বুধবার, নভেম্বর ১৩

ব্লগ: কলমবাজের জানলা ১/ পক্ষ, বিপক্ষ, আত্মপক্ষ ও সিংঘম

হিন্দোল ভট্টাচার্য

আপনাকে যদি কেউ বলে আপনি একটা গরম কড়াইয়ের উপর বসে আছেন, তাহলে আপনি তা বিশ্বাস করবেন না? এই ধরুন সুজলা সুফলা মানে যে যে শব্দ দিয়ে আমরা আমাদের দেশটিকে চিনি, এমনকী কল্লোলিনী তিলোত্তমাই বলুন বা সারে জাঁহা সে আচ্ছা এই ভারতবর্ষ, এই সব শব্দ কি এখন আর আদৌ অর্থপূর্ণ? তার চেয়ে বলা ভালো না, আমরা হলাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সুতোয় গাঁথা পুতুল। নাচছি। আমাদের নিজেদের কোনও ইচ্ছে নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে নিজেদের কোনও মতামতও নেই। ভাবছি আমরা আমাদের মতামত আছে, কারণ আমাদের বলা হচ্ছে তোমার মতামত খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বলা হচ্ছে যা, আমরা তেমন করে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি। আবার আমাদের প্রতিক্রিয়াকেও সম্পাদিত করে তৈরি করা হচ্ছে এক একটি জনমতামত। এর মানে, আপনি কী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন, আর তার কী অর্থ আসলে একটা গণমতামতের অংশীদার হয়ে কিছু কিছু পরিকল্পনাকে কার্যকরী করে দিচ্ছে আপনি জানেন না। আপনার মত, বা কথার উপরে আপনার নিজের আর নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে আপনি আদৌ কোনও কথা বলবেন কিনা ভাবছেন। এই ভাবাভাবির মধ্যে যেটি হচ্ছে তা আরও মজার। আর তা হল, আপনার মত তৈরি করে দিচ্ছে কেউ কেউ বিভিন্ন মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে। আপনি কিছুই আসলে দেখছেন না, বুঝতেও পারছেন না, আপনি একটা বিরাট বড় ফিকশনাল রিয়ালিটিতে ঢুকে পড়েছেন। টিভি দেখছেন, নিউজ রিপোর্ট পড়ছেন, টিভিতে তর্ক শুনছেন, পক্ষ-বিপক্ষ নিচ্ছেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে তাই নিয়ে সরব হচ্ছেন, সেখানেও মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যে উত্তেজিত হচ্ছেন এবং দিনের শেষে জানতে পারছেন আপনার মত প্রকাশ এবং তর্কে অংশগ্রহণে কিছু মানুষ উত্তেজিত হল, কিছু মানুষ সরব হল, কিছু মানুষ প্রতিপক্ষ হল, এবং এর ফলে কিছু উপরতলায় থাকা মানুষের কাছে আপনার কণ্ঠ পৌঁছে গেল। এবার কিছু হবে। হল না। কিছুই হল না। কিন্তু কেন হল না? বরং যা যা হলো, তা হলো, আপনি নিজে ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, আপনি যা নিয়ে বলছেন, যেভাবে বলছেন, তাতে আপনিও কিঞ্চিত তাদের মতো হয়ে গেছেন। আপনার ব্যক্তিজীবনেও আপনি এতটা অসহিষ্ণু নন, কিন্তু ক্রমশ হয়ে যাচ্ছেন। আপনার এতকাল সমস্ত পড়াশুনো আদর্শ সব ধূসর হয়ে গেছে। আপনি অতীত-ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলতে পারছেন না। আপনি আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না সমসময় ছাড়া। ভাবতে পারছেন না সমসময়ের চর্চিত বিষয়পত্র ছাড়া এবং আপনার কথাগুলো কোনও না কোনও পক্ষের হয়ে যাচ্ছে, আপনি ক্রমশ একটি গতানুগতিক স্রোতে ভাসমান খড়ের কাঠির মতো হয়ে যাচ্ছেন, যে আদতে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু যার কিছু করার ক্ষমতা নেই।

মনে কি হয় না এটিই আসল রাজনীতি? সেটি আপনার ক্ষেত্রে একটু পরিশীলিত ভাবে আসছে, আর গ্রাউন্ড রিয়ালিটিতে থাকা বেশিরভাগ মানুষের কাছে যাচ্ছে অত্যন্ত সোজা সাপ্টা। আর এই রাজনীতিটি ব্যবহার করেছে আমাদের দেশের মূল শাসক দল। কিন্তু তাদের চেয়ে কোনওমতে পিছিয়ে নেই তাদের বিরোধী দলগুলিও। যেমন ধরুন, যে গেরুয়া পোশাক পরা দলটি দাঙ্গা বাঁধায়, কর্পোরেট পুঁজির কাছে দেশকে বেচে দেয়, সাধারণ মানুষের জীবন নরক করে দেয়, সেই দলের নেতারা যখন রাম নিয়ে মানুষকে ফুঁসলিয়ে তুলে , জাতপাতের রাজনীতি, মুসলিম ও দলিতদের উপর যথেচ্ছ অত্যাচার করে দেশে হিন্দুত্ববাদকে একটা জঘন্য প্রবণতা হিসেবে তৈরি করে, যে দলের হিন্দু মৌলবাদী শাখাসংগঠনটি প্রকাশ্যে হিন্দুত্ববাদী হিংসার কথা বলে, সে দলের হয়ে দেখেছি অনেক সংবেদনশীল মানুষ-ও বলছেন মোদীর জন্য তো তবু কিছু উন্নতি হচ্ছে। যখন ধরা হয় কোথায় উন্নতি ভাই, তখন মোদী আর মোদীবৃন্দের আইটি সেলের বা প্রচারব্যবস্থার প্রচারগুলিকেই তোতাপাখির মতো করে বলতে থাকা তারা। দেখবেন তাদের প্রচারে, অর্থনীতি বিষয়ে এমন সব কথাবার্তা, যেন আমরা বাস করছি আক্ষরিক রামরাজত্বে। আর সেই সব বিষয়ে অসহিষ্ণু বাতাবরণ, যেগুলি, মানে হিন্দুত্বের , ফ্যাসিবাদের সব বিষয়, অত্যন্ত হাস্যকর, আক্রমণের বিষয়, তর্কের বিষয়, ব্যঙ্গের বিষয়। অথচ যারা এগুলিকে নিয়ে ব্যঙ্গে রত, তারা অর্থনীতির এই ভয়ানক আগ্রাসন বিষয়ে চুপ। ফ্যাসিস্টরা যা চায়, আসলে আমরা তাই করছি। প্রকারান্তরে তাদের বিজ্ঞাপনটিও করছি। অথচ ভারতবর্ষের এই গেরুয়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সব দল যে এক হয়ে আগে তাদের তাড়াবে, সেটি হচ্ছে না। কিন্তু কেন? সংসদীয় দলগুলির, যাদের রাজনৈতিক আদর্শ বলে কিছুই নেই, তাদের একটা ফ্যাসিস্ট দলকে তাড়াতে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে একে অপরের হাত ধরতে কী সমস্যা? তা কেউ জানে না। আর সমস্যা যদি থেকেও থাকে, তাহলেও দেশের এই ভয়ংকর শত্রুকে আগে তাড়াতে নিজেদের মধ্যে জোট বাঁধাটাই তো রাজনৈতিক দূরদর্শীতার পরিচয়। কিন্তু কে কার কথা শোনে?

আর শুনবেই বা কেন? বরং তারা কে বেশি হিন্দু- এ নিয়েই ব্যস্ত হয়ে উঠবে। খুব চোখে লাগার মতো বিষয়। ধরা যাক গেরুয়া সন্ত্রাসের বিরোধী সবুজের আহবান । তো তারা ঢাক ঢোল পিটিয়ে দাবী করতে শুরু করলো গেরুয়া হিন্দু নয়, আসল হিন্দু আমরাই। বলে, সেই সব পুজো আচ্চা, ধর্মীয় ব্যাপার স্যাপার করতে শুরু করলো, যা তাদের করার কথা নয়। এক্ষেত্রেও তো গেরুয়া শিবিরের জয় বলতে হবে। কারণ তারা তাদের ধর্মীয় ফ্যানাটিক বিষয়গুলি এভাবে আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে দিয়েছে তাদের বিরোধী শিবিরগুলিতেও। তাই রুটি, চিকিৎসা, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারখানা, পেট্রল ডিজেল নয়, – আমরা কত বেশি হিন্দু, কত সাচ্চা হিন্দু এ নিয়ে প্রতিযোগিতা। ফ্যাসিজম আর কিছু না করুক, এভাবেই ধর্ম নিয়ে পাগলামি ঢুকিয়ে দিয়েছে আর সেখানেই তো তার কিস্তিমাত। তার রাজনীতি। এই রাজনীতিকে পালটা আক্রমণ করতে গেলে তো তার সংস্কৃতিকে আক্রমণ করতে হবে। সেটি না করলে, কোন রাজনীতি দিয়ে তাকে আক্রমণ করবেন ভাই?

ও হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, এ সব কিন্তু আমি বলছি একজন আয়কর দাতা নাগরিক হিসেবে, কবি হিসেবে নয়। কারণ একটি অদ্ভুত বিষয় চারিদিকে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে। কবির কাজ এটি, কবির কাজ এটি নয়- এই জাতীয় বিধিনিষেধ। যেন প্রকৃত কবিরা আয়কর দেয় না, ভোট দিতে যায় না, গুন্ডারা তার বাড়ি আক্রমণ করতে যায় না, বেশি ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করে না, হাসপাতালে বেশি টাকা দিয়ে ট্রিটমেন্ট করায় না, ভেজাল খাবার খায় না, তাদের মধ্যে যেন কেউ বেকার নয়। মানে, তারা পুরোদস্তুর রাজনৈতিক ব্যক্তি হলেও যেহেতু কবি বা শিল্পী, অতএব তারা কেবল প্রেমের সাধক, তারা কেন কেন্দ্র বা রাজ্যের শাসক শিবিরের বিরোধী হবে? মানে, তাদের রাজনীতি হবে কেবল সমর্থনের অথবা চুপ করে থাকার। তাঁদেরকে যা বলা হবে, তাঁরা তা করবেন শুধু। এর চেয়ে বেশি ট্যাঁ ফোঁ যেন তারা বিন্দুমাত্র না করেন। কারণ তারা শিল্পী। তাদের কেন মতামত থাকতে হবে। মতামত থাকলেই বিপদ। তুমি তার মানে বিশুদ্ধ কবি নও। ইত্যাদি প্রভৃতি। একজন কবি সবসময় সমস্ত ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে থাকেন। প্রশ্ন তুলে যাওয়াটাই তার কাজ। তিনি কোনও শিবিরের নন, কোনও জার্সির নন। কথা হলো , যদি গেরুয়া শিবিরের বিরোধী হও, তবে পক্ষ নিতেই হবে। কিন্তু পক্ষ নিলেই কি তা সবসময় প্রশ্নহীন? পক্ষ নিলাম আমি কারুর, কিন্তু তার মানে তো এটি নয়, আমাকে প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখাতে হবে। শয়তানের বিরুদ্ধে আমার অপর কাউকে সমর্থন করা একটি রাজনৈতিক কাজ। আমি তা করলাম। কিন্তু যাকে সমর্থন করলাম, তার ভিতরেও যদি এমন কিছু প্রবণতা দেখি, যা ঠিক নয়, তবে আমি তাদের সমর্থন করি বলে চুপ করে আনুগত্য দেখাব? সেটি কি একটি রাজনৈতিক কাজ? তা যদি আমি না করি, তবে আমি যার পক্ষ নিচ্ছি, তার বিপক্ষ হয়ে গেলাম? পক্ষ-বিপক্ষ-আত্মপক্ষের এই বাস্কেটবলে তাহলে যুদ্ধটা কাদের মধ্যে হচ্ছে এবং কাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে?

গেরুয়া শিবিরের হয়ে যে সমস্ত কবি-লেখকরা কথা বলছেন, তারা তো অসংবেদনশীল মানুষ। তারা জানেন না ভবিষ্যত তাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাসে যেমন জর্মন ফ্যাসিস্টদের সমর্থন যারা করেছিলেন, তাদের ইতিহাস ক্ষমা করেনি কখনও। কারণ গণতান্ত্রিক অধিকারের নাম করে ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করার ঘটনা জর্মনিতেও হয়েছিল। মুশকিল হলো, তার পর তারা আর সামলাতে পারে নি। এখনই এ দেশে তার নমুনা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

যাঁদের রাজনীতি ভাল লাগে না এত, তাঁরাও কিন্তু এড়িয়ে যেতে পারবেন না এই সব ব্যাপার থেকে নিজেদের। অসুবিধের জায়গাটি এখানেই। কারণ এই চুপ করে থাকাটিও রাজনীতি। কিন্তু উচ্চকিত বোকার মতো বকবক করেও তো লাভ নেই। আমরা সবাই জানি, এখন এক তীব্র অসহিষ্ণুতার সময়ে। ফ্যাসিজম তো একা আসে না, একটা ভাবনাকে নিয়ে আসে। আর সে ভাবনাকে ছড়িয়ে দেয় মানসিকতায়। তা প্রকাশ পায় নানা ভাবে। আমার মত তোমার সাথে মিললে ভাল, না হলে তুমি খারাপ, তোমার ব্যক্তিগত জীবন খারাপ, তুমি যে রাস্তা দিয়ে যাও তাও খারাপ। এ হলো মানসিকতার ফ্যাসিজম। আমার সঙ্গে তোমার মত না মিললে, তুমি আমার পক্ষে না থাকলেই তুমি বিপক্ষ। কেউ দেখবে না তুমি যে বিপক্ষেরও বিপক্ষ। তখন প্রশ্ন উঠবে তাহলে তুমি কার পক্ষে? যেন বা আমি কারো পক্ষে হলে তার সাত খুন মাফ। আর না হলেও তোমার অধিকার জন্মে যায় রাজনৈতিক বা যুক্তি দিয়ে আক্রমণ না করে আমাকে আমার ব্যক্তিগত জীবনে আক্রমণ করায়। একে একঘরে করে দাও, একে লাথ মারো, একে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে ফেলে দাও। মুশকিল হচ্ছে ব্যক্তিগত জীবনে কেউ সিংঘম না হলেও প্রায় সকলেই জয়কান্ত শিকড়ে। নিজেদের এলাকায় সিংহ। আর সবাই স্বপ্ন দেখে একদিন কেউ আসবে সিংঘমের মতো, যে এসে ঢিসুম ঢিসুম করে সব বদলে দেবে।

কিন্তু অবতার তো আর কেউ এলেন না। কোনদিন এসেছিলেন কি?

 

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

(হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। তুমি, অরক্ষিত, তারামণির হার, জগৎগৌরী কাব্য, মেডুসার চোখ, তালপাতার পুথি, যে গান রাতের, তৃতীয় নয়নে জাগো প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন জগৎগৌরী কাব্যের জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।)

Leave A Reply