শ্যামাপ্রসাদ যা বলতেন আর এনারা যা বলছেন

একদা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এখন আছেন দিলীপ ঘোষ। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। সময়ের সঙ্গে অনেক বিবর্তন হয়েছে। হওয়াই স্বাভাবিক। তবু শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে দিলীপবাবুদের তুলনা এসেই পড়ে। কেননা তাঁরা শ্যামাপ্রসাদকে গুরু বলে মানেন।

মানুষের ব্যবহারই তার পরিচয়। সৌজন্য, শিষ্টাচার, বুদ্ধিদীপ্ত কথাবার্তা, এসব দিয়ে মানুষকে চেনা যায়। এই ব্যাপারগুলো শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে ছিল। তাঁকে যাঁরা সংসদে ভাষণ দিতে শুনেছেন, তাঁরা বলেন, সে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

বিশাল চেহারা ছিল শ্যামাপ্রসাদের। সেইরকম গমগমে গলা। তিনি ভাষণ দিচ্ছেন শুনলে সেন্ট্রাল হলে চা-কফির আড্ডা ফেলে সব এমপি লোকসভা কক্ষে হাজির হতেন। তাঁর ভাষণে এমন জাদু ছিল, যা মুগ্ধ করে রাখত সকলকে। কংগ্রেসিরা সুদ্ধু যেভাবে মন দিয়ে তাঁর কথা শুনতেন, তাতে রেগে যেতেন নেহরু। তিনি মাঝে মাঝেই শ্যামাপ্রসাদের ভাষণে বাধা দিতেন। লেগে যেত তর্ক। প্রতিবারই তর্কে নেহরুর হার হত।

শ্যামাপ্রসাদ নিজে নাকি একবার নেহরুকে বলেছিলেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী। আমাদের সকলের সম্মানের পাত্র। আপনাকে তর্কে হেরে যেতে দেখে আমারও খারাপ লাগে। আপনি কি আমার ভাষণের সময় বাধা না দিয়ে থাকতে পারেন না?

নেহরু বললেন, আপনার কথা আমি মানি। কিন্তু আপনি যখন বলেন, আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারি না।

শ্যামাপ্রসাদের কথা বিরোধী দলের লোকেরাও মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। কিন্তু দিলীপবাবুদের কথা শুনে মাঝে মাঝে তাঁদের নিজেদের দলের লোকই অস্বস্তিতে পড়েন। গত ক’মাসে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের নামে কটুকাটব্য করছেন খুব। বলছেন, গুলি করে মারব, লাশ গুনতে হবে, কেউ প্রশ্ন তুললে জবাব দিচ্ছেন, বেশ করেছি তোর বাপের কি, কখনও বিরোধীদের বাপ-মা তুলে গাল দিচ্ছেন। আরও অনেক কথা বলছেন যা শুনলে কানে আঙুল দিতে ইচ্ছা করে।

কুকথা আমরা আগেও শুনেছি। বামফ্রন্ট আমলে ছিলেন বিনয় কোঙার। দিদিমণির আমলে আছেন অনুব্রত মণ্ডল। সব দলই প্রতিপক্ষকে গাল দেওয়ার জন্য অমন এক-আধজনকে ফিট করে রাখে। সেদিক থেকে বিজেপি আলাদা। এরা মনে হয় সবাইকে ফিট করে রেখেছে। বিজেপির বড়, মেজ, সেজ, কেউ কম যাচ্ছেন না। এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ। অকথা-কুকথার স্রোত বইছে।

মানুষের কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে তার শিক্ষার পরিচয় পাওয়া যায়। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন সেরা ছাত্র। স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি তাঁর ঝলমলে রেজাল্ট। এখনকার বিজেপি নেতাদের অনেকেরই পরীক্ষা পাশের সার্টিফিকেট নিয়ে নানা গোলমাল আছে শোনা যায়। শ্যামাপ্রসাদের মতো বাগ্মীতা তাঁরা পাবেন কোত্থেকে?

শিক্ষিত মানুষজনকে বিজেপি দেখতে পারে না। তাঁরা খালি প্রশ্ন তোলেন। একজন নেতা তাঁদের বললেন কুকুর। অন্যরা বলছেন পাকিস্তানের দালাল। দেশদ্রোহী। অমর্ত্য সেন বা অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাউকে ছাড়ছেন না।

দিলীপ ঘোষের কোনও রাখঢাক নেই। তিনি বলছেন, আমি ভদ্রলোকের রাজনীতি করতে আসিনি। সম্ভবত ভাবছেন, হুলিগানদের দিয়েই পার্টি চলবে। এরকম হয়। কোনও দল যত মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তত গুন্ডাদের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে।

বিজেপি নেতারা স্বীকার করুন বা না করুন, সিএএ নিয়ে বেশ ফ্যাসাদে পড়েছেন। কীভাবে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা যাবে, কী কাগজ লাগবে, কেউ স্পষ্ট বুঝতে পারছে না। বিজেপি নেতারা যুক্তির ধার দিয়ে যাচ্ছেন না। ভাবছেন, গালাগালির তোড়ে বিরোধীদের উড়িয়ে দেবেন।

সিপিএমও তাই ভেবেছিল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম নিয়ে যখন নাস্তানাবুদ, তাদের নেতারা তেড়ে গাল দিতেন।

তার কী পরিণতি হয়েছে সকলের জানা। যে নেতারা একসময় ছিলেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, এখন মিউ মিউ করছেন।

মুশকিল হল, এত কিছু দেখেও কেউ সংযত হতে চায় না।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.