প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, মানুষই আগুন লাগিয়েছে আমাজনে! উপগ্রহ চিত্র দেখে শিউরে উঠছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতি বছরই কম-বেশি দাবানল লাগে আমাজনের অরণ্যে। সম্প্রতি এমনটাই জানা গিয়েছে, আমাজনে মাস খানেক ধরে চলতে থাকা একটানা অগ্নিকাণ্ডের পরে। কিন্তু এই বারের দাবানল তার চেয়ে অনেকটা আলাদা। প্রতি দিন গড়ে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে অরণ্য ধ্বংস হয়ে যেতে শুরু করার পরে আলোচনায় উঠে এসেছে এই অরণ্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হয়েছে হ্যাশট্যাগ প্রে ফর আমাজন। অভিযোগ উঠেছে ষড়যন্ত্রের। মনে করা হয়েছে, কোনও মুনাফার বশবর্তী হয়ে ইচ্ছে করে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে আমাজনের রেনফরেস্ট। সেই রেনফরেস্ট, যা পৃথিবীর মোট চাহিদার ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগান দেয়, যাকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।

যড়যন্ত্রের ইঙ্গিত আগেই মিলে থাকলেও, প্রমাণ ছিল না কিছু। এই দাবানল যে প্রাকৃতিক নয়, ইচ্ছাকৃত ভাবে ঘটানো, তার সপক্ষে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু এবার স্যাটেলাইটের পাঠানো ছবি ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে পরিবেশবিজ্ঞানীরা অনেকটাই নিশ্চিত হলেন এই দাবানল শুধুই প্রাকৃতিক নয় মোটেই। মানুষের হাত ছাড়া এত বড় মাপের দাবানল কার্যত অসম্ভব। উপগ্রহ চিত্রগুলি দেখে রীতিমতো শিহরিত পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, বলিভিয়ার সুপার ট্যাঙ্কার আগুন নেভাতে শুরু করার পরে বড় আগুন অনেকটা স্তিমিত হলেও, এখনও অন্তত আড়াই হাজারটি ‘পকেট ফায়ার’ রয়েছে গোটা অরণ্যে। অর্থাৎ এখনও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি, জ্বলছে ধিকধিক করে। এই অবস্থায় চিন্তিত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরাও। আসন্ন জি-৭ সামিটে এই আমাজন-বিপর্যয় প্রসঙ্গে জরুরি আলোচনার প্রস্তাব রেখেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল।

পরিবেশবিজ্ঞানীদের দাবি, চাষযোগ্য জমি তৈরির জন্য এবং খনিজ সম্পদের লোভে নির্বিচারে গাছ নষ্ট করার জন্য আগুন লাগানো হয়েছে। তাতেই সম্ভবত এমন দুর্দশার মুখে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর ফুসফুস। তথ্য বলছে, ২০০৩ সালেও এক বার এমনই সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল আমাজনের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায়। সে সময়ে ব্রাজিলের মাতো গ্রোসো এলাকা ছেয়ে গিয়েছিল প্রবল দূষণ, কালো ধোঁয়ায়। এই বারে ঠিক এমন দশা হয়েছে আমাজন থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরের শহর সাও পাওলো-তে।

২০০৩ সালের সেই বিপর্যয়ের সময়েও স্যাটেলাইট ছবি খতিয়ে দেখা গিয়েছিল, জঙ্গলের গাছ কেটে, শুকনো করে, পরিকল্পিত ভাবে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে, যা থেকে এমন দাবানল। সেই বার অবশ্য এতটা ঝলসে যাওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণ করা গিয়েছিল আগুন।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আমাজন একটি রেনফরেস্ট। বৃষ্টিচ্ছায় অরণ্য, চিরসবুজ। বছরভর বৃষ্টিতে সিক্ত। সূর্যের আলো প্রায় ঢোকেই না অরণ্যে। আর এখানেই উঠেছে বিশাল প্রশ্ন। এমন সিক্ত ও সবুজ অঞ্চল, এত বিস্তীর্ণ ভাবে কী করে দাবানলের শিকার হয়! যদিও তথ্য বলছে, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত আমাজনের আবহাওয়া একটু শুষ্ক থাকে। তাই সহজে আগুন নেভে না। প্রতি বছরই কম-বেশি দাবানল ধরে যায়। এই বারের স্যাটেলাইট ছবি ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে আর সেই তত্ত্বে সিলমোহর বসাতে পারছেন না পরিবেশবিদেরা।

কারণ দগ্ধ অরণ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের ছবিতে দেখা গিয়েছে, জঙ্গল কেটে সাফ করে মাটির চিত্রই বদলে ফেলা হয়েছে। ভেজা ঘাসে ভরে থাকা জমি একেবারে ফাঁকা ও শুকনো হয়ে গিয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে আরও ধরা পড়েছে, এই কাণ্ড করতে গিয়ে অরণ্যের গভীরে চলছে ট্রাক্টরও! উপড়ে ফেলে শুকনো হচ্ছে মাটি। ফলে আলগা হচ্ছে গাছের শিকড়, এমনিই মরে যাচ্ছে অনেক গাছ। সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি হারিয়ে যাচ্ছে এই চিরসবুজ অরণ্য থেকে।

আমাজনের এই পরিস্থিতির জন্য ইতিমধ্যেই আঙুল উঠেছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টে বোলসোনারোর দিকে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বেআইনি জমিনীতি নিয়েছে রাষ্ট্র। এই নীতিতে আমাজনের জঙ্গলের জমিতে কৃষিকাজ বা খননের কড়াকড়ি অনেকটাই আলগা হয়েছে। এবং সেই কারণেই জমি ও খনি মাফিয়ারা এই জঙ্গলকে যেমন-তেমন ভাবে ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ।

প্রেসিডেন্ট অবশ্য এ সব অভিযোগ উড়িয়ে পাল্টা নাশকতার দাবি এনেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ফান্ডিং কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তারাই সরকারকে পাকে ফেলতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার চেষ্টা না করে সাধারণ মানুষের নজর অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট। শুধু সেনা পাঠানো ছাড়া, আর কোনও পদক্ষেপই করেননি তিনি। সে জায়গায় বরং আকাশ পথে জলবাহী সুপার ট্যাঙ্কার বোয়িং ৭৪৭ বিমান পাঠিয়ে আগুন নেভানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলিভিয়া।

তবে এ সবের মাঝে কিন্তু জ্বলেই চলেছে অরণ্যের আগুন। ফলে যত দিন যাচ্ছে, তত মারা যাচ্ছে গাছেরা। শিকড় আলগা হয়ে গিয়ে শুকিয়ে যাওয়া গাছেদের মধ্যে আগুন বেড়ে চলেছে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল সবুজ। জঙ্গলের ছাদে ঘিরে থাকা ঘন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সে ছবি। যেখান দিয়ে সূর্যের আলো ঢোকাও দুষ্কর ছিল, তা সহজেই মেপে ফেলছে স্যাটেলাইট ক্যামেরার লেন্স।

ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের তরফে জানানো হয়েছে, আরও নিখুঁত ছবি আনার চেষ্টা করছে তারা।

পরিবেশবিজ্ঞানীরা আতঙ্কিত। আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। চোখের সামনে ঝলসে যাচ্ছে পৃথিবীর ফুসফুস। বিশ্বের সব চেয়ে বড় অরণ্য ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে জ্বলতে জ্বলতে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More