শনিবার, অক্টোবর ১৯

শাস্তি বা সুরক্ষায় নয়, সমাধান নিধনে

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: আসিফা-কাণ্ডের ক্ষত সারার আগেই আঘাত বাড়িয়েছে দিব্যা-কাণ্ড। নিজের মতো করে প্রতিবাদ খুঁজে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ধর্মীয় মেরুকরণ হয়েছে ধর্ষণের। মুসলিম ধর্ষিতা বনাম হিন্দু ধর্ষক, আবার হিন্দু ধর্ষিতা বনাম মুসলিম ধর্ষক। এ যেন খেলার দান! আর দ্রষ্টব্য, প্রতিটা ঘটনায় নাম বদলে বদলে কেমন করে কেবল নতুন ‘কাণ্ড’ হয়ে উঠছে।

খেলা ছাড়া কী-ই বা বলা যায়! নিছক কাণ্ড ছাড়াই বা কী! ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী এ যাবৎ ভারতবর্ষে রিপোর্টেড ধর্ষণের সংখ্যা বছরে চল্লিশ হাজার। যার অর্থ, প্রতি দিন ১১০টা করে ধর্ষণ হয় এ দেশে। অর্থাৎ ঘন্টায় সাড়ে চারটে করে, তথা প্রতি সাড়ে তেরো মিনিটে একটা করে ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট হয়। রিপোর্টের বাইরেরগুলো বাদই দিলাম। চরম ঘৃণ্য একটা অপরাধ যদি এমন দেদার হারে ঘটতে থাকে, তবে মানুষের মনে তার প্রভাব ও গুরুত্ব দু’টোই কমে যায়, কমে যেতে বাধ্য। এ যেন এক রকম ‘জলভাত’ হয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার। আর তাই বোধ হয় তারতম্য থেকে যায় প্রতিবাদের মাত্রা এবং ধরনেও। যে দেশে প্রতি সাড়ে তেরো মিনিটে একটা করে ধর্ষণ হচ্ছে, সেখানে কি প্রতি চোদ্দো মিনিটে একই রকম গুরুত্বে ও মাত্রায় ও বিস্তারে নতুন প্রতিবাদের জন্ম দেওয়া সম্ভব?

সম্ভব নয়। তবু প্রশ্ন ওঠে প্রতিবাদের, প্রশ্ন ওঠে শাস্তির। একটা সময়ের পরে মনে হয়, যাঁরা গলা ফাটিয়ে প্রশ্ন তুলছেন “ওর বেলায় প্রতিবাদ এর বেলায় নয় কেন”, তাঁরা ধর্ষণ নিয়ে যতটা বিচলিত, তার চেয়েও বেশি বিচলিত ধর্ষিতা ও ধর্ষকের ধর্মীয় অভ্যেসের ফারাক নিয়ে, সাম্প্রদায়িক অবস্থানের তফাত নিয়ে, সামাজিক পরিচিতির পার্থক্য নিয়ে। আর এই বিভাজন করতে গিয়েই যেন গুরুত্ব কমে যায় ধর্ষণের। অপরাধের। অপরাধের সামনে আগে চলে আসে প্রতিবাদের নানা ফিল্টার।

প্রশ্ন-প্রতিবাদের পাশাপাশিই চলে সমাধানের উপায় খোঁজার নিরন্তর চেষ্টা। সিসিটিভির কড়া নজরদারি হোক, বা মার্শাল আর্টসের মারণপ্যাঁচ হোক, বা ব্যাগের সাইডপকেটে গুঁজে রাখা পেপার-স্প্রে। এ সবই যেন ধর্ষণরোধী অস্ত্র হয়ে ওঠে। এমনকী বাজারে আসে নতুন যন্ত্র, যা স্ত্রী-যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে রাখলে, বলপ্রয়োগ করে কেউ সেখানে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ করালে, তাতে আটকে যাবে যন্ত্রটি। যন্ত্র খুলতে হলে ছিঁড়ে যাবে পুরুষাঙ্গের চামড়া। অর্থাৎ, নারী শরীর বা যৌনাঙ্গটুকু সুরক্ষিত রাখতে পারাটাই যেন ধর্ষণের সমাধান হয়ে উঠছে। আর সমাজে ধর্ষণ বন্ধ করার বৃহত্তর লক্ষ্যে এভাবেই মিশে যাচ্ছে পণ্যের খাদ।

