শনিবার, অক্টোবর ১৯

দিদির মডেল যা, মোদীর মডেল তা

শঙ্খদীপ দাস

কথা রেখেছি। সমর্থন মূল্য বাড়িয়েছি। এ বার ভোটটা দেবেন তো!

সোমবার মেদিনীপুর কলেজিয়েট মাঠে কৃষি কল্যাণ সমাবেশের মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হয়তো গোটা গোটা শব্দে এই কথাগুলিই বলবেন না। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ঠারে ঠোরে বক্তব্য হবে এটাই। ঠিক যে ভাবে দিদি বলেন, জঙ্গলমহল হাসছে! পিছিয়ে পড়া মানুষগুলিকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়ার জন্য সরকার দু টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে। আগে কখনও হয়েছে বাংলায়!

তা হলে মানে কী দাঁড়াল?

একটাই। দিদি-র মডেল যা মোদীর মডেলও তাই।

রাজ্যের মোট জনসংখ্যার, বিশেষ করে গ্রাম ও পিছিয়ে পড়া এলাকার একটা বড় অংশের মানুষ কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, নিজশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পের উপভোক্তা। সরকার যে তাঁদের চাল, ডাল, সাইকেল, টাকা এমনকী শ্মশান যাত্রার খরচ দেয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো বটেই তৃণমূলের তস্য ছোট নেতাও প্রতি মুহূর্তে স্মরণ করিয়ে দেন, সেই ওয়েলফেয়ার স্টেটের অবদানের কথা। রেডিও, টিভি, সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনেও লেখা হয়, মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণাতেই এই সব প্রকল্প হচ্ছে। তাই উন্নয়নের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশেই থাকুন।

মোদী মডেল তার থেকে ভিন্ন কোথায়?

পাঁচ বছর আগে চোদ্দ-র ভোটের সময় যে মোদী মডেলের কথা বলা হয়েছিল তা ভুলে যান। কর্মসংস্থান, আর্থিক বৃদ্ধি, মেক ইন ইন্ডিয়া মায় ম্যাক্রো ইকোনমিক্সের অবস্থাকে দুরবস্থা বললেও কম বলা হয়। বরং এখন পরিষ্কার যে দিদির মতোই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিটাই মোদীর কাছে উনিশের ভোটে জেতার একমাত্র ফর্মুলা হয়ে উঠেছে।

দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বসে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতারাই জানাচ্ছেন, মোদী-অমিত শাহই তাঁদের সেই রোড ম্যাপ জানিয়ে দিয়েছেন। চার বছর আগে কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে পুরনো প্রকল্পে নতুন জামা পরিয়ে মোট পাঁচটি ক্ষেত্রে নতুন যোজনা শুরু করেছেন নরেন্দ্র মোদী। এক- আর্থিক অন্তর্নিবেশের জন্য প্রধানমন্ত্রী জনধন প্রকল্প, দুই- পরিচ্ছন্নতাকে জাতীয় মিশনে পরিণত করতে স্বচ্ছ ভারত অভিযান, তিন-রান্নার গ্যাসকে গ্রাম-গরিবের কাছে পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনা, চার-দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা এবং গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীরণের জন্য দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা।

এর পরেও ভোট বছরের জন্য আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ছিল আয়ুষ্মান ভারত যোজনা। যার আওতায় দেশের আশি শতাংশ মানুষকে বছরে পাঁচ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা দেবে সরকার। সম্ভবত, ১৫ অগস্টে লালকেল্লার বক্তৃতার মধ্যে দিয়ে ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়াও কদিন আগেই ধান-সহ ১৪ টি খারিফ শস্যের জন্য সমর্থন মূল্য এক ধাপে ২০০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। বিজেপি-র দাবি, প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন পাঁচ বছরের মধ্যে কৃষকদের বিনিয়োগের উপর মুনাফা ৫০ শতাংশ করে দেখাবেন। সরকারের হিসাব মতো ১ কুইন্টাল ধান উৎপাদন করতে কৃষকদের এখন খরচ হয় ১১৬৬ টাকা। সমর্থন মূল্য কুইন্টাল প্রতি ১৭৫০ টাকা করার ফলে মুনাফা ৫০ শতাংশই হওয়ার কথা।

