ব্ল্যাকহোল-গবেষণায় নতুন মাত্রা! ১৮ বছরেই রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির ফেলো অমল

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ব্ল্যাকহোল। ব্রহ্মাণ্ডের এমন একটা বিষয়, যেটা নিয়ে কৌতূহল এবং গবেষণার শেষ নেই আজও। এ বিষয়ে একটি সুপরিচিত উপপাদ্য হল, ‘নো হেয়ার থিওরেম’। যার মাধ্যমে কোনও ব্ল্যাকহোলের সমস্ত প্রপার্টি বিচার করা যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনও ব্ল্যাকহোলের মাস, ইলেকট্রিক চার্জ এবং অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম– এই তিনটে ফ্যাক্টর জানা থাকলেই, নো হেয়ার থিওরেমের মাধ্যমে কোনও ব্ল্যাকহোলের সমস্ত প্রপার্টি জানা যায়।

কিন্তু অমল বলছে অন্য কথা। সম্পূর্ণ অন্য একটি প্যারামিটারের হিসেব ব্যাখ্যা করে, সে নতুন করে মেলাতে চাইছে ব্ল্যাকহোল-হিসেব।

কী রকম?

বস্তুত, সারা বিশ্বে যে মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন ছড়িয়ে আছে, রেলিক অফ দ্য বিগ ব্যাং, ব্রহ্মাণ্ডের ব্যাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়েছে। হতে হতে, সেগুলো এখন খুবই ঠান্ডা অবস্থায়, গড়ে ২.৭ ডিগ্রি কেলভিন তাপমাত্রায় রয়েছে। এই রেডিয়েশনের কথা নতুন নয়, বিজ্ঞানের খাতায় পরিচিত বিষয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছেয়ে রয়েছে এই রেডিয়েশন। কিন্তু এর তাপমাত্রা সর্বত্র একই নয়। সামান্য তারতম্য আছে জায়গা-ভেদে।

এখন অমল বলছে, সম্পূর্ণ ভাবে আইডেন্টিক্যাল দু’টো ব্ল্যাকহোল যদি দু’টি আলাদা জায়গায় থাকে, আর সে দু’টি জায়গায় উপস্থিত রেডিয়েশনের তাপমাত্রা যদি আলাদা হয়, তা হলে তার উপর নির্ভর করে ব্ল্যাকহোলের মাস, তাপমাত্রা ও এনট্রপিও পাল্টে যাবে। এ কথা শুধু বলেইনি অমল। নির্ভুল অঙ্ক কষে দেখিয়েছে, কত তাপমাত্রার ফারাকে কতটা পরিবর্তন হবে ব্ল্যাকহোলের।

অমলের এই বিষয়ে লিখিত একটি পেপারের দৌলতেই ব্রিটেনের রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে মাত্র ১৮ বছরের এই কিশোর! অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্স মহল বলছে, ব্ল্যাকহোল গবেষণায় এর আগে এই নতুন প্যারামিটারটি নিয়ে এর আগে কেউ কাজই করেননি।

কিন্তু কে এই অমল?

নামের মতোই ছোট্ট এবং সহজ তার পরিচয়। পাটনার দিল্লি পাবলিক স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র, অমল পুষ্প। আগামী বছর এপ্রিল মাসে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে সে। এর মধ্যেই, ব্ল্যাকহোল গবেষণা নিয়ে তার লেখা অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্সের পেপারটি রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমির স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ায় বিস্মিত বিজ্ঞানী মহল!

তবে এই সবটাই হয়েছে, বিজ্ঞানী পার্থ ঘোষের হাত ধরে। অমল জানিয়েছে, পার্থর একটি ছোট্ট রেকমেন্ডেশনই গোটা বিষয়টা এই রকম আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ বোস ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন প্রফেসর ও গবেষক পার্থ ঘোষ বললেন, “মাস কয়েক আগে আমার কাছে একটি ই-মেল আসে। অমল পুষ্প নামের পাটনার একটি ছেলে জানায়, ও একটি পেপার পাঠিয়েছে আমায়। আমি যাতে সেটি কোথাও প্রকাশ করার জন্য রেকমেন্ড করি, সে বিষয়ে অনুরোধ করে।”

