মাস্কবাদী

মাস্কের বাজার আর বাজারের মাস্ক, দুটোই এখন তুঙ্গে। শপিংমল, রেস্তোরাঁ, সিনেমাহল বন্ধ থাকায় বাঙালির প্রিয়তম বিচরণভূমি এখন বাজার।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সমীপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

করোনা আবহে পাল্টে গেছে নিত্যদিনের যাপন। ক্রমাগত বাড়তে থাকা আক্রান্তের সংখ্যা স্নায়ুর চাপ বাড়াচ্ছে, আরও আঁটোসাঁটো করে বেঁধে নিচ্ছি মাস্ক। ছাপোষা মধ্যবিত্তের করোনা-যুদ্ধে হাতিয়ার বলতে এটাই, তার মাস্ক। স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্যই PPE কিট অপ্রতুল, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে প্রশ্নই ওঠে না। এদিকে কাজকর্ম, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত পুরোদমে শুরু হল বলে। অগত্যা, মাস্ক। মন না চাইলেও মাস্কবাদী হতে হচ্ছে। আরও হাজারটা আপসের মতোই এটাও হয়তো একটা আপস। আগামীদিনে তাই মাস্ক হতে চলেছে নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই আবহে আসুন, চিনি আর ভয় ছাড়া লাল চা সহযোগে একটু মাস্ক-চর্চা হয়ে যাক।

আমার এক রসিক বন্ধু ফেসবুকে প্রশ্ন করেছে, ‘‘আচ্ছা, যাদের দু’কান কাটা তারা মাস্ক পরবে কী করে?’’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দু’কান কাটাদের মাস্ক পরার দুঃসাহসের কথা যদি ছেড়েও দিই, মাস্ক আর কানের যে একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক আছে তা কিন্তু অনস্বীকার্য। দাঁতের মতোই কান থাকতে কানের মর্যাদা বোঝেন না অনেকেই। ছোটবেলায় স্কুলে কষা কানমলা খেয়েছি বিস্তর। অংকের স্যার একটা বিশেষ ভঙ্গিতে ক্যারামের ঘুঁটি স্ট্রাইক করার মতো কানের নরম অংশে জব্বর আঘাত হানতেন। দীর্ঘক্ষণ লাল হয়ে থাকত কান। শাসন তখন অন্যরকম ছিল। তারপর ইংরেজি স্কুল এসে সেসব পাট তুলে দিল। কোভিড নাইন্টিনের অনলাইন ক্লাসের জমানায় স্যারের কানমলা এখন ইতিহাস। এরই মধ্যে ভাল দিক– মাস্ক বাঁধার খুঁটি হিসেবে ফিরে এল কান। যারা চশমা পরেন, তাদের কাজ একটু বেশি। পরার সময় আগে মাস্ক, পরে চশমা, বাড়ি ফিরে খোলার সময় উল্টো। একটু ওলটপালট হলেই অফিসে লেট। যারা দু’চাকার যান ব্যবহার করেন তাদের কসরত আরও একধাপ বেশি। পেট্রোল পাম্পে আগে হেলমেট বাধ্যতামূলক ছিল, এখন মাস্ক। তাহলে কি দুটোই থাকল, নাকি করোনা-কালে প্রথম নিয়মটি অবলুপ্ত হল, সে উত্তর এখনও জানা নেই।

অন্য অনেক ‘বাদী’র মতো মাস্কবাদীরও দু’টি অর্থ। একদল মাস্ক-সর্বস্ব, তাই মাস্কবাদী, আর একদল মাস্ক প্রায় বাদ দিয়েছেন: সেখানে মাস্ক আছে, আবার নেইও। তারাও মাস্ক-বাদী। এই দ্বিতীয় ধরন হলেন তারা, যারা মাস্কটা থুতনির নীচে পরে থাকেন। নাক, মুখ উন্মুক্ত রেখে তারা থুতনির নিচে মাস্ক পাঠিয়ে অবলীলায় ঘুরে বেড়ান। এক্ষেত্রে মাস্ক প্রতীকমাত্র। মাস্ক আছে, তবে যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। এই মাস্ক ব্যবহারকারীরা মাস্ক পরার গুণাগুণ সম্বন্ধে সচেতন, তবে এভাবে থুতনির নীচে ঝুলিয়ে দেওয়ায় যে কানে কিঞ্চিৎ বেশি টান পড়ছে এবং কানদু’টি যে খানিকটা হুঁকোমুখো হ্যাংলার মতো দেখাচ্ছে, তা বোধহয় তারা জানেন না। অথবা, ছোটবেলায় এরা এত কানমলা খেয়েছেন যে, কানে টান পরাটা গা-সওয়া হয়ে আছে এখনও। কেউ কেউ আবার কাজের সময় মাস্কটা এক কানে ঝুলিয়ে রাখেন। এদের ক্ষেত্রে কানটা হ্যাঙ্গার হিসেবে কাজ করে, সে দৃশ্যও মন্দ না।