অন্য দিকে দাবি ওঠে শাস্তির। নৃশংসতম ও নির্মমতম শাস্তির দাবিতে তোলপাড় শুরু হয় প্রায় প্রতিটা ধর্ষণের পরে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে ঘটা ‘বিরল থেকে বিরলতম’ অপরাধে এত দিন ধরে যত ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট ঘটেছে, তার কোনওটাই ধর্ষণের সংখ্যা এতটুকু কমাতে পারেনি। বরং, প্রতি বারই, সমস্ত শাস্তিকে কাঁচকলা দেখিয়ে আরও দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হয়েছে ‘ধর্ষণ উৎসব’। আট মাসের শিশু থেকে আট বছরের বালিকা হয়ে আশি বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত বারবার যোনিপথ চিরে গিয়েছে ধর্ষকের উদ্ধত, উন্মুক্ত ফলা।

আর এই পাকেচক্রে বারবার যেন ফোকাস নষ্ট হচ্ছে ধর্ষণ-সমস্যা-নিধনের। ধর্ষণের সমাধান যে কেবল ধর্ষণ বন্ধ করাই, এই প্রাথমিক ধারণাটুকু সরে যাচ্ছে প্রতিবাদে, প্রতিরোধে, শাস্তিতে। ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি চাই। অবশ্যই চাই। প্রচলিত আইনেই চাই। আবার প্রচলিত আইনও যে একশো শতাংশ সঠিক ও অপরিবর্তনীয়, তা-ও নয়। প্রাচীন সমাজে কোনও ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি যেমন ছিল শূলে চড়ানো অথবা বেত মারা অথবা পাথর ছুড়ে মারা—তা এই একুশ শতকে একই ভাবে বলবৎ থাকতে পারে না, থাকা সম্ভব নয়।

বস্তুত, ধর্ষণ রুখতে যত আলোচনা, প্রতিবাদ, তর্ক-বিতর্কই হোক না কেন, যত কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির দাবিই উঠুক না কেন, এ কথা মাথায় রাখতে আমরা বাধ্য, যে ধর্ষণ যে লোকটা করছে, সে-ও কোনও এক দিন একটা নিষ্পাপ শিশু হিসেবেই এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল। বিপদের আঁচ পেলে আপনি-আমি যে ভাবে সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরি, তার মা-ও হয়তো সেভাবেই তাকেও…..
কিন্তু সে যে পথে বড়ো হতে হতে মানুষ, থুড়ি, অমানুষ হয়ে উঠল, তাতে যেমন সে নিজে তীব্র ভাবে দায়ী, তার অপরাধের ভার যেমন একা তারই, তেমনই অন্য দিকে যে সমাজে সে বাস করে, যে পারিপার্শ্বিকে সে খায়, ঘুমোয়, খেলে, পড়ে—তারও দায় এড়ানো যায় না একশও শতাংশ। যন্ত্র এবং যন্ত্রে উৎপাদিত প্রোডাক্টের সমীকরণ সব সময়ে একমুখী এবং সরলরৈখিক হয় না। খারাপ প্রোডাক্ট মানে খারাপ প্রোডাক্ট। এ কথা ঠিক। তেমনই, লাগাতার খারাপ প্রোডাক্ট উৎপন্ন করে চলা যন্ত্রটিও কিন্তু নেড়েচেড়ে দেখার অবকাশ থেকে যায়, বদল আনার প্রয়োজন থেকে যায়।

