শনিবার, মে ২৫

এ বার তোমার সঙ্গে হলো আলাপ

সোহিনী চক্রবর্তী

কিলোমিটারের দূরত্ব অনেকটা। এই গ্রহে দূরত্বের সীমা ভেঙে দেওয়ার জন্য যা যা আছে তার মধ্যে গান অবশ্যই অন্যতম। আর সেই গানই কলকাতার সঙ্গে মিলিয়ে দিলো কুয়েতকে। যিনি মেলালেন, তাঁর নাম দেবদীপ মুখোপাধ্যায়

গত এক মাসে মহানগর থেকে শহরতলি সর্বত্র পরিচিত দেবদীপ। না হওয়া আলাপের লিরিক দিয়েই আলাপ জমানোর হিড়িক তুলেছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তাঁর গানের ভিউয়ারশিপ। জেন ওয়াইয়ের এই তারকার সঙ্গেই আড্ডায় বসেছিল thewall.in

কথায় কথায় জানা গেল, দেবদীপের জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন শিলাজিৎ। দেবদীপ জানালো, “বোর্ড এক্সামের আগের ছুটিতে ল্যাব ফাঁকি দিয়ে শিলাদার কাছে যেতাম। গান-বাজনা করতে। তখনই বুঝেছিলাম এটাই হবে আমার দ্বারা। যদিও প্রথমদিকে মারাত্মক বেসুরো গাইতাম আমি। (প্রচন্ড হেসে) শিলাদাকে শিলাদারই গানের সুর ভুলিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর দাদাই বললো গানবাজনাটা শেখ। চর্চা কর। ইনস্ট্রুমেন্ট শেখ। ব্যাস ওটাই শুরু।”

গায়ক হবে এটাই কি ভেবেছিলে?

>নাহ। এমন কোনও ভাবনা ছিল না। ছোট বেলায় তো বুঝতেই পারতাম না কি হবো। ক্লাস ফাইভে স্কুলেজিজ্ঞাসা করেছিল বড় হয়ে কী হতে চাও? প্রিয় বান্ধবী উত্তর দিয়েছিলো ‘অ্যাস্ট্রোনট।’ আমিও ওটাই বলেছিলাম। তার  পর ধীরে ধীরে বয়ঃসন্ধিতে আসা। শিলাজিতের গানের প্রেমে পড়া। সব গান তখন মুখস্থ। গুরুর গান মুখস্থ মানে সেটাই একটা ব্যাপার। বেশ একটা গর্ব ছিল জানো সেই সময়। বলা ভালো শিলাদাই আমার গানের জগতে আসার ইন্সপিরেশন।

মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে গায়ক হবে….বাড়ির লোক সাপোর্ট করেছিল?

>প্রথমে তো একেবারেই নয়। পিসিরা বাবাকে বলতো ‘গান গাইবে? গান গেয়ে কী হবে?’ তার পর একবার গানের সূত্রেই আমি আমেরিকায় যাই। ব্যাস ওতেই টনক নড়ে সবার। ভাবটা এমন যে, আরিব্বাস এ গান গেয়ে আমেরিকা চলে গেলো। আর আম বাঙালির কাছে আমেরিকা যাওয়াটা এখনও একটা বিশাল ব্যাপার। তবে হ্যাঁ,মা-বাবা প্রথমে একটু আপত্তি করলেও পরে পাশেই থেকেছে। এখন তো বাবা সারাদিন ইউটিউব খুলে দেখেই চলেছে আমার গানের ভিউ কত বাড়লো (প্রচন্ড হাসি)।

ইউটিউবে গানের ভিউ সাড়ে তিন লাখ পেরিয়ে গিয়েছে। কী বলবে?

