে কসমোলজি আমার গবেষণার বিষয়। তাই গাণিতিক লজিক থেকেই এসব বোঝার বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। সিলেক্টিভ টেস্টের একটা কারণ হল ঠিক কত লোক অসুস্থ হতে পারে তার একটা ছবি পাওয়া। এটা অনেকটা জনমত সমীক্ষার মতো। জনমত সমীক্ষায় চেষ্টা করা হয় যতদূর সম্ভব বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নিতে। এক্ষেত্রে হয়েছে যারা রিস্ক গ্রুপে তাদের। কেন, না তাতে সবচেয়ে বেশি কত লোক অসুস্থ হতে পারে তার চিত্র পাওয়া যায়। আর সেভাবে প্রস্তুতি নিলে সবাইকে চিকিৎসা দেওয়ার সুবিধা হয়। ইতালি, স্পেন বা আমেরিকায় এত মৃত্যুর কারণ সময়মতো সবাইকে চিকিৎসা না দিতে পারা। রাশিয়ার সুবিধা ছিল, সে বেশ কিছুদিন সময় পেয়েছিল নিজেকে প্রস্তুত করার। তার সামনে ছিল চিন, ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা-সহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ। একটাই প্রচেষ্টা ছিল— যতদূর সম্ভব দেরিতে পিক টাইম সরিয়ে দেওয়া। কারণ একটাই। এতে সময় পাওয়া যাবে নিজেদের প্রস্তুত করার।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অপটিমাইজেশনের দোহাই দিয়ে অনেক হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছিল। এপিডেমি নিয়ে যারা কাজ করতেন তাদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক করা হয়েছিল। মোট কথা দেশ এ ধরনের সংকটের জন্য প্রস্তুত ছিল না। দরকার ছিল কয়েক মাস সময় যাতে নতুন ইনফেকশন সেন্টার গড়ে তোলা যায়, পুরনো হাসপাতালগুলোকে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য সাজানো যায়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ৯০ হাজার নতুন বেড তৈরি করার। সেটা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। নতুন বেড হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনী বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মীরা লড়ছেন করোনার সঙ্গে ফ্রন্ট লাইনে আর সেনা পালন করছে মূল সরবরাহকারীর ভূমিকা।
বারবার আমি এদের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড দেখে অবাক হই। প্রতিবছর শীতের শেষে শুরু হয় এদের কাজ। এ দেশে অধিকাংশ নদী পড়ে উত্তর সাগরে। যেহেতু উত্তরে বরফ গলে অনেক পরে তাই অপেক্ষাকৃত দক্ষিণে গলে যাওয়া বরফ সাগরে যাওয়ার পথে বাধা পায়, শুরু হয় বন্যা। তাই প্রতিবছর ফাইটার বিমান থেকে বোমা ফেলে বা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নদীর মুখ পরিষ্কার করতে হয় আর্মিকে। প্রতিবছর রাশিয়ার বিশাল অরণ্য আগুনে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যায়। কারা এগিয়ে আসে? সেনাবাহিনী। এবার করোনার আক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত গতিতে হাসপাতাল গড়ল কারা? সেনাবাহিনী। সবচেয়ে বড়কথা, এসব সাময়িক ব্যবস্থা নয়। ভবিষ্যতেও, করোনা-পরবর্তী রাশিয়ার মানুষকে নতুন গড়ে তোলা ১৬টি সেন্টার চিকিৎসা দেবে।

