বুধবার, মার্চ ২০

রান্নার লোক

গাছগাছালি সমৃদ্ধ শহরের একটি পার্ক। সকালের পদচারণায় এক বৃদ্ধ ও এক বৃদ্ধার কথোপকথন। তাঁরা দম্পতি নন। কিছু ক্ষণ পরেই বোঝা গেল, ওই বৃদ্ধের স্ত্রীয়ের বান্ধবী ওই বৃদ্ধা। এবং দু’জনের কথোপকথনের বিষয়ও, অনুপস্থিত সেই বৃদ্ধা স্ত্রী। আরও বোঝা গেল, তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে ‘মিস’ করছেন ওই বৃদ্ধা। জানতে চাইছেন, কেন প্রাতর্ভ্রমণে আসছেন না তাঁর সহেলী।

এর পরেই আসল গল্পের শুরু। বৃদ্ধের জবাব, কী করে আসবে? রান্না করতে হবে না? হন্টন-সঙ্গী বৃদ্ধার মৃদু প্রতিবাদ, সারা জীবন তো এটাই করল। চির কাল করে যাবে? সকালে এক-আধ ঘণ্টা অক্সিজেন নেওয়ারও ফুরসত পাবে না?

ছায়াবীথির স্নিগ্ধ বাতাস গায়ে লাগিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বৃদ্ধ ভদ্রলোক কিঞ্চিৎ গলা চড়িয়ে এবং স্বামীসুলভ কাঠিন্য এনে বললেন,—“তা কী করা যাবে আর, রান্না তো করতেই হবে!”
—রান্নার লোক রাখতে পারেন তো!
—না, রান্নার লোকের হাতের রান্না আমি খেতে পারি না।

অতএব কী দাঁড়াল? স্বামী, তা তিনি যতই বৃদ্ধ হোন, যতই দাঁত পড়ে যাক, যতই চামড়া ঢিলে হয়ে যাক, বাতের বেদনায় কুপোকাত হোন, তবু স্বামী তো! তাই তিনি রান্নার লোক না রেখে স্ত্রীকেই সারা জীবন রান্নার লোক বানিয়ে রাখবেন।

এমন মনে করার কোনও কারণ নেই, যে এমন মানসিকতা শুধু ওই প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিংবা শুধু গ্রাম-জীবনেই সীমাবদ্ধ। মনে করার কারণ নেই, শিক্ষিত, শহুরে, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত এই মানসিকতা থেকে একশো শতাংশ মুক্ত। এমন নয়, সেখানে মেয়েদের স্কুল-কলেজে পড়িয়ে বা চাকরি করে বা ছেলেমেয়ের হোমওয়ার্কে সাহায্য করে, দোকান-বাজার করে আর রান্নার দিকটা সামলাতে হয় না।

অনেকে বলবেন, কেন তাঁদের স্বামীরাও তো মাঝেমধ্যে টুকটাক রান্না করেন, সাহায্য করেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেটা শুধু বিনোদনের খাতিরে, স্ট্রেস কাটানোর জন্য। রান্না তাদের কাছে বাধ্যতা বা কমপালশন নয়। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে যেভাবে লিঙ্ক শেয়ার করেন, সে ভাবে তারা পত্নীর দায়িত্ব বা কমপালশন শেয়ার করেন কি? নারীর সম-অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কত আলোচনাচক্র, কত সেমিনার, কত প্রদীপ প্রজ্জ্বলন। কিন্তু সেই প্রদীপের নীচেই তো অসংবেদনশীলতার অন্ধকার, তথাকথিত ঝাঁ চকচকে সমাজেও। রান্নাবান্নায় তাই রকমফের থেকেই যায়। কখনও সেটা বিনোদন, কখনও বাধ্যতা।

Shares

Leave A Reply