সোমবার, জানুয়ারি ২৭
TheWall
TheWall

চৈত্র শেষের আলোয় রাঙে গাজন, জানুন এই পরব নিয়ে বাংলার ধর্ম-সংস্কৃতি-ইতিহাস

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

অনির্বাণ

এই বাংলা উৎসবের বাংলা। এখানে সংস্কৃতি আর ধর্মের মেলবন্ধনে গোটা বছর ধরেই চলে নানা পরব। এবার চৈত্র শেষের সোনালি আলোয় বেজে উঠেছে গাজনের ঢাক। গাজন বা চড়কই তো বাংলা বছরের শেষ উৎসব।

অনেকে মনে করেন গাজন বা চরক মানে শুধুই শিবের আরাধনা। কিন্তু শুধু শিবকে কেন্দ্র করেই নয়, গাজন উৎসব পালিত হয় ধর্মরাজকে ঘিরেও। আর দুই দেবতার পুজোতেই জাতপাতের ভেদাভেদ ভেঙে যে কেউ অংশ নিতে পারে। এটাই বাংলার সংস্কৃতি।

গাজন শব্দটি এসেছে ‘গর্জন’ থেকে। অনেকে বলেন, সন্ন্যাসীদের হুঙ্কারই শিবসাধনায় গাজন নামে প্রচলিত হয়। বাংলার মঙ্গলকাব্যেও গাজনের উল্লেখ মেলে। ধর্মমঙ্গল কাব্যে রানি রঞ্জাবতী ধর্মকে তুষ্ট করতে গাজন পালন করেছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

আবার পুরণেও রয়েছে গাজনের উল্লেখ। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে রয়েছে– ‘‘চৈত্র মাস্যথ মাঘেবা যোহর্চ্চয়েৎ শঙ্করব্রতী। করোতি নর্ত্তনং ভক্ত্যা বেত্রবানি দিবাশিনম্।। মাসং বাপ্যর্দ্ধমাসং বা দশ সপ্তদিনানি বা। দিনমানং যুগং সোহপি শিবলোক মহীয়তে।।’’ অর্থাৎ, চৈত্র মাসে কিংবা কোনও শিবভক্ত যদি মাঘ মাসে এক, সাত, দশ, পনেরো কিংবা তিরিশ দিন বেতের লাঠি হাতে নিয়ে নৃত্য করেন তবে তাঁর শিবলোক প্রাপ্ত হয়।

ইদানীং কমছে। তবুও গ্রামবাংলায় তো বটেই শহরাঞ্চলে এখনও গাজনের ছবি দেখা যায়। চৈত্র মাসের শুরু থেকেই ধ্বনিত হয় ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে…’। গৃহীরাই সন্ন্যাস নেন। সারাদিন সন্ন্যাসীর পথে পথে ঘুরে ভিক্ষা করেন। দিনভর উপবাসের পরে ভিক্ষায় মেলা চাল, সবজি রান্না করে খান।

তবে বাংলার সর্বত্র গাজন পালনের ছিব এক নয়। বিভিন্ন প্রান্তে গাজনের আঞ্চলিক বৈচিত্র দেখা যায়। কোথাও মুখোশ নৃত্য, কোথাও প্রতীকী শিবলিঙ্গ মাথায় নিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে পথ পরিক্রমা করেন ব্রতধারী সন্ন্যসীরা। অনেক জেলায় আবার এই সময়ে কালীনাচ দেখা যায়।

গাজন পরবের অংশ হিসেবেই পরের দিন পালিত হয় নীল পুজো। সনাতন সংস্কৃতি মেনে সন্তানের মঙ্গল কামনায় গাজন সন্ন্যাসীদের ফল, আতপচাল, ও অর্থ দান করেন মায়েরা। অনেকে গোটা দিন উপবাস করে শিবের পুজো দেন। কেউ দিনের শেষে সাবু মাখা খান, কেউ রুটি, লুচি। তবে ভাত নৈব নৈব চ।

আর চৈত্রের একেবারে শেষ দিনে উদ্‌যাপিত হয় চড়ক। গাজনতলায় হয় চড়কগাছের পুজো। চড়কগাছ মানে একটি লম্বা কাঠের দণ্ড। তার উপরে অনেকটা উঁচুতে আংটায় ঝুলে থাকা জনা সন্ন্যাসীর ক্রমাগত ঘুরপাক খান। এ দৃশ্য খোদ কলকাতাতেও দেখা যায়।

নানা লোককথা রয়েছে গাজন নিয়ে। শোনা যায়, শিবভক্ত বান রাজা ইষ্ট দেবতাকে তুষ্ট করতে কঠিন কৃচ্ছ্বসাধনের মধ্য দিয়ে তপস্যা করেন। সেই সূত্র ধরেই চড়কের শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা আজও বান ফোঁড়ান, নানা ধরনের ঝাঁপ দেন। যা বেশির ভাগই অত্যন্ত কষ্টের। থাকে নানা অদ্ভূত আচার। জীবনের ঝুঁকিও নেন সন্ন্যাসীরা। বাংলার কোথাও কোথাও গাজনে নরমুণ্ড নিয়ে নাচও দেখা যায়।

তবে ব্রিটিশ আমলে এই প্রথাকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টাও হয়। এর পরে বানের বদলে পিঠে গামছা বেঁধে চড়কে পাক খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। এখন সেটাই বেশি প্রচলিত। গাজন উৎসবে নানা বৈচিত্রের কথা আগেই বলা হয়েছে। মালদহ জেলায় গাজন উৎসবই গম্ভীরা।

কলকাতায় চড়কের মেলার পাশাপাশি গাজনের অঙ্গ হিসেবে বের হয় চৈত্র সংক্রান্তির সঙ। জেলে পাড়ার সঙ-এর কথা বহুল পরিচিত। এক সময়ে এই সঙের বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগও ওঠে। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও এখনও চলছে সঙ যাত্রা। উত্তর কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরেও সঙ বের হয় চৈত্র সংক্রান্তির দিনে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাজনের উৎসবে অনেক বদল এসেছে। তবে অতীতের মতো এখনও গাজন মানে সব স্তরের মানুষের উৎসব। এখানে কোনও কোনও ভেদাভেদ নেই। বাংলা বছরের শেষ দিনে বাংলার এই উৎসব আসলে মিলনের উৎসব। সব ভেদাভেদ ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আগে মহা-মিলন।

Share.

Comments are closed.