মস্কো সিটি।

প্রথম দিকে এখানে করোনা আক্রান্ত কম ছিল। অনেকের ধারণা ছিল যেহেতু এখানে শিশুদের গড়ে কিছু টিকা (টিবি ইত্যাদি রোগের) দেওয়া হয়, সেটা হয়তো করোনার বিরুদ্ধে কিছু ইমিউনিটি তৈরি করে। এটা শুধু রাশিয়ায় নয়, পর্তুগাল এবং পূর্ব ইউরোপের সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে দেখা গিয়েছে। তবে সেটা শুধুই অনুমান, এর বাস্তব ভিত্তি কতটুকু কে জানে। ইদানীং অনেক বাবা-মা শিশুদের টিকা দিতে আগ্রহী নন। এ ঘটনা তাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করাবে বলে আশা করা যায়।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, প্রথম থেকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কতটা সফল বা কার্যকর। আসলে যেকোনও জিনিসের সাফল্য বা ব্যর্থতার বিচার করা যায় শুধু সেটা পুরোপুরি শেষ হলে, যাকে ক্রিকেটের ভাষায় বলে শেষ বলটি করার পরে। এর আগে পর্যন্ত সবই সম্ভাবনা, মানে দুটো টিমের সম্ভাব্য জয়-পরাজয় নিয়ে কথা বলা। এখানেও তাই। যতদিন পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা কম ছিল ততদিন আশা ছিল যে এ দেশে করোনার আক্রমণ ব্যাপক হবে না, যদিও দেশ প্রথম থেকেই সে জন্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। কারণ, চিনের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত, রাশিয়া আকারের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ, এর প্রতিবেশী দেশ সবচেয়ে বেশি— যাদের কিছু কিছু হয় বিভিন্ন দিকে পিছিয়েপড়া নয়তো যুদ্ধবিগ্রহে বিধ্বস্ত। এই দেশ ব্যাপক পরিমাণ বিদেশি, বিশেষ করে চিন, ভিয়েতনাম ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মানুষের কর্মস্থল। তা ছাড়া মনে রাখা দরকার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৬ মিলিয়ন লোক হারায়। তারপরে নব্বইয়ের দশকের ব্যাপক পরিবর্তন। যার ফলে জনসংখ্যার ঘাটতি এখানে সবসময়ই ছিল। বিগত কয়েক বছরে সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে জনসংখ্যা বাড়াতে, প্রতিটি সন্তানের জন্য বিরাট অঙ্কের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে পরিবারগুলোকে। তাই করোনাকে না ঠেকানো মানে নিজেদের বিগত দশকের সমস্ত চেষ্টাকে, সমস্ত কার্যক্রমকে বানের জলে ভাসিয়ে দেওয়া। তাই সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসেব পরে। তা ছাড়া যদি করোনা একজন মানুষকেও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়, সেটাও এক অর্থে ব্যর্থতা। তবে পৃথিবীর সব কিছুই আপেক্ষিক। তাই সাফল্য বা ব্যর্থতার হিসেব কষা যায় শুধু অন্য দেশগুলোর সাফল্য বা ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা করে। তবে সেটাও খুব সুখকর বা সহজ নয়।

শুধু কুকুর-বিড়াল প্রভৃতি পোষ্যের প্রয়োজনে ঘোরাফেরা করা যায় মস্কোয়। ছবি: ক্রিস্টিনা সাহা

