শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

আরশি

শ্যামশ্রী দাশগুপ্ত

হলদে রোদ                     

ঘড়িতে প্রায় সাড়ে এগারোটা। হেমন্তের শেষ। রোদ তাই দ্রুত সরছে পুবদিকের জানলা থেকে। আদ্যন্ত পড়ে খবরের কাগজটা গুছিয়ে ভাঁজ করে রাখছিলেন নালন্দা। আগে ছিল ‌না। তবে এখন জলখাবারের পর খুঁটিয়ে খবর পড়া অভ্যেস করে ফেলেছেন। রোজনামচা ভেঙে গড়ার পক্ষে তিন বছর তো অনেকটাই সময়।

কালো কালো অক্ষর আর রঙ বেরঙের ছবি সকালের অনেকটা সময় ব্যস্ত রাখে। আবার সমাজ-সংসারের সঙ্গে একটা প্রচ্ছন্ন বাঁধনও যেন জিইয়ে থাকে। স্বদেশ-বিদেশ যেখানকারই হোক, খবর তো আসলে মানুষেরই গল্প।

বাগানের গেট খোলার আওয়াজ পেলেন। দোলনচাঁপার ঝাড়টা পেরিয়ে লাল মোরামের রাস্তা দিয়ে সাইকেল পাশে নিয়ে এগিয়ে আসছে মাধব। এ সময়ই প্রতিদিন আসে সে। সময়ের নড়চড় এই তিন বছরে বড় একটা দেখেননি নালন্দা। সবার ব্লাডপ্রেশার মাপে মাধব। যদি দরকার হয় কারও,  ইঞ্জেকশনও দেয়। আজকাল চটজলদি সুগার মাপার যন্ত্রও রাখছে একটা। নালন্দার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই কুশল বিনিময় করে প্রতিদিনের মতো।

অস্ট্রো আথারাইটিসে ইদানিং বেশ কাবু দু’টো হাঁটুই। তবুও তাতেই ভরসা করতে ভালবাসেন। লাঠি ধরেননি এখনও। ডাইনিং হল ছেড়ে আস্তে আস্তে পা বাড়ান দোতলায় নিজের ঘরের দিকে। সিড়ির বাঁ ধারেই কিচেন। আজ বোধহয় মুসুরি ডালে মেথি ফোড়ন দিয়েছে গোপাল। চেনা গন্ধটায় যেন হঠাৎই আলতো ছোঁয়া লাগে লুকিয়ে থাকা কোনও তন্ত্রীতে। মেঘ জমার আগেই অবশ্য সতর্ক হয়ে পা রাখেন সিড়িতে। ধীরে ধীরে উঠে আসেন দোতলায়। নিজের ঘরে ঢোকার আগে স্নানঘরের দিকে চোখ যায়, আর দরজাটা বন্ধ দেখেই তেতো হয়ে যায় মুখটা। তার মানে এখনও স্নান সারা হয়নি প্রতিভার।

বাগানে ঘেরা সাজানো গোছানো এই বৃদ্ধাশ্রমে পাশাপাশি ঘর নালন্দা আর প্রতিভার। লাগোয়া বাথরুমটি বরাদ্দ তাঁদের দু’জনের। দিনের অন্য সময় বিশেষ অসুবিধা হয় না,  কিন্তু সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয় এই সময়টাতেই। ঠিক বারোটায় স্কুল বাসটা এসে যায়। তার আগে স্নান-পুজো না সারলেই নয় নালন্দার। এ দিকে ব্রেকফাস্ট শেষ করে সাড়ে ন’টার মধ্যে উপরে উঠে এলেও প্রায় দিনই স্নান সারতে বেলা গড়ায় প্রতিভার। বাথরুমের দরজা বন্ধ দেখে নিজের ঘরে ঢুকে দেরাজ খুলে শাড়ি-ব্লাউজ গুছিয়ে নেন। গতকাল দেখা করতে এসেছিল মিমি। বড়দার এই একমাত্র কন্যাটিও এখন  মার্কিন মুলুকে ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা। পিসির সঙ্গে দেখা করতে এসে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে একটি বিদেশি সাবান দিয়ে গিয়েছে। স্নানে যাওয়ার আগে হাতে নিয়ে গন্ধ শুঁকে দেখছিলেন। প্রতিভার সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি দেরাজ বন্ধ করে ঘরের বাইরে পা বাড়ান।

