শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

নাক ডাকা হাসির বিষয় নয়

জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার এই যুগে আমাদের সকলেরই ঘুম কমে আসছে। টানা আট ঘণ্টা শান্তির ঘুম ঘুমোতে পারেন কজন? এমনিতে ঘুম কারও বেশি, কারও বা কম। তার মধ্যে যদি ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে শরীরেরই কোনও সমস্যার জন্য, তা হলে তো উদ্বেগেরই কথা। ঘুম না হলে স্লিপিং পিল খেয়ে নেন অনেকে। কিন্তু সমস্যার গভীরে যাই কি আমরা? কিন্তু ঘুমের সমস্যা আমাদের জীবনহানি পর্যন্ত ঘটাতে পারে। “স্লিপ অ্যাপনিয়া” তেমনই একটি রোগ। আমাদের সকলের বাড়িতেই কমবেশি এই রোগে আক্রান্ত দু-একজন থাকেন। হয়তো কেউ কেউ প্রথম শুনছেন নামটা, তবে জানেন কি পুরাকালেও এই রোগ ছিল বিদ্যমান। স্বয়ং কুম্ভকর্ণ এই রোগে আক্রান্ত ছিলেন। স্লিপঅ্যাপনিয়া নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম বিশিষ্ট ই.এন.টি স্পেশালিস্ট ডঃ দীপঙ্কর দত্তর সঙ্গে। কী বলছেন ডাক্তারবাবু জেনে নিন।

দ্য ওয়ালঃ “স্লিপ অ্যাপনিয়া” কী?

 ডঃ দীপঙ্কর দত্ত : বাড়িতে অনেকেই আছেন যাঁদের নাক ডাকে ঘুমের মধ্যে। অনেকেই এতে হাসির পাত্রও হয়ে ওঠেন। কিন্তু নাক ডাকার অ্যাডভান্সড স্টেজ, যেখানে নাক ডাকার মাঝে শ্বাসও বন্ধ হয়ে যায়, তাকেই ল্যাটিন ভাষায় বলে “অ্যাপনিয়া”। সেখান থেকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া। এক ভাবে নাক ডাকেন না অনেকেই। নাক ডাকতে ডাকতে আর ডাকেন না, কিছুক্ষণ শ্বাস আটকে থাকে তাঁদের। মুখটা হাঁ হয়ে থাকে তখন। এই অবস্থা বেশ কিছুক্ষণ সমানে চলতে থাকলে হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। যে সময় ঘুমের মধ্যে নাক না ডেকে হাঁ করে থাকেন কেউ, আসলে তখন আমাদের ব্রেন রিফ্লেক্সে হাঁ করিয়ে শ্বাস নেওয়ায়। যে সময় আমাদের শ্বাসনালি পর্যন্ত সরাসরি হাওয়া যাচ্ছে না অর্থাৎ নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে, সেই অবস্থাকে বলা হচ্ছে “ওএসএ” বা “অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া” ডিসিজ।

দ্য ওয়াল: স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণগুলো কী কী?

 ড: দীপঙ্কর দত্ত: আমরা দেখি যে অনেক সময় নাক ডাকার মাঝেমধ্যেই ধড়ফড়িয়ে উঠছেন কেউ। আর সেটা বারবার হচ্ছে। যেহেতু রাতে ঘুম সঠিক হচ্ছে না তাই সারাদিনই ক্লান্তি কাজ করছে, এ জাতীয় লক্ষণেই আপনাকে বুঝতে হবে। আসলে সব নাক ডাকা স্লিপ অ্যাপনিয়া না হলেও সব স্লিপ অ্যাপনিয়ারই একটা লক্ষণ নাক ডাকা। নাক থেকে শ্বাসনালি পর্যন্ত যে জায়গা সেখানে অল্পস্বল্প বাধা থাকলে সেটায় সাধারণ নাকডাকা হয়। আর বেশি বাধা থাকলেই হয় ওএসএ বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া ডিসিজ।

দ্য ওয়াল: এই অসুখের কোনও বয়স আছে? নাকি যে কোনও বয়সেই হতে পারে? বংশগত কোনও বিষয় কি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ?

