সুন্দরী সিকিমের বিজন পথে

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান পাল

    পথিক সাহিত্যিক শব্দবন্ধটি তাঁর নামের পাশে হয়তো সবচেয়ে ঠিকঠাক বিশেষণ। তবে শুধু সেটুকু বললে কিছুই বলা হয় না। এমন মানুষ বাংলার ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাসে কমই এসেছেন। ছাত্রাবস্থাতেই সাহিুত্যের ভুবনে প্রবেশ করেছিলেন সুবোধকুমার চক্রবর্তী, এ বছর যাঁর জন্মশতবার্ষিকী। ভ্রমণ সাহিত্যে তাঁর ভূমিকার প্রখম পদক্ষেপ রম্যাণি বীক্ষ্যর প্রথম পর্ব পড়েই সজনীকান্ত দাস তাঁর সম্পাদিত শনিবারের চিঠিতে তা প্রকাশ করেন। ভ্রমণপ্রিয় বাঙালির অন্যতম পুরোধা সুবোধকুমার চক্রবর্তীর রম্যাণি বীক্ষ্য চরৈবেতির প্রকৃত ছবি বলে মনে করেছিলেন সজনীকান্ত।

    রম্যাণি বীক্ষ্য পড়ে পথিক সুবোধকুমার চক্রবর্তীকে অনুসরণ করে বেরিয়ে পড়লাম মোটরবাইকে সফরে। উদ্দেশ্য? সিকিম হিমালয়ের প্রান্তে পাঁচ দিন বিজন পথে ভ্রমণ।

    প্রথম দিন

    আম বাঙালির সঙ্গে সিকিমের যোগ বহুচর্চিত। তাই এমন সব জায়গার সন্ধান দিচ্ছি যা মূলত উত্তর সিকিম যা তেমন ভাবে বঙ্গ পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি এখনও। তাই রংপো থেকে আমাদের বাইক গ্যাংটকের দিকে না গিয়ে দু ঘণ্টার যাত্রার পর পৌঁছলাম ডিকচু নামে এক পাহাড়ি গ্রামে। ডিকচু থেকে মাঙ্গান যাওয়ার পথ দিয়েই সিকিমের উত্তর প্রান্তের শুরু। আর চার পাশে দেখতে পাবেন অজস্র ঝর্ণা, অর্কিড, বন্য লিলি আর বিভূতিভূষণের প্রিয় ‘ফরগেট মি নট  ফুল।’

    মোটর সাইকেলের পিছনের সিটে বসে থাকায় রাস্তার ধারে এই ফুলের ঝাড় আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আকাশের মেঘ বলছিল বৃষ্টি আসবে। তাই তাড়াতাড়ি মাঙ্গানের নর্থ ডিস্ট্রিক্ট অফিসে পৌঁছনোর  পর দেখা হল আরও বাইকারদের সঙ্গে। বাইকার ব্রাদারহুডের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ের পর তাঁরাই সন্ধান দিলেন ট্যুরিস্ট লজের। ট্যুরিস্ট লজটি সিঙ্গিকে অবস্থিত। মাঙ্গানের খুব কাছে। সিঙ্গিক ট্যুরিস্ট লজের চারপাশের অপার্থিব সৌন্দর্য্য ছাড়াও মুগ্ধ করে লেপচাদের আতিথেয়তা। লজের লেপচা তরুণ পরিচারকের সঙ্গে স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতি নিয়ে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। স্তম্ভিত হয়ে গেছিলাম লেমন গ্রাসের তৈরি একটি পানীয় খেয়ে। লজের বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখা ছিল এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।

    দ্বিতীয় দিন

    পরের দিন সকালে আবার জামাকাপড়, হেলমেট, আর্ম গার্ড, নি গার্ড, পোঁটলা পুঁটলি বেঁধে এ বার লাচুংয়ের দিকে যাত্রা শুরু হল। যাওয়ার পথে বন্দি করতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে ক্যামেরায়। এনএইচ ১৩ ধরে সিঙ্গিক থেকে লাচুং পৌঁছতে লাগল তিন ঘন্টা। সাথে সাথে অবশ্য চলেছে তিস্তাও। লাচুংয়ের নিজস্ব ঢঙে চলে। এখানে ম্যাগি পাওয়া গেলেও, মোমো পাওয়া যায় না। এমনকী এখানে বোতলে ভরে পানীয় বিক্রিও নিষিদ্ধ। কর্মব্যস্ত এই গ্রামটিতে বিপুল সংখ্যায় বাইকারস ও পর্যটক আসে।