অমিতার সংসার

হঠাৎ করে রান্নার লোক না এলে একটু দিশাহারা লাগে বটে, তবে মনে ম‌নে যে একটু আনন্দই হয় তা আর কাকে বোঝাবেন। আজও রেবা আসেনি। এবং যথারীতি না বলেই। তাই আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে পারেনি দিয়া। সকালে মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে নিজে কোনওমতে টোস্ট-ওমলেটে পেট ভরিয়ে ল্যাবে রওনা হয়ে গিয়েছে। তিন দিনের সেমিনারে সোম দিল্লিতে। রাতে ফেরার কথা। ফ্রিজ খুলে কই মাছগুলো সরিয়ে বড় বড় পারসে মাছগুলোই জলে ভেজালেন। তাঁর হাতে পারসের ঝাল শুনলেই এখনও চোখ চকচক করে সোমের। বড় দেখে দুটো বেগুনও ধুয়ে রাখলেন অমিতা। দিয়ার পছন্দের চাল বেগুনও থাকবে আজ রাতের মেনুতে। নিজে হাতে করবেন সব। সোম এসে বিরক্ত হবে,  কিন্তু ওর পাত বলে দেবে, আসলে কতটা খুশি হয়েছে।

নৈহাটির বাড়ি থেকে কলকাতায় অফিস করতে আসতেন স্নেহাশিস। ভোজনরসিক স্বামীর জন্য প্রতিদিনই রাত থাকতে উঠে রান্না চাপাতেন অমিতা। বাড়ি ফিরেও ঝালেঝোলেই রাতের খাবার খেতেন স্নেহাশিস। সোম তখন যাদবপুরে মাস্টার্স করছে। হস্টেলে থাকতো। সপ্তাহান্তে ছেলে বাড়ি ফিরলে যেন উৎসব লেগে যেত। রবিবার সকাল সকাল হইহই করে ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেতেন স্নেহাশিস। বাপ আর ছেলের ফরমাশ রাখতে কত কী যে রাঁধতে হত। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর নৈহাটিতেই গুছিয়ে থাকবেন বলে স্থির করেছিলেন। অবসরের পর পাওয়া টাকা থেকে বাবার করে যাওয়া বাড়িটার খোলনলচে বদলে ফেলেছিলেন পছন্দমতো। কিন্তু পরে মত বদল।

খাওয়ার টেবিলের উপর ঝোলানো ঘড়িটায় চোখ পড়তেই ছিড়ে যায় চিন্তার সুতোগুলি। হাতে আর ঘণ্টাদুয়েক। তিন্নি আসার আগেই সেরে ফেলতে হবে রান্নার পাট। সে ফেরা মানেই তো এই তিন কামরার ফ্ল্যাটে কথার প্রজাপতিদের ওড়াউড়ি শুরু। তার সব কথা শুনতে হবে মন দিয়ে। তারপর স্নান খাওয়া। তাকে গল্প শোনানো। তিন্নির মধ্যে প্রতিদিনই যেন নতুন করে খুঁজে পান সোমকে। এও এক অভিজ্ঞতা।

ক্ষিপ্রতা এখন তলানিতে। তবুও সচল হন অমিতা। দিয়া বলে গিয়েছিল রাতে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নেবে। এ বেলাটা কোনও মতে চালিয়ে নিতে। কিন্তু তিনিই তো পারতেন সব। এখনই বা পারবেন না কেন?  আর তো ক’ টা মাত্র দিন।

