বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

সরল কাহিনির প্রতি অনীহা নিয়েই মৃণাল সেন পৌঁছেছেন বিশিষ্টতায়, তৈরি করেছেন নিজস্ব ঘরানা

সোমেশ্বর ভৌমিক

কাব্যগ্রন্থ ‘পদাতিক’-এর কবি বলেছিলেন, “রাস্তাই একমাত্র রাস্তা।” চলচ্চিত্র ‘পদাতিক’-এর সদ্যপ্রয়াত পরিচালকের বিশ্বাস ছিল, “সিনেমার বিকল্প সিনেমাই।” হাতে-কলমে সিনেমা তৈরির জগত থেকে ছুটি নিয়েছিলেন বহু দিন। কিন্তু খবর রাখতেন সব কিছুর। আধুনিক সিনেমার প্রযুক্তিসর্বস্ব রূপ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বারবার। সেই উপলব্ধিরই প্রকাশ এই বাক্য।

তাঁর সমসাময়িক কিংবা উত্তরসূরী পরিচালকদের তৈরি কাহিনি চিত্রের আদল থেকে মৃণাল সেনের তৈরি কাহিনি চিত্রের আদল প্রথম থেকেই আলাদা। তাঁর ছবিগুলি কাহিনি নির্ভর হয়েও হয়ে ওঠেনি গতানুগতিক কাহিনি চিত্র। কথকতার আকর্ষণ বা ঘটনার চাপকে সযত্নে এড়িয়ে মৃণাল সেন চলে গেছেন কাহিনির এক অন্য মহলে। সেটাকে বলা চলে, কাহিনির অন্দরমহল। কাহিনি সেখানে নিয়মিত অগ্রগতির বদলে ঘুরে বেড়িয়েছে নানা অনিয়মিত প্যাটার্নে। নির্ভর করতে চেয়েছে চরিত্রগুলির অনুভূতির ওপর। কাহিনির গৌরবে গরীয়ান ছিল না মৃণাল সেনের কোনও ছবিই। কাহিনি তাঁর ছবিতে কেবল উপলক্ষ। তাঁর ব্যবহৃত চরিত্রগুলিকে ধারণ করার আধার মাত্র।

ছবির প্রয়োজনে সাহিত্যের দিকে যখন উনি মুখ ফেরান, তখন খুব বেশি কিছু দাবি থাকে না তাঁর। ছবির জন্যে সাহিত্যের কাছ থেকে উনি নিয়েছেন কিছু সামাজিক তথ্য, কোনও সামাজিক প্রক্রিয়ার আদলটুকু। তারপর চিত্রনাট্যের হাত ধরে সেই সাহিত্য শুধু রূপান্তরিতই হয়নি, গোত্রান্তরও ঘটেছে তার। সেটি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন চরিত্রের দর্পণ। এমনকী তাদের বকলমে তাঁর নিজের মানসিকতারও প্রতিফলন। কাহিনির প্রান্তিক ভূমিকার জন্যেই তাঁর ছবিতে গুরুত্ব পেয়েছে বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত। কাহিনি নয়, তাঁর ছবিকে ঘনত্ব দিয়েছে এই সব মুহূর্তের সংগঠন এবং সেগুলির বিন্যাস। এই অর্থে মৃণাল সেনের সিনেমা সাহিত্য-নিরপেক্ষ।

অল্প কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া মৃণাল সেন যে-সব কাহিনি সূত্র ব্যবহার করেছেন ছবির প্রয়োজনে, সেগুলির সাহিত্যমূল্য খুব উল্লেখ করার মতো নয়। অন্য দিকে উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে ছবি করার সময়ে মৃণাল সেন ঘটনাগুলিকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। সিনেমায় বদলে দিয়েছেন মূল সাহিত্যের ভাষা। মুন্সী প্রেমচন্দের হিন্দি গল্প ‘কফন’ থেকে তৈরি করেছেন তেলুগু ছবি ‘ওকা উরি কথা’, সুবোধ ঘোষের বাংলা গল্প ‘গোত্রান্তর’ অবলম্বনে হিন্দিতে তৈরি করেছেন ‘এক আধুরি কহানি’, বনফুলের বাংলা গল্প ‘ভুবন সোম’ থেকে একই নামের হিন্দি ছবি অথবা প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাংলা গল্প ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ অবলম্বনে হিন্দিতে ‘খণ্ড্‌হর’।

আসলে মৃণাল সেন চাননি, তাঁর ছবির শিল্পমূল্য আলোচিত হোক ব্যবহৃত কাহিনীর সাহিত্যমূল্যের সমান্তরালে কিংবা প্রতিতুলনায়। নিজে ছিলেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক। জানতেন, সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতার চেয়ে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা কতখানি আলাদা। উচ্চ মানের কোনও সাহিত্য তার প্রবল অভিঘাতে তাঁর ছবির দর্শককে আচ্ছন্ন করুক, এটা তাঁর কাম্য ছিল না। সেই ইচ্ছে থেকেই মৃণাল সেন বর্জন করেছিলেন কাহিনির সাবলীলতা, কথকতার মুন্সিয়ানা। আখ্যানে জটিল বিন্যাস নয়, বিভিন্ন চরিত্রের অনুভব আর উপলব্ধিই হয়ে উঠেছিল তাঁর ছবির মূল চালিকাশক্তি। তবে তাঁর প্রথম জীবনের ছবিতে চরিত্রগুলির উপরে আখ্যানের প্রলেপ ছিল তুলনায় পুরু। সেখান থেকেই চরিত্রগুলির অনুভবের পৃথিবীটাকে খুঁজে নিতে হয়েছে একটু কষ্ট করে। পরে অবশ্য তাঁর ছবিতে আখ্যান-নিরপেক্ষ কক্ষপথেই চরিত্রগুলি বিচরণ করেছে।

প্রথম থেকে যে সেই লক্ষ্যেই মৃণাল সেন এগিয়ে গেছেন, তা হয়তো নয়। কিন্তু তাঁর সিনেমার সংগঠনে কাহিনিকে অতিক্রম করে যাওয়ার একটা প্রবণতা বরাবরই দেখা গেছে। আখ্যানের বাইরেও কী যেন খুঁজেছেন মৃণাল সেন। কাহিনির গুরুত্ব কমিয়ে সিনেমার ফর্ম নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আসলে সেই অনুসন্ধানেরই ফল। সরল কাহিনি বা সুষ্ঠু আখ্যানের প্রতি এই অনীহা নিয়েই মৃণাল সেন পৌঁছে গেছেন বিশিষ্টতায়। তৈরি করেছেন তাঁর নিজস্ব ঘরানা, নিজস্ব শিল্পজগৎ।

নিজেকে ভাঙার খেলা খেলতে খেলতে এক সময়ে মৃণাল সেন চেয়েছিলেন, তাঁর ছবিতে আসুক কবিতার স্পর্শ। ‘অন্তরীণ’ বা ‘জেনেসিস’ ছবি দু’টিতে সেই প্রয়াস ছিল তাঁর। সমাজ ও জীবন সম্পর্কে এক তীব্র যন্ত্রণার বোধ তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল এই দিকে। কিন্তু নানা কারণে তিনি পৌঁছতে পারলেন না তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে।

Shares

Comments are closed.