বৃহস্পতিবার, জুন ২০

পাহাড়ে একটা ভুলই হয়তো শেষ ভুল, শিখিয়েছিলেন পেমবাজি

পর্বতারোহণে এক ধাক্কায় বেশ এগিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এমন আরোহী প্রায় বিরল, যাঁর কোনও না কোনও বড় মাপের আরোহণে সঙ্গী হননি দার্জিলিঙের পেমবা শেরপা। সেই পেমবা শেরপাই এখন কারাকোরামের সাসের কাংরি অভিযানে গিয়ে, ক্রিভাসের অতলে নিখোঁজ। কী বলছেন রাজ্যের পর্বতারোহীরা? পেমবা শেরপার সহযোগিতায় এভারেস্ট ছোঁয়া এবং বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সপ্তশৃঙ্গের সফল অভিযাত্রী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত ভাগ করে নিলেন তাঁর অভিজ্ঞতা।

সত্যরূপ সিদ্ধান্ত

ঝড়ের গতিতে কুড়ি হাত দূর দিয়ে বেরিয়ে গেলেন এক জন শেরপা। উঁচু-নিচু জায়গায় ক্যাম্বিস বলের মতো ড্রপ খেতে খেতে। ‘‘ও গির রাহা হ্যায়, ও গির রাহা হ্যায়!’’ বলতে বলতে গলা ধরে এল আমার। রক্ত হিম হয়ে গেল যেন। এই প্রথম কাউকে দেখলাম চোখের সামনে এমন ভাবে পড়ে যেতে। নীচে গিয়ে ৬১০০ মিটারে থামল মানুষটা। মনে-প্রাণে খুব করে চেয়েছিলাম যদি এক বার উঠে বসে।

পেমবাজিকে বললাম, “ও জিন্দা রহেগা না? বলিয়ে না, ও জিন্দা রহেগা?” স্পষ্ট দেখলাম পেমবাজির ঘামে ভেজা চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর ভাবে আমায় খালি বললেন, ‘’সত্যরূপজি, সেফটি ঠিকসে লাগানা।’’

আরও পড়ুন: পাহাড়ে পেমবাজি সঙ্গে থাকলে বিপদ ধার ঘেঁষত না

আমার ইচ্ছা ছিল, ক্যাম্প ওয়ান এবং টুয়ের মধ্যের বরফের ফাঁকা ময়দানে সেফটি না লাগানোর। আবার নিচু হও, আবার দড়ি থেকে বরফ সরাও। ক্লান্ত শরীরটাকে খামোখা ব্যস্ত করব কেন! আপাত-শান্ত  পেমবাজি যেন গর্জে উঠলেন এবার, ‘‘সত্যরূপজি, আপ কেয়া সোচতে হ্যায়, কি ইয়ে লোক যো রস্যি লাগাকে গ্যায়া, ও বুদ্ধু হ্যায়? কি ইতনা ভারী রস্যি লেকে ইধার অ্যায়সে হি লাগা দেঙ্গে ইতনি উঁচায়ি মে? আপ অউর ম্যায় নাহি জানতে মতলব ইয়ে নাহি হ্যায়, কি ইধার খাতরা নাহি হ্যায়। সেফটি লাগাকে যানা।’’

ভরসার রশি পেমবাজির হাতে। ক্লাইম্ব করছেন সত্যরূপ।

পেমবাজির আদেশ শিরোধার্য করে নিয়েছিলাম। আর এক দিন ক্যাম্প টুয়ের পথে যেতে যেতে চার নম্বর ‘ইউ’ আকৃতির ক্রিভাসটার নীচে নেমে আবার উপরে উঠে রীতিমতো ক্লান্ত শরীরটা হাঁপাচ্ছে তখন। আর একটু এগোতেই দেখলাম একটা সরু নালার মতো ক্রিভাস। আবার একটা বড় স্টেপ ফেলতে হবে। একটু বিশ্রাম নিয়ে ক্রস করব ভাবলাম। পেমবাজির কথা মনে হল। আদেশ আছে, ফিক্সড রোপ দেখলেই টুক করে সেফটি ক্যাচটা লাগিয়ে নিতে হবে। অত ক্লান্তির মধ্যেও লাগিয়ে নিলাম। আর পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিয়েই আবার শুরু করব। হঠাৎ লক্ষ করলাম ডান পাটা বরফের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। অ্যান্টেনা খাড়া হয়ে গেল। সর্বনাশ! স্নো ব্রিজ কি ভাঙছে? আমি রিফ্লেক্সে বাম দিকে ঝাঁপালাম। নিমেষে ভস করে গোটা জায়গাটা আমাকে নিয়ে ধসে পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সব ওলোটপালোট হয়ে গেল। কিছু বোঝার আগেই দেখলাম আমি ক্রিভাসের মধ্যে ঝুলছি। সেই সেফটি রোপে আমি ঝুলছি ক্রিভাসের ৬-৭ ফুট ভিতরে। তখনও মুখে চোখে বরফ ঝুরঝুর করে পড়ছে। বুঝলাম, এ যাত্রায় হাড়গোড় ভাঙা থেকে রক্ষা পেলাম। এ বার উঠতে হবে। ভাগ্যিস পেমবাজির কথা মনে করে সেফটি লাগিয়েছিলাম।