    লাচুংয়ের নিজস্ব সংস্কৃতির একটা ছোট্ট উদাহারণ দিয়েই চলে যাব আগামী কাল সকালে ইয়ুমথাং যাত্রায়। লাচুংয়ে ভুটিয়া মা-মেয়ের দোকানে বসে তাঁদের তৈরি বেতের ঝাপিতে (যাকে ওরা টোম বলে)ভাজাভুজি দিয়ে চা খেতে খেতে জানলাম, লাচুংয়ে ছোট্ট বাজারে সিংহভাগ দোকান মূলত মহিলারাই পরিচালনা করেন।

    তৃতীয় দিন

    ১২,৮০০ ফুট উঁচুতে ইয়ুমথাং লাচুং থেকে বাইকে দু ঘন্টার পথ। চার পাশে ঘাসে ঘাসে ফুটে আছে নাম না জানা জংলি ফুল। আশপাশে রডোডেনড্রনের ঝাড়। মে মাসেও এখানে বৃষ্টি ও বরফ। তাই জুতো ভিজে গিয়েছিল। কিন্তু বাইকাররা তা অগ্রাহ্য করেই এগিয়ে চলে। ইয়ুংথাং ছাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট যাওয়ার পথে আর্মি চেক পোস্ট পার করেই সেনাদের তৈরি করা একটা শিবমন্দির দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। সেই মাহেন্দ্রক্ষণটিতে মেঘ সরে গিয়ে রোদ উঠল। এই যাত্রাপথে আরও উপভোগ্য দু পাশে দেখা ইয়াক বা চামরিগাই। কচি সবুজ ঘাসে চরে বেরাচ্ছে তারা। ঘাসের সেই শুরু আর সেই শেষ। এর পর এই পাণ্ডববর্জিত বিজন পথে প্রকৃতি শুধু বরফ দিয়েই সাজিয়েছে নিজেকে। জিরো পয়েন্টের অন্যদিকে চিনেরা আর এ দিকে বরফ নিয়ে খেলতে মগ্ন পর্যটকেরা। এ বার একটু সুবোধকুমার চক্রবর্তীর মতো করে চিন্তা করি। কারণ অনেক প্রশ্নই কুহেলিকার মতো উদয় হচ্ছিল এখানকার সেনাদের দেখে। আমাদের খুব ভাল লাগছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে। কিন্তু কাশ্মীরের পাহাড়ই হোক বা নর্থ সিকিমের ইয়ুমথাংয়ের জিরো পয়েন্ট- এই ঠাণ্ডায় দিনের পর দিন পরিবার থেকে দূরে নিদারুণ সঙ্কটে কী ভাবে তারা দিন যাপন করে?

    এত ঠাণ্ডায় ফ্রয়েডিয় তত্ত্বও যেন ফেল করে যাবে। এই বিপদসংকুল পথ কি সুন্দর! জিরো পয়েন্টে তুষার বৃষ্টি দেখে সকল পর্যটকরা শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে ভিজতে লাগল। যেন নতুন করে কৈশোরে ফিরে গেছেন তাঁরা।

    চতুর্থ দিন

    ফিরে আসি লাচুংয়ে সেখানে এক রাত্তি থেকে পর দিন গ্যাংটক গমন। গ্যাংটকে এই যাত্রায় আমার প্রথম বার আসা। আর সুবোধকুমার চক্রবর্তীর চোখ দিয়ে দেখলে, মহাত্মা গান্ধী মার্গের জন অরণ্য দেখে বিচিত্র গল্পের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। মনে পড়ল বিজয়া রায় লিখেছিলেন, এই গ্যাংটকে এসেই সত্যজিৎ রায় তাঁর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লিখেছিলেন, গ্যাংটকে গণ্ডগোল। এ প্রসঙ্গে বলি সিকিমের রাজা চোগিয়ালের প্রস্তাবে তৈরি সত্যজিৎ রায়ের সিকিমের উপর ডকুমেন্টারিটা দেখলে উত্তর সিকিমকে অনেকটা বোঝা যাবে। তবে উত্তর সিকিমের রোমান্সে এখানেই ইতি টেনে আমাদের যাত্রায় ইতি টানব। এ বার শেষ দিনে ছাঙ্গু লেক, হরভজন বাবার মন্দির দেখে নাথুলা বর্ডার ছুঁয়ে নাথাং ভ্যালি যাব।