>ভীষণ ভালো লাগছে। এতো মানুষ গানটা শুনছেন। অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ভালোবাসা জানাচ্ছেন। সত্যিই আমি খুব খুব খুশি। আমি তো আনন্দ করে গানটা গাই। সবার জন্য গান বানাই। সবার ভালো লেগেছে এটাই আমার কাছে ইম্পরট্যান্ট। আর হ্যাঁ এর জন্য অবশ্যই উপলদা, রুফটপ কনসার্ট এবং আমার সমস্ত মিউজিসিয়ানদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সবাই না থাকলে এই ম্যাজিকটা হতোই না।

নিজের স্ট্রাগল পিরিয়ডটা মনে পড়ে?

>হ্যাঁ মনে তো পড়েই। প্রথম যখন অ্যালবাম তৈরী করতে যাই তখন রীতিমতো বিভিন্ন মিউজিক কোম্পানির দোরে দোরে ঘুরেছিলাম। শহরের এক নামজাদা কোম্পানি সে সময় আমার রেকর্ড জমা নেয়। বেশ কিছুদিন পর বলে ওটা নাকি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমায় আরেকবার রেকর্ড জমা দিতে বলা হয়। সেটাই করি। কিন্তু এই ঘটনার পর বেশ কিছু মাস কেটে গেলেও ওই কোম্পানি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। উল্টে বলা হয় আমার রেকর্ডটা নাকি হারিয়ে গিয়েছে। বেসিক্যালি তখন আমার হাতে আর কিছুই নেই। ভেঙে পড়েছিলাম। তবে ওদের বলেছিলাম আজকেই রেকর্ডটা যেভাবেই হোক খুঁজে বের করে রাখবেন। আমি নিয়ে যাবো। গিয়ে নিয়েও এসেছিলাম। ওদের সঙ্গে কাজটা আমি আর করিনি।

‘আলাপ’ বানানোর সময় ভেবেছিলে এইভাবে হিট হবে?

>(আলতো হেসে) হ্যাঁ ভেবেছিলাম। আসলে ‘হয়নি আলাপ’ আমি না লিখলে আর কেউ লিখতো না। এটা অহংকার বা ওভারকনফিডেন্স নয়। আসলে আমি স্বপ্ন দেখতাম যে একটা খোলা মাঠে গাইছি। সামনে ৫০ হাজারের বেশি দর্শক সেই সুরে মাথা দোলাচ্ছেন, হাত নাড়াচ্ছেন। এই স্বপ্নটা আমায় তাড়া করে বেড়াতো। খোলা মাঠের কনসার্টটা এখনও হয়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যে আমি এতো মানুষের কাছে পৌঁছতে পেরেছি এটাই আমার কাছে বিশাল ব্যাপার।

‘আলাপ’ লিখেছিলে কার কথা ভেবে? প্রেমিকা?

>না না। প্রেমিকা আমার আছে। তবে এই গানটা একদম অন্য একটা ভাবনা থেকে আসে। আমি বাস-ট্রেন-অটো-মেট্রো যেখানেই ট্রাভেল করতাম তখন অনেককে দেখেই আমার ভালোলাগতো। শুধু আমার কেন বেশিরভাগ মানুষেরই লাগে। তবে এটা কিন্তু নিছকই ভালোলাগা। প্লিজ অন্যভাবে নিও না। কিন্তু দেখো, এই ভালোলাগাটা তো তাৎক্ষণিক। সেও অটো থেকে নেমে গেলো আমার ভালো লাগাও উড়ে গেলো। কিন্তু আমার তো কত গল্প আছে ওই মানুষটাকে বলার। সেই মানুষটারও রয়েছে অনেক গল্প। কিন্তু কিছুই তো বলা হয়ে ওঠে না। এই অদ্ভুত ব্যাপারটা আমি খুব ফিল করতাম। আর সেখান থেকেই জন্ম ‘তখনও তো তোমার আমার হয়নি আলাপ’-এর।

এখনো পর্যন্ত নিজের সেরা কাজ কোনটা?