আরও পড়ুন: ‘আরোহী’ দেবাশিসকে তিলে তিলে গড়েছে এই পেমবা শেরপাই

পেমবাজি বলতেন, এখানে আত্মা থাকে। ওরা অপেক্ষা করে থাকে, কখন কেউ কোনও ভুল করবে। পাহাড়ে একটা ভুল, হয়তো গোটা অভিযানের একটাই ভুল, আর ওটাই শেষ ভুল। ওরা টেনে নেবে সঙ্গে সঙ্গে। কত জায়গায় প্রেয়ার্স ফ্ল্যাগ লাগাব?

এভারেস্ট সামিট থেকে নামার সময়ে প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। শেষ ৩০ মিনিট কোনও অক্সিজেন ছিল না। তখন পেমবাজির সঙ্গে দেখা। তিনি শুনলেন আমার অক্সিজেন মাস্কের সমস্যার কথা। বাকি শেরপাদের খুব করে বকে দিলেন। আমি তো ভয়েই মরি। এত উচ্চতায় মাথা গরম হয়ে গেলে পরে যদি সাহায্য চাইলে না পাই। কিছুটা নামার পর ভাবলাম, পেমবাজি নামলে একসঙ্গে নামব। তত ক্ষণ একটু বসে পড়ি। দড়িটা পেঁচিয়ে বসতেই চোখ ঘুমে ঢলে এল। বাকিরা চেঁচাচ্ছে, ঘুমিও না। আমি বললাম আগে পেমবাজি আসবেন, তার পর উঠব।

আরও পড়ুন: রেখেছো শেরপা করে, আরোহী করোনি

মনে হল যেন চোখ বন্ধ করলাম আর পর ক্ষণেই খুললাম। এর মধ্যেই মিনিট পাঁচেক কেটে গিয়েছে। চোখ খুলে দেখলাম পেমবাজির মুখ। বললেন, সব ঠিক হ্যায় সত্যরূপজি? আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত ঘুম কেন পাচ্ছে আমার? পেম্বাজি বললেন, এখানে বসে থাকলে মরে যাবে। তোমাকে চলতে হবে। আর নিজেকেই চলতে হবে। টনিকের মতো কাজ করেছিল। এরকমই আগলে আগলে রাখতেন পেমবাজি আমাদের এভারেস্ট অভিযানে।

সামিটে বেরোনোর আগে প্রমিস করিয়ে নিয়েছিলেন, সকাল ১০টার পর যে যেখানেই থাকি না কেন, ফিরে আসতে হবে। সামিট হোক আর না-ই হোক। জীবন আগে।

সেই পেমবাজি আজ যখন ক্রিভাসে পড়ে আছেন, স্পট করা যাচ্ছে না, যেখানে ৯৯ শতাংশ লোকই হাল ধরার আগে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে রয়েছেন। ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধারে নামার আগেই প্রশ্ন করছেন সেখানে কি আর মানুষটা এত ক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবেন?

একেবারেই কি পারেন না? তিনি হয়তো আশায় বুক বেঁধে আছেন, কেউ না কেউ আসবেন তাঁকে উদ্ধার করতে। হতেই তো পারে তিনি আহত। যেখানে এক একটা মিনিট দামি, সেখানে একটু তৎপরতা, আর একটু সম্মান কি দাবি করতে পারে না আট বার এভারেস্ট সামিট করা, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করা এই মানুষটি।

আরও পড়ুন: তুষার-গহ্বরে তিন দিন নিখোঁজ পেমবা, আশার আলো ক্ষীণ

একটাই তো ফোন কল করার দরকার ছিল এয়ারফোর্সে। যে উদ্ধারকার্য তিন দিন পর আসছে, তৎক্ষনাৎ হতে পারত না? যে উদ্ধারে শুনছি আলোর অভাবে পিছিয়ে এসেছেন শেরপারা, সে আলো সেনা বা বায়ুসেনার হেলিকপ্টারের পক্ষে বাইরে থেকে পৌঁছে দিতে কত ক্ষণ লাগতে পারে? একটা দেশ যদি তার এই বীর যোদ্ধার অবদান স্বীকার করতে না পারে, সেই দেশ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে কী দিশা দেখাবে?

হায় রে ক্রিকেট, হায় রে ফুটবল! আমাদের এতই অন্ধ করে দিলে তোমরা? পেমবাজির মতো ভারতবর্ষের এক গর্ব আজ এমন অবহেলায় হারানোর মুখে?

Leave A Reply