বৃহস্পতিবার, জুন ২০

মানবদরদী দুটি মনের মিলন ইতিহাস গড়ল ব্রিটেনে

চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত

 শিশু চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলে যে শিশু, জন্ম থেকে ৬ বছর বয়স পর্যন্ত যে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়, সেগুলোই তার ব্যক্তিত্ব ও মানসিক গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারির ক্ষেত্রেও তার বিকল্প ঘটেনি। মানবদরদী ও মানবসেবা – মায়ের শেখানো এই দুই বীজমন্ত্র তাঁদের জীবনের মূল প্রেরণা। মায়ের অবর্তমানেও সেই মানসিকতা পাল্টায়নি।  শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার জন্য যাঁরা জীবনের মূল স্রোতের বাইরে পড়ে রয়েছেন, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার একান্ত চেষ্টা এই দুই ভাইয়ের, বিশেষ করে হ্যারির।  

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হ্যারির ‘সেন্টিবালি’ চ্যারিটি। সেন্টিবালি – দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রভাষা সুসুথুতে যার মানে ‘ফরগেট মি নট’। এই সংস্থাটি বোত্‌সোয়ানা, লেসুটু এবং তার পারিপার্শ্বিক এলাকায় এইড্‌স্‌ আক্রান্ত ৫ লক্ষ অনাথ বাচ্চার চিকিৎসা, পুষ্টি ও সুস্থ জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে। হ্যারি জানিয়েছিলেন যে এইড্‌স্‌ নিয়ে তার মা যে কাজ শুরু করেছিলেন তা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর এই উদ্যোগ।

হ্যারির আর একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ‘ইনভিকটাস্‌ গেমস্‌’। ইনভিকটাস্ – ল্যাটিন ভাষায় যার অর্থ ‘অপরাজিত’। যুদ্ধে আহত অক্ষম সৈন্যদের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। প্রথম শুরু হয় ২০১৪ সালে, লন্ডনে। এর পর প্রতি বছর পৃথিবীর নানা দেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। হ্যারির মতে, প্রতিবন্ধকতার উর্ধ্বে যে জীবনের উৎসব, এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা তারই প্রতীক। এই বাৎসরিক অনুষ্ঠান দেশের মানুষকে মনে করিয়ে দেবে দেশের সৈন্যদের অবদানের কথা।

আর মেগান?…।  তিনি তো সেই এগারো বছর থেকেই বৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। জুলাই মাসের সেই গ্রীষ্মসন্ধ্যায় যেদিন তাঁর প্রথম হ্যারির সাথে দেখা, তার বহু আগে থেকেই মেগান বহু আন্তর্জাতিক সমাজসেবী উদ্যোগে সক্রিয়। গ্লোবাল ভিশন চ্যারিটি সংস্থার বিশ্বপ্রতিনিধি হিসাবে তিনি আফ্রিকার রোয়ান্ডায় পরিষ্কার পানীয় জল সরবরাহের ব্যবস্থায় কাজ করেছিলেন। এই একই সংস্থার হয়ে তিনি মুম্বই শহরে ময়না মহিলা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করছেন রজঃস্বলা মহিলাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে।

নিজের মা ছাড়া, তাঁর পরিচিত অন্য কোনও মহিলাকে সমাজসেবার কাজে এতখানি জড়িত থাকতে দেখেননি হ্যারি। তাই তিনি মুগ্ধ হন এই মিশ্রবর্ণের মেয়ের বন্ধুত্বপূর্ণ, আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব দেখে। বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে হ্যারি বলেছিলেন যে তিনি এত কম সময়ের মধ্যে কোনও মহিলার প্রেমে এত গভীরভাবে  পড়েননি। সেই জন্যই তাঁর বিশ্বাস যে এই মিলন নিয়তির নির্দেশ।

লেডি কলিন ক্যাম্পবেল, যিনি ১৯৯৮ সালে ডায়ানার জীবনী লিখেছিলেন, বলেন যে এই বিবাহে ডায়ানা অত্যন্ত খুশি হতেন। ডায়ানা সবসময় বলতেন, ‘আই ওয়ান্ট মাই সন্স টু বি মেন ফার্স্ট এন্ড প্রিন্সেস সেকেন্ড’। মায়ের এই ইচ্ছে পূরণ করেছেন হ্যারি।

মেগানকে দেওয়া আংটিতে মায়ের ব্যবহৃত দুটি হীরে বসিয়ে, তাঁর বিবাহিত জীবনের অনিবার্য উপস্থিতি দিয়েছেন তাঁকে। শুধু তাই নয়, এই দম্পতি তাঁদের বিয়েতে কোনও উপহার না নিয়ে, নিমন্ত্রিত অতিথিদের অনুরোধ করেছিলেন যে তাঁরা যেন হ্যারি ও মেগানের পছন্দের সাতটি চ্যারিটির যে কোনও একটিকে সাহায্য করেন। সেই তালিকায় ভারতের ময়না মহিলা ফাউন্ডেশনও রয়েছে।

প্রিন্স হ্যারি ও মেগানের শুভ পরিণয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তো বটেই, এমনকী, মানব সভ্যতার ইতিহাসেও এক ঐতিহাসিক ঘটনা। জাতি, শ্রেণী, ধর্ম, বর্ণ এ সবের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী ভেঙ্গে, মানবদরদী দুটি সুন্দর মনের মিলন ঘটেছে, যারা বিশ্বের জনহিতকারী কাজে ব্যস্ত। লেডি ক্যাম্পবেলের মতে, মেগান হল ব্রিটিশ রাজপরিবারে ঈশ্বরদত্ত আশীর্বাদ। এই শুভ পরিণয় ব্রিটিশ সমাজর সামনে মানবমৈত্রীর নিদর্শন হয়ে থাকবে।

অচলায়তনের দুর্ভেদ্য প্রাচীরে মা ফাটল ধরিয়েছিলেন, আর পুত্র সেই প্রাচীর ধুলিসাৎ করে বিশ্বকে আলিঙ্গন করেছেন। বসুধৈব কুটুম্বকম্‌।       (সমাপ্ত)

 

লন্ডনবাসী ডঃ চান্দ্রেয়ী সেনগুপ্ত পেশায় শিশুচিকিৎসক। সেন্ট মেরি’স হাসপাতালে কর্মরতা। চান্দ্রেয়ীর জন্ম ও শিক্ষা প্রধানত কলকাতায়। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর নেশা সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি, যার অনেকটা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। নির্বাক চলচিত্র যুগের অভিনেতা চারু রায়ের দৌহিত্রী তিনি।  তিনি লন্ডনে গড়েছেন এক নাট্যদল, ইস্টার্র্ন থেস্‌পিয়ান্স। যেটি মননশীল মৌলিক নাটক পরিবেশন করে ইংল্যান্ডে সুখ্যাতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া ‘রয়্যাল ওয়েডিং’ নিয়ে তাঁর রচনা সাগরপারের রূপকথা।

 

 

 

Leave A Reply