কাঁচের দেওয়াল

গুরুদেবের ছবির সামনে বসে জপ সেরে নেন নালন্দা। এরপর শাড়িটা ভদ্রস্থ করে পরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে প্লাসটিকের চেয়ারটা টেনে নিয়ে এসে বসেন বারান্দায়। স্কুলবাসটা  তখন চলে গেছে ধুলো উড়িয়ে। তাঁর এক চিলতে বারান্দা আর ওঁদের মস্ত লিভিংরুমটা একেবারে মুখোমুখি। ছোট্ট দুটো হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে তাঁকে সোফায় বসিয়ে তখন জুতো খুলে দিচ্ছিলেন তিনি। এরপর জলের বোতলটা খাওয়ার টেবিলের উপর রেখে বইয়ের ব্যাগ হাতে করে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন হলদে সবুজ চৌখুপি পর্দা সরিয়ে। ততক্ষণে রামধনু পাখা মেলে ওড়াউড়ি শুরু হয়ে গেছে প্রজাপতির।

তাঁকেও কি কম ঘোড়দৌড় করাতো ঝিলিক। বাবা ব্যস্ত কলেজ নিয়ে। মা হাসপাতাল, চেম্বার, ওষুধ, রোগী। স্কুল ছুটির পর ঝিলিককে তাঁর জিম্মা করে বাড়িতে খেতে চলে যেত ড্রাইভার রতন। তাকে সামলাতে সামলাতেই দীর্ঘ দুপুর কখন গড়িয়ে বিকেল, একেক দিন টেরই পেতেন না। নিখিলেশ রাগ করতেন মাঝেমাঝে। বলতেন, “ এখন আমাদের বাণপ্রস্থ। অত জড়িও না। সুতো ছিড়লে কষ্ট পাবে।”

“ও সব অলক্ষুণে কথা বোলো নাতো। আমি কি পরেৱ জন্য ভাবি?” ঝামড়ে উঠতেন নালন্দা।

জড়াননি নিখিলেশ। কিন্তু সোনাই আর সংযুক্তা এ দেশের পাট গোটানোর পর বছর ঘোরারও সময় দেননি। মাঝে মধ্যেই তাঁকে জিজ্ঞেস করতেন, “দিব্যি তো ছিল দুজন। ঠিক কী কী পাওয়ার জন্য দেশ ছাড়ল ওরা।” বাবার থেকে মায়েরই বেশি ন্যাওটা ছিল সোনাই। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরটাতো তাকেও বলে যায়নি সে। তবুও নিজের মতো করে যুক্তি খাড়া করতেন তিনি। ও দেশে অনেক সুযোগ-সুবিধা। রোজগার কত বেশি। মেয়েটারও উচ্চ শিক্ষার সুবিধা হবে। কিন্তু নিজেই কি বিশ্বাস করতেন সে সব কথা, তাহলে তো আরও জোর দিয়ে বোঝাতে পারতেন নিখিলেশকে। ডাক্তার বুঝতে পারেননি, কিন্তু তিনি তো বুঝেছেন শুধু সিগারেট নয়, নিখিলেশের হার্ট ফেলিওরের পিছনে কতটা অনুঘটকের কাজ করেছে আত্মদহন।

আজ বড্ড ভোগাচ্ছে মেয়েটা। এক একটা গ্রাস খেতে যেন একেকটা দিন। খাবার টেবিল আর বারান্দা করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন ভদ্রমহিলা। বয়সতো তাঁরই কাছেপিঠে। কত আর পারা যায়? মাঝেমধ্যেই হতাশ হয়ে বসে পড়ছেন বারান্দায় পাতা শৌখিন চেয়ারে। ঝিলিককে কিন্তু ছোট থেকেই টেবিলে বসে খাওয়ার অভ্যেস করিয়েছিলেন তিনি। খাওয়া নিয়েও কখনও তেমন ভোগায়ওনি। বরং তাড়াতাড়ি সে পাট চুকিয়ে ঠাম্মার গলা জড়িয়ে ধরে রাজপুত্র, রাজকন্যা, ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীদের সঙ্গে মোলাকাতের ইচ্ছেটাই প্রবল ছিল তার।