প্রতিটা ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসার পরে গলি থেকে রাজপথে, আদালত থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল চিৎকার ওঠে, ধর্ষণে অভিযুক্তদের হয় পিটিয়ে মেরে ফেলার বা লিঙ্গচ্ছেদ করার বা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার। মোট কথা, ধর্ষণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কথা বলার সময়ে, নিজের বিরুদ্ধে কোনও রকম নির্দয়তা বা নির্মমতা বা নৃশংসতার অভিযোগ শুনতে রাজি নন কেউ। কেন শুনবেন? তাঁরা যে অনেকেই মা, বাবা। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের জন্য চিন্তিত, খুব স্বাভাবিক ভাবেই। যাঁরা আবার আর একটু সাবধানী, তাঁরা অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি। তবে অপরাধ প্রমাণ হলে, এ রকম কোনও ক্যাপিটাল পানিশমেন্টেরই পক্ষপাতী। অথচ যে সমাজ ওই ধর্ষণের কারিগরকে অর্থাৎ ধর্ষককে বা ধর্ষকদের তৈরিতে আংশিক ভাবে হলেও ভূমিকা রাখল, তাকে কী শাস্তি দেওয়া যায়, আদৌ তার শাস্তি হয় কি না, হলে তার পথ কোনটা—তা নিয়ে শাস্তিকামী প্রতিবাদীদের কারও তেমন চিন্তা-চেষ্টা-চেতনা নেই।

এ কথা খানিক জোর দিয়েই বলা যায়, এঁদের বাবা-দাদা-ভাই-ছেলের বিরুদ্ধে একই রকম ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে, এঁরা অবশ্যই চাইবেন অভিযুক্ত যেন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগটুকু পান, অপরাধ প্রমাণের আইনি পথ যেন স্বচ্ছ হয়। অপরাধ প্রমাণ হলে প্রচলিত আইনের সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও, নিজের বাবা-দাদা-ভাই-ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলার সপক্ষে গলা ফাটাবেন না। চাইবেন না, এঁদের কারও লিঙ্গ কেটে নিতে। এটা কারও দোষ নয়। ঠিক যে যুক্তিতে তিনি সন্তানের মা, আতঙ্কিত, ভীত, অস্থির মা… সেই একই যুক্তিতে তিনি মেয়ে বা বোন বা দিদি বা মা। স্তম্ভিত, নিরুপায়, অসহায়। বস্তুত, প্রকৃতির নিয়মেই নিজের মানুষের ব্যাপারে দুর্বলতা জন্মায়। জন্মাতে বাধ্য। তাই নিজের মেয়ের মুখে যেমন তিনি আসিফার ছায়া দেখে সিঁটিয়ে যান, ধর্ষকের মুখেও তেমনই আত্মজনের আদল দেখে দিশাহারা হয়ে যাবেন তিনি।

অপরাধ, অপরাধের ধরন ও ধারা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক করাটা জরুরি। জরুরি, প্রয়োজনে তাকে ঢেলে সাজানো। শাস্তির প্রয়োজন আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা বিশ্বাস করা জরুরি, যে শুধুই শাস্তিতে সমাজ অপরাধমুক্ত হয় না। শাস্তি-জর্জরিত সমাজ মানবিকও হয় না। বস্তুত, এটা মাথায় ঢুকিয়ে নেওয়া যেতেই পারে, যে এত বেশি সংখ্যক মানুষ (বা অমানুষ) যে সমাজে রোজ, প্রতি ঘণ্টায় ধর্ষক হয়ে উঠছে (আক্ষরিক ধর্ষণের বাইরেও প্রতি মুহূর্তে যে হেনস্থা, নিগ্রহ, মানসিক ধর্ষণ চলছে), সেই সমাজের গোড়ায় নিশ্চয় কোনও সমস্যা আছে। আছেই। স্বাভাবিক, মানবিক, উত্তরণশীল সমাজে এত লোক এমন গণহারে অপরাধের পথে যায় না! যেতে পারে না!

