ট্রেন কি এখনই চালাতে হবে?

৪৭

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

গত সপ্তাহ থেকে নানা জেলায় ট্রেন নিয়ে গোলমাল শুরু হয়েছে। মার্চ মাস থেকে পশ্চিমবঙ্গে লোকাল ট্রেন চলা বন্ধ। করোনা ঠেকাতে তখন জারি ছিল লকডাউন। তারপর দফায় দফায় আনলক হয়েছে। ক্রমশ গড়াতে শুরু করেছে বাস, অটো, টোটোর চাকা। কিন্তু থেমে আছে ট্রেন। মফঃস্বল থেকে যাঁরা রোজ চাকরি, ব্যবসা অথবা অন্য কাজে কলকাতায় আসেন তাঁরা পড়েছেন বিপদে। বাসে চড়ে বা অন্যভাবে কলকাতায় আসতে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। যাঁরা ট্রেনে হকারি করেন, তাঁদেরও রুজি-রোজগার বন্ধ। অনেকের দাবি, এখনই ট্রেন চালু করতে হবে। তাঁদের ক্ষোভ, বাস চলতে পারে, বাজার, শপিং মল খোলা যেতে পারে, আর ট্রেন চললেই যত দোষ? শুধু ট্রেনেই কি করোনা ছড়ায়?

এখনকার দিনে মানুষের ধৈর্য বড় কম। যে কোনও বিক্ষোভ দ্রুত হিংসাত্মক রূপ নেয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অতিমহামারীর মধ্যে রেলের কর্মীদের যাতায়াতের জন্য কয়েকটি স্পেশাল ট্রেন চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষও অনেকে সেই ট্রেনে উঠে পড়ার চেষ্টা করছেন। তাঁদের জোর করে নামিয়ে দিলে বাধছে ধুন্ধুমার। প্রথমে এরকম হয়েছিল সোনারপুরে। তার পরদিন অশান্তি ছড়ায় হুগলিতে। গত রবিবার পাণ্ডুয়া স্টেশনে অবরোধ করেন নিত্যযাত্রীরা। তাঁদের দাবি ছিল, অবিলম্বে লোকাল ট্রেন চালু করতে হবে। না হলে স্পেশাল ট্রেনে সাধারণ যাত্রীদের উঠতে দিতে হবে। পাণ্ডুয়ার পরে অবরোধ হয় বৈঁচিগ্রামে। তারপরে হুগলি স্টেশনে লাইনে স্লিপার ফেলে স্পেশাল ট্রেন আটকে দেয় জনতা।

হুগলির পরে হাওড়া। সোমবার একটি হাওড়াগামী স্পেশাল ট্রেনে উঠে পড়েছিলেন অনেক সাধারণ মানুষ। তাঁদের লিলুয়া স্টেশনে নামিয়ে দেওয়া হয়। টিকিট চেকাররা তাঁদের ফাইন করেন। জনতা ক্ষেপে উঠে স্টেশনের অফিসে ভাঙচুর চালায়। পুলিশ ও র‍্যাফ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

রাজ্য সরকার জানিয়েছে ট্রেন চালালে আপত্তি নেই। সে তো বলবেই। রাজ্যের শাসক দল মানুষের বিরাগভাজন হতে চায় না। সামনেই বিধানসভা ভোট। এইসময় সকলেই কমবেশি জনতোষিণী রাজনীতি করে। কোনও দাবি যতই অযৌক্তিক হোক না কেন, তাতে সায় দেয়। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে অবশ্য কোনও রাজনৈতিক দল এই কাজ করে না।

এখন বাসে যেভাবে মানুষ বাদুড় ঝোলা হয়ে যাতায়াত করছেন, তাতে সামাজিক দূরত্ববিধি উঠেছে শিকেয়। প্রথম যখন বাস চালু হল, তখন নানা নিয়ম মেনে চলার কথা বলা হয়েছিল। কিছু নিয়ম অল্পস্বল্প মানাও হচ্ছিল। তারপর সব বিধিনিষেধ খড়কুটোর মতো উড়ে গেল।

এই অবস্থায় ট্রেন চালু করা কি ঠিক হবে? ট্রেনে তো বাসের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ উঠবেন। রাস্তাঘাটে বেরোলে দেখা যায়, অনেকেই মাস্ক পরছেন না। পরলেও নামিয়ে রাখছেন মুখের নীচে। অতিমহামারীর সময় আরও যে সব বিধি মেনে চলতে বলা হচ্ছে, তাতে পাত্তাই দিচ্ছেন না। ট্রেন চললে সেখানেও এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ অনেকে উঠবেন। ফলে করোনা আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা যাবে। সদ্য দেশ জুড়ে করোনা গ্রাফ নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছে। এই অবস্থায় রেল কি লোকাল ট্রেন চালু করার ঝুঁকি নিতে পারে?

কিছুদিন হল মেট্রো রেল চালু হয়েছে। মেট্রোয় সকলে শৃঙ্খলা মেনে চলে। সেরকম একটা কালচার তৈরি হয়ে গিয়েছে। যে যাত্রী লোকাল ট্রেনে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল, সেও মেট্রো স্টেশনে সংযত থাকে। মেট্রো স্টেশনে কেউ গুটখা বা পানের পিক ফেলে না। তাই ভরসা করে মেট্রো রেল চালানো গিয়েছে।

মুম্বইয়ের মতো শহরে সাবার্বান ট্রেনও চালু হয়েছে। কিন্তু সেখানে যাত্রীদের গাদাগাদি করে ট্রেনে উঠতে দেখা যায় না। তাঁরা শৃঙ্খলা মেনে চলছেন। কিন্তু আমাদের রাজ্যের ব্যাপার আলাদা। এখানে অনেকেই নিয়ম ভেঙে আনন্দ পায়। ভাবে, হিরো হওয়া গেল। এখানে ট্রেন চালালে যে বিশৃঙ্খলা হবে, তাতে করোনা সংকট বাড়বে বহুগুণ। তখন তো রেলের ওপরেই দোষ পড়বে। রেল কি সেই ঝুঁকি নিতে পারে।

আমরা যদি শৃঙ্খলা মেনে চলতাম, তাহলে মেট্রোর মতো লোকাল ট্রেনও এতদিনে চালু হয়ে যেত। কিন্তু আমরা বাসে নিয়ম মেনে যাতায়াত করছি না, উপরন্তু ট্রেন চালানোর জন্য নানা জায়গায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছি। এই অবস্থায় ট্রেন বন্ধ থাকাই ভাল। তাতে অনেকের অসুবিধা হবে ঠিকই, কিন্তু কিছু করার নেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More