আদ্যোপান্ত নাটকের মানুষ ছিলেন নিমাইদা

নিমাই ঘোষ। বরেণ্য এই আলোকচিত্রী প্রয়াত হয়েছেন ২৬ মার্চ, ২০২০। ‘‘রে’জ ফোটোগ্রাফার’’ হিসেবে নিমাই ঘোষকে চেনে বিশ্ব। কিন্তু আদ্যেপান্ত নাটকের মানুষটির সখ্যতা ছিল উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের সঙ্গেও। নাট্যকর্মী ও অভিনেতা থেকে আলোকচিত্রী হয়ে ওঠা নিমাই ঘোষকে নিয়ে কলম ধরলেন তাঁর স্নেহধন্যা অভিনেত্রী।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সন্ধ্যা দে

    নিমাই ঘোষকে মানুষ চেনেন সত্যজিৎ রায়ের ফোটোগ্রাফার হিসেবে। কিন্তু তারও আগে নিমাই ঘোষ ছিলেন নাটকের মানুষ। কলেজে পড়তে পড়তে উৎপল দত্তের সান্নিধ্যে এসে তিনি এলটিজিতে যোগ দেন। এলটিজিতে থাকাকালীন তিনি অনেক নাটকে যুক্ত ছিলেন। অভিনয় করেছেন ‘ফেরারি ফৌজ’, ‘জুলিয়াস সিজার’, অঙ্গার’ প্রভৃতি নাটকে। থিয়েটারে থাকতে থাকতেই প্রখ্যাত আলোক-পরিকল্পক তাপস সেনের আলোর প্রয়োগপদ্ধতি, আলোছায়ার খেলা বুঝতে চেষ্টা করতেন। তখন নাটকের ছবি তুলতেন শম্ভু বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁকেও লক্ষ্য করতেন। দেখে দেখে ছবি তোলার প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। পরবর্তী কালে তিনি অভিনয় থেকে দূরে সরে আসেন এবং ফোটোগ্রাফিতে ঝুঁকে পড়েন। প্রথম দিকে অসংখ্য নাটকের ছবিও তুলেছেন। তার পরে বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়কে ক্যামেরায় ধরতে শুরু করেন। কিন্তু নাটকের প্রতি ভালবাসা ছিল আজীবন।

    ১৯৩৪-এর ৮ মে কলকাতায় জন্ম নিমাই ঘোষের। উৎপল দত্তের এলটিজি থেকে পিএলটি তৈরি হলে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। ‘চলাচল’ নামে নাট্যদল গড়ে তোলেন রবি ঘোষ, ভোলা দত্ত, সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল সেন প্রমুখ মিলে। ক্রমে ক্যামেরার চোখে দেখতে ও দেখাতে থাকেন জগৎকে। আমি থিয়েটারে আসি, নান্দীকারে, তার পর নান্দীমুখে। ১৯৭৮-এ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পাপপুণ্য’ নাটক নির্মাণ করেন। সেই নাটকের ছবি তুলেছিলেন একমাত্র নিমাই ঘোষ। সিগাল থেকে প্রকাশিত ‘থিয়েটার মোমেন্টস’ নামের বইতেও সেই ছবি আছে। এ ছাড়া বহুরূপী সহ অনেক নাট্যদলের বিভিন্ন প্রযোজনার বিভিন্ন মুহূর্ত ধরা রয়েছে সেই বইটিতে। সেই বহুমূল্য বইটি আমাকে এককপি দিয়েছিলেন নিমাইদা। আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।

    নিমাইদা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। থাকতেন পূর্ণ সিনেমার পিছনদিকে। অনেকবার গেছি ওঁদের বাড়িতে। বাড়ির সবাই আমাকে ভালবাসতেন। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ ভবানীপুরে চিত্তরঞ্জন সেবাসদনের চিলেকোঠায় থাকতাম। ৮০ সাল নাগাদ। আমি তখন কলেজে পড়াশুনো করি। নিমাইদা আসবেন। বাসায় কিছুই নেই তাঁকে আপ্যায়ন করব। নিউ মার্কেট থেকে কাপ-ডিস কিনে আনলাম চা দেব বলে। সেদিনের কথা আজ খুব মনে পড়ছে। আমার ছবি তুলবেন বলে একদিন নিমাইদা সাতসকালে ট্যাক্সি করে নিয়ে গেলেন ভিক্টোরিয়ায়। সেই প্রথমবার গেছি। কোনও মেকআপ ছাড়াই আমার ছবি তুললেন। আরেকবার বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড স্টুডিয়োতেও নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ব্যাকলাইট ব্যবহার করে আমার ছবি তুলেছিলেন। নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি।

     

    অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশেষ পছন্দ করতেন নিমাইদা। অজিতেশের অনেক নাটকের প্রচুর ছবি আমাকে দিয়েছিলেন। আমি খুব যত্ন করে রেখেছি সব ছবি। বাম আমলে সে ছবির প্রদর্শনীও করেছি। নিমাইদা দেখতে এসে আক্ষেপ করেছিলেন, আমার ছবিগুলি এ দেশ সংগ্রহ করল না। তখন নাট্য একাডেমিতে পবিত্র সরকার, নৃপেন সাহা প্রমুখ ছিলেন। আমি আবেদন করলাম, ছবিগুলি নিয়ে কিছু করা যায় কি না। তখন নিমাইদাকে ডেকে তাঁর তোলা ছবি সংগ্রহের ব্যবস্থা হয়। গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় প্রদর্শনের ব্যবস্থাও হয়। বিখ্যাত সব নাটকের মুহূর্তগুলি সর্বসমক্ষে আসে। নাটকের প্রতি এ হল নিমাইদার ভালবাসার নিদর্শন।

    নিমাইদা চলে গেলেন। এমন একটি নক্ষত্রপতন ঘটল, অথচ কোথাও কোনও শব্দ হল না, কম্পন জাগল না। আত্মবিস্মৃতির এতটাই অতলে পৌঁছে গিয়েছি আমরা!

    (নিমাই ঘোষের তোলা ‘পাপপুণ্য’ নাট্যের ছবি।অভিনেত্রী সন্ধ্যা দে-র সংগ্রহ থেকে।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More