কিন্তু মাস্ক পরা আমরা শিখলাম কার কাছে? অবশ্যই সেই সব মহান সংগ্রামী মানুষদের কাছে, যাদের ভোট দিয়ে আমরা দেশ চালাতে পাঠিয়েছিলাম। টিভিতে মুখ, সরি, মাস্ক দেখিয়ে তারা আমাদের অনুপ্রাণিত করলেন। তারা দেখালেন কীভাবে মাস্ক পরেও রাজনৈতিক তরজার তুফান তোলা যায়। এও দেখলাম কিছু মাস্কবাদী কেমন ক্যামেরা নিয়ে ত্রাণকার্যে এগিয়ে যান নির্বিবাদে, আবার কিছু মাস্কবাদীকে কেমন সমকাজে ‘‘লকডাউন চলছে, বাড়িতে থাকুন’’ বলে পুলিশ ফেরত পাঠিয়ে দেয়। মাস্কের নানা রঙ আছে বইকী। তবে নজর কেড়েছে মাননীয় দিলীপ ঘোষের মাস্ক। তিনি যখন টিভিতে কথা বলেন, আমি ঠায় চেয়ে থাকি তাঁর মাস্কের দিকে, ঠোঁটের নড়া দেখা যায় না, তবে তাঁর মাস্কের ওপর পদ্মফুলের ওঠানামা দেখতে কী যে ভাল লাগে!

মাস্কের বাজার আর বাজারের মাস্ক, দুটোই তাই এখন তুঙ্গে। শপিংমল, রেস্তোরাঁ, সিনেমাহল বন্ধ থাকায় বাঙালির প্রিয়তম বিচরণভূমি এখন বাজার। তবে সেখানেও যোগাযোগের নানান মাস্কজনিত সমস্যা। আলু চাইলে বাজারের ব্যাগে ঢুকছে মুলো আর ছোলার ডাল চাইলে চালান হচ্ছে কলাইয়ের ডাল। জিজ্ঞেস করতে বিক্রেতা এক মাস্ক হাসি দিয়ে বললেন, ‘‘মাস্ক পরে অতদূর থেকে বলছেন তো। ঠিক ঠাউর করতে পারিনি!’’ এখানেই শেষ নয়। প্রতিবেশী তপনদার সঙ্গে সেদিন বাজারে দেখা অনেকদিন পরে। এক মাস্ক ‘কেমন আছেন?’ মার্কা হাসি নিয়ে তার দিকে চাইলাম, কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে গেলেন তপনদা। যারপরনাই অপমানিত লাগলেও পরে বুঝেছিলাম, মাস্কের জন্য তপনদা আমায় চিনতেই পারেননি। এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে অন্য এক কেরল মডেল। কেরলের একটি সংস্থা মুখের নিচের অংশের ছবি তুলে সেটা মাস্কে প্রিন্ট করে দিচ্ছে। ব্যাস, মাস্ক থাকলেও চিনে নিতে আর ভুল হবে না। মাস্কের ওপর নিজেকে পেস্ট করে তৈরি হয়ে যাচ্ছে অভিনব মুখ কাম মুখোশ।

মুখ আর মুখোশের এই সহাবস্থান চলবে আরও বেশ কিছুদিন। তবু একদিন নিশ্চয়ই উঠে যাবে এই মাস্কের আবরণ। সেদিন আবার সকলে এক হব, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চেনা ছন্দে ফিরব। এই অকালে এটুকু স্বপ্ন দেখাই যায়।

(লেখক গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More