তাই কখন যেন অজান্তেই, সারা ক্ষণ শুধুই শাস্তি দিতে দিতে, শাস্তির মাত্রা চড়িয়ে যেতে যেতে, নতুন নতুন নৃশংস পথে শাস্তির উপায় খুঁজতে থাকা সমাজ নিজেও আক্রমণকারী সমাজে পরিণত হয়। সে তখন নৃশংস শাস্তির মাধ্যমে ধর্ষককে সামাজিক ভাবে ধর্ষণ করতে চায় মাত্র। নিজের মধ্যে ধর্ষক উৎপাদনের উপাদানগুলিকে চিহ্নিত করতে চায় না। এই তীব্র শাস্তিপ্রিয়তা ধর্ষণ-ক্লান্ত প্রাণে কিঞ্চিৎ আরাম দেয়। উৎকণ্ঠায় নিমজ্জিত মনে সাময়িক স্বস্তি দেয়। আর সেটাকেই ন্যায়-বিচার বলে ভুল করে ফেলার দিকে ঠেলে দেয় আমাদের।

এক জন অভিযুক্তকে, সে যতই খারাপ হোক, উল্টো দিকে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ দল বেঁধে নৃশংস শাস্তি দিচ্ছে—এটা কোনও মানবিক সমাজের ছবি হতে পারে না।

অথচ এই সমাজই ক্ষোভে-রাগে-অসহায়তায় উন্মাদ হয়ে গিয়ে দাবি তোলে ধর্ষকের লিঙ্গচ্ছেদের। কিন্তু এই চিন্তাটাও সম্পূর্ণ ভুল। হ্যাঁ, এ কথা জোর করেই বলা যায়, এটা ভুল চিন্তা। কারণ বেশির ভাগ ধর্ষণের ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গ শুধুমাত্র একটা যন্ত্র, একটা টুল। ধর্ষণ লিঙ্গের কারণে নয়, ধর্ষকামী মস্তিষ্ক আর বিকৃত মনের কারণে ঘটে। লিঙ্গসুখের জন্য একটি কয়েক মাসের শিশুকে ধর্ষণ করে না কেউ। করতে পারে না। কয়েক মাসের শিশুকন্যার রেচনাঙ্গে যৌনতার স্বাদ মেলা অসম্ভব! প্রতি রাতে ঘর বন্ধ করে এ দেশে যে অসংখ্য ম্যারিটাল-রেপ ঘটে নিঃশব্দে, তা শুধুই লিঙ্গসুখের জন্য নয়। তেমনই, ধর্ষণ করার পরে যে যৌনাঙ্গে রড ও পাথর ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো বিকৃতির সঙ্গে কোনও রকম যৌনতা জড়িয়ে নেই। আছে ক্ষমতা, দাপট, ঔদ্ধত্য, বিকৃতি, ধর্ষকাম।

এই ধর্ষকামী মস্তিষ্ক কী ভাবে কাজ করবে, বিকৃত মন কী ভাববে, সেটাও আবার অনেকটা সামাজিক নির্মাণ হলেও, পুরোটা কখনওই নয়। আমরা তো ধর্ষকের লিঙ্গ কাটার কথা বলি, কিন্তু ধর্ষকের মস্তিষ্ক কেটে বার করার কল্পনাও করতে পারি না। তার মনের ভিতরের হদিস পেয়ে, অসুখ নির্ধারণের চেষ্টাও করি না। শাস্তির ওষুধে ভাবি অসুখ সারল। আসলে ওই যে, সাময়িক আরাম, কিঞ্চিৎ সস্তি। আসল অসুখের বীজ থেকে যায় সেই তিমিরেই।