বিজ্ঞানী পার্থ ঘোষ।

পেপারটি পড়ার পরেই রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে যান পার্থ। “মাত্র বছর আঠেরোর একটা ছেলে, এত পড়াশোনা, এত পরিষ্কার চিন্তা, এত জ্ঞান… আমার প্রচণ্ড আগ্রহ জন্মায়। খুব খুঁটিয়ে সবটা পড়ি আমি। এবং আমার ওর সমস্ত যুক্তি ও অঙ্কই নির্ভুল বলে মনে হয়। এর পরেই আমি ওর এই পেপারটা এনডোর্স করি।” অমলের মতে, পার্থর সেই রেকমেন্ডেশনের ভিত্তিতেই একটি ফরাসি আর্কাইভ ‘হ্যাল‘ এই পেপারটি সিলেক্ট করে এবং নিজেদের সাইটে আপলোড করে। পেপারটির নাম, ‘এ নিউ এফেক্ট ইন ব্ল্যাকহোল ফিজ়িক্স’।

আর এর পরেই ঘটে যায় ম্যাজিক। পার্থর অজান্তেই পেপারটি চোখে পড়ে যায় রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির সদস্য, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির এমেরিটাস প্রফেসর, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লর্ড মার্টিন রিজ়ের। এবং এর পরে অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটি থেকেই অমলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তাঁরা। অমলকে ফেলো হিসেবে নির্বাচিত করার কথা কথা জানান। বিস্মিত অমল মেল করে সবটা জানায় পার্থকে। অকুণ্ঠ ধন্যবাদ জানায়, তাঁর রেকমেন্ডেশনের জন্য। স্নেহভাজনের সাফল্যে অত্যন্ত খুশি হন পার্থ নিজেও। খানিক চমকিতও হন, যে তাঁর রেকমেন্ড করা পেপারের ভিত্তিতেই কি এত বড় সাফল্য অর্জন করল অমল! এর পরেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

উচ্চ মাধ্যমিকের পরে দেশেরই কোনও এক টপ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে চায় অমল। পার্থর কাছে এমনটাই অনুরোধ তার। এদিকে, তার এত দিনের পরীক্ষার সামগ্রিক ফলাফল খুব একটা ভাল নয়। অমলের স্কুলের প্রিন্সিপাল বি বিনোদ বলছেন, “হবে কী করে! ও কি ফিজ়িক্স ছাড়া আর কিছু পড়ে? ওই বিষয়টায় ফুল মার্কস বাঁধা। কিন্তু বাকি সব সাবজেক্টেই তো পিছিয়ে পড়ছে! এরকম করলে গোটা রেজ়াল্টই তো খারাপ হবে!”

পিতৃসুলভ হেসে পার্থ বললেন, “এখন কী করে ওকে টপ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করব, সেটাই আমার চিন্তা। সামগ্রিক রেজ়াল্ট ভাল না হলে তো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে ও। কিন্তু এরকম অ্যাচিভমেন্টও তো এইটুকু বয়সে আগে কেউ করতে পারেনি সারা বিশ্বে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে নির্বাচিত হচ্ছে রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটিতে! ভাবা যায়! তাই এই দিকটা ভেবে ওকে যদি একটু কনসিডার করা হয় ওর আগামী শিক্ষা জীবনে, সেটা খুবই ভাল হবে।”

রয়্যাল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির ইতিহাস বলছে, ১৮ বছরের ওপর হলেই যে কারও পেপার এই ফেলোশিপের জন্য নির্বাচিত হতে পারে। কিন্তু এত দিন এই ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন অভিজ্ঞ গবেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসরেরাই। মাত্র ১৮ বছরের অমলের কীর্তি সারা বিশ্বের বিজ্ঞান মহলে তাক লাগিয়ে দিয়েছে রীতিমতো!

পার্থও বলছেন সেই কথাই। এই বয়সে ও যে বিশাল একটা কাজ করে ফেলেছে, তার তুলনা হয় না সারা বিশ্বে। তাই এ দেশের শিক্ষা কাঠামোর কাছে ওর কাজ যেন শুধু নম্বর নয়, মেধার ভিত্তিতেই স্বীকৃত হয়, সেটাই আশা করছেন তিনি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More