দুপুরের খাবারের জন্য ডেকে গেলেন প্রতিভা। প্রতিদিনের মতো শাসনও করলেন একটু। বেলা করে খেতে যাওয়ার জন্য। স্কুলে পড়াতেন। বিয়ে থা তো করেননি, সংসারের অনিয়ম মালুম হবে কী করে? অতশত অবশ্য বুঝতে দেন না। আলতো হেসে বলেন, “এই তো যাই। তুমি নামো না বাপু। সকালের রুটি তরকারিটা হজম হতে হবে তো।”

নির্ধারিত সময়েই বন্ধ হয়ে গেল কাঠের ফ্রেম লাগানো কাঁচের ভারী দরজাটা। পর্দা টেনে ঘরে চলে গেলেন তিনি। প্রতিদিনের মতো। উঠে পড়লেন নালন্দাও। প্রতিদিনের মতো। কী যে এক পাগলামিতে পেয়ে বসেছে তাঁকে। নিজের বারান্দা থেকে অন্যের ঘরে উঁকিঝুকির এই স্বভাবটা কীভাবে যে রপ্ত হল বুঝতে পারেন না নিজেই। তবে ব্যাপারটা যে মোটেই শোভনীয় নয়, সেটা বোঝেন । উল্টোদিকের উনি কী খেয়াল করেন তাঁকে? ভাবলেই লজ্জা করে। এটা যে ভীষণ রকম ব্যক্তিগত। প্রতিদিনই ভাবেন, আর নয়। আজই শেষ। কিন্তু পরের দিন সকাল হতে না হতেই আবার সময় গোনা শুরু হয়ে যায়। এ যেন এক নিষিদ্ধ আকর্ষণ।

দরজা বন্ধ করে নেমে আসেন নিচের ডাইনিং হলে।

কথাদের যাওয়া আসা

সকালের ব্যস্ততা শেষ। সোম-দিয়া-তিন্নি বেড়িয়ে পড়েছে যে যার মতো। সবার পরে বেড়িয়েছে সোম। কাল রাতের ফ্লাইট ধরে ফিরতে দেরি হয়েছে বেশ। অফিস যাওয়ার আগে আজ অনেক দিন পর অনেকটা সময় কাটালেন তাঁরা মায়ে-পোয়ে। কথাবার্তার পুরোটাই অবশ্য ভবিষ্যতের প্ল্যানিং। হাতে আর মেরে কেটে এক মাস। তারপরেই অন্তত কিছুদিনের জন্য এ শহরের পাট গোটানোর প্রস্তুতি। বিদেশে ফেলোশিপ পেয়েছে দিয়া। সেই সূত্রেই সোমের বদলির আর্জি মঞ্জুর করেছে তাঁদের ওষুধ প্রস্তুতকারী বহুজাতিক সংস্থা।

মনে পড়ছে অমিতার। স্নেহাশিসের সেই একজন চেনা জ্যোতিষী ছিলেন। নানা ঠেকায় ছুটতেন তাঁর কাছে। সোমের ভর্তির পরীক্ষা, পরীক্ষার ফল, চাকরির ইন্টারভিউ, একটা না একটা লেগেই থাকতো। ভালবাসার বিয়ে। তবুও সোমের বিয়ের আগে  যোটক বিচার করতেও ছুটেছিলেন। তখন তাঁরা নৈহাটিতে। পাশের বাড়ির নমিতা মাসিমার ছেলে যখন বিলেত গেল, চুপি চুপি জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলেন সেই জ্যোতিষীকে, সোমের ভাগ্যে কি বিদেশ যাওয়া আছে? স্নেহাশিস কখনই ছেলেকে নিয়ে খুব একটা উচ্চাকাঙ্খী ছিলেন না। অফিস থেকে ফেরার পর সেই গল্প করতেই তাই হেসেছিলেন অল্প।

