আমায় টুকলিবাজ বলত লোকে, আজ আমার গানকেই ওরিজিনাল বলছে গোটা বিশ্ব

সঙ্গীতময় ছোটবেলা। গান না গাইলে তবলাবাদক হতেন। সোনাকেই সিগনেচার করেছেন, যাতে কেউ সহজে অনুকরণ না করতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    স্টার জলসা চ্যানেলের ‘সুপার সিঙ্গার’ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তার শিখরে। এই গানের প্রতিযোগিতায় যে শুধু ভবিষ্যতের গায়ক-গায়িকাকে বেছে নেওয়া হচ্ছে, তাই নয়। গায়ক-গায়িকাদের পাশাপাশিই উঠে আসছে মিউজিক কম্পোজার, লিরিসিস্ট, মিউজিসিয়ান। যার যেদিকে ট্যালেন্ট বেশি, কোনও গানের রিয়্যালিটি শো-তে এই প্রথম সেই দিকগুলোও বেছে নিচ্ছেন তিন বিচারক— মেলোডি কিং কুমার শানু, সুরসম্রাজ্ঞী কবিতা কৃষ্ণমূর্তি এবং সুরসম্রাট জিত গাঙ্গুলি। শোয়ের সূত্রধর যীশু সেনগুপ্ত। এঁদের সঙ্গে এবার নতুন এপিসোডে বিশেষ বিচারক হিসেবে ‘সুপার সিঙ্গার’-এর মঞ্চে উপস্থিত হলেন ‘সোনার মানুষ’ বাপ্পি লাহিড়ি।

    বাপ্পি লাহিড়ির মুখোমুখি ‘দ্য ওয়াল।

    স্টার জলসা চ্যানেলের ‘সুপার সিঙ্গার’-এর মঞ্চ তখন ভেসে যাচ্ছে বাপ্পি লাহিড়ীর সুরের মূর্ছনায়। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’, ‘ইয়াদ আ রাহা হ্যায়’, ‘ডিস্কো ডান্সার, ‘কে পাগ ঘুঙরু বাঁধ’, ‘হরি ওম হরি’ …বাপ্পি-সঙ্গীতে মঞ্চ ভরপুর। কবিতা, শানু, জিত—তিন জনে বাপ্পর সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠলেন, তাঁরই সুরারোপিত ‘আঁখে’ ছবির সেই গান ‘ও লাল দোপাট্টেওয়ালি তেরা নাম তো বাতা’।

    এসব গান আজও নস্ট্যালজিয়া। শুনলেই অনেকের নেচে ওঠে মন। তাই শুনেই সঞ্চালক যীশু সেনগুপ্ত বাপ্পিদার গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলেন, অল্প নাচেও ফ্লোর মাতাচ্ছিলেন। সেই সব সুপার ডুপার হিট গানই ফিরে এল এদিনের সুপার সিঙ্গারের মঞ্চে। দু’টি পর্ব ধরে সব প্রতিযোগীই তাঁরই গানে গানে প্রণাম জানাল কিংবদন্তি বাপ্পি লাহিড়িকে সামনে পেয়ে। আর সেই দুই পর্বের শ্যুটের ফাঁকেই মেক আপ রুমে ধরা দিলেন সোনায় মোড়া মানুষটি। দ্য বাপ্পি লাহিড়ী।

    বলিউড কিং হয়েও, মাতৃভূমিকে ভুলে যাননি তিনি। তাই বাংলা দিয়েই শুরু হল কথা।

    প্রশ্ন: আপনার জন্ম, বেড়ে ওঠায় বাংলায়। আপনি ভারতবর্ষের একমাত্র সুরসম্রাট, যিনি টলিউড, বলিউড, ঢালিউড-সহ হলিউডও জয় করেছেন। আবার এই বাংলাতেই ‘সুপার সিঙ্গার’ প্রতিযোগিতায় বিশেষ বিচারক হয়ে এসেছেন। আপনার গানই সবাই গাইছে, কেমন লাগছে আপনার?