 ড: দীপঙ্কর দত্ত:  বহু বাচ্চাদেরই রাজভোগের মতো বড় টনসিল থাকে গলায়। কারো বা নাকের পিছন দিকে থাকে ন্যাসাল টনসিল, যাকে বলে অ্যাডিনয়েড। এগুলোই যখন বড় সাইজের হয় তখন তাদের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঘুমোলে শ্বাস আটকে বারবার দম আটকে যায়। একে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে  পি এস এ বা পেডিয়াট্রিক স্লিপ অ্যাপনিয়া। তাই যারা জন্মাচ্ছে সেরিব্রাল পলসি বা জেনেটিক ডিসঅর্ডার নিয়ে, অথবা আই কিউ লেভেল কিছুটা কম, তাদের এই রোগ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বংশগতভাবে সরাসরি আক্রান্ত না হলেও যদি কেউ অত্যাধিক মোটা হয়, তার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে তার ওজন। সে মোটা মানেই তার থুতনি এবং গলার মাঝের স্পেস কমতে থাকে, ফলে তার শ্বাসনালি চাপে থাকছে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হবে। আর সেটা শুলে বা ঘুমোনোর সময়ে বাড়বে। এ ছাড়াও জন্ম থেকে যাদের মঙ্গোলিয়ান ফেস বা যাদের ফেসিয়াল স্ট্রাকচারে গন্ডগোল আছে, তাদের এই সমস্যা হতেই পারে। অনেকেরই দেখবেন নীচের থুতনিটা ভিতর দিকে ঢোকানো বা সেটা খুব ছোট। তাদের হতে পারে স্লিপ অ্যাপনিয়া কারণ তাদের শ্বাসনালির উপর চাপ পড়ছে। আবার যাদের জিভে সমস্যা থাকে অর্থাৎ জিভটা কোনওভাবে শ্বাসনালিকে বাধা দিলে হতেই পারে এই  অসুখ। এই অবস্থাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে রেট্রোগনাথিয়া।

দ্য ওয়াল: সমাধানের রাস্তা কী?

ড: দীপঙ্কর দত্ত: শিশুদের হলে সাধারণ মাইক্রো সার্জারিতে সারিয়ে ফেলা সম্ভব। বংশগত কোনো সমস্যা থাকলে অবশ্যই সাপোর্ট থেরাপি দিতে হবে। যার এই সমস্যা দেহের ওজন বেশি বলে হচ্ছে, তাকে অবশ্যই ওজন কমাতে হবে। ওজন বেশি থাকলেই স্ট্রাকচারাল সমস্যা অর্থাৎ ওই থুতনি ছোট বা জিভ মোটা অথবা নীচের চোয়াল আর গলার মধ্যে জায়গা কম ইত্যাদি হবে তাই আগে ওজন কমাতে হবে। নইলে হার্ট অ্যাটাক বা ফুসফুসের সমস্যা হতেই পারে। জিভ বা আলজিভের সমস্যাও তো থাকতে পারে। তবে এই সব ক্ষেত্রেই সারিয়ে ফেলা সম্ভব এই অসুখ। প্রাথমিক ভাবে ঘুমের সময় দেহে তার লাগিয়ে কিছু কনফার্মেটরি টেস্ট করা হয়। এর মাধ্যমে করা হয় স্লিপ স্টাডি। একে বলা হয় পলিসমনোগ্রাফি বা পিএসজি। এর থেকে বোঝা যায় য়ে রোগীর সত্যিই স্লিপ অ্যাপনিয়া সিন্ড্রোম কিনা! যদি এই টেস্টে দেখা যায় যে সমস্যা আছে, সে ক্ষেত্রে যন্ত্রের সাহায্য নিতেই হবে। সিপিএপি মেশিন ব্যবহার করতে হবে এক্ষেত্রে। যে মেশিনের মাধ্যমে রোগীর দেহে অক্সিজেন পাঠানো হতে থাকে। অপারেশন একদম শেষ পর্যায়ে করা হয়। যান্ত্রিক ভাবে অক্সিজেন দিয়েও কাজ না হলে একদিন রোগীকে নিয়ে তার সমস্ত চেকআপের পর তাকে ও.টি.তে নিয়ে গিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেখা হয় কোন পথে রয়ে গেছে সমস্যা। এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে শ্বাসনালির কোন পথে সমস্যা সেটা দেখে নেওয়া হয়। সেদিনকার মতো রোগীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পরে অন্য একদিন হয় অপারেশন।

অর্থাৎ স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো মারাত্মক অসুখ ফেলে না রেখে চিকিৎসা করে ফেলাই শ্রেয়। অন্তত ডাক্তারবাবু তো তাইই বলছেন। আপনার পাশের মানুষটি ঠিক মতো ঘুমোচ্ছেন কি না খেয়াল রাখতে পারবেন একমাত্র আপনিই। তাই যে অসুখে কুম্ভকর্ণও আক্রান্ত ছিলেন, সে রোগ পুষে রেখে লাভ নেই। কারণ এতে বাড়াবাড়ি হলে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। স্মোকিং হোক বা অ্যালকোহল, বাদ দিতে হবে সবই। সঙ্গে অবশ্যই পর্যাপ্ত ঘুম। তাই সঠিক সময়ে ঘুমোন, সুস্থ থাকুন।

 সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Shares

Comments are closed.