খাট থেকেও নামতে পারতেন না অসুস্থ মা! তাঁকেই দোতলা থেকে টেনে-হিঁচড়ে আনা হল হোটেলে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: বেশ কয়েক বছর ধরে অসুস্থ তিনি। হার্নিয়া অস্ত্রোপচার হয়েছে। হৃদযন্ত্রেও বড় সমস্যা ধরা পড়েছে। চলাফেরা করতেই পারেন না। সমস্ত প্রয়োজনীয় কাজটুকু করিয়ে দিয়েছেন তাঁর মেয়ে এবং পরিচারিকা। নিয়ম মতো খাওয়া, সময় মতো ওষুধ, ঘরে বসেই ঈশ্বরের পুজো আর বিনোদন বলতে টেলিভিশন– এইটুকুই ছিল মল্লিকা পালের জগৎ। কার্যত খাট থেকেই নামেননি শেষ কয়েক মাস। শরীরের ওজন বেশ অনেকটাই বেশি।
    এই মানুষটাকেই মাত্র  ১০ মিনিটের নোটিসে টেনে হিঁচড়ে বার করে আনতে হল ১/৫বি, দুর্গা পিথুরি লেনের বাড়ির দোতলা থেকে!
    রয়ে গেল ওষুধপত্র, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, আরও নানা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তাঁর মেয়ে, দিশাহারা সোনালি পালের গলায় এখনও আতঙ্ক! “যে কোনও সময়ে হার্টের সমস্যা দেখা দিতে পারে মায়ের, কোনও রকমের উত্তেজনা বারণ! সেই মানুষটাকে এভাবে ঘর থেকে বার করে এনে দিনের পর দিন হোটেলে রাখা কি সম্ভব!”– অসহায়তা উপচে পড়ে।
    শুধু তা-ই নয়। মাকে এভাবে বার করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই সঙ্গে আনতে পারেননি কিচ্ছু। এক জন মহিলার ঘরের বাইরে থাকার জন্য যে ন্যূনতম প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা-ও নেই তাঁর। সর্বোপরি, বাড়ির ভিতরে রয়ে গিয়েছে মৃত বাবার স্মৃতি। পরবর্তী কালে হাজারো ক্ষতিপূরণ মিললেও, তা হয়তো আর ফেরত পাওয়া যাবে না! এই যে এত দিন বাড়ির ঈশ্বরেরা জল পাচ্ছেন না, সেই ক্ষতিই বা পূরণ করবে কে!
    সরকারের উপরে তেমন অভিযোগ নেই সোনালির। কয়েক দিনের হোটেল বাস না হয় মানিয়ে নেবেন। খাওয়াদাওয়ারও খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন একটাই, ঠিক কত দিন এমনটা চলবে। “রবিবার যখন বাড়ি ভেঙে পড়ল, চার দিকে ছোটাছুটি, আমাদের বাড়িতেও ফাটল ধরে। সেটা এসে দেখেও গেছিলেন এঞ্জিনিয়াররা। বলেছিলেন, সুড়ঙ্গ বানানো হচ্ছে যেখানে, তার ৫০ মিটারের মধ্যে আমাদের বাড়ি পড়ছে না। ফাটল ধরলেও আমরা নিরাপদে আছি। আমরাও সেই শুনে নিশ্চিত ছিলাম।”– বলেন সোনালি। যদিও কারেন্ট ছিল না রবিবার সারা দিনই।
    কিন্তু সোমবার সমস্ত নিশ্চয়তা ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যায়। সকালে ব্যাঙ্কের কাজে বেরিয়েছিলেন সোনালি। এসে দেখেন, বাড়ির সামনে পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স ছয়লাপ। এই মুহূর্তে বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দিচ্ছে পুলিশ। আকাশ ভেঙে পড়ে সোনালির মাথায়। বললেন, “আমি বাইরে থেকে এসে দেখি এই অবস্থা। ওঁরা আমাকে ঢুকতে পর্যন্ত দেননি ভেতরে। ওঁরাই ওপর থেকে মা-কে নামাচ্ছিলেন নিজেরাই! আমি তো প্রায় পায়ে পড়ে যাই পুলিশের। বুঝিয়ে বলি, মা অসুস্থ। আমার যাওয়াটা দরকার। কিন্তু কে শোনে কার কথা! উল্টে পুলিশ আমাদের ধমক দেন, ‘আপনারা কি প্রাণে বাঁচতে চান না’!”
    তবে পুলিশেরা খুবই সাহায্য করেছেন বলে জানালেন সোনালি। ১০-১২ জন মিলে, অত্যন্ত যত্নে এবং সাবধানে নামিয়েছেন মা মল্লিকাকে। বারবার আশ্বস্ত করেছেন, কোনও ভয় নেই। রীতিমতো যুদ্ধ করে মল্লিকা দেবীকে নীচে নামিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলা হয়। তার পরে নিয়ে আসা হয় চাঁদনি চক এলাকার হোটেল এমব্যাসিতে। সেখানেই আপাতত রয়েছেন মা-মেয়ে। একই বাড়িতে থাকতেন সোনালির জ্যেঠতুতো দাদা শুভজিৎ পাল। তাঁর মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে সম্প্রতি। পরিচ্ছন্নতাজনিত সমস্যা হতে পারে বলে হোটেলে নিয়ে আসতে পারেননি তাঁকে, রেখেছেন আত্মীয়ের বাড়িতে।
    হোটেলে এসে ডাক্তারকে ফোন করে মায়ের ওষুধগুলি নতুন করে জেনে, সেগুলি সবার আগে কিনে এনেছেন সোনালি। জামাকাপড়ও কিনেছেন প্রয়োজনীয়। ২০-৩০টা পাখিও পোষা ছিল সোনালির। কোনও রকমে পাড়ার এক বন্ধুর বাড়িতে দিয়ে আসতে পেরেছেন সেগুলিকে। কিন্তু ভয় পাচ্ছেন, তাঁদেরও যদি বাড়ি ছাড়তে হয়! সঙ্গে আনতে পারেননি কোনও সার্টিফিকেট, মার্কশিট। ফাটল যদি বাড়ে, পুরো বাড়ি যদি ভাঙে, তা হলে কী করে ঘুরে দাঁড়াবেন মা-কে নিয়ে, জানেন না সোনালি।
    “কিন্তু সত্যিই কি আর একটু সতর্কতা নেওয়া যেত না? আমাদের আগে থেকে বলা যেত না, এমনটা হতে পারে? সব শুনে মনে হচ্ছে, আশঙ্কা তো আগে থেকেই ছিল। এ তো ম্যানমেড দুর্ঘটনা হয়ে গেল। সরকার অবশ্য আমাদের খেয়াল রাখছে যথেষ্ট। থাকা-খাওয়া নিয়ে আমাদের অভিযোগ নেই। বাড়ির যা ভাঙন ধরেছে, তা সারানোর ক্ষতিপূরণও হয়তো দেবে সরকার। কিন্তু এই যে ধকলটা গেল, এই যে অসুবিধা করে থাকতে হচ্ছে অনির্দিষ্ট কালের জন্য, এটার ক্ষতিপূরণ কে দেবে! কে বলে দেবে, এই ধকল ঠিক কত দিনের। আর যদি ঈশ্বর না করুন নিজের বাড়িতে ফেরা না হয়, তা হলেই বা কোথায় ঠাঁই মিলবে আমাদের?”– প্রশ্ন তাঁর।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More