সেই সোম বিদেশ যাবে। গতকালই রাঙাবৌদি ফোন করেছিলেন। কৃতিত্বটা সোমের না দিয়ার তার চুলচেরা বিশ্লেষণের আগে খবর নিচ্ছিলেন সব। সোম বিদেশ গেলে তিনি কোথায় থাকবেন, সে সবও।

নতুন গড়ে ওঠা এই পূর্ব কলকাতায় খুব সস্তায় পাঁচ কাঠা জমি কিনে রেখেছিলেন স্নেহাশিস। তাঁর অল্প মাইনের সরকারি চাকরির থেকে যতটা সম্ভব বাঁচিয়ে। তখন এ সব এলাকায় শরবনে ঢাকা পড়ত প্রায় নাক পর্যন্ত। শেয়াল ডাকতো দিনে দুপুরে। অমিতার বাপের বাড়ির বড়লোক আত্মীয়রা এ জমির প্রসঙ্গ উঠলেই হাসি ঢাকতে মুখ ঘোরাতেন। সে জমি প্রমোটারকে দিয়েই তিনতলার উপর খোলামেলা চোদ্দশো স্কোয়্যার ফিটের ফ্ল্যাট পেয়েছেন তাঁরা। সঙ্গে কিছু টাকাও। স্নেহাশিস চলে যাওয়ার পর এখন তাঁর চাকরির অর্ধেক পেনশন আর সেই টাকার সুদ ভরসা যোগায় অমিতাকে। তাঁর সোনার টুকরো ছেলে। তবুও।

প্রথম যখন এ পাড়ায় এসেছিলেন, তখনও চারপাশ ফাঁকা। নীচের তলায় দাসবাবুরা পুজোর সময় বেড়াতে গেলে, এত বড় বাড়িতে রীতিমতো ভয় করতো। আর এখন সে পাড়া বদলে গিয়েছে আমূল। কত মানুষ, কত বাড়ি। সামনে যে মাঠের মতো জায়গাটা পড়ে ছিল এই সে দিন পর্যন্ত,  সেখানে তৈরি হল এক মস্ত বৃদ্ধাশ্রম। সারাদিন লোক লস্কর। মস্ত যজ্ঞিবাড়ি যেন।

সোম আর দিয়া রাতের খাবারের পরে তাঁদের বিদেশ যাত্রার খবরটা যে দিন প্রথম জানিয়েছিল, সে দিন অমিতার বিকল্প বাসস্থান হিসেবে যে পাশের বাড়িটাই তাঁদের পছন্দ, বলেছিল সে কথাও। দিনকাল খারাপ, তাই মায়ের জন্য বৃদ্ধাশ্রমের সেফ কাস্টডি পছন্দ ওঁদের দুজনের। ২৪ ঘণ্টা দেখাশোনার লোক, ডাক্তারের সুবিধা। কথা বলে জেনেছে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও চমৎকার। সুতরাং মায়ের কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

মাত্র তো তিনটে বছর। তত দিন পাশের বাড়ি থেকে নিজের বাড়ির উপর নজর রাখবে মা। তারপরতো ফিরেই আসবে তাঁরা। বারবার বলছিল সোম আর দিয়া। সে রাতে আর ঘুম হয়নি অমিতার। তিন্নিকে ছাড়া  অক্সিজেন পাবেন কোথা থেকে, ভাবতে ভাবতে ভিজে উঠছি‌ল চোখের পাতা। মনে পড়ছিল স্নেহাশিসের কথা।

ভোরের আলো ফুটেছিল কখন। তাঁর রাত জাগা চোখ ধরা পড়ে গিয়েছিল সোমের চোখে। কিন্তু অমিতা বলেছেন,  ‘‘কাল সারা রাত আনন্দে ঘুমোতে পারিনি রে, তুই বিদেশ যাবি, কতদিনের স্বপ্ন বলতো আমার।’’