>নিজের সব কাজই তো ভালোলাগে। আসলে আমি তো খুন আনন্দ করেই গানটা লিখি। হইহই করে গান গাই। তাই সব গানই আমার কাছে ভালো। তবে ‘প্রিয় বন্ধু’ আমার একটু কাছের। এই গানটা লিখেছিলাম আমার সেই সময়ের বান্ধবীর জন্য। সবচেয়ে মজার কথা হলো গানটা তৈরির পর ভীষণ ভীষণ আনন্দ হয়েছিল। জাস্ট ভাবো তুমি কারোর জন্য গান বানাচ্ছ, একদম নিজস্ব ক্রিয়েশন। ব্যাপারটাই ভীষণ শান্তির। তবে আমি কিন্তু বেশ পাগলের মতো উদ্ভট ভাবেও ভাবি। (পাশের টেবিলে তাকিয়ে) এই দেখো এটা আমার বাইকের হেলমেট তো। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মাথায় এলো এটাকে আমি বাইকের ডিম ভাবতেই পারি। ভাবতে পারি এই ডিম ফুটে বেরোবে আরেকটা বাইকের ছানা।

তোমার কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে দেবদীপের প্রেম জীবন বেশ রঙিন…..

>হ্যাঁ একদমই তাই। প্রেম আমার জীবনে এসেছে বহুবার। ভেঙ্গেওছে বারবার। আর ভালোবাসা ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণাটা আর পাঁচ জনের মতোই আমাকেও বারবার ভেঙেছে। কিন্তু মজার ব্যাপার কি জানো, আমি ওই যন্ত্রণাতেও শান্তি খুঁজতাম। আনন্দ খুঁজতাম। হয়তো সেই জন্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার একটা করে ভালো গান বানাতে পারতাম। আর তারপর যে কি আরাম…..কি শান্তি পেতাম….উফফ এটা বলে বঝানো যাবে না।

‘হয়নি আলাপ’ দিয়েই সবার সঙ্গে আলাপ জমালে তুমি। দেবদীপের কাছে এখনও অবধি সেরা পাওনা কোনটা?

>এক নয় দুই নয় এক্কেবারে তিনখানা সেরা পাওনা আছে এখন আমার ঝুলিতে। প্রথমত রোজ স্মার্টফোন হাতে নিয়ে আমার বাবা ছেলের গানের ভিউ গুনছেন-এই বিষয়টাই আমি হেব্বি মজা দেয়। দ্বিতীয়, ক’দিন আগেই মেসেঞ্জারে এক মহিলা পাঠিয়েছেন, ‘কুয়েতের রাস্তায় বৃষ্টির রাত/সঙ্গে গাড়িতে বাজছে তোমার গান’। আর সেরা পাওনা হল একটি ছোট্ট মেয়ের গান। আমার পরিচিত গুগলে কর্মরত রাজর্ষি গুহ নামের এক ব্যক্তি একটা ভিডিও পাঠিয়েছেন। তাঁর পুচকে মেয়ে মাথা দুলিয়ে ‘হয়নি আলাপ’ গাইছে। আওয়াজটা খুব পরিষ্কার ভাবে ফোনে আসেনি। তবে যান্ত্রিক ত্রুটিতেও আমি বেশ বুঝতে পেরেছি ওই পুঁচকের কিন্তু গানটা বেশ পছন্দ হয়েছে। তাই পাওনার তালিকায় আমার কাছে এটাই সেরা।

সিনেমায় প্লেব্যাক করা নিয়ে কোনও ভাবনা রয়েছে?

>আছে। ইনফ্যাক্ট ছোটোখাটো হলেও বেশ কয়েকটা কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। অপেক্ষায় রয়েছি বিগ ব্রেকের। আর আমার কোনো ছুৎমার্গ নেই ভাই। যে ভালোভাবে আমার গান নেবে আমি তার সঙ্গেই কাজ করতে রাজি। তবে এখন কিন্তু ‘হয়নি আলাপ’-টাই আমার কাছে একটা বড়ো ব্রেক। এতো ভালোবাসা পাবো এটা সত্যিই ভাবিনি। এতো লোকের কাছে আমার গান পৌঁছেছে এটাই সবচেয়ে আনন্দের।

 

 

Shares

Leave A Reply