আগেই বলেছি, অনেকদিন পর্যন্ত এদের করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। যদিও এটা বোঝা যাচ্ছিল টেস্ট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনুপাতিক হারে বাড়বে করোনা পজিটিভের সংখ্যা। এপ্রিলের অনেকটা সময় পর্যন্ত করোনার দৈনিক বৃদ্ধি ছিল ৫ থেকে ৬ হাজার। একসময় সেটা কমতেও শুরু করে। সবাই ভাবতে শুরু করে, এই তো বেসলাইনে পৌঁছে গেছি। আর একটু অপেক্ষা করলেই শুরু হবে নিম্নগতি। আর কয়েকটা দিন মাত্র। তবে বাধ সাধল আবহাওয়া। এ দেশে সেপ্টেম্বর থেকে সূর্য অমাবস্যার চাঁদ হয়ে যায়। সারা দেশ হা-পিত্যেশ করে অপেক্ষা করে একটুকরো সূর্যের জন্য। এবার শীত আসি আসি করেও আসেনি, শূন্যের এদিক-সেদিকেই ঘোরাফেরা করেছে কয়েক মাস। তবে মার্চ বা এপ্রিলে মোটেই বসন্ত ছিল না। না ঠান্ডা না গরমের এক অদ্ভুত ককটেল। ফলে কাজেকর্মে বাইরে গেলেও ঠিক ঘুরতে যাওয়ার মতো আবহাওয়া ছিল না। সেটা অঘোষিত লকডাউনকে কিছুটা হলেও সফল করেছে। তবে মে মাসের শুরুতে সবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সূর্য বেরিয়ে আসে মেঘের আড়াল থেকে। সরকার বাধ্য হয় লকডাউন শক্তভাবে প্রয়োগ করতে। শুরু হয় পাস সিস্টেম।
তবে শুরুটা হয় অদূরদর্শিতার মধ্য দিয়ে। প্রথম দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মূলত হাতে হাতে চেক করতে থাকে পাস, আশপাশের শহর ও গ্রাম থেকে মস্কো প্রবেশের পথে, মেট্রো স্টেশনে জমে মানুষের ভিড়। সেদিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয় এর। পরের দিন থেকে সব নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে। কম্পিউটার প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে মস্কোর রাস্তার মানুষের গতিবিধি। তবে এর মধ্যে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। নতুন করে বাড়তে থাকে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২ মে থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ হাজার করে নতুন রোগী সনাক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অসুস্থ হয়েছেন, কেউ কেউ আবার সুস্থ হয়ে কাজেও ফিরেছেন। করোনা নিয়ে এরা যে লুকোচুরি খেলছে না এসব খবর সেই ধারণাই দেয়। যদিও বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে পশ্চিমি দেশগুলো ধরেই নেয় যে, এরা সমস্ত খবর প্রকাশ করছে না। আমার নিজের বিশ্বাস, করোনার বিরুদ্ধে এরা বলতে গেলে সর্বাত্মক যুদ্ধে নেমেছে। এই যুদ্ধে জয় নির্ভর করছে কতটা সঠিকভাবে এরা তথ্য সামলাবে তার ওপর আর মানুষ কতটা সেটাকে শুধু বিশ্বাসই করবে না, সেই অনুযায়ী সাবধানতা অবলম্বন করবে তার ওপর। তাই এখানে লুকোচুরি করা আর যাই হোক, এই যুদ্ধে জয়ের পথে সহযোগী হবে না। পশ্চিমি মাধ্যমের ভাষায় ‘লুকোচুরি’ মানে অসুস্থ বা মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো। সেটা করা মানে সাধারণ মানুষ লকডাউন বা ঘরে থাকার নির্দেশকে হালকাভাবে নেবেন। তাই যারা এভাবে বলে তারা আর যাই হোক, লজিক্যালি চিন্তা করে না। তাদের একটাই উদ্দেশ্য, সত্য-মিথ্যা দিয়ে রুশ সরকারের সমস্ত উদ্যোগকে ছোট করে দেখা এবং এটা করে করোনা নিয়ন্ত্রণে এখনও পর্যন্ত তাদের নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা।
বিগত কয়েকদিন যাবৎ অনেকেই দেশ থেকে জানতে চাইছেন, হঠাৎ এত হুহু করে করোনা পজিটিভ মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণ কী? আগেই বলেছি, প্রথম দিকে এরা টেস্ট করেছে মূলত যাদের উপসর্গ ছিল তাদের আর যে গ্রুপ রিস্ক জোনে ছিল তাদের। লক্ষ্য ছিল সেখান থেকে যে স্ট্যাটিস্টিক্যাল চিত্র পাওয়া যাবে তার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের প্রস্তুত করা। সেক্ষেত্রে এরা সফল। তখন থেকেই বলা হচ্ছিল, ধীরে ধীরে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়বে। তবে যে ব্যাপারটা এদের টেস্ট বাড়াতে বাধ্য করেছে সেটা হল প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের কোনও লক্ষণ ছাড়াই অসুস্থ হওয়ার ঘটনা। টেস্টের মাধ্যমে প্রচুর মানুষের দেহে অ্যান্টিবডি ধরা পড়েছে। এর অর্থ হল, প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ কোনওরকম উপসর্গ ছাড়াই শুধু অসুস্থই হননি, আরোগ্যও লাভ করেছেন। এটা একদিকে যেমন খুশির খবর, অন্যদিকে তেমনি ভয়ের ব্যাপারও। এর মানে হল, আপাতদৃষ্টিতে একজন সুস্থ মানুষ করোনা পজিটিভ হতে পারেন। ফলে তার নিজের কোনও ক্ষতি না হলেও তিনি আশপাশের অনেককেই সংক্রামিত করতে পারেন। তাই এই সুপ্ত রোগীদের চিহ্নিত করা জরুরি হয়ে পড়ে, শুরু হয় ব্যাপক টেস্ট। ১৩ মে পর্যন্ত টেস্টের সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ, এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ২,৪২,২৭১ জন। উল্লেখ করা যেতে পারে, এক্ষেত্রে যারা শুধু এই মুহূর্তে করোনা পজিটিভ তাদের কথাই বলা হচ্ছে না। যারা হাসপাতালে যাননি, মানে কোনওরকম উপসর্গ ছাড়াই যারা অসুস্থ ছিলেন অর্থাৎ যাদের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে তাদেরও ধরা হয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ৪৮,০০৩ জন আর মারা গিয়েছেন ২,২১২ জন। তবে এখানেও নানা প্রশ্ন আছে। (চলবে)

লেখক গবেষক ও শিক্ষক, জয়েন্ট ইন্সটিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ, দুবনা, রাশিয়া

পড়ুন দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি

আমরা আশার দুয়ারে বান্দা খাটি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More