বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগই শুরুর ফুরসৎ পায়নি সরকার, অথচ ইন্টার্নদের ব্যবস্থা হয়ে গেল!

সৌমেন দে

বলা হয়, শিক্ষা মানুষকে শিক্ষিত করে তোলে এবং সেই শিক্ষাই আনে চেতনা। আর চেতনা থেকেই আসে বিপ্লব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে সব চেয়ে অবহেলিত বিষয়টি বোধ হয় এই শিক্ষাই।

কিছু দিন আগেই প্রকাশিত একটি তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯০ হাজারের বেশি এমন স্কুল আছে, যেখানে সর্বসাকুল্যে শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র এক জন!

এ তো গেল দেশের সার্বিক চিত্র। কিন্তু রাজ্যের চিত্রটা আরো ভয়াবহ।

বিগত কয়েক বছর ধরেই রাজ্যের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী প্রায় নিয়ম করে বলে আসছেন, তাঁর সরকার ৬৮ লক্ষ চাকরি দিয়েছেন। কিন্তু কে কে পেল সেই চাকরি, কারা আছেন সেই চাকরি প্রাপ্তের তালিকায়– তা কেউই জানেন না। যদিও সেই তিনিই আবার কেন ৬৮ লাখ চাকরি দেওয়ার পরেও চপ-মুড়ি ভেজে ব্যবসা করার পরামর্শ দেন, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। এ পর্যন্তও না হয় সব ঠিক ছিল।

কিন্তু আজ যেন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল এ সব কিছুর। মাননীয়া ঘোষণা করলেন, স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকলেই তাদের দু’হাজার বা আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে ইন্টার্ন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হবে! এমনকী মিলবে সার্টিফিকেটও, যা দেখিয়ে তাঁরা পরে আবার চাকরি পাবেন!

এ তো ভয়ানক প্রবণতা!

চোখের সামনে সারা রাজ্য জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি শিক্ষক শিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে প্রতি বছর বিপুল অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি অর্জন করছেন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। সকলের চোখে স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার, সমাজ গড়ার। আসলে নিন্ম-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষেরা আজও স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষক শিক্ষিকা হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।

আসলে এই স্বপ্ন দেখার বিলাসিতা তাঁরা অর্জন করেছেন, ৩৪ বছরের “বাম অপশাসন” দেখে। বাম সরকার ১৯৯৮ থেকে ২০১১ অবধি ১১টা এসএসসি-র মাধ্যমে এক লাখ ৩৫ হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগ করেছিল। তাই স্থায়ী চাকরি পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম ছিল এসএসসি-ই।

কিন্তু পালাবদলের পরে স্কুল সার্ভিস কমিশনেরও বদল হল। চার বছরের সরকার এক বার পরীক্ষা নিয়েছে, কিন্তু
তা-ও দায়সারা ভাবে। নিয়েছে একাধিক তুঘলকি সিদ্ধান্ত। তার উপরে এসএসসি বা প্রাইমারি– কোনও নিয়োগ নীতিতেই স্বচ্ছতা নেই। প্রাইমারির মতো নিয়োগে কোনও ওয়েটিং লিস্ট নেই। ঠিক কত জনকে ডেকেছেন, তার কোনও হিসেব নেই, আর কোনও দিন হবে বলেও মনে হয় না। যখন যাকে খুশি এসএমএস করে ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়ে দিচ্ছে সরকার। এসএসসি-র মতো নিয়োগে একটা বা দু’টো বিষয়ে নয়, একাধিক বিষয়ের একাধিক উত্তরপত্র ভুলে ভরা। উচ্চ প্রাথমিকের  পরীক্ষা হয় ১৬ আগস্ট ২০১৫। এই চার বছরে এখনও নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার ফুরসৎ পায়নি সরকার। অথচ ইন্টার্ন নিয়োগ ভেবে ফেলা গেল আচমকা!

সম্প্রতি দাঁড়িভিটা-কাণ্ডও প্রমাণ করে দিয়েছে, এই সরকার শিক্ষার যত্নে কতটা উদাসীন। শূন্য পদ না থাকা সত্ত্বেও জোর করে শূন্যপদ তৈরি করে একরাশ বিপত্তি বাড়াল শিক্ষা দফতর। যার খেসারত হিসেবে গেল তরতাজা তিন যুবকের প্রাণ।

আর এত কিছুর পরে, আজ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বলে দিলেন, দু’আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে ইনটার্ন রাখবেন স্কুলে পড়ানোর জন্য! এ দিকে কিন্তু ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের বিধায়ক ও মন্ত্রীদের মাইনে বেড়েছে হুড়মুড়িয়ে। আর রাজ্যের তরুণ-তরুণীর শিক্ষকতার স্বপ্ন কিনে নিতে চাইছেন দু’আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে!

এমনিতেই বেসরকারি স্কুলের বাড়বাড়ন্তের এই সময়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আগলে রাখা উচিত। তার বদলে এই সব সিদ্ধান্তে মানুষের বিশ্বাসভঙ্গ হবে সরকারি স্কুলের উপর। ফলে শিক্ষায় ১০০% বেসরকারিকরণ সম্পন্ন হবে। খুন হবে লাখ লাখ বেকারের স্বপ্ন। দলদাস তৈরি হবেন তরুণ-তরুণীর একটা বড় অংশ, যাঁরা সরকারের উপরে নির্ভরশীল হয়ে জীবনযাপন করবেন। আসলে সরকারের লক্ষ্য হল, যুবশক্তিকে নষ্ট করা।

মাঝে মাঝে মনে হয়, অদৃশ্য কোনও শক্তি বোধ হয় বঙ্গবাসীকে শাস্তি দিচ্ছে! কারণ ৩৪ বছরের ‘জগদ্দল’কে সরাতে গিয়ে
আজ রাজ্যে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছেন রাজ্যবাসীই। কিন্তু তাঁরা মনে রাখেননি, বিষবৃক্ষ লাগানো সহজ। কিন্তু তাকে উপড়ে ফেলা কঠিন।

তাই বর্তমান শিক্ষিত সমাজের বুকে যে গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছে, তা সহজে সারবে না। মাননীয়াকে তার জবাব দিতেই হবে।

এখনও সময় আছে, দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য– এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে ‘কড়া হাতে’ দমন করুন। ভাল পরিষেবা দিন। নিয়োগনীতিতে স্বচ্ছতা আনুন, নিয়োগে ধারাবাহিকতা আনুন।

দেখবেন, সত্যিই বাংলা হাসবে! হাসবে বাংলার মানুষ।

Comments are closed.