বস্তুত, সামাজিক অপরাধ বা সোশ্যাল ক্রাইমের সমাধান কখনও ব্যক্তি-নির্ভর শাস্তির মাধ্যমে হওয়া সম্ভব নয়। তেমনই ব্যক্তি-নির্ভর সুরক্ষা নিশ্চিত করেও সামাজিক অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আমরা তো সকলেই এমন একটা ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে ধর্ষণ থাকবে না। নিদেনপক্ষে ধর্ষণের সংখ্যা এতই কমে আসবে, যে তা ব্যতিক্রমী ও বিরল অঘটন তথা অপরাধ হিসেবে দেখা হবে। কিন্তু তা বিচ্ছিন্ন শাস্তি দিয়ে সম্ভব নয় বলেই আমি মনে করি। তা করতে হলে, সবার আগে আমাদের হাজার বছর ধরে তৈরি হওয়া সামাজির চিন্তাভাবনার নির্মাণগুলো বদলাতে হবে, প্রয়োজনে ভাঙতে হবে। প্রতিটা মানুষের যে আত্মমর্যাদা নিয়ে এবং ইচ্ছে ও অনিচ্ছে নিয়ে সুস্থ ভাবে (শারীরিক সুস্থতা নয়, সামাজিক সুস্থতা) বেঁচে থাকার অধিকার আছে, সে ছেলে হোক বা মেয়ে, রূপান্তরকামী হোক বা সমকামী, বৃদ্ধ হোক বা শিশু—এই বোধ বা এই চিন্তা প্রতিটি শিশুর মধ্যে ছোটোবেলা থেকে গেঁথে দিতে হবে। ঘরে, বাইরে, টিভির পর্দায়, বইয়ের পাতায়—প্রতিটা মুহূর্তে গাঁথতে হবে। নির্মাণ করতে হবে তার চিন্তার গতিপথ।

এই আত্মমর্যাদা ও ইচ্ছে-অনিচ্ছেরই যে একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ শরীরের অধিকার, তা-ও তাকে বোঝাতে হবে বড় হওয়ার পথে হাঁটার সময়েই। বড় হওয়ার পরে নয়। কারও স্পষ্ট ও সম্পূর্ণ সম্মতি ছাড়া তার সঙ্গে যৌন সংসর্গ করাই ধর্ষণ, এটাও প্রতিটা মানুষকে ছোটবেলা থেকে শেখাতে শেখাতে এগোতে হবে। যৌন সংসর্গ করার বয়স (আপনার মাপকাঠিতে নির্ধারিত বয়স) পর্যন্ত অপেক্ষা করা, বা ‘ও ভাল ভাবে বড় হয়েছে, এমন কিছু করবে না’ এমন বিশ্বাসে আটকে থাকা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। খুব সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে, একটি শিশুকে ধর্ষণের সম্ভাবনা থেকে আগলে রাখার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, কোনও শিশুকেই ধর্ষক হয়ে উঠতে না দেওয়া।

আর এই সমস্ত শিক্ষার দায় শুধুমাত্র বাবা-মায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে, অথবা গুচ্ছখানেক গাইডবুকের শিক্ষার আকারে গিলিয়ে লাভ নেই। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। চেষ্টা করতে হবে অনেক বড় মাপে। যে গতিতে এক জন শিশু মোবাইলের ছোট্ট পর্দায় এক মিনিটে একশো জন ‘শত্রু’ নিধনের গেমে পারদর্শী হয়ে ওঠে, তাদের মগজে ও হৃদয়ে সুস্থ, সৃজনশীল চেতনা বৃদ্ধি করার গতি আরও বাড়াতে হবে। এ ভাবে হয়তো রাতারাতি শূন্যের কোঠায় নামবে না ধর্ষণের সংখ্যা। কিছু লোক হয়তো অবধারিত ভাবে কোনও কিছুতেই কোনও শিক্ষা নেবে না, দিনের শেষে তারা অমানুষই হবে। কিন্তু আবার অনেকটা বড় সংখ্যক মানুষও তৈরি হবে।

প্রতি সাড়ে তেরো মিনিটে ধর্ষণ ঘটে যাওয়ার এই অঙ্ক এভাবেই চলতে থাকলে, এ কথা ধরে নেওয়া যায় যে এই সমাজ ক্রমেই একটা প্রকট বিভাজনের দিকে এগোচ্ছে। যে বিভাজনের এক দিকে থাকবে ধর্ষিতরা, অন্য দিকে ধর্ষকেরা।

সেই সমাজের চোখে চোখ রেখে বদলের অঙ্গীকার করার সময় এসেছে। কেবল শাস্তি আর প্রতিবাদে রুদ্ধ থাকার নয়।

Leave A Reply