রবিবার, ডিসেম্বর ৮
TheWall
TheWall

বুলবুল-বিধ্বস্ত বিষণ্ণ মৌসুনি, যেন ধ্বংসের মাঝেও জীবনের অনন্ত আলো

জ্যোতিরিন্দ্রনারায়ণ লাহিড়ী

সুন্দরবনের একটা বড় অংশে তার ছাপ রেখে গেল বুলবুল। বদ্বীপের বিভিন্ন অংশে বিপর্যস্ত হয়ে আছে জনজীবন ৷ গাছপালা ভেঙে পড়ে রাস্তা বন্ধ, অধিকাংশ বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছে, ভিজে গেছে গৃহস্থালীর জিনিসপত্র৷ মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকা বহুগুণ কষ্টকর হয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। নামখানা, পাথরপ্রতিমা ব্লকের মাঝে বুলবুল তার গতিপথের অনেকটা সময় কাটিয়েছে৷ ফলে তার গতিপথে থাকা জনবসতিপূর্ন জিপ্লট, মৌসুনি, বকখালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি করে৷

ঝড়ের গতিবেগ ভয়ঙ্কর থাকলেও আয়লার তুলনায় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতি একটু অন্য ধরনের৷ প্রথমত, আয়লার সময় থেকে আজ কেটে গেছে দশ বছর। ফলে যোগাযোগ ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে পৃথিবী এগিয়ে গেছে অনেকটাই৷ অনেক দিন আগে থেকেই মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার গতি অনেক দ্রুত হয়েছে৷

দ্বিতীয়ত, আয়লার সময় নদীতে ছিল ভরা জোয়ার, ফলে নদী বাঁধের উপর আছড়ে পড়া জলের চাপ ছিল অনেক বেশি৷ এই কারণে এইবারে সুন্দরবনে নদী বাঁধের ক্ষতি তুলনামূলক ভাবে কম হয়েছে৷

তৃতীয়ত, স্থলভাগ স্পর্শ করার পরে আয়লার গতিপথ ছিল দক্ষিণ থেকে উত্তরে, সুন্দরবনকে অতিক্রম করে আয়লা এসে পৌঁছেছিল কলকাতায়৷ বুলবুলের মূল গতিপথ কিন্তু ছিল পশ্চিম থেকে পূর্বাভিমুখী এবং সে অগ্রসর হয়েছে অনেকটাই ধীর গতিতে৷ ফলে অনেক বেশিক্ষণ সুন্দরবনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বুলবুল৷ মৌসুনি যাওয়ার শাসমল ঘাটে দাঁড়ানো বৃদ্ধ অনুকূল জানা যে বলছেন এতখানি বয়স পর্যন্ত এমন ঝড় কখনও দেখেননি, তার কারণ এইটাই৷ ঝড় চলেছে সন্ধ্যে ছ’টা থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত৷

চতুর্থত, ক্ষতিগ্রস্ত গোটা সুন্দরবন জুড়ে যে অসংখ্য ভেঙে পড়া গাছ দেখা যাচ্ছে, তারও একটা বাস্তব কারণ আছে৷ দশ বছর আগের আয়লা সুন্দরবন অঞ্চলের প্রায় সব বড় গাছকে ধরাশায়ী করেছিল৷ এখন যে গাছগুলো ভেঙেছে, তাদের অধিকাংশেরই বয়স দশ বছর বা তার কম৷ তাই মাটির নীচে শিকড় ছড়ানোর মতো পর্যাপ্ত সময় তারা পায়নি৷ ফলে প্রবল ঝড়ের ধাক্কায় তারা ভেঙে পড়েছে সহজেই৷

সব শেষে এটা মনে রাখার, যে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষ যাঁরা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে তাঁদের সহবাস বহুদিনের৷ মাস ছয়েক আগে আমরা যখন মুন্নিদের বাড়িতে বসে মুড়ি খেতে খেতে বাড়িতে কত জন মানুষ আছেন, কী করে তাঁদের সময় কাটে– এসব কথা শুনছিলাম, তখন সার ভাটা চলছে৷ এর আগে দু’বার এসেও আমরা ফিরে গেছি বাড়ির সামনে থেকে৷ কারণ আগের দু’বারই এসেছিলাম ভরা জোয়ারে৷ দ্বীপের মতো ভেসে থাকা বাড়িতে কোমর সমান জল ভেঙে ঢুকতে পারার মত সাহস অর্জন করতে পারিনি৷

শনিবার শহরের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে মোবাইলের উপগ্রহচিত্রে বুলবুলের গতিপথ, এগিয়ে আসা দেখতে দেখতে শিউরে উঠছিলাম৷ মৌসুনি দ্বীপের একেবারে দক্ষিণতম প্রান্তে বালিয়াড়ার পনেরর সওয়ালে যেখানে মুন্নিদের বাড়ি সেখান থেকে গুগল ম্যাপে যদি ক্রমাগত দক্ষিণ দিকে নামা যায়, তবে স্থলভাগের দেখা পেতে ম্যাপ ধরে যেতে হবে সেই অ্যান্টার্কটিকা পর্যন্ত!

১৩৫ কিলোমিটার গতিবেগের ঝড়ের ধাক্কার পরে কি আর অস্তিত্ব থাকবে মুন্নিদের বাড়ির!

এই সব ভাবতে ভাবতে, দু’দিন পরে রাস্তার উপরে পড়ে থাকা অসংখ্য ভাঙা গাছ পেরিয়ে যখন মুন্নিদের বাড়ির কাছে পৌঁছলাম, তখন দেখলাম মুন্নির আব্বা শেখ আয়ুব সামান্য উপকরণ দিয়ে ভারী মনোযোগ সহকারে নির্বিকার মুখে সেই বাড়ি আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন৷ কিশোরী মুন্নি আজ লজ্জিত মুখে মনে করিয়ে দেয় “আজ আর উপরে যেওনি, ভেঙে যেতি পাারে।” সে মুখে কোনও অভিযোগ নেই কারও প্রতি৷ মুন্নির আম্মা বলেন “সেদিন লাউয়ের তরকারি ছিল, খেতে বললুম, খেলে না। আজ তো কিছু নাই।”

পরিপূর্ণ ধ্বংসের মাঝে দাঁঁড়িয়েও আতিথেয়তার কথা কি সহজ স্বাভাবিকতায় উঠে আসে এঁদের মুখে!

বন কেটে বসত করার প্রথম দিন থেকেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার আশ্চর্য প্রযুক্তি কী এক মন্ত্রবলে যেন আয়ত্ত করে নেয় মুন্নিরা৷ বারবার আয়লা, বুলবুলের মত বিধ্বংসী ঝড় এদের একটু একটু করে গড়ে তোলা স্বপ্নকে মিলিয়ে দেয় মাটির সাথে৷ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে ওঠেন শেখ আয়ুবরা। আবার জেগে ওঠে সুন্দরবন৷

সারাদিন ধরে ভেঙে যাওয়া বাড়ি, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি দেখতে দেখতে গোটা দ্বীপ ঘুরে, বিষণ্ণ মনে ফিরে আসি মৌসুনি বাজারে৷ শুনতে পাই, সুন্দরবন বিষয়ক একটি পত্রিকা বালিয়ারার একশোটি পরিবারের প্রত্যেকের হাতে তুলে দিয়েছে নতুন জামাকাপড়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মৌসুনি স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এনেছে শিক্ষাসামগ্রী। সন্ধ্যে নামার সময়ে দেখি চারটি বড় মেশিনভ্যানে বালিয়ারার দিকে যাচ্ছে এক হাজার সরকারি ত্রাণের ত্রিপল৷

ফের বুঝতে পারি, হাজার হতাশার মাঝে আজও বেঁচে আছে মানবিকতা… বারবার ধ্বংসের মাঝে টিকে থাকা সুন্দরবনের মানুষগুলোর মতোই ৷

Comments are closed.