    বাপ্পি: স্টার জলসার ‘সুপার সিঙ্গার’ শোয়ে আমি স্পেশ্যাল জাজ হয়ে এসেছি আজ। এই সময়ের শ্রেষ্ঠ রিয়্যালিটি শো এটা। আউটস্ট্যানডিং মিউজিক কম্পিটিশন। বাংলায় এমন একটা শো হচ্ছে, এটা তো ভাবাই যায়না। এখানে শুধু আমি নয়, কুমার শানু, কবিতাজী, জিত গাঙ্গুলিরাও আছেন। এমনকি আশা ভোঁসলেজীর পদধূলিধন্য এই শোয়ের মঞ্চ। এমন নক্ষত্রখচিত শোয়ে যে প্রতিযোগীরা সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা কতটা লাকি ভেবে দেখো। তাদের বলব এই মহামঞ্চটাকে কাজে লাগাতে। গানকে যারা পেশা করতে চায়, তাদের জন্য ‘সুপার সিঙ্গার’ এর মঞ্চ পারফেক্ট।

    প্রশ্ন: রিয়্যালিটি শোয়ের মঞ্চ নতুন শিল্পীকে তৈরি করতে কতটা সাহায্য করে?

    বাপ্পি: এরা সবাই খুব ট্যালেন্টেড। তিন জন বিচারক কুমার শানু, কবিতাজী, জিত গাঙ্গুলি খুব ভাল। এঁদের গাইডেন্সে আগেও অনেক ভাল গায়ক-গায়িকা আমরা পেয়েছি। ‘সুপার সিঙ্গার’ র পরিচালক শুভঙ্করও ভীষণ ভাল। এত নতুন আইডিয়া দিয়ে একটা শো করছে। আজকে ওঁরা আমার গান দিয়ে শো সাজিয়েছে। এক জন প্রতিযোগী, রাজদীপ বলে একটি ছেলে আমার খুব পছন্দের একটা গান গাইল, ‘কে পাগ ঘুঙরু বাঁধ’ … খুব এনজয় করলাম। ‘সুপার সিঙ্গার’ সুপার সুপার সাকসেস পাক।

    প্রশ্ন: এত অডিশন, গলা ঠিক রাখা সব গানে, এত অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে এক একটা রাউন্ড পার করা। আপনার তরফ থেকে কি সাজেশন থাকবে প্রতিযোগীদের জন্য?

    বাপ্পি: আমি তো আজ একটি মেয়ের গান খুব মনে রেখেছি, নাম তুলিকা। যে ‘হরি ওম হরি’ গাইল।  ও ভীষণ ভাল লোকসঙ্গীতও গায় কিন্তু। তুলিকাকে আমি বলেই দিয়েছি আজ, আমি তোমাকে মুম্বই নিয়ে যাব, আমার সঙ্গে ওখানে গাইবে তুমি। প্লে ব্যাকের জন্য খুব ভাল ওঁর গলা। আরও প্রতিযোগী আছে, যারা খুব ভালো গাইছে। সবে শুরু হয়েছে শো। আরও ভাল শিল্পী আমরা পাব। অধ্যবসায় করতে হবে।

    প্রশ্ন: আপনার ছেলেবেলার গল্পে আসি। টালিগঞ্জের গ্রাহামস ল্যান্ড অঞ্চলে আপনার বড় হওয়া। আপনার বাবা-মা দু’জনেই স্বর্ণযুগের বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী অপরেশ লাহিড়ি ও বাঁশরী লাহিড়ি। সেইসব সোনালি দিনের গল্প শুনি একটু।

    বাপ্পি: বাঁশদ্রোণীতে আমার জন্ম। টালিগঞ্জের গ্রাহামস ল্যান্ডে ছেলেবেলা কাটিয়েছি। ঐ বাড়িতে লতাজী এসেছেন। আরও সব নামী-দামি গুরুজিরা আসতেন। আর অপরেশ লাহিড়ি ও বাঁশরী লাহিড়ি তখন বিখ্যাত নাম। তাই বাংলা ও বম্বের বহু শিল্পীই আমাদের গ্রাহামস ল্যান্ডের বাড়িতে আসতেন। তাঁদের দেখতে বাড়ির বাইরে ভিড় জমে যেত। আমার বাবা মা কিন্তু আদতে ওপার বাংলার পাবনার সিরাজগঞ্জের মানুষ।

    কলকাতাতেই আমার ছোটবেলা কাটে। আমি এক জন বাঙালি হয়ে বিশ্ববিখ্যাত, সেটা আমার গর্বের বিষয়। বাংলা আমার মা। আমার সঙ্গীতশিক্ষা শুরু তবলা দিয়ে। কিন্তু পরে হয়ে গেলাম গায়ক, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক। এগুলো না হলে তবলাবাদকই হতাম।

    চার বছর বয়সে প্রথম বাবা-মার সঙ্গে পারফর্ম করি তবলা বাজিয়ে। কলকাতার এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লতা মঙ্গেশকরজি। উনি আমার তবলা বাজানো শুনে মুগ্ধ হন। তখন আমার নাম ছিল মাস্টার বাপ্পি। লতাজি আমার বাবাকে বলেছিলেন, “অপরেশদা আপনার ছেলেকে তবলা শেখান পণ্ডিত শান্তাপ্রসাদজির কাছে।” আর লতাজি আমার বাবার সুরে অনেক গানও গেয়েছেন। ‘সুভাষচন্দ্র’ ছবিতে ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ লতাজির গাওয়া বিখ্যাত গান। আমার বাবা অপরেশ লাহিড়িই সুর করেছিলেন গানটির।

    পণ্ডিত শান্তাপ্রসাদজি বিরাট তবলাবাদক ছিলেন। সেই আমার ক্লাসিক্যাল জগতে তবলা জীবনের শুরু। এর পরে ধীরে-ধীরে আমার মনে হল, পিয়ানো শিখব। পিয়ানো শিখে কম্পোজার হয়ে গেলাম। আমার ১২ বছর বয়সে আমার সুর করা গানে আমার বাবা অপরেশ লাহিড়ি গান গেয়েছিলেন। গানটা ছিল, ‘সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো এ জীবন, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগে পূর্ণ।’ সেই গান আধুনিক বাংলা গান শোনা বাঙালিরা হয়তো মনে রেখেছেন আজও।

    গায়ক কিন্তু তখনও হইনি আমি। বাংলা ছবির সুরকার হিসেবে কাজ শুরু করলাম এর পরে। প্রথম ছবি ‘দাদু’। ১৯৬৯ সালে অজিত গাঙ্গুলি পরিচালিত, বিকাশ রায় এবং সন্ধ্যা রায় অভিনীত।

    তখন আমার উনিশ বছর বয়স। বিকাশ রায়, সন্ধ্যা রায়, অনুপ কুমার—বড় স্টার কাস্ট ছিল। আমি সুরকার হিসেবে কাজ করলাম এই বাংলা ছবি দিয়ে। আরতি মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন ‘আমি প্রদীপের নীচে পড়ে থাকা এক অন্ধকার।’ সুপারহিট গান। মেলোডি ভোলার মতো নয়।

    প্রশ্ন: এর পরে বলিউড পাড়ি?

    বাপ্পি: দাদু ফিল্ম দিয়ে আমার কেরিয়ার শুরু হল। তার পরে আমি সোজা চলে এলাম বম্বে। ১৯৭১ সালের কথা। বলিউডে আমার সুরের প্রথম হিন্দি ছবি রিলিজ করল ১৯৭৩ সালে। ‘নান্নাহ শিকারি’। তনুজা মুখার্জী আর দেব মুখার্জী অভিনয়ে। প্রযোজনায় সমু মুখার্জী। বম্বের শশধর মুখোপাধ্যায়ের পুজোর পরিবার। সোমু মুখার্জী আমায় ব্রেক দিলেন। শুরু হয়ে গেল আমার বলিউড সফর।

    গায়ক বাপ্পির গান সুপার ডুপার হিট হল ১৯৭৭ সালে বিনোদ খান্নার লিপে ‘আপ কি খাতির’ ফিল্মে ‘বোম্বাই সে আয়া মেরা দোস্ত’। বিশাল হিট করল এই গান। আর আমায় পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। (গান গেয়ে তালেতালে শুনিয়ে দিলেন স্বয়ং বাপ্পি লাহিড়ী)।

    প্রশ্ন: আপনাদের গ্রাহামস ল্যান্ডের বাড়িটাকে আপনার বাবা-মায়ের নামে মিউজিক অ্যাকাডেমি করতে চান? একটা সময়ের দলিল, ইতিহাস তো কলকাতায় লাহিড়ি পরিবারের বাড়ি। আপনাদের পরিবারকে কলকাতায় নবীন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে পৌঁছে দিতে চান এভাবে?

    বাপ্পি: খুব ভাল ভেবেছো। আমার কাছে আগে কোনও সাংবাদিক এই প্রস্তাব রাখেননি বা বলেননি। দেখো ইচ্ছে তো আছে কিছু করার। বাড়িটায় আমার বাবা-মায়ের স্মৃতি, আমার ছেলেবেলা জড়িয়ে। শুধু তো ইট-কাঠ-পাথরের বাড়ি নয়! কিন্তু আমার সময় নেই। আমার পায়ের এই অবস্থা। আমার ছেলে এখন আমেরিকায় কাজ করছে। ইচ্ছে তো আছে করার। দেখি কী হয়।

    প্রশ্ন: আপনি তো ডিস্কো কিং। ডিস্কো জমানা নিয়ে এলেন ভারতীয় ছবিতে। তো আপনার সুরারোপিত কোন গানটা মনে হয় ভারত-সহ সমগ্র বিশ্বে ভীষণ জনপ্রিয়? বিদেশের মাটিতেও যে গান সবার প্রিয়?

    বাপ্পি: ‘জিমি জিমি জিমি’ … যে কোনও দেশের দর্শক ও শ্রোতা পরের লাইন গেয়ে ওঠে ‘আজা আজা আজা’। আমার গান এমনই, লোক না নেচে থাকতে পারবে না। আবার একদম মেলোডি বেসড বহু গানও করেছি।

    প্রশ্ন: ‘জিমি জিমি আজা  আজা’ … এই গান বর্তমানে কোনও শিল্পী গাইলে, কার গলায় পারফেক্ট হবে বলে মনে হয় আপনার ?

    বাপ্পি: সুনিধি চৌহান ইজ় পারফেক্ট ফর জিমি জিমি।

    প্রশ্ন: টলিউডে উত্তম কুমার থেকে প্রসেনজিৎ হয়ে দেব আবার বলিউডে দেব আনন্দ থেকে বিগ বি, মিঠুন, জিতেন্দ্র হয়ে বরুন ধাওয়ান—সবাই আপনার গানে লিপ দিয়েছেন। এই জেনারেশনের পর জেনারেশান আপনিই কিন্তু কনস্ট্যান্ট। ম্যাজিক মন্ত্রটা কি?

    বাপ্পি: বাপ্পি লাহিড়ি বুড়ো হয় না বলছো তাহলে? হা হা হা… আশাজি এক বার ওঁর নাতনিকে বলেছিলেন নায়িকা না হয়ে গায়িকা হও। তাহলে আশা ভোঁসলের মতো সব যুগের নায়িকার লিপে তোমার গান বাজবে।

    আসল ব্যাপার হল, আমার বাড়িতে যদি আসো তাহলে দেখবে প্রচুর পুরস্কার। ঘরে রাখার জায়গা নেই। কিন্তু আমি অতীত আঁকড়ে বসে থাকি না। আমি আজ এখন কী করছি, সেটাই আমার পরিচয়।

    উত্তম কুমারের লিপে ‘এই তো জীবন’, কিশোর মামার গান, আমার সুরে আইকনিক। মিঠুন তো আমায় ওঁর একটা অংশ বলেন। আমরা জুটি। ‘অমর সঙ্গী’তে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ গানটা অবাঙালিদের মধ্যেও জনপ্রিয়। সেই ‘তাম্মা তাম্মা’তে সঞ্জয় দত্ত নেচেছিল, এখন বরুন ধাওয়ান ‘বদ্রীনাথ কি দুলহানিয়া’তে নাচছে। সব জায়গায় আজও বাপ্পি লাহিড়ির মিউজিক হিট।

    প্রশ্ন: এখন কী করছেন বললেন, তাই বলছি। আপনি হলিউডে অনেকগুলো ছবিতে মিউজিক করেছেন। সম্প্রতি বিখ্যাত মার্কিন গায়িকা লেডি গাগার সঙ্গেও ডুয়েট গাইলেন।

    বাপ্পি: লেডি গাগা গানগুলির ইংলিশ ভার্সন গেয়েছেন আর আমি হিন্দি। আশা করা যায় এই বছরের শেষের দিকেই মুক্তি পাবে গান। এত ফরেন স্টারদের সঙ্গে কাজ করছি, খুব ভাল লাগছে। লেডি গাগা ছাড়াও ‘লায়ন’ তো আছেই। ‘ট্র্যাপ সিটি’ নামে হলিউড সিনেমায় একটি ব়্যাপ গানের সুর দিলাম। এছাড়াও ‘মোয়ানা’, ‘দ্য গার্ডিয়ান্স অব দ্য গ্যালাক্সি টু’। আমি চাইছি পিট বুলের সঙ্গেও কাজ করতে।

    একসময় আমার নিজের দেশে আমাকে ‘টুকলিবাজ’, ‘কপি মাস্টার’ বলত কিছু নিন্দুক। আর আজ আমার গান গোটা বিশ্ব ওরিজিনাল বলে জানছে। এর থেকে গর্বের আর কী হতে পারে?

    প্রশ্ন: আরডি বর্মন, যতীন-ললিত, এআর রহমান, এক একটা যুগ চলেছে, কিন্তু বাপ্পি লাহিড়ির মিউজিক এখনও সবুজ, তরুণ। সেই লতা-আশা-কিশোর থেকে উরি উরি বাব্বা, উলা লা লা, তাম্মা তাম্মা—সব গান পাবলিক লুফে নিচ্ছে। মুখেমুখে ফিরছে আপনার গান। নিজেকে যুগোত্তীর্ণ করার ম্যাজিকটা কি আপনার।

    বাপ্পি: আসল হল আমার গানে বিট। বিটে বিটে পাবলিক দুলবে। আমি মেলোডি বেসড গান তো অনেক করেছি। কিন্তু এই ডিস্কো বা বিট-বেসড গান পাবলিক কোনটা নেবে সেটা আমার ভাল আইডিয়া আছে। সেই শুরুর দিন থেকেই মহম্মদ রফিজির গান করেছি। লতাজি আমার মা সরস্বতী। ফোনে কথা হলেই লতাজিকে আমি বলি, ‘মা সরস্বতী প্রণাম’। আশা দিদির কত কত গান আমার সুরে সব হিট। কিশোর মামা তো ভাগ্নে মানতেন আমায়। কিশোর কুমারের শেষ রের্কডিং গান আমার সঙ্গেই। আমি ওঁদের পছন্দগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতাম। কোনটা ওঁদের কণ্ঠে মানায়, সেই রকম ভাবে নতুন আইডিয়ার গান আনতাম। এর পর ডিস্কো থেকে উলা লা লা সব গানে বিট মিউজিক আমি প্রধান রেখেছি আমার গানে। ক্যাচি শব্দ, যা পাবলিকের মুখে মুখে ফিরবে। এটাই আমার ম্যাজিক।

    প্রশ্ন: বাপ্পি লাহিড়ি মানেই সোনা। এত সোনা পরেন আপনি, সোনা কি শুভ বলে মানেন? নাকি আপনার কাছে আলাদা আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আছে সোনার?

    বাপ্পি: সোনা আমার কাছে শুভ অবশ্যই। আর সোনার গয়না আমার সিগনেচার মার্ক। গোল্ড ইজ় মাই গড। সোনা আমার জন্য লাকি। সোনা ছাড়া বাপ্পি লাহিড়িকে মানায় না।

    প্রথম সোনা পরেছিলাম এই হরেকৃষ্ণ হরেরাম লকেট। ‘জখমি’ ছবি যখন সিলভার জুবলি হিট হল ১৯৭৪ সালে, তখন আমার মা আমায় এই সোনার লকেট আর সোনার হার পরিয়েছিলেন। আজও পরে থাকি। এর পরে যখন আমার বিয়ে হল তখন বালাজি লকেট ধারণ করি। এরপর গণেশের দুধ খাওয়ার ঘটনা মনে আছে? তখন আমায় স্বপ্নাদেশ দেন গণপতি বাপ্পা। তখন গণপতি বাপ্পা লকেট ধারন করি। এভাবে এখন সোনায় মুড়ে গেছি আমি।

    নিউ ইয়র্কে খুব ঠান্ডায় একবার আমি সোনাগুলো পোশাকের ভিতরে ঢুকিয়ে সোয়েটার-জ্যাকেট পরে বেরিয়েছি। ফ্যানরা এসে জিজ্ঞেস করছে ” আপনাকে চেনা চেনা লাগছে, আপনিই কি বাপ্পি লাহিড়ি?”

    আমি বললাম, “কেন?”

    তখন ওরা বলছে “আপনার সোনাগুলো কোথায়?”

    মানে সোনা দেখে লোকে আমায় আইডেন্টিফাই সবার আগে করে। এমন সোনা দিয়ে সিগনেচার মার্ক নিজের করে দিয়েছি, যেটা কেউ কপি করতে পারবে না। আমার চশমা, গগলস, ব্রেসলেট, ঘড়ি, গয়না—সব সিগনেচার মার্ক তৈরি করে নিয়েছি। এরকম স্টাইল আইকন ট্রেন্ডসেটার ছিলেন এলভিস প্রেসলি। আমি আমার গয়না স্টাইলের রাইট নিয়ে নিয়েছি। যে আমার স্টাইল কপি করবে, মামলা করে দেব তার নামে। হা হা হা…

    প্রশ্ন: আপনার এত প্রানবন্ত এনার্জির উৎস কী?

    বাপ্পি: আমার এনার্জি সঙ্গীত সঙ্গীত সঙ্গীত। পায়ে এত বড় অপারেশন হয়েছে, তার পরেও সঙ্গীতের টানে ‘সুপার সিঙ্গার’-এ এসছি।

    প্রশ্ন: এত রিয়্যালিটি শো, এত প্রতিযোগী, কত জন টপ ফাইভে পৌঁছচ্ছেন, চ্যাম্পিয়ন হচ্ছেন। আবার এঁদের অনেকেই কালের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছেন। শো শেষে কয়েক মাস পর চ্যাম্পিয়নদেরই লোকে ভুলে যাচ্ছে। এই সব খ্যাতি আগেই পেয়ে গিয়ে পরে যেন শূন্য। টিকে থাকার জন্য কী টিপস দেবেন এঁদের?

    বাপ্পি: শুধু গান গাইলেই হয় না। অন্যের গান গেয়ে শোনালেও হয় না। হ্যাঁ নিশ্চয়ই পাবলিকদের ভাল লাগল সে গান। কিন্তু সবকিছুর পেছনে থাকে তকদির। তকদির বোঝো? তকদির মানে বাংলায় যাকে বলে ভাগ্য। প্রতিটি মানুষের নিজের তকদির থাকে। ভাগ্যই তোমাকে নিয়ে যাবে আর সঙ্গে চাই অধ্যবসায়। ভাগ্যে না থাকলে কেউ কিশোর কুমার বা লতা মঙ্গেশকর হতে পারে না। তাই সবকিছুর সঙ্গে স্বতন্ত্রকা বজায় রাখতে অবশ্যই নিজের গান, নিজের সিগনেচার গান গাইতেই হবে। অন্যের গান তো নিজের সতন্ত্রতা তৈরি করবে না।

    তবু বলব, সুপার সিঙ্গারের মঞ্চ একটা বড় প্ল্যাটফর্ম। বড় সুযোগ। এই এত মাস ধরে আইকনিক শিল্পীদের গাইডেন্স, তাঁদের থেকে শেখা, এগুলো ক’জনের ভাগ্যে হয়। ‘সুপার সিঙ্গার’ থেকে যাঁরা উঠবেন, তাঁদের একটা আইন্ডেটিটি তৈরি হবে।

    ‘সুপার সিঙ্গার’ মঞ্চ প্রতিযোগীদের প্রদীপটা তৈরি করে দিচ্ছেন। এবার তেল কতটা ঢালতে হবে, প্রদীপ কতক্ষণ ধরে জ্বলবে, সেটা প্রতিযোগীদের হাতে। সেটাই ভবিষ্যৎ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More