    পঞ্চম দিন

    ছাঙ্গু লেক, হরভজন বাবার মন্দির এবং নাথুলা বর্ডারে প্রচুর বাঙালি পাবেন যাঁরা বরফের আকর্ষণেই মূলত আসেন। আর হরভজন বাবা সেনাবাহিনীর এক অফিসার ছিলেন। কথিত আছে তাঁর আত্মা এখনও ঘুরে বে়ড়ায় এখানে। তাঁকে কেন্দ্র করেই মন্দির। আমাদের এর কোনওটাই আকর্ষণীয় লাগেনি। আমি বরং আপনাদের নিয়ে যাই নাথাং ভ্যালিতে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার আগে ১৪৪০০ ফুট উচ্চতায় রোপওয়েতে করে ছাঙ্গু লেকের উপর দিয়ে যাত্রাটি এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। প্রসঙ্গত, দশ বছরের মানবিক সংগ্রামের ফসল এই জনমানবহীন এলাকায় আধুনিক প্রযুক্তির এই রোপওয়েটি।

    ঘরে ফেরা

    নাথাং ভ্যালিতে যখন ঘুম ভেঙেছিল তখন সূর্যের আলোর ছটায় হাসছে হিমালয়ের এই উপত্যকা। নাথাং ভ্যালি ১৩৪০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এক জনমানবহীন উপত্যকা। যেখানে মোটরবাইকের চাকা পাংচার হলে বা মোটরবাইক খারাপ হলে দূর দূর পর্যন্ত সারাবার কোনও উপায় নেই। বিশাল এই উপত্যকাটি সিল্ক রুটের অংশ। সকাল ৬টার সময় রওনা হয়ে আমার সঙ্গী তথা চালক চিরঞ্জিৎ ঘোষকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম জুলুকের উদ্দেশে। সিল্ক রুটের কোথায় ঘুরব তা আগে থেকে ঠিক ছিল না। গাড়িতে ওঠার আগে সকালের চা আর টোস্ট খেতে খেতে (এর বেশি কিন্তু এখানে প্রাতঃরাশে আশা করবেন না) ঠিক করি বিশ্বের ইতিহাস খ্যাত সিল্ক রুটের কোন অংশ দিয়ে আমরা যাব। তার পর সেখান থেকে প্রায় তিন ঘন্টা বাইক যাত্রা করে জুলুকের খাড়া রাস্তা অতিক্রম করে পৌঁছলাম রংপু,-সিকিমের অন্তিম ঠিকানায়। এর পর পশ্চিমবঙ্গ শুরু। মানে ঘরে ফেরা। তবে এখানেই বলে রাখি বাইকে করে যাত্রায় উত্তর সিকিমের বেশ কিছু ভাঙাচোড়া পাথুরে পথে কষ্ট হয়। পাকদণ্ডীর মতো রাস্তা উপরে উঠে গেছে। বিশেষ করে জুলুক এবং ইয়ুমথাংয়ে। একপাশে গভীর খাত নিকোলাস রোয়েরিখের ছবির মতো। সেখান থেকে বয়ে গিয়েছে তীব্র গতিতে তিস্তা নদী। অন্যদিকে উঠে গিয়েছে খাড়া পাহাড়। বাইকে বসে ভয় হয় ঠিকই, তবে পাহাড়ের উপর থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে সেই ভয় কেটে গিয়েছিল নিমেষে। আর এই সৌন্দর্য্য গাড়িতে বসে তেমন করে উপলব্ধি করা যায় না। তাই চিরঞ্জিৎকে বলে ফেলেছিলাম বাইক দুর্ঘটনায় যদি মরেও যাই, তা হলেও এই রম্যাণি বীক্ষের মাঝে মরে সুখ আছে।

    ছবি: চিরঞ্জিৎ ঘোষ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More