বিজেপি নেতারা জানাচ্ছে, মোদী-অমিত শাহ তাঁদের পরিসংখ্যান দিয়ে জানিয়েছেন দেশের ২২ কোটি পরিবার সরকারের থেকে এই সব প্রকল্পগুলির একটি বা দুটি-র সুবিধা পায়। সুতরাং এই ২২ কোটি পরিবারকেই টার্গেট করতে হবে। ২২ কোটি পরিবার মানে প্রায় একশো কোটি মানুষ। অমিত শাহদের বক্তব্য, চোদ্দর ভোটে বিজেপি ৩১ শতাংশ ভোট তথা ১৭.১৬ কোটি মানুষের ভোট পেয়েছিল। কংগ্রেস পেয়েছিল ১০ কোটি ৭০ লক্ষ ভোট। এ বারও ২২ কোটি উপভোক্তা পরিবার থেকে বিজেপি যদি ১২ থেকে ১৫ কোটি ভোট সুনিশ্চিত করতে পারে তা হলেই কেল্লা ফতে!

সুদূর মেদিনীপুরে এসে প্রধানমন্ত্রীর কৃষি কল্যাণ সমাবেশ করার রাজনৈতিক কারণ এতক্ষণে হয়তো বোধগম্য। কেবল তাই নয়, মোদী-শাহরা বাংলায় একটা নতুন পথও নিয়েছেন। কেন্দ্রের প্রকল্পের প্রচারের পাশাপাশি এ-ও বলতে চাইছেন, রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার যে ২ টাকা কিলো চাল দেয়, তা আসলে দেয় কেন্দ্র। রাস্তা ঘাট, জল, বিদ্যুৎ সবই হচ্ছে কেন্দ্রের টাকায়। অর্থাৎ কৃতিত্বের ভাগাভাগি যাতে না হয়, তাও নিশ্চিত করতে চাইছেন তাঁরা।

বাস্তব হল, কেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের সময়েও সামাজিক সুরক্ষার জন্য কম প্রকল্পের বাস্তবায়ন হয়নি। সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোপণ্যের দাম ছিল চড়া। সীমিত আর্থিক পরিসরের মধ্যেও সনিয়া গান্ধীর চাপে সামাজিক সুরক্ষায় দেদার অর্থ বরাদ্দ করেছিল মনমোহন সরকার। খাদ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করে ২ টাকা কেজি দরে চাল, গম সরবরাহর জন্য কৃতিত্ব পাওনা মনমোহন-সনিয়ার। ঘটনা হল, মনমোহন সিংহ পরবর্তীকালে বলেছিলেন, কেন্দ্র সামাজিক সুরক্ষায় যে সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে, তার প্রচার ঠিক মতো করতে পারেনি কংগ্রেস। মোদীর প্রচারের জৌলসে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ায় কংগ্রেস সরকারের কাজ দেখতে পায়নি অনেকেই।

মনমোহন ঠিকই বলেছিলেন, প্রচারে বিজেপি-কে হারানো মুশকিল। প্রচারে আধুনিকতা আনতে এক সময় এক সময় প্রমোদ মহাজন দলকে যে মন্ত্র শিখিয়েছিলেন, সেই পাঠে এখন রীতিমতো গবেষণা করে ফেলেছেন অমিত শাহ-রা। উপভোক্তারা যখন সরকারের প্রকল্পের প্রসাদ পেয়েছে তখন প্রচারও দেখতে হবে তাদের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-নরেন্দ্র মোদী সেখানে ফারাক নেই। মডেল একই।

Leave A Reply