আরশি

রাত ঘন হলেই শিরশিরানি ভাব। শীত প্রায় এসে গেল। শোওয়ার সময় হালকা পাতলা নীল বালাপোশটায় নিজেকে মুড়ে নেন নালন্দা। সেই কবেকার জিনিস। কত কিছু জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। কী করে যেন রয়ে গেছে এটা। কত বছরের চেনা ওম। পরম আত্মীয় যেন। সেই কালীঘাটের হালদার পাড়া রোডের বাড়িতে থাকার সময় কেনা হয়েছিল। তারপর নিখিলেশ চলে যাওয়ার পর সোনাইয়ের সঙ্গে গল্ফগ্রিনের বাড়িতে। শীত নামলেই ঝিলিকও ঢুকে পড়ত বালাপোশটার নীচে। তারপর টানাটানি। সেখান থেকে ঠাঁইনাড়া হওয়ার পরেও এটিকে কাছছাড়া করেননি।

সকালের প্রথম চা টা এখানে ঘরে ঘরে দেওয়াই নিয়ম। অন্যদিন ছোটু আসে ট্রের উপর কাপ-প্লেট সাজিয়ে। আজ চা দিতে এসেছিল গোপাল নিজেই।

‘‘দিদা আজ তো তোমার আরও একজন বন্ধু আসছে। তাঁর জন্যেও রান্না বলা হল।’’

আরাম করে চায়ে চুমুক দিলেন নালন্দা। তবে গোপালের কথায় খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না। তাহলেই এখন গল্প জুড়ে দেবে গোপাল। সকালটা চুপচাপ কাটাতেই ভাল লাগে। আলতো জবাব দিলেন,

‘‘তাই?’’

‘‘দিদা, আজ রবিবার। লুচি- সাদা তরকারি।’’

‘‘হ্যাঁ। জানি তো।’’ কথোপকথন এখানেই শেষ। দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে যায় গোপাল।

খাওয়ার ঘরের ভিড়টা তখন হালকা। জলখাবারের পরে দেওয়া চা টা নিয়ে খোশ গল্প করছেন দু’এক জন। খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে সোফায় এসে বসলেন নালন্দা। প্রথম পাতায় চোখ রাখতেই বাগানের গেট খোলার আওয়াজ হল। মুখ তুললেন তিনি। এগিয়ে আসছেন তিনজন। দুর থেকে ততটা ঠাহর করতে পারেন না আজকাল। কিন্তু কাছে আসতেই দোলনচাঁপার ঝাড়টা দুলে উঠল যে। সেই দুষ্টু প্রজাপতিটা না?

তাইতো। পিছনে পিছনে এগিয়ে আসছেন তিনি। হলুদ পাড়ের ধবধবে সাদা শাড়ি। হলুদ রঙের ব্লাউজ। টানটান চেহারা। পিছনে ব্যাগ-সুটকেস-ঝোলা নিয়ে ছেলে-বউ ?  না মেয়ে-জামাই?

সারা শরীরটা দুলে উঠল কেন নালন্দার। ওরা এগিয়ে যাচ্ছে অফিসঘরের দিকে। কী মনে করে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও বসে পড়লেন সোফায়। কেমন ভারশূন্য লাগছে মাথাটা। ছোটবেলায় একবার হাত থেকে অসাবধানে পড়ে ভেঙে গিয়েছিল মায়ের নতুন আয়না। কি বকাটাই না বকেছিলেন মা। মায়ের উপর রাগ হয়েছিল খুব। দুঃখও হয়েছিল। সঙ্গে ভয়। কিন্তু আরশি ভাঙায় এত কষ্ট?

নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হলেন নালন্দা। আরও একবার।

শ্যামশ্রী দাশগুপ্ত দ্য ওয়ালের একজন কর্মী। সাংবাদিক হিসেব কাজ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। তার আগে টেলিভিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি গল্পও লেখেন।